বাংলাদেশের তাঁতশিল্প

অনার্য তাপস

 

"বাংলাদেশের তাঁতশিল্পনামক এই বইটির মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে আর শেষ হয় ২০১০ সালে। কিন্তু পরবর্তীতে আরও কিছু ফলোআপ করা হয় বিভিন্ন তথ্যের। বারোটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে বইটিকে। মোট ৪৩৩ পৃষ্ঠার এই বইয়ের প্রকাশক বাংলাদেশেরদেশাল'। হার্ডকভারে বাঁধানো এই বইয়ের প্রচ্ছদ করা হয়েছে তাঁতের কাপড় দিয়ে। এই বইয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্যটেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়াঅর্থাৎ পুরো বাংলাদেশের তাঁত প্রধান অঞ্চলগুলোতে ক্ষেত্রসমীক্ষা চালানো হয়েছে। সাথে সাথে ক্ষেত্রসমীক্ষা চালানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বেশ কয়েকটি স্থানে। শুধু তাই নয়; বাংলাদেশ তো বটেই এই বইয়ের রসদ সংগ্রহের জন্য ভারতের কয়েকটি মিউজিয়ামেও ঘুরতে হয়েছে গবেষক শাওন আকন্দকে। এরপর দীর্ঘসময় চলে গেছে পাণ্ডুলিপি তৈরি এবং সংশোধনের জন্য। অবশেষে ২০১৮- ফেব্রুয়ারি মাসের  তারিখ বইটি বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়। এবং ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, কলকাতায় আনুষ্ঠানিক প্রকাশ অনুষ্ঠান হয়, DW Studios-এ।

প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীব্যাপী বাংলার সুখ্যাতি ও পরিচিতি এনে দিয়েছিল যে শিল্প মাধ্যমটি সেটি হচ্ছে তাঁতশিল্প। কিংবদন্তির মসলিন কিংবা নানারকম নকশা সমৃদ্ধ জামদানির বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা ও সমাদর ছিল গ্রিক, রোমান কিংবা দিল্লির সম্রাটদের কাছে। এ তথ্য সবার কমবেশি জানা থাকলেও বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তাঁতশিল্পের ক্রম-বিবর্তনের ইতিহাস, এর বিভিন্ন ধরনের কৃৎকৌশল কিংবা তাঁতিদের বিষয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের তাঁতবস্ত্রে ব্যবহৃত বিচিত্র নকশা, নিজস্ব রং প্রস্তুত প্রণালী এবং তাঁত সংক্রান্ত আরও বহু প্রয়োজনীয় তথ্য ও বিশ্লেষণ এখনও অপ্রতুল। এইসব বিভিন্ন সংকট ও সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশের তাঁতশিল্প নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করে ফ্যাশন হাউজ ‘দেশাল’। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের সনাতনী নকশাগুলোকে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব কিনা — প্রাথমিকভাবে এই সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখতে ২০০৭ সালে শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দের নেতৃত্বে একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীকালে এই প্রকল্পটি পরিণত হয় বাংলাদেশের তাঁতশিল্প বিষয়ক একটি নিবিড় ও বিস্তারিত গবেষণায়। বাংলাদেশের তাঁত, তাঁতি, সুতা, নকশা, রং ইত্যাদি তাঁত বিষয়ক নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে যথাসম্ভব অনুসন্ধান করা হয় এই প্রকল্পের আওতায়। এমনকি বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা এবং বেনারসে অনুসন্ধান চালানো হয়। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের প্রচেষ্টায় নানারকম তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ শেষে ‘বাংলাদেশেরতাঁতশিল্প’ গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।

