মৌমাছি, টুপি, ঘোড়সওয়ার

স্বাতী ভট্টাচার্য

 

দাঁত উঠলে শিশুরা যেমন সব কিছু কামড়ে বেড়ায়, পড়তে শেখার পর আমার দশা হয়েছিল সেই রকম। সব সময়ে মন সুড়সুড়, কী পড়ি কী পড়ি। একবার গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি গিয়েছি। সেখানে মাসতুতো বোন আগেই এসে ঘাঁটি গেড়েছে। আমার বই-বই বাই দেখে সে বলল, এ বাড়িতে এসে সে নাকি দারুণ মজার একটা বই পড়েছে, তার নাম ‘জ্যান্ত টুপি।’

কোথায় রে বইটা?

এখানেই তো ছিল, কোথায় যে গেল!

খোঁজ খোঁজ, দ্যাখ দ্যাখ। দুই মামী, দুই মামা, কেউ মনে করতে পারল না তেমন কোনও বইয়ের কথা। আমার মুখের চেহারা দেখেই হয়তো মামামণি কথা দিল, আজই বাজার করতে গিয়ে বইটার খোঁজ করবে, নইলে একটা সত্যিকারের টুপি আনবে আমার জন্য। তারপর যা হয়, তাই হল। বই এল না, টুপিও না। ‘জ্যান্ত টুপি’ আজও আমার মাথায় চেপে আছে, রাতে ঘুম ভেঙে মনে হয়, ইস কী যে কাণ্ড হয়েছিল টুপিটা নিয়ে সিটিজেন কেন মরার আগে ফিসফিস করে বলে গিয়েছিল ‘রোজবাড’, তেমনি আমি যদি বলে যাই ‘জ্যান্ত টুপি’, তা হলে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের প্যাসেঞ্জাররা অন্তত বুঝবেন ব্যাপারটা।

কিন্তু তখন ক্রাইসিস, পড়ি কী? মামার তাক ঘেঁটে একটা বই পেলাম, ‘মৌমাছিতন্ত্র।’ তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, কোথায় মৌমাছির গল্প আছে। কোত্থাও নেই। ‘মৌমাছি’ কথাটা পর্যন্ত একবারও লেখা নেই। তখনও তাড়াহুড়ো করে খুলতে গেলে ইজেরে গিঁট বেঁধে যায়, সেই বয়সেই বুঝলাম, বড়দের জন্মই হয়েছে ছোটদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য। নিজে বড়র দলে ভিড়েছি অনেকদিন, তবু সে দিনের বিশ্বাসটা যায়নি।

‘মৌমাছিতন্ত্র’ বইটাও আর পড়া হয়নি। শিবনারায়ণ রায়ের লেখা প্রবন্ধ, তাঁর সম্পাদিত ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকা পড়েছি, কিন্তু ওই বইটা কেন জানি হাতে আসেনি। খুঁজলে নিশ্চয়ই পাব, কিন্তু আমার সে দিনের মধুর নিরাশা কি আর ঘুচবে হেজেমনির কড়া তত্ত্বে?

খিদে যখন বেশি, খাবার না পেলে কষ্টটা তখনই বেশি হয়। তাই ছেলেবেলার না-পড়ার কত আফশোস মনে পড়ছে। তুতো দিদিরা সন্দেশ পত্রিকা রাখত, অনেকগুলো সংখ্যা একত্রে বাঁধাই করিয়ে নিত। কালের নিয়মে সেই সম্পদ এল আমার হাতে। কিন্তু হায়, মাঝের এক একটা সংখ্যা মিসিং। ব্যস, বাদ পড়ে যায় ওই সংখ্যায় গন্ডালুর কীর্তি। কালু কী দুঃসাহসী কাজ করল, বুলু বেচারির আতঙ্ক কাটল কি না, কে এবার বলে দেবে? গল্পটাও তো সাংঘাতিক, মাঝরাতে মেয়েদের হস্টেলে শোনা যায় অদৃশ্য ঘোড়সওয়ারের ছুটে যাওয়ার আওয়াজ, খটাখট খটাখট। গায়ে কাঁটা দিত, গল্পে মাঝের ফাঁকগুলো ভরাতে হত কল্পনা দিয়ে। অনেক পরে বই আকারে হাতে এসেছিল নলিনী দাশের ‘মধ্যরাতের ঘোড়সওয়ার।’ তখন আর মনে পড়ে না, কোন কোন চ্যাপটার মিস হয়েছিল। পড়া শেষ করার পরেও না-পড়ার আক্ষেপটা ফিকে হল না।

