সতেরোর অর্ধেক আকাশ : সবে হয়তো অর্ধেক পথ

অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

অর্ধেক আকাশ মেঘাচ্ছন্ন।

সেখানে মাঝে মাঝে বজ্রপাত, বিদ্যুতের ঝলক। আর ক্বচিৎ কদাচিৎ মেঘ কেটে হঠাৎ যেন সূর্যের এক চিলতে আলো।

তেমনই একটা তিন তালাক বিল। লোকসভায় সদ্য পাশ হওয়া এই বিল নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। এক দিকের বিবাদটা যখন ইসলাম ধর্ম, শরিয়ত, ও মুসলিম ব্যক্তিগত আইন নিয়ে, অন্যদিকটা অবশ্যই নারী মুক্তি ও তাঁদের ক্ষমতায়ন নিয়ে। আমাদের বিচার্য, পরেরটা।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, তিন তালাক বিল মহিলাদের একার্থে শক্তি জোগাবেই। এক নিমেষে যেখানে ছিন্ন হত সব বন্ধন, মহিলাদের মেনে নিতে হত ‘নিয়তি’কে, সেখানে তাঁরা কিছুটা হলেও শক্তিশালী হলেন। কেউ কেউ হয়তো এর ফলে আইনি সহায়তা নিতে ভরসা পাবেন। কাজেই ধর্মীয় বিতর্ক বাদ দিলে, তিন তালাক বিল একটা নতুন দিশা দেখাল। কিন্তু এ তো গেল সাদা চোখে তালাক বিলের ঝটিতি বিশ্লেষণ।

কিন্তু তা কি শুধুই মুসলিম সমাজে সীমাবদ্ধ নাকি এটা একটা প্রেক্ষাপট মাত্র, যার ব্যাপ্তি অনেকটা?

আসলে এই বিল মেয়েদের কতটা এগিয়ে দিল? বা অধিকার দিলেও কত জন তা প্রয়োগ করতে পারবেন? কত জন মহিলা সমাজ, সংস্কার ও ধর্মীয় অনুশাসনের বাধা ডিঙিয়ে গিয়ে দ্বারস্থ হবেন আদালতের? সাহস করে যেতে পারবেন পুলিশে?

এতে অনেকরই হয়তো কপাল কুঁচকে যাবে, মনে করবেন, আমি নিশ্চয় মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব থেকে এ কথা বলছি। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

তাকিয়ে দেখুন নিজের সমাজকে। তা হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ হিসেবে নয়, আমার-আপনার আশপাশের সবাইকে নিয়েই সেই সমাজ। যেখানে মেয়ে হয়ে জন্মানো অনেকের কাছে এখনও অপরাধ, পাপ। যে সমাজ চোখে আঙুল দিয়ে ভাবতে শেখায়, ‘মেয়ে, তুমি তো পণ্য। তোমার সব কিছু বিক্রির অধিকার রয়েছে পুরুষতন্ত্রের। তাই বিজ্ঞাপনে বেচব, বিয়ের বাজারে বেচব, একা মেয়ে দেখলে ব্যবসার জন্য বেচব।’ আর মেয়ে তুমি প্রতিবাদী হলে, সে তোমার স্পর্ধা, সে তোমার সাহস। যাকে ঘেন্না করে দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা। তাঁরা চান, মহিলারা এখনও আটকে থাকুক হেঁশেলে ও আঁতুড়ে। আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য মুখাপেক্ষী থাকুক পরিবারের পুরুষ বা পুরুষদের প্রতি। তা হলেই কোনওদিন আর খাঁচার পাখি বনের পাখি হওয়ার জন্য ছটফটাবে না।

কিন্তু পাখির স্বভাবই যে তাই। আর সে জন্যই ইশরত জাহান, সায়রা বানুরা ডানা ঝাপটিয়ে পৌঁছে যান শীর্ষ আদালতে। প্রশ্ন তোলেন, তাৎক্ষণিক তিন তালাকের বৈধতা নিয়ে। সুপ্রিম কোর্টকে ঘাঁটতে হয় সংবিধান, জানিয়ে দিতে হয়, ‘যে রীতি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী, তা কিছুতেই বৈধ নয়।’

