আমার বইমেলা

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

সে এক সময়। মা যা ছিলেন।

রবীন্দ্রসদন উপকূলে ভিক্টোরিয়া সংলগ্ন মাঠে, ছড়ানো ছেটানো বইমেলার সূত্রপাত। ছেয়াত্তর। বেয়াল্লিশ বছর আগে। ক্লাস ফাইভে পড়ি। ইশকুল থেকে দিদিমণিরা বাসে চাপিয়ে নিয়ে গেলেন বইমেলা দেখাতে। খোলামাঠে রোদ্দুর পড়েছে, সবুজ ঘাস তখনও পায়ে পায়ে মরে যায়নি। সেই গন্ধটা আর পেঙ্গুইনে দেখা নতুন বইয়ের গন্ধ মনে পড়ে গেল হঠাৎ। লক্ষ করেছি তখনই, বইয়ের গন্ধ তিন প্রকার। ইংরিজি বইয়ের আলাদা, বাংলা বইয়ের আলাদা। বাংলা নতুন বইয়ের গন্ধ আর বাংলা পুরনো বইয়ের গন্ধও আলাদা।

প্রথম বইমেলা, ১৯৭৬

সেবার না তার পরেরবার। ইশকুল ফেরত এসেছি। তখনও সাদা সবুজ স্কুল ড্রেস পরা। মা আমাকে আর দিদিকে নিয়ে সোজা মাঠে। বই কিনেছি। দুটো কি চারটে বড়জোর। নানা বই ঘেঁটে দেখার সুযোগ এই প্রথম। বই পড়ার চেয়ে এখানে বই দেখা, অনেক অনেক বই একত্রে দেখা, এই অনুভূতিটাই নতুন। বিশেষ করে একেবারে আকাশ ছোঁয়া দামের ইংরেজি বইগুলোকে ছুঁয়ে ধরে দেখার সুযোগ। উফ সে যে কী অনুভূতি। তারপর, একটা জায়গায় বসে পড়েছি আমরা। রুমাল পেতে। খাচ্ছি মেলায় কেনা ফিশ অর্লি, বিজলি গ্রিলের স্টল থেকে। অথবা, বাড়িতেই চটপট করে সেদ্ধ কড়াইশুটি বিন গাজর আর শশা-টমেটো-লেবু-বিটনুন মাখিয়ে মা চাট বানিয়ে এনেছেন, টিফিন বাক্স ভরে। সে স্বাদ আর সন্দেশের স্টলে লীলা মজুমদার নলিনী দাশকে দেখার বিস্ময়। আনন্দের স্টলের সামনে সুনীল শক্তির নাচ, সাঁওতাল করেছে ভগবান রে… গানের সঙ্গে। এসবের মুগ্ধতা, সব লেগে আছে আজও মনের পরতে পরতে।

প্রভাত চৌধুরী

বইমেলার স্মৃতি এভাবেই, এখনও টাটকা। বছরগুলো কেটেছে, প্রতিবার নতুন করে নিজেকেই খুঁজে পেয়েছি। ১৯৯৬-এ প্রথম বই বেরনোর আনন্দ। প্রভাত চৌধুরী, কবিতা পাক্ষিকের স্টল, সেই সব উত্তেজনার আলাপ আরও অনেক কবির সঙ্গে। নতুন লিখতে আসা মেয়েকে উৎসাহ দিয়েছিলেন সেসব নতুন আলাপের অগ্রজরা। অনিল আচার্যের অনুষ্টুপ থেকে উত্তম দাশের মহাদিগন্ত, বাসুদেব দেবের কালপ্রতিমা থেকে  প্রদীপ ভট্টাচার্যের একালের রক্তকরবী।

কবিতা পাক্ষিক-এর স্টল

আর এক সময়। মা যা হইয়াছেন।

রবীন্দ্রসদনের সামনে (এখন যেখানে মোহর কুঞ্জ) থেকে এসে, বহুবছরে পার্ক স্ট্রিটের বইমেলা স্বীকৃত হয়ে গিয়েছিল। তার পরেই এল ধাক্কা, দু হাজার পরবর্তী সেই ধাক্কায় ঝোড়ো হাওয়ায় ওড়া ফুচকার শালপাতার মতো বইমেলা একবার এসে পড়ে সল্টলেক স্টেডিয়ামে, তার পর মিলন মেলায়। তারপর এইবার আবার সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্কে।