এই গ্রন্থটিতে পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে তাঁতশিল্পের উদ্ভব থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশে এবং বাংলার তাঁত শিল্পের সূত্রপাত বিষয়ে অনুসন্ধানী বিবরণ যেমন থাকছে, তেমনি থাকছে বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের সোনালী অতীতের কথা। বৈচিত্রময় সুতার কাহিনী, রঞ্জনশিল্প তথা সুতা ও বস্ত্র রঙিন করার প্রক্রিয়া এবং এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রাচীনকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত বিভিন্ন তাঁতযন্ত্রের উদ্ভব, কৃৎকৌশল ও বিবর্তনের রূপরেখা সম্পর্কে জানা যাবে এই গ্রন্থটিতে। এই বইয়ে আরও থাকছে তাঁতশিল্পের সাথে যুক্ত তাঁতিদের অতীত-বর্তমান, তাদের সমাজজীবন ও মনোজগতের নানা বিবরণ। তাঁতযন্ত্রে বস্ত্রবয়ন পদ্ধতি এবং তার কৌশলগত খুঁটিনাটি, ঐতিহ্যবাহী বৈচিত্রময় নকশা ও নকশার বিবর্তন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এই বইয়ে। এছাড়াও প্রাচীন ও বর্তমানকালের তাঁতবস্ত্রের বাজার ও বিপনণ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেবার চেষ্টাও রয়েছে। এ গ্রন্থের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে তাঁতিবৃত্তান্ত। সম্ভবত এই প্রথমবারের মতো তাঁতের কাজে যুক্ত মানুষদের কথা বিস্তারিতভাবে জানার সুযোগ পাওয়া যাবে এই গ্রন্থটি থেকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তাঁতি এবং তাঁতসংশ্লিষ্ট মানুষদের বক্তব্য যেমন রয়েছে এই বইয়ে তেমনি রয়েছে নাগরিক নকশাবিদ ও উদ্যোক্তা থেকে তাঁত সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের কথাও। কাজেই গবেষকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নয়, তাঁত বিষয়ে তাঁত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও দেখা যাবে ‘বাংলাদেশের তাঁতশিল্প’ নামক এই সুবিশাল গ্রন্থে।

দেশাল-এর কথা :

বাংলাদেশের তাঁতবস্ত্রের তৈরি পোষাক নিয়ে নাগরিক পরিসরে কাজ করতে গিয়ে সকল উদ্যোক্তাকে কাপড়, রঙ ও নকশা নিয়ে নানারকম ঝামেলা পোহাতে হয়। ২০০৫ সালে যখন আমরা ফ্যাশান হাউস হিসেবে যাত্রা শুরু করি সংকটটা তখনও ছিল। আমাদেরকেও এই সমস্যা ও সংকটগুলো মোকাবিলা করতে হয়েছে। যেমন, আমাদের একটা সংকট ছিল নকশা নিয়ে। তাঁত অধ্যুষিত অঞ্চলে ঘুরে আর ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথা, টাঙ্গাইল শাড়ি, ঢাকাই জামদানি ইত্যাদির নকশা, শৈলী এবং বৈচিত্র দেখে আমরা নতুন করে ভাবতে শুরু করি। পুরনো ও হারিয়ে যাওয়া নকশাগুলো পুনরায় ব্যবহার করা যায় কিনা — সেই সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখার চেষ্টা আমাদের প্রাথমিক ভাবনায় ছিল। এই ভাবনার সূত্র থেকে আমরা যে কাজটি করার কথা ভাবি তা হল একটি নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে আমরা জানতে ও জানাতে পারব তাঁতশিল্পের বিভিন্ন নকশা ও নানা অজানা তথ্য সম্পর্কে। বাংলাদেশের তাঁতশিল্প নিয়ে গবেষণা কাজের এই হল প্রাথমিক প্রেক্ষাপট।

আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল আমাদের শিল্পীবন্ধু শাওন আকন্দ। শাওনের বহুমূখী চিন্তার কারণে এই ছোট পরিসরের গবেষণা প্রকল্পটির পরিধি বিস্তৃত হতে শুরু করেছিল। নকশার পাশাপাশি তাঁতশিল্পের আরও নানা প্রসঙ্গ গুরুত্বের সাথে নিয়ে অনুসন্ধান ও জরিপ চালানো হয়। ক্রমশ প্রকাশিত হতে থাকে খুঁটিনাটি বিভিন্ন অজানা তথ্য ও বিশ্লেষণ। এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন বছরের বেশি সময় গবেষণা প্রকল্প চলার পর, এখন বাংলাদেশের তাঁতশিল্প ও তাঁত সংস্কৃতির অনেকটা আমাদের সামনে উন্মোচিত — এরকম বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের অতীত ঐতিহ্য ও গৌরবময় ইতিহাস জানার পাশাপাশি কারিগরী বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তাঁতিদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন এবং তাঁতশিল্পের সঙ্গে বিশ্ব-অর্থনীতি ও রাজনীতির বিচিত্র সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের গল্প উঠে এসেছে এই গবেষণা গ্রন্থে যা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও কার্যকরী। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই গবেষণা প্রকল্প ‘দেশাল’-এর কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে নানাভাবে সহায়তা করেছে।