পড়তে পারিনি স্কুল লাইব্রেরির কাচের আলমারির ভিতরে রাখা চকচকে রঙিন বইগুলো। খড়ের গাদায় কুকুরের ভূমিকাটি নিয়েছিলেন শ্রীমতী লাইব্রেরিয়ান, মলিনা মিস। কতগুলো মলিন, চটা-ওঠা, শস্তা বাংলা বই বার করে রাখতেন। ‘কঙ্গোর জঙ্গলে ভল্টুদা’, ‘মধ্যরাতের ভযঙ্কর’, এমন সব নাম। সেই রদ্দি মালগুলো আমাদের মধ্যে ঘোরাতেন, ফেরত দিতে দেরি করলে ফাইন গুনতেন, কিন্তু ভাল বইয়ে ঠাসা আলমারি খুলে দিতেন না। পরে গোলপার্কে  রামকৃষ্ণ মিশনের জুনিয়র লাইব্রেরি গিয়ে সে দুঃখ একটু মিটেছিল। সারি সারি বই নাগালের মধ্যে, হাত দিলে কেউ বকবে না, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। ঠিক তেমনই অবাক হয়েছিলাম প্রথম বিদেশে পড়তে গিয়ে। লাইব্রেরি কার্ড তৈরি করে প্রশ্ন করলাম, একসঙ্গে কটা বই নিতে পারি? ‘যতগুলো বইতে পারো,’ বলেছিলেন লাইব্রেরিয়ান। মাথার উপর যেন ঢাকনা খুলে গেল। যত পারো তত, এ কথাটা আমার দেশে তো কেউ বলে না। সেই থেকে না-পড়া বইয়েরা ক্রমশ আর না-পাওয়া বই রইল না। না-চাওয়া বই (কিংবা যথেষ্ট আর্জেন্টলি না চাওয়া বই) হয়ে উঠল।

না-পড়া বই মনে আক্ষেপ তৈরি করত আগে। নিজের অক্ষমতায় আফশোস, অসম্পূর্ণতায় ধিক্কার। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ দূরে থাক, সল বেলোর একটাও বই পড়িনি, এ বারের বুকার-জেতা বইটা ধরাই হয়নি, পড়া হয়নি অমর মিত্রের গত পুজোর উপন্যাস। আলেফ আর স্পিকিং টাইগার প্রকাশনার নতুন মেজাজের বইগুলো কিনব কিনব করে কেনা হয়নি। তা না হোক, না-পড়া বইয়ের কথা চিন্তা করে এখন আর অমন বুক খালি-করা ভাব হয় না। রাস্তায় বেরোলে চেনা লোকের চাইতে তো অচেনা লোকই চোখে পড়বে বেশি। তেমনই পড়া বইয়ের পিছনে ভিড় করে থাকে না-পড়া বই। তা বলে তারা আমার পর নাকি? অচেনা মানুষেরাও আমার চেনা দুনিয়ার অংশীদার। সব ভাষার, সব কালের, সব দেশের না-পড়া, না-জানা বই শেষ অবধি আমারই বই। আমার বিহার-বিচারের পরিধি তারা তৈরি করেছে, ধরে রেখেছে। আমার চেনা বই, চেনা মানুষের মুখ দিয়ে না-পড়া বইয়েরা কথা বলে চলেছে। তাদের তৈরি নকশায় আমার জীবন বুনে চলেছে কত বিচিত্র গল্প। তাদের জন্যই আমি হয়েছি আমি, সে আমি বুঝি আর ছাই না বুঝি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...