সরকার, রাষ্ট্র, মহামান্য, মাননীয়া, যাই বলুন আর তাই বলুন, বাঙালির এই সাংস্কৃতিক আইকনটিকে নিজের অহংকারের তাজের ওপর মণির মতো আদরেই কিন্তু বসাচ্ছেন। কিন্তু এই হুট করে মণি নিয়ে একবার লাল পাগুড়ি একবার নীল পাগুড়ি এ আমাদের সয় না। আমরা বলে অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট না কী যেন। তাই, হায় হায়, আহা আহা অনেক হল, পথমিছিল, মোমবাতি শোভাযাত্রা, কালোমুখোশ। বইমেলার ওপর তথাকথিত রাষ্ট্রীয় আঘাত নেমে আসার মুহূর্মুহূ ঘটনায় বিপর্যস্ত আমরা আবার নীল সাদা পতাকাতলে স্বাধীন, দলে দলে যোগ দিচ্ছি এই নতুন লোকেশনের বইমেলাতেও। সবাই কিন্তু বলছে, বিশেষ করে বই প্রকাশকরা, এবার মজা দেখার, ফিশ ফ্রাই খাওয়ার, এবং সিনেমা স্টার দেখার ভিড় কম, বই ক্রেতার ভিড় বেশি। কেননা এতটা উজিয়ে আসবে না কেউ যদি না নিছক বইপ্রেমীই হয়।

এবারের মেলায় ঢুকেই চোখে পড়ল তক্তা, পেরেক, ঠকাঠক আওয়াজ, মার ঝাড়ু মার ঝাড়ুর ধুলো, আর রাশি রাশি পুলিশ। পুলিশি তৎপরতায় গাড়ি থামতে পারছে না, দাঁড়ালেই লাঠিহস্তেন তেড়ে আসছেন পুলিশদাদা। পার্কিং অনেক দূর, গাড়ি রেখে মাইলখানেক হেঁটে আসতে হবে আপনাকে। অটো বা রিক্সায় এলেও দূরে নামতে হবে। সব মিলিয়ে বেশ চাপের এই মেলা দেখতে আসা আমার কাছে। (অনেকের কাছে সহজতর, কেননা পাশেই তো করুণাময়ী বাস স্ট্যান্ড। যাদবপুরগামীদের বিস্তর সুবিধা, এস নাইন এখান থেকে ছাড়ছে। তাছাড়াও আছে অনেক বাসের রুট।)

কিন্তু না এসে পারব কী করে। ওখানে বন্ধুরা আছে তো, আছে বইমেলার আসল আকর্ষণ, আড্ডা। চেনামুখ। অনেক হাসি, হৈ হৈ, পরচর্চা, পড়ন্ত শীতের রোদে বই বিনিময়, লিখে দেওয়া, সই দেওয়া সেলিব্রিটি হবার অবভাস আর ‘বই-আমার-জীবন’ ভাবার অবকাশ (বাকি দিনগুলো, তিনশো পঁয়ষট্টি মাইনাস ১২ দিন, অন্য কিছু চলে যে জীবনে, খাওয়াদাওয়া রুজিরোজগার এটা ওটা সেটা)।

আসলে বইমেলার মাঠ বদলাচ্ছে, কিন্তু তার মূল চরিত্র পাল্টাচ্ছে না। শাড়ি গয়না হস্তশিল্প সব মেলার থেকে এ মেলা আলাদা আর তা সম্ভব হচ্ছে শুধু এই মেলার এই ভিড়টার জন্যই, যেটা সম্ভব করেছে কিছু বই কেনা বাঙালি, কিছু বই উৎসুক কিন্তু না কেনা বাঙালি, কিছু মজা দেখা প্যান ইন্ডিয়ান ক্যালকাটান, কিছু একেবারেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ শিকারি। তাদের মধ্যে আছেন অনেকে, যথা কবি, বা চৌকো লিখিয়ে (আজকাল কবিতাও না গদ্যও না গল্পও না এমন চৌকো লেখা খুব চলছে বিশেষ করে ফেবুতে), লিটম্যাগওয়ালা, উঠতি লেখক, পুরনো পাপী প্রকাশক (পুপাপ্র), নতুন শিংওয়ালা প্রকাশক (নশিপ্র), ব্লগরাইটার, ইনফ্লুয়েন্সার (ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়), সোশ্যাল মিডিয়া প্রজাতির নব্য পাঠক-কাম-লেখক-কাম-প্রকাশক…।