২০১১ সালে পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে যাবার পরও নানা কারণে এই গ্রন্থটি প্রকাশ করতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেল। নানা বিপত্তি কাটিয়ে উঠে, শেষ পর্যন্ত এটা যে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতে চলেছে তাতে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমরা আশা করি এই বই বাংলাদেশের তাঁতশিল্প নিয়ে যারা সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করে বা করবে এবং যারা তাঁতশিল্প বিষয়ে আগ্রহী পাঠক, শিক্ষার্থী, গবেষক — তাদের সকলের সহায়ক হবে।

আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের উন্নয়নে কোনওভাবে কাজে আসলে আমরা আমাদের উদ্যোগ সার্থক মনে করব। সবাইকে শুভেচ্ছা।

DW Studios, A Kolkata Commons Initiative-এর কথা :

শাওন আকন্দ বাংলাদেশের একজন চিত্রশিল্পী ও গবেষক। তাঁর সঙ্গে প্রথম আলাপের দিন, শাওন যখন বলছিলেন, উত্তরাধিকারটা কীসের, কাদের, এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার নয় কি?

সেই প্রথম, তাঁতের ব্যাপারে আমাদের জানাবোঝাগুলোর সঙ্গে মিল আছে, এমন একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটল। ততদিনে, DW Studios-এর একটা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। হাতে কাটা সুতোয় হাতে বোনা কাপড় নিয়ে, “সুতাইরা” নামে, আমরা নিজেরা কাপড় তৈরি করছি। কিন্তু, তাঁতশিল্প সম্পর্কে যেটুকু জানাবোঝা তৈরি হয়েছে, সেগুলো কারও সঙ্গে মিলছে না। খুব নামী সব হ্যান্ডলুম হাউসগুলো সকলেই যেটাকে বাংলার ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বলছেন, আমরা কাজ করতে গিয় বুঝতে পারছি, এগুলো কোনওটাই, ১০০-১৫০ বছরের বেশি পুরনো নয়। ৫০-৬০ বছর আগে শুরু হওয়া প্র্যাকটিসও, ঐতিহ্য-উত্তরাধিকার, ইত্যাদি বর্গে ঢুকে গেছে।

শাওনের সঙ্গে পরিচয় হয়ে, এই প্রথম একজনকে পাওয়া গেল, যিনি নিজের গবেষণার ওপর দাঁড়িয়ে, জোর গলায় এটা বললেন, এগুলোর বেশিরভাগটাই বাংলার দেশজ ঐতিহ্য বা তার উত্তরাধিকার নয়, মূলতঃ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার।

তখন থেকেই পরিকল্পনাটা শুরু হয়েছিল, এপার ওপার দুই বাংলা মিলিয়ে, তাঁতশিল্পের ইতিহাস নিয়ে একটা ডকুমেন্টেশনের কাজ শুরু করব। পশ্চিমবঙ্গে Kolkata Commons আর বাংলাদেশে যথাশিল্প যৌথভাবে একটা প্রকল্প নেবে। ‘দেশাল’-এর পৃষ্ঠপোষকতায়, শাওন আকন্দ নিজে অবশ্য ততদিনে, মূলতঃ বাংলাদেশে এবং বেশ খানিকটা পশ্চিমবঙ্গে ও বেনারসে, একটা বড় সমীক্ষানির্ভর কাজ করে ফেলেছেন, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে। সেটাই এই যৌথতার শুরুর বিন্দুটাকে নির্দিষ্ট করেছে।

‘দেশাল’-এর প্রথম প্রকাশনা শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দের গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের তাঁতশিল্প’ প্রকাশিত হয়েছে ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮। এবং কলকাতায়, বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছে, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, DW Studios-এ।

বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের এই জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতার ছেঁড়া সুতোগুলোকে খুঁজে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে চেনা এবং ভবিষ্যতে ব্যবহারোপযোগী করে তোলার জন্য একটা চেষ্টার শুরুকে চিহ্নিত করছে এই বই।

এটা বলা হয়ে থাকে যে প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে কৃষি। কৃষিজাত সেই অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে ঠেলে নিয়ে গেছে ব্যবসা। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের তৈরিকৃত পণ্যসামগ্রী, মশলা ইত্যাদি ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের ব্যবসার মূল উপকরণ। মশলা বা অন্যান্য উপকরণে না হলেও তৈরিকৃত পণ্যসামগ্রীর দিক দিয়ে প্রাচীন ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলা অঞ্চল ছিল অন্যতম। আর প্রাচীন বাংলার গুরুত্বপূর্ণ বা বলা চলে প্রধানতম তৈরি পণ্য ছিল তাঁতবস্ত্র। এছাড়া উল্লেখযোগ্য পণ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল হাতির দাঁতের বিভিন্ন পণ্য,কাঠের তৈরি সূক্ষ্ম কারুকাজ করা বিভিন্ন দ্রব্য ইত্যাদি। এটা ভাবা অসঙ্গত নয় যে বহির্বিশ্বে প্রাচীন ভারতবর্ষের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল যেসব কারণে তার মধ্যে হস্তচালিত তাঁত যন্ত্রে তৈরি করা বস্ত্র প্রধানতম। চাণক্য, প্লিনি কিংবা পেরিপ্লাসের নাম না জানা লেখকের বিবরণ, টলেমির বিবরণ থেকে শুরু করে চীনা পর্যটকদের বিবরণেও এর সত্যতা মেলে। এইসব বিবরণে তাঁতবস্ত্রের যত উল্লেখ পাওয়া যায় অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর কথা ততটা পাওয়া যায় না। গ্রিক লেখক প্লিনির বিবরণে পাওয়া যায়, সে সময় ভারত থেকে প্রায় পঞ্চান্ন কোটি রোমান মুদ্রার (সেস্টোরসেজ) ভারতীয় পণ্য রোমে রপ্তানি হত। বলা বাহুল্য, এই রপ্তানি পণ্যের মধ্যে বড় অংশ ছিল সুতি ও রেশম বস্ত্র। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের হিসাব অনুসারে সেই সুতি ও রেশম বস্ত্র রপ্তানির পরিমান ছিল চৌদ্দ লাখ পাউন্ড!

প্রাচীন ভারতবর্ষে তাঁতশিল্পের গুরুত্বের জায়গা বোঝাবার জন্য এতক্ষণ এইসব প্রাচীন তথ্য টানা হল। এবার প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রসঙ্গ মূলত বাংলাদেশের শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দ এর সদ্য প্রকাশিত বই “বাংলাদেশের তাঁতশিল্প”।

পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে ভারত উপমহাদেশীয় তথা বাংলার তাঁতশিল্পের প্রাথমিক ধারণা যেমন থাকছে এই বইটিতে, তেমনি থাকছে বাংলার তাঁতশিল্পের সোনালী অতীতের কথা। বৈচিত্রময় সুতার কাহিনী, রঞ্জনশিল্প তথা সুতা ও বস্ত্র রঙ্গিন করার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি, প্রাচীনকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত বিভিন্ন তাঁতযন্ত্রের উদ্ভব ও বিবর্তনের রূপরেখার কথা যেমন থাকছে এই বইয়ে তেমনি থাকছে তাঁতশিল্পের সাথে যুক্ত তাঁতিদের অতীত-বর্তমান, তাদের সমাজজীবন, মনোজগতের গল্প। তাঁতযন্ত্রে বস্ত্রবয়ন পদ্ধতি এবং তার কৌশলগত খুঁটিনাটি, ঐতিহ্যবাহী বৈচিত্রময় নকশা, নকশার বিবর্তন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এই বইয়ে। এছাড়াও প্রাচীন ও বর্তমান কালের বাজার ও বিপনণ বিষয়ে ধারণা দেবার চেষ্টাও রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তাঁতি এবং তাঁত সংশ্লিষ্ট মানুষদের বক্তব্য যেমন রয়েছে এই বইয়ে তেমনি রয়েছে নাগরিক উদ্যোক্তা থেকে তাঁত সংশ্লিষ্ট সরকারি মানুষদের কথাও। কাজেই গবেষকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নয়, তাঁত বিষয়ে তাঁত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও দেখা যাবে ‘বাংলাদেশের তাঁতশিল্প’ নামের এই বইয়ে।

