দুঃখ

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

 

শ্রীজ্ঞানদার দুঃখ নেই। তবে নিয়তি আছে, বলে ওটাই আসল। চায়ের ভাঁড়ে নিজের কপালকে দেখে। চাপড়ায়। চা উলটে পড়ে। আঃ শ্রীজ্ঞানদা, আমি দুতিনদিন পরপর এরম করতে দেখে একদিন ধমাকালাম। লাভ হল না। পরের দিন মিনি বাসের হাতল ধরে যেতে যেতে ফস্কাল। স্পটেই। আমার শ্রীজ্ঞানদার সঙ্গে ভাল করে আলাপ ওইদিন থেকেই। ওরা পুড়িয়ে যখন বাড়িতে নিয়ে এল, আমি তখন লোকটার বিজয়গড়ের বাড়িতে হাওয়া খাচ্ছি। মার্চের গরম। সবে ধরতে শুরু করেছে। শ্রীজ্ঞানদার বাড়ি। পোষা চিড়িয়াখানা। বলত, পায়রাগুলো কমছে। রাতের দিকে শব্দ। উঠতে উঠতেই পালাল। মাঝরাতে আবার এল। ঘুমিয়ে কাদা হয়ত। পরের দিন সকালে চাপ চাপ রক্ত। কবুতর যাহ্‌ যাহ্‌ যাহ্‌। শ্রীজ্ঞানদা যশোধরাদিকে ভালবাসত। ম্যায়নে পেয়ার কিয়া। টিকিট কেটে দেখাল। বিয়ে করত কি? জানি না। তবে এর মধ্যেই সেই মেয়ে টিটেনাস হয়ে চলে গেল। শ্রীজ্ঞানদা মানেনি। শ্মশানেও যায়নি। বলল, ওর মোক্ষ হয়েছে। গেছে, বেঁচেছে। সেই যশোধরাদি। মুখের একটা দিক অ্যাসিডে পোড়া। বাকিটাতে শ্বেতী গ্রো করছিল আস্তে আস্তে। সারানোর ফালতু চেষ্টায় ছিল। কমপ্লিট হল না। শ্রীজ্ঞানদা এসব ভাবত না। বলত, দুঃখ করে কী হবে? আলোবাতাস আছে, জল আছে, পার্কের বাচ্চাগুলো আছে। পাখিগুলো আছে। কুকুর বেড়াল আছে। আমরা আছি না আছি, কার কী বে। কারও কিছু নয়। তবে সেদিন মার্চের গরমে ওর বিজয়গড়ের বাড়িতে একটু এদিক হলেই যেতাম। সিলিং থেকে পড়ে গেল পাখাটা। ঠিক আগেই বারান্দায় উঠে এসেছিলাম। ওপরের চাঙ্গর ভেঙে কিছুটা পড়ল। শ্রীজ্ঞানদা জীবন দিয়ে গেল। এভাবেও যেতে পারত, যায়নি। চয়েস। ডায়েরি লিখত। দেখায়নি। সেদিন লুকিয়ে পকেটে নিয়ে বেরোলাম। পড়ছিলাম। এইট বির মোড়ে। ই ওয়ান বাসটা মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল বাচ্চাটার। শ্রীজ্ঞানদা খেতে দিত। বড় হলে তাগড়াই হত। মা’টা কাঁদল খুব। দুদিন ঘুমোতে পারল না শ্রীজ্ঞানদা। আমাকে বলেনি, ডায়েরি বলছে। থানার সামনে একটা লোক দুটো কুকুর নিয়ে বসত। একথালা ভাত। কে কোনটা খেত, শ্রীজ্ঞানদা জানে না। শুধু লোকটা বাসে চাপা পড়ার আগে অন্তত একটা কুকুরকে দিয়ে যেতে চেয়েছিল। শ্রীজ্ঞানদা ভাবল দুদিন। পরে ডিসিশন নেওয়ার দিন ওদের পাত্তা নেই। সারা গা ঘা। একটা সেদিনই মরেছে। অন্যটা বেপাত্তা। এসবই পড়ছিলাম। একসময়ে চা খেতে গিয়ে ডায়েরির বিশেষ ওই জায়গাটা হলদে হয়ে গেল। চা পড়ে। আর ওখানেই …। ‘একদিন এভাবেই চলে যাব। লোকে বুঝবে অ্যাকসিডেন্ট। ভুল তো কিছু নয়। জন্মাতে গিয়ে মাকে খেয়েছি। চার বছরে বাবাটাকে। পায়রা, মুনিয়া, কুকুরগুলো একে একে গেল। যশোধরা গেল। একদিন হাত ফস্কাব। যাওয়ার আগে বলে যাব…।’ মহেন্দ্রকে চিনতাম। ওই বাসেই ছিল। হাত ফস্কাবার আগে শ্রীজ্ঞানদা চিৎকার করে উঠেছিল — ‘আঃ, মোক্ষ’।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...