বীণা পাণিতে যাহার মেলা

স্বর্ণেন্দু সরকার

 

বইমেলায় ঢুকতেই কে যেন বলল, ‘শুনলাম কলকাতা বইমেলা আগামী বছর নাকি বারাসতে হবে’।

বাইরের সমস্ত কোলাহল শুষে নেওয়া এমনি একটা দুপুর। অমর সার্কাসের তাঁবু উঠে গিয়ে, বইয়ের তাঁবু পড়েছে শহরের উপকন্ঠে। এটা যেন দুপুরের কোনও জলাশয়ের নির্জন ঘটনা। লোকজনের আয়োজন নেই, কখনও কেউ কেউ — সে যাওয়া আসা মন্থর মেঘের মতো কিংবা বাতাস লেগে কেঁপে ওঠা গাছের পাতারা যেমন। সময়ের সাথে সাথে এ দৃশ্য বদলে যাবে নিশ্চিত। এ শহরের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এই হাট। শহরে নিয়মিত বাজার আছে। ক্রেতা বিক্রেতার কলতান আছে, প্রতিদিনের ওঠাবসা আছে। তবু এইসবের পরেও হাট বসে প্রতি বছরে প্রথম মাসের শেষের দিকে।

ভস্ম মাখি মাটিতে শুই, রাহুল পুরকায়স্থ

এমন হাটের চরিত্রগুলোয় বদল আসছে, খুব সম্ভব বাণিজ্য যখন উৎপাদকের হাত থেকে ফড়েদের হাতে চলে এসেছে, মেলার জাঁক বেড়েছে যেমন তেমনি তীব্র আলোর ভিতর নিতান্ত মাটি রঙের কিছু কিছু তাঁতি এসে বসে, কৃষক ঝাঁকা নামিয়ে রাখে মাথা থেকে।

ক্রেতার অভাব হয় না। কৃষক রমণী ও তাঁতি বউ ছাড়াও শহুরে, মফস্বলের মায় গাঁ-গঞ্জের স্ত্রীলোকেরাও দল-সমেত ভিড় জমাচ্ছে। বেসাতি ও বিকিকিনির পসরা সাজিয়ে বসে আছে যত্রতত্র। আর এই শহরে এই মুহূর্তে এসে অন্তত একবার এই মেলায় আসতে চাইবে সবাই। হাটটা শহরের কেন্দ্র থেকে, নদীর পাশ থেকে দূরে সরে এসেছে, এমন এক হাট যাকে মেলা বলাই ভালো, কেননা স্ত্রীলোকেরা হাটে যাবার চাইতে মেলায় যেতে বেশি পছন্দ করে। ছুটির দিন নয় তবুও সে বলে, ‘চলো কোথাও ঘুরে আসি’। কোথা থেকে পালিয়ে কোথাও আশ্রয় নেবার মতো, বা পরিশ্রমের পরে বুকের যে ওঠানামা হয়, উত্তেজনা হয়, সেইসব নিয়ে দুপুরের কিছু পরে ওরা বেড়িয়ে পড়ে। পুরুষটি যানবাহনের প্রস্তাব করেছিল, সে রাজি হয়নি।

কবিতা সংগ্রহ, বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়

‘চলো তা হলে যেভাবে যেতে হয়’। প্রায় মাইল দুয়েক হেঁটে ওরা মেলায় পৌঁছল। পুরুষটি রন্ধনে পটু হতে চায়।

মেলায় ঘুরে ঘুরে গোটা কয়েকি এমন বই তার কেনা হল। হাতে আঁকা ক্যালেন্ডার, ঘর ঝাড়বার উপকরণ, বীজ থেকে চারাগাছ ইত্যাদি ইত্যাদি। বরং মেয়েটির নজর একটু উঁচুর দিকে। বিদেশি অনুবাদের বা কাঁথা শিল্পের, বাংলায় মাটির পুতুলের ইতিহাসের বই তাকে খুব টানে, যেন সে জলের ঘূর্ণির ভিতর সাঁতার-না-জানা অবোধ।

তারপর তারা দোকান দোকান দেখে বেড়াতে লাগল। কত যে বই হতে পারে এমন কিছুটা আন্দাজ করে ওরা প্রায় নিশ্চুপ হয়ে পড়ল, অন্তত কথা না বলাটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে চাইছিল। মেয়েটির মনে হল এ যেন স্বচ্ছ ও ঝকমকি মনোহারীর দোকান। দোকানগুলো যেন আট আনার দোকান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত ক্রেতা, এত পল্লবগ্রাহী পাঠকের বিদ্যুৎরেখার মতো সশব্দে ভেঙে পড়ার ভিতর দোকানগুলো সবই ছেলেভুলানো ছড়ায় ছেয়ে আছে।

অসুখের কবিতার দিকে, সৌরীন ভট্টাচার্য

‘কৃষক, তাঁতিদের দিকে চলো যাই’। এই হাটে ফড়েদের হাতের নাগালে ওইদিকে তবু কিছু নির্মল বাতাস আছে। পুরনো মানুষজনের দেখা পাওয়ার সুতীব্র বাসনা আছে। ‘আমি জানতাম উনি ইহজগতে আর নেই কিন্তু এখানে না পৌঁছলে অজানাই থাকত সে কথা’।