বাংলাদেশের তাঁতশিল্প নিয়ে এত বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে এর আগে কোনও গবেষণা অথবা গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হয়নি বলেই আমরা জানি। মসলিন, জামদানি নিয়ে পৃথক পৃথক বই থাকলেও এবং তাঁত নিয়ে অল্পবিস্তর লেখালেখি হলেও সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে তাঁতশিল্প নিয়ে প্রকাশিত হওয়া বই এটাই প্রথম।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ যতই একটি বিভাজক রেখা টেনে দিক না কেন বর্তমান বাংলাদেশ অন্যান্য স্বাধীন দেশগুলোর মতোই ভারতবর্ষের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। শাসন ব্যবস্থা, মুদ্রা বা জাতীয় পতাকায় পার্থক্য থাকলেও সাংস্কৃতিগত অনেক কিছুতে বর্তমান ভারতবর্ষের তথা পশ্চিমবঙ্গের সাথে এর সাদৃশ্য রয়েছে। এই সাদৃশ্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে তাঁতশিল্প। সে কারণে বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের আলোচনায় ভারতবর্ষের তাঁতশিল্পের আলোচনাকে উহ্য রাখা সম্ভব নয়। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লেখক শাওন আকন্দ “বাংলাদেশের তাঁতশিল্প”তে সে কথা উল্লেখ করেছেন। দেশভাগের ফলে অন্যান্য অনেককিছুর মতোই তাঁতশিল্পেও একটা অভিঘাত লেগেছিল। এর ফলে বর্তমান বাংলাদেশের তাঁতিদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দেশান্তরী হয়ে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিপুর, সমুদ্রগড়, ফুলিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি গেড়েছেন। আবার বেনারস বা ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও অনেক তাঁতি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে চলে এসেছেন। যে প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে বেনারসি শাড়ি তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে তাঁতযন্ত্রে। শাওন আকন্দ দেখিয়েছেন, এই দেশান্তরী তাঁতিদের কারণে দুই দেশের তাঁতশিল্পের ইতিহাস খানিক পাল্টে গেছে। আর এই পাল্টে যাওয়া ইতিহাসের অনুসন্ধান করতে হবে দুই দেশেকে, যৌথভাবে। এই বই হয়তো সেই যৌথ প্রক্রিয়াকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।

“বাংলাদেশের তাঁতশিল্প” বইখানির মোট বারোটি পর্বের একটি পর্ব সাজানো হয়েছে তাঁতিদের সাক্ষাৎকার দিয়ে। এই অংশে যেমন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতিদের সাক্ষাৎকার আছে, তেমনি আছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতিদের সাক্ষাৎকারও। দুই বাংলার লোকায়ত শিল্পের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লোকায়ত শিল্পের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় লোকশিল্পীদের বক্তব্য শোনা যায় না। তারা কী বলতে চান, কেন বলতে চান — বিভিন্ন তত্ত্বের মাধ্যমে সেগুলোকে আড়াল করে রাখা হয়। শাওন আকন্দ তার বইয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার সেই সীমাবদ্ধ পথটিকেই এড়িয়ে গেছেন যত্ন করে। আর সে কারণে পাঠকের সামনে এক নতুন জগত খুলে গেছে। এই সাক্ষাৎকার অংশে পাওয়া যাবে বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে তাঁতশিল্প নিয়ে দুর্নীতির গল্প, ধুঁকতে থাকা তাঁতিসমাজের দীর্ঘশ্বাস, পাওয়া যাবে দেশান্তরী তাঁতির গভীর মনোবেদনার স্পর্শ। দেশান্তর প্রক্রিয়ার মানসিক ধকল সামলে নতুন জনপদ আর জলবায়ুতে বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রজন্মান্তরে শিখে আসা বিদ্যাকে অবধারিতভাবে কাজে লাগানোর প্রক্রিয়াটা খুব একটা সহজ ছিল না। সে কারণে লাল-নীল-সবুজ সুতার বুনন যে সবসময় সমানভাবে এগিয়ে যায়নি সে গল্পের চাঁছাছোলা বয়ান পাওয়া যায় এই সাক্ষাৎকার পর্বে। বাংলাদেশের তাঁতিদের, যারা দেশভাগের পর নিজ ভূমি ত্যাগ করে পাড়ি দিয়েছিলেন অজানায়, তাদের একটা বড় আশ্রয়কেন্দ্র ছিল সমুদ্রগড়। বর্ধমানের সমুদ্রগড়ে মূলত বাংলাদেশের টাঙ্গাইল অঞ্চলের অভিবাসী বসাক তাঁতিদের বাস। শাওন আকন্দ জানাচ্ছেন, “সেখানে একদিন দুপুরে আমরা হাজির হই তাঁতশিল্পের বর্তমান হালচাল দেখার উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন তাঁত কারখানা দেখার পর আমরা একটা সমবায় সমিতির অফিসে বিশ্রাম নিতে বসি। সেখানেই আমাদের সাথে কথা হয় অনিল কুমার বসাকের। সমুদ্রগড় এবং বসাক তাঁতিদের সম্পর্কে নানা চিত্তাকর্ষক তথ্য জানা গেছে তাঁর কাছ থেকে।” গবেষক এবং তাঁতির সেই আলোচনার অল্পকিছু অংশ আমরা তুলে দিচ্ছি পাঠকদের জন্য।

