ধ্রুবদাকে নিয়ে

কাজল সেনগুপ্ত

 

যেমনটা কড়ার হয়েছিল, তাতে জলাভূমি সম্পর্কিত আর কোনও কিস্তি লেখার কথা নয়। কারণ, যেমন বলেছিলাম প্রথমে, এটা কোনও লেখা নয়, একটা চর্চা তৈরি করার চেষ্টা। জলাভূমি নিয়ে আমাদের কয়েক বছরের কাজের অভিজ্ঞতায়, আমরা কিছু জিনিস কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। খানিকটা বোঝা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ভুল-ও থাকতে পারে। আর অনেকটা না বোঝা। এই চর্চার পরিসরে না বোঝা, ভুল বোঝাগুলোকে খানিক যাচাই করে নেওয়া, শুধরে নেওয়া, এটাই লক্ষ্য। দু-একজন মন্তব্য করেছেন। সেই দু-একটি মন্তব্যকে সম্মান জানানোর দায় আমাদের। তাই বইমেলার পরে ফের যখন কিস্তি চালু করার কথা বললেন সোমেন, ওইটুকুই ভাবা ছিল। কিন্তু বাকিটা ভাবা ছিল না। সেই অভাবনীয়তার কারণেই, এই কিস্তিটা লেখা।

“You have addressed the reader very differently. New style if I may say so.”

২০ জানুয়ারি, ২০১৮, দুপুর বারোটা দুই।

প্রায় দু’সপ্তাহ পরে নার্সিংহোম থেকে ফিরে, যোগাযোগ করেছিলেন ধ্রুবদা, ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। দ্বিতীয় কিস্তিতে লিখেছিলাম, ধ্রুবদার কথা। এই লেখাটার কথা শুনে পড়তে চেয়েছিলেন। ওই দুর্বল শরীরে, গোটাটা পড়ে এই মন্তব্য। তারপরে, ফোন। ‘সামনাসামনি কথা বলা দরকার’। দুর্বল মানুষটি একটু সুস্থ হয়ে নিন, তারপরে কথা বলতে যাব, এরকম ভেবেছিলাম। মধ্যে আরও কিছু কেজো ও অকেজো সমস্যা চলে এল। সব মিলিয়ে, সামনাসামনি হওয়ার আগেই, ১৬ই ফেব্রুয়ারি সকালে জানলাম, ধ্রুবদা আর নেই।

–“এত কিছু করে ফেলেছেন, আমার কাছে এর আগে আসেননি কেন?”

–“আজ্ঞে, দু’টি কারণে।

এক, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি নিয়ে কাজ করতে গেলে, প্রতি চার শব্দে যাঁর নাম আসে, তাঁর সঙ্গে চাইলে দেখা করা যেতে পারে সেটা আগে মাথায় আসেনি।

দুই, ব্যক্তিগতভাবে, যাঁরা ভারী ভারী বই লেখেন, তাঁদেরকে এড়িয়ে চলাটা একটা অভ্যাসগত প্রতিবর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলবয়সের অভ্যাস, তাই কাটাতে সময় লেগেছে। আর, জলাভূমি সংক্রান্ত কাজের সূত্রে প্রথমে অ্যাকাডেমিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে, যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা একদমই সুখকর নয়।

নেহাত বেজায় ঠেকে গিয়ে, একটি প্রশ্ন নিয়ে এসেছি। যদি ভীষণ অর্বাচীন প্রশ্ন মনে হয়, তাহলে এখনই পত্রপাঠ বিদায় নিতে পারি।

২০১৪-র ডিসেম্বর নাগাদ, ধ্রুবদার সঙ্গে প্রথম আলাপ। সমস্ত সম্ভব ও অসম্ভব সরকারি দফতর ঘুরে, জলাভূমিভুক্ত পঞ্চায়েতগুলোতে এবং স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে একাদিক্রমে মিটিং করে যে প্রশ্নটা সামনে আসছিল, সেটা নিয়েই হানা দিয়েছিলাম, ওঁর ডেরায়।

ধ্রুবা তখন ছিলেন না। ধ্রুবদার একমেবাদ্বিতীয়ম সেনাপতি। জলাভূমির কাজেই কয়েকজন মৎস্যজীবির সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন। ধ্রুবদা আর ধ্রুবা একটা অঘোষিত হেল্পলাইন চালিয়েছেন বরাবর। জলাভূমি সংক্রান্ত কোনও সমস্যার কথা জানতে পারলেই, ধ্রুবা সরাসরি পৌঁছে যান। তারপর, যেখানে যেমন দরকার, চিঠি-চাপাটি, লেখালেখি শুরু হয়। তারপরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেই সমস্যার কথা পৌঁছে দেওয়া। তারপরে ক্রমাগত ফলোআপ।

সেদিন, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ধ্রুবা যখন ফিরলেন, তাকে জল খাওয়ার সময়টুকুও দেননি ভদ্রলোক।

“এই একদল লোক পাওয়া গেছে। শোন শোন, কী বলছে।”

অত্যন্ত অ্যাপোলোজেটিকালি, ওই কথার মধ্যেই এক বোতল জল ঢক ঢক করে গিলে, ধ্রুবা অত্যন্ত নিরুপায়ভাবে তাকালেন, কোন দল, কারা লোক, তারা কী করেছে, কোথায় তাদের পাওয়া গেল, এগুলো বলার তোয়াক্কাই করছেন না ভদ্রলোক। উত্তেজনায় বলে চলেছেন, আমরা কী সাঙ্ঘাতিক কাজ করে ফেলেছি। ততক্ষণে, অবশ্য, সম্বোধন ‘তুমি’-তে চলে এসেছে। আর জানিয়ে দিয়েছেন, প্রফেসর ঘোষ নয়, ধ্রুবদা বললেই উনি বেশি খুশি হবেন।