ধর্ম ও রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রাখলে, এই রায় নিঃসন্দেহে সুদূরপ্রসারী। মুসলিম মহিলারা, তিন তালাকের মাধ্যমে যে অবিচারের শিকার হন, তার থেকে মুক্তি তো বটেই। এই প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হবে শাহ বানো মামলায়। সেটা ১৯৮৫ সাল, সুপ্রিম কোর্ট তার ঐতিহাসিক রায়ে জানায়, খোরপোষ দিতে হবে তালাকপ্রাপ্ত মহিলাকে। দেশ জুড়ে শুরু হয়, তুমুল বিতর্ক। চাপের মুখে পিছু হঠে রাজীব গান্ধী সরকার। ৩২ বছর আগের সেই রায় খাতাবন্দি হয়ে রয়ে যায়, থমকে থাকে মুসলিম নারীর অধিকার। সেই বিচারে তিন দশক পরে যেন কিছুটা শাপমোচন। কিন্তু…

তাই প্রশ্নটা মাত্রার। কতটা মুক্তি এল এই আইনে?

হয়তো এল। হয়তো এল না। বা আসার পথ প্রশস্ত হল।

এমন ভাবনার কারণ, আমাদের দেশেরই আরও কয়েকটি আইন। এই যেমন গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধে আইন হয়েছে, বেশ কয়েক বছর। বাড়িতে চুলের মুঠি ধরে টানা হোক বা মানসিক উৎপীড়ন — এ সব কিছুর জন্যই কিন্তু মহিলারা আইনের সাহায্য পেতে পারেন। তাই আইনটি যখন এসেছিল, নারীর ক্ষমতায়নে বিশাল মাইলফলক। কিন্তু তার পরের কয়েকটি বছরে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর নথিতে দেখা গিয়েছে, মহিলাদের উপর যে সব ধরনের নির্যাতন হয়, তাতে বাড়ির মধ্যে নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি। কাজেই আইন আছে, কিন্তু ফল কি তেমন হয়েছে?

এবার তাকানো যাক কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ আইনের দিকে। কর্মরত মহিলাদের যদি কাজের জায়গায় কোনওরকম অশালীন আচরণ বা যৌন হেনস্থার শিকার হতে হয়, সে ক্ষেত্রে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তাঁর কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সেলে জানাতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতিটি অফিসে যৌন অভিযোগ দায়ের করার জন্য সেল থাকা বাধ্যতামূলক। এক কথায় যাকে আমরা বিশাখা আইন বলে জানি।

এই আইন যখন কার্যকর হল, তখন তা নিয়ে বলা হয়েছিল, মহিলাদের ক্ষমতায়নে বিশাল দিশা। কাগজে কলমে তো তা বটেই। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে?

মহিলারা নালিশ করলে তাঁদেরই পড়তে হচ্ছে শাস্তির মধ্যে। এমনকি চলে যাচ্ছে চাকরিও। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, অভিযোগকারিণীর চরিত্র নিয়েও। কিন্তু দেশের আইন বলছে, বিশাখা গাইডলাইন মহিলাদেরই রক্ষাকবচ।

সেভাবেই পণ প্রথা রোধে ৪৯৮এ মহিলাদের জন্যই। তার যে কোনও অপব্যবহার হয় না, এমন নয়। কিন্তু যত সংখ্যক মহিলা শ্বশুরবাড়িতে নিপীড়নের শিকার, তার তুলনায় অপব্যবহার কতটা? সেই আইনের সুবিধা নিতে পারেন কজন? আর যাঁরা পান তাঁদের প্রতি সমাজের আচরণ কেমন হয়? শুরু হয় সেই মহিলাকে নিয়ে নানা কৌতূহল। চলতে থাকে নানা আলোচনা। মানসিক শান্তি বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