ছেলেটির সদ্য চশমা হয়েছে। কথার ফাঁকে একটু চোখের দিকে ঠেসে দেওয়া বা অসময়ে মুছে নেবার ভঙ্গিমা দেখলেই সেটা টের পাওয়া যায়। চশমা, পোষাক, কাঁধে ঝুলে থাকা ব্যাগের সজ্জায়, যাবতীয় আলোকসম্ভাবনা, বচন, নেশার ভিক্ষাবৃত্তিতে, কল্পনাতে…

জালালুদ্দিন রুমী: জীবন ও কবিতা, শ্রীঅনির্বাণ ধরিত্রীপুত্র

‘কী ভাবছ, ক্লান্ত লাগছে খুব? চলো, কৃষকদের দিকেই যাই।’

‘তারপর বাড়ি ফিরে চা নিয়ে বসব।’

ক্লান্তি শব্দটা অনুভব করে পাল্টা কী বলা যায় ভাবতে ভাবতেই তারপর বাড়ি ফিরে বই আর চা নিয়ে বসব এমন এক কল্পনায় মন বিভোর হয়ে ওঠে। লেখকদের নিয়ে কথা বলতে সে খুবই ভালোবাসে। ইদানিংকালের লেখক যারা, বা আগামীদিনের, এককালে তাদের সাথে ওঠাবসার ধারণা হয়তো তার ছিল। সে লেখকদেরকে কৌতূহলের সাথে লক্ষ্য করত, কারণ সে কখনও তেমনভাবে এত কাছ থেকে লেখকদের দেখেনি। পুরুষসঙ্গীটি বড় বেশি চুপচাপ। সকালে নিউজপেপার পড়ার সময় তার মুখে যে শান্তিভাব লেগে থাকে বা একগাল সাবেকি দাড়ি কেটে ফেলার পরবর্তীতে যে ঠাণ্ডা চোখেমুখে লেগে থাকে, তেমনই মুখচোখ করে আর মেয়েটির অনেক দামি শাড়ির মধ্যে থেকে, এটা এতটা দামি নয় অথচ খুব যত্ন করে পড়েছে।

চোখে প্রয়োজনের তুলনায় কাজল হয়তো একটু বেশিই লেগে আছে। একটা কালো কোমলতা, কিছুটা অজানা ভাষা চোখের সাদায় মিশে গিয়ে যেমন রং ধরে, তেমনি।

রূপ লইয়া কী করিব, দেবাশিস তরফদার

মেলা শেষে রাত্রি যখন মানুষকে ফাঁকা করে দিচ্ছে বইয়ের তাঁবুগুলো থেকে, লেখক স্বয়ং এগিয়ে এল। হাত পাখার মত মেলে ধরা আছে নিজের বই। এই লেখক নামজাদা নন, হবেনও না কোনওকালে। শিশুকালের লেখক হওয়ার বাসনায়, আজীবন লিখে গেলেন এঁরা। খোকাখুকুর ছড়া, রহস্য উপন্যাস, আমাদের রামকৃষ্ণ। গত কুড়ি বছর ধরে আমি এঁদের দেখে আসছি। এঁর মতো কতই যে লেখক ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বিক্রি করছেন শুধু নিজের রচনা। আর বই, সে তো এক আশ্চর্য সূতিকাগার, মহা মহা সমুদ্র।

মেলায় এসে আমার সেই মানুষগুলোর সাথে দেখা হয়, যারা কোনওদিন আর মেলায় আসবে না। দেখা হয় সেইসব লেখকদের সাথে যাদের শুধু এখানেই দেখা যায়। নূতন বই খোঁজার সাথে অজানা অচেনা লেখক খুঁজে বের করা আমার একটা নেশা বলা যেতে পারে। প্রতিবছর দূর থেকে আমি ওঁদের লক্ষ করি।

হাইওয়ে A4 ও অন্যান্য কবিতা, লিন্ডা মারিয়া বারোস

মেয়েটিকে প্রায় জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবার ভঙ্গিতে, পুরুষটি লেখকের হাতে হয়তো দশ কি কুড়ি বা একশো টাকা দিয়ে থাকতে পারে। মুহূর্তে লেখক আরও এক পাঠকের পিছু নিল।

স্বামী সামান্য এগিয়ে হাঁটছে, ঈষৎ তফাতে মায়ের সাথে মেয়ে।

*

দীর্ঘ সময় ট্রেন ভ্রমণের পরেও যেমন দুলুনি থেকে যায়, ঠিক তেমনি এই মেলা শেষ হবার পরেও রেশ থেকে যাবে আরও কিছুদিন। কিছু ভালো বই চোখে পড়ল। আমার এই লেখাটির সাথে তার মধ্যে কিছু বইয়ের খবরাখবর জড়িয়ে রাখলাম।

উপরের সব ক’টি বই-ই ভাষালিপির থেকে প্রকাশিত। একটি বইয়ের কথা বলে এই লেখা শেষ করা যাক।

বুবুর সঙ্গে দ্রাক্ষাবনে, কৌশিক বাজারী

এই বই ভালো নয় আবার খারাপও নয়। এই বই এক দলিল হয়ে থাকবে। এই বই সংসারের মায়াজড়ানো শৈশবে ভরপুর। শিশুটি আছে তার মায়ের লুকানো প্রচ্ছায়ার ভিতর চিরকালীনতা নিয়ে। বাবা মায়ের নিভৃতে বেড়ে ওঠা বুবুর অবাক বিস্ময় আর কেঁপে কেঁপে ওঠা রেখার আলোয়, কৌশিক একের পর এক অপূর্ব মুহূর্তগুলো কয়েদ করে রেখেছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2331 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...