শা.আ. : সমুদ্রগড়ে কীভাবে তাঁতের সূত্রপাত হল, সে বিষয়ে আপনার কী অভিমত?

অনিল : প্রথমে তাঁতের শুরুটা হয় ফুলিয়াতেই। বিধান রায় যখন কল্যাণী করল, দুর্গাপুর করল, তারপরে… তখন কিছু তাঁতশিল্পী বাংলাদেশ… পাকিস্তান পিরিয়ড তখন; পাকিস্তান থেকে এনে এইখানে… ফুলিয়াতে তখন প্রচুর জায়গা ছিল।

শা.আ. : এটা কোন সময়ের কথা বলছেন?

অনিল : সেটা অন্তত… উনিশশ আটচল্লিশ… বিধান রায় মুখ্যমন্ত্রী ছিল কোন সালে? বিধান রায় মুখ্যমন্ত্রী ছিল তখন… দোকান-টোকান করল, শিল্পনগরী করল… তার শখের কল্যাণী… তার মায়ের নামে না কার নামে… কল্যাণী সংস্কার করে, সেরকমভাবে পরিস্থিতি করে উনি সেইভাবে স্ট্যাটাসলি সব তৈরিপত্র করল। তখন দেখল যে, কৃষি তো আছেই, তাঁতশিল্পীর একটা গোষ্ঠীকে এনে… কয়েকটা ফ্যামিলি… পাকিস্তান পিরিয়ডে ওইখান থেকে এনে ফুলিয়াতে… কলোনিতে জায়গা দিল।

শা.আ. : ওখান থেকে মানে?

অনিল : টাঙ্গাইল থেকে। এখন তো টাঙ্গাইল জেলাই। আগে ময়মনসিংহ জেলা ছিল। টাঙ্গাইল থেকে ওদের কিছু ফ্যামিলি নিয়ে আসে। আর ওই সময়ে দুই-একটা ফ্যামিলি চলে আসে আমাদের এখানে।

শা.আ. : সমুদ্রগড়ে?

অনিল : হ্যাঁ, সমুদ্রগড়ে। চলে এসে এখানে তখন মহেন্দ্র বসাক, গদাধর বসাক আর হচ্ছে চাঁদমোহন বসাক আর মহাদেব বসাক; তখন টোটাল নশরতপুরে তিনটি ফ্যামিলি হল — মহেন্দ্র বসাক, গদাধর বসাক আর হচ্ছে গিয়ে যোগেন্দ্র বসাক। আমাদের এখানে হাতশোলাতে এল তিনটি ফ্যামিলি — চাঁদমোহন বসাক, মহাদেব বসাক আর হচ্ছে যদুনাথ বসাক। তখন তো সব মাঠ। এই পাকা রাস্তাটি হয়নি তখনও।