নিরুপায় ভাবটা কাটিয়ে, ধ্রুবা যখন শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে পারলেন, তখন, ধ্রুবদার উত্তর শুনে বুঝলাম, আমরা নিজেরাও আমাদের কাজ, এতদিনে যেটুকু করেছি, আর আগামীদিনে যেটা করতে চাই বলে ওঁর কাছে এসেছি, সেটার প্রয়োজনীয়তাকে এত ভালোভাবে বোঝাতে পারতাম না।

সেই শুরু। তারপর থেকেই অভিভাবকের মতন আমাদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা শিখেছি, কী করে শিখতে হয়। আর ভদ্রলোক, যেখানে পেরেছেন, যখন পেরেছেন, নিজ দায়িত্বে কলকাতা কমন্স সিরা-র কথা বলে এসেছেন। আমাদের কাজটার কথা বলে এসেছেন।

এমনিতে জলাভূমি সংক্রান্ত কাজের সূত্রে, আমাদের অভিজ্ঞতা, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, খুব সুবিধেজনক নয়। এখানে বেজায় কুলীনপ্রথা চলে। অন্যান্য ব্যক্তি বা সংগঠন যাঁরা কাজ করছেন, বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করার সূত্রে একরকম পরিচিতি তৈরি হয়েছে, তাঁদের বেশিরভাগেরই ভাবভঙ্গি অনেকটা, “এতদিন কোথায় ছিলেন?” ধরণের। একদমই পাখির নীড়ের মতন চোখ তুলে নয়, বরং বেশ চোখ পাকিয়েই। ব্যাপারটা পলিটিকালি কারেক্ট একদমই নয়, কিন্তু ধ্রুবদা খুব একটা তোয়াক্কাও করেননি পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের। জলাভূমি সম্পর্কে, কৌলীন্যপ্রথার নিরিখে, বিপ্রশ্রেষ্ঠ স্বয়ং এবার দাঁড়ালেন আমাদের সমর্থনে। ব্যাপারটাকে কখনও প্রায় এই পর্যায়ে নিয়ে গেলেন, “এটাই একমাত্র কাজ”। বিরোধিতা আসেনি, এরকম নয়। ধ্রুবদা মজা করে গল্প বলেছেন। আমাদের অস্বস্তি বেড়েছে। এরকম একটা সময়ে এক উচ্চপদস্থ সরকারি আমলার কাছে গোটা কাজটা রিপোর্ট করার দরকার পড়েছিল। পাছে ধ্রুবদার অকারণ অস্বস্তি তৈরি হয়, তাই গোটা মিটিং-এ ওঁর নাম নিইনি। প্রেজেন্টেশনের শেষে, লিফ্‌ট দিয়ে নামতে নামতেই মেসেজ এল,

“You are making things difficult for me”. লিফ্‌ট থেকে বেরিয়ে ফোন করে যা জানা গেল, আমাদের প্রেজেন্টেশনের সত্যতা নির্ধারণের জন্য ওই উচ্চপদস্থ ভদ্রলোক ধ্রুবদাকে ফোন করেছিলেন। এবং, আমাদের কাজটা সম্পর্কে উনি কিছু জানেন কিনা জানতে চেয়েছিলেন। এবার, যেহেতু মানুষটি ধ্রুবদা, তিনি সম্ভবত উত্তর দিয়েছিলেন, যে কাজটার সঙ্গে উনি তো আছেনই, এবং এই কাজটাই কেন একমাত্র হওয়া দরকার সেটাও সম্ভবত সবিস্তারে বলেছিলেন। এই অংশটুকু আমার আন্দাজ কারণ এটা ধ্রুবদা বলেননি। যেটা বলেছিলেন, সেটার সারমর্ম এই যে, ওই আমলা ভদ্রলোক বেশ ব্যোমকে গিয়ে ওঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “ তাহলে ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ-এর নাম এরা একবারও বলল না কেন!” এরকম বারবার হয়েছে। যে পলিসি ওয়ার্কশপের কারণে, কলকাতা কমন্স সিরা-র আজকের পরিচিতি, সেটা নিয়ে যখন রামসার সেক্রেটারিয়েটরে সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি, তারাও আমাদের পরিচয় যাচাই করে নিয়েছিলেন, ধ্রুবদার কাছ থেকেই।

গত তিনবছরে, এরকম অভিজ্ঞতা প্রচুর। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অপরাধবোধের কারণে, এখানে অকারণ শব্দসংখ্যা বাড়ানোর কোনও মানে হয় না।

২০১৪-র ডিসেম্বরে, এই প্রশ্নটাই নিয়ে গিয়েছিলাম ধ্রুবদার কাছে। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, যে পরিষেবাটা দেয়, কলকাতা ও কলকাতাবাসীকে, গোটা বাস্তুতন্ত্রকে, এবং তার জন্য, জলাভূমির অধিবাসীদের যা ছাড়তে হয়, তার বিনিময়ে তাঁদের কিছু প্রাপ্য তৈরি হয় না কি? যদি হয়, সেই প্রাপ্য মেটানোর দায় কেন রাষ্ট্র নেবে না? এই প্রাপ্যের অধিকারের স্বীকৃতিটা কেন সমগ্র নাগরিক সমাজের দাবী হবে না?

ধ্রুবদার স্বীকৃতি অবশ্যই জোর বাড়িয়েছে। বাকিটা, দেখা যাক।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*