এই লিস্ট বানাতে বানাতেই আমি কীরকম যেন হুশ করে এই সময়ের বইমেলার অন্তরটিতে সেঁধিয়ে গেলাম। পুরনো ঘরানার অলটারনেটিভ বা মেইনস্ট্রিম পাবলিশার এখনও পাঠক-ক্রেতায় আসীন। যথা অনুষ্টুপ-থিমা-গাঙচিল প্রমুখ ছাঁচভাঙা এবং দেজ মিত্রঘোষ আনন্দ পত্রভারতী জাতীয় খানদানি বইবিক্রেতা। এই প্রথাসিদ্ধ কম্বাইন থেকে বেরিয়ে এসে, এখন বেশি লোকাল ভিড় গুরুচণ্ডালিতে, সৃষ্টিসুখে এবং লিরিকালে, ঋত অভিযান কাফে টেবল বইচই এবং আরও অনেকের স্টলে। যেখানে ক্রয় চলে আবার আড্ডাও, লেখক পাঠক মিলেমিশে ঘণ্ট। আছে সপ্তর্ষি বা ধানসিড়ির মতো ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রকাশকদের দ্রুত উত্থানের পদাবলী।

এবারের বইমেলায় গিয়ে এক গলি খুঁজে পেয়েছি যার একদিকে ছোঁয়া, আমার গল্পগ্রন্থ সলিটেয়ার-এর প্রকাশক, এবার শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারও ওদের হাতেই বের হবে। অন্যদিকে সৃষ্টিসুখের আড্ডা, যেখানে নিয়ত দেখা হয় এতদিনের ভার্চুয়াল বন্ধুদের সঙ্গে। ও পাশে শব্দহরিণ, সত্যপ্রিয় মুখোপাধ্যায়ের ড্রিম প্রজেক্ট, যেখানে আমরা সপরিবারে আড্ডাই, আছে প্রিয় পঁচিশ সিরিজের বইগুলির সঙ্গে সঙ্গে অনুবাদ গ্রন্থও কিছু। তারই এক পাশে বইচই অন্য প্রান্তে ৯ঋকাল। একটু বেরিয়েই সব পেয়েছির দেশ লিট ম্যাগ প্যাভেলিয়ান, যেখানে প্রায় সবাই চেনা, কারণ মূলত লিট ম্যাগে লিখতে লিখতে আমার কবি নামের কিছু একটা হয়ে ওঠা। মিতুলের কবিয়াল, সঙ্গীতার শুধু বিঘে দুই, প্রিয়াঙ্কার কাগজের ঠোঙা, অতনুশাসনের দশদিশি, গৌতমদার রক্তমাংস। আরও কত কত। চেনামুখ, চেনা মানুষ। প্রিয় কাগজ। সেসবের ভিড় ঠেলে বেরিয়েই গৌতম-এর কড়া দুধ চা আর মচমচে ফিশ ফিঙ্গার। সঙ্গে আড্ডা। বড় লেখক, আমেরিকা প্রবাসী ভার্চুয়াল বন্ধুরা যারা পরিযায়ী পাখির মতো বছরের এই এক সময়েই আসেন, ছোট্ট ভাইয়ের মতো কবিবন্ধু যারা মফস্বল শহরতলি থেকে বাসে চেপে হাজির, সব একাকার।

মূলত অসামাজিক, প্রায় বলা যায় অ্যান্টিসোশ্যাল আমি। সে আমিই ফেসবুকে মহা সামাজিক হইয়াছি। সুতরাং বইমেলায় প্রতি ভার্চুয়াল বন্ধুত্বকে ঝালিয়ে নিতে থাকা। একের পর এক টু ডাইমেনশনাল প্রফাইল পিক-এর সঙ্গে আসল থ্রি ডি মানুষটিকে মিলিয়ে নেওয়া। সে যে কী চাপ! এত কথা। এত হাঁটা। এত হাসি। এত আড্ডা। খানিক পর বিপুল ক্লান্তি।

কোমর আর পা ব্যথা নিয়ে ফিরে আসি ঘরে। একাকী ঘরে, যেখানে আমার সামনে আমি, আমার সাদা খাতা। আমার সাদা স্ক্রিন। কবিতার জন্য অসামাজিক, একাকিত্বের ঘরটিতেই। সেটা মনে পড়ানোর জন্যও মাঝেমাঝে এই সতেজ ভিড়ের কাছে যাই। বইমেলার ভিড়। যার তুলনা নাই।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. খুব ভালো লাগলো পড়ে।বিশেষ করে মা যা ছিলেন অংশটি। ছবির মতো ভেসে উঠলো সে সব দিন। ছিয়াত্তরে আমরাও গিয়েছিলাম স্কুল থেকে দিদিমণিদের সঙ্গে। সঙ্গের ছবিটিও মন কেমন করা!

  2. লেখাটা চমৎকার । স্রোতস্বিনী নদীর মতো , একরোখা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*