এবার এক নজরে তাকান বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইনে। সেখানে ১৮ বছরের নীচে মেয়ের ও ২১ বছরের নীচে ছেলের বিয়ে দেওয়া অপরাধ, কিন্তু কোথাও বলা নেই, সংশ্লিষ্ট বয়সের নীচে বিয়ে হলে তা অবৈধ। এরও শিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় কিশোরীরা। আর তার সঙ্গে সংশ্লেষ রেখেই তাই সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, পনেরো বছর বয়সী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের অর্থ নাবালিকা ধর্ষণ। কিন্তু ওই পর্যন্তই। যে কিশোরীর ১৫ বছরে বিয়ে হচ্ছে, সে আদৌ পারবে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনতে? সরকারি একাধিক রিপোর্ট যেখানে বলছে, বাল্যবিবাহ মাত্রাছাড়া, সেখানে এই আইন বা রায়, কতটা কার্যকর করা যাবে?

কিন্তু তবু অনন্ত জাগে।

আর সেখানেই জয় হয় প্রতিবাদের। সাহসের।

মিলে মিশে এক হয়ে যায় ইশরত, তৃপ্তি ও বালিকাবধূরা। তাঁদের কেউ পুরুষের ইচ্ছায় তালাকের বিরুদ্ধে, কেউ শনি মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢোকার অনুমতি আদায় করে, আবার কেউ নিজের বিয়ের প্রতিবাদ করে জাগিয়ে তোলেন সমাজকে। পুরুষতন্ত্রের কঠোর অপ্রয়োজনীয় অনুশাসনকে প্রশ্ন করে নড়িয়ে দেয় জগদ্দল পাথর। অচলায়তন মুক্তির প্রতীক্ষায় ব্যগ্র হয়।

কারণ যে সমাজ পায়ে বেড়ি পরিয়ে রেখেছে, সেই সমাজেই মাথা তোলার স্বপ্ন দেখান তাঁরা।

তাই তিন তালাক নিয়ে যখন নানা বিতর্ক, তখন সেটাই পথ দেখায় এগিয়ে চলার। এক সময় ঠিক যেভাবে পথ দেখিয়েছিল সতীদাহ নিবারণ আইন, বিধবা বিবাহ আইন বা দেবদাসী বিলুপ্তি প্রথা। সেখানে ধর্ম নয়, সমাজে নারীর ন্যায্য অধিকার ও প্রয়োজনীয়তাই মুখ্য হয়ে ওঠে।

কোনও হিন্দু স্ত্রী যখন স্বামীবিচ্ছিন্না হন তখন তাকে সমাজ পরিহাস করে, মুসলিম রমণী যখন তালাক পান সমাজ তাকেই অভিযুক্ত করে।

তাই আইন নয়, বদলাতে হবে সমাজভাবনার খোলনলচে। তাহলে নারী বিবর্জিতা নন, বিজয়া হবেন। সেখানেই আসবে পরিবর্তন।

আইন থাকুক শক্তি হিসেবে কিন্তু জারিত হোক অন্তরের সেই শক্তি, যা নিজে থেকেই সূচনা করবে বিজয়পথের।

কন্যা হলে তার বিয়ের চিন্তা নয়, তাকে মানুষ করে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর স্বপ্ন দেখুক মা-বাবার। কন্যাভ্রূণ হত্যা করা নয়, তাকে ঘিরে শুরু হোক উৎসব। তা হলে আর বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও স্লোগানের প্রয়োজন হবে না, মেয়েকে পড়াতে হবে না কন্যাশ্রীর লোভে। নিজের দিশাতেই পথ খুঁজে পাবে সকলে।

সেটাই হবে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন। সেখানে তালাক বা বিচ্ছেদ নয়, সমাজের প্রতিটি শিরা-ধমনীতে বয়ে যাক সেই শক্তির রক্তকণিকা।

জয় হোক চেতনার, ভারসাম্যের। আড়ালেই থাকুক ধর্ম আর রাজনীতির বিষাক্ত সমীকরণ।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*