শা.আ. : তখনকার সময়ের সমুদ্রগড়ের একটা বিবরণ যদি আপনি দেন।

অনিল : তখন তো এখানে শুধু এখানকার স্থানীয় লোকেরা গরু চড়ায়, ধান আবাদ করে। আর এরা কয়েকটা ঘর বসে তখন তাঁতের কাজ শুরু করে।

অনিল কুমার বসাকের মতো দুই দেশের ২১ জন তাঁতিদের বয়ান থেকে পাঠক নিজেই তৈরি করে নিতে পারবেন দুই দেশের তাঁতশিল্পের বর্তমান রূপরেখা।

ইতিহাসের পেছনের ইতিহাস আর রাজনীতির পেছনের রাজনীতি নাকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁতশিল্পের নিরিখে সেই তত্ত্ব ভীষণভাবে খেটে যায়। খ্রিস্টপূর্ব কাল থেকে মুঘল যুগ পর্যন্ত বাংলা তথা পুরো ভারতবর্ষ তাঁতশিল্পের সার্থক স্বর্ণালী উত্তরাধিকার বয়ে চলেছিল। ব্রিটিশ যুগে সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক আশ্চর্য সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু কেন? শাওন আকন্দ জানাচ্ছেন, ঔপনিবেশিক রাজনীতির সরাসরি বলি হয়েছিল তাঁতশিল্প। সুপরিকল্পিতভাবে একে দীর্ঘ সময় ধরে হত্যা করা হয়েছে সরাসরি, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায়। পলাশীর যুদ্ধের আগে ইংল্যান্ড অন্তত দুটি আইন করে ভারতীয় সুতি ও রেশমবস্ত্রের আমদানি ঠেকিয়েছিল নিজেদের তাঁতিদের কথা মাথায় রেখে। দেওয়ানি লাভের পর বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁতশিল্পের উপর পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং রপ্তানির জন্য অধিক কাপড় উৎপাদনের লক্ষ্যে তাঁতিদের উপর অত্যাচার শুরু করে। এই অত্যাচারের গল্প কিংবদন্তির আকারে শুনে থাকি আমরা — কখনও তাঁতিদের আঙুল কেটে দেওয়ার আখ্যানে, কখনও তাঁতিদের পালিয়ে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে যাবার বয়ানে। তাঁতশিল্পের উপর ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রভাব ছিল বহুমুখী এবং ভয়াবহ। ইংল্যান্ডে নিজেদের তাঁতিদের সুরক্ষা আইন, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং সে কারণে আমেরিকা-ইংল্যান্ড উত্তেজনা, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনে ইংল্যান্ডের সাথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংঘর্ষ ইত্যাদি বহুবিধ ঘটনার প্রভাব পড়েছিল আঠারো শতকের বাংলায় এবং তাঁতশিল্পের উপর। এই পুরো চিত্র তথ্য-উপাত্য-সারণীর মাধ্যমে শাওন আকন্দ তুলে ধরেছেন তার বইয়ে যা আঠারো শতকের বাংলা তথা ভারবর্ষ, তার অর্থনীতি আর কিছু পরিমাণে রাজনীতিকে বুঝতে সহায়তা করে।

শাওন আকন্দ খুব গুরুত্বের সাথে রচনা করেছেন বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের বর্তমান অবস্থা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে তিনি এবং তার দল যেসব তথ্য-উপাত্য সংগ্রহ করেছিলেন, বলা চলে ২০১০ সাল পর্যন্ত তা বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের এক বিরাট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।তাঁতশিল্পের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই তথ্য ও উপাত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাকে বৃহত্তর অংশে ধরে (১৯৮০’র দশকের বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের মহকুমাগুলোকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। সে কারণে প্রতিটি বৃহত্তর জেলা ভেঙে একাধিক জেলা তৈরি হয়। (যেমন: বৃহত্তর দিনাজপুর। এই জেলা ভেঙে দিনাজপুর, পঞ্চগড় এবং ঠাকুরগাঁও জেলা তৈরি হয়। তাই বৃহত্তর দিনাজপুর বললে একসাথে তিনটি জেলাকেই বোঝায়।) এই আঞ্চলিক ইতিহাস তৈরি করা হয়েছে। এই ইতিহাসে একই সাথে প্রাচীন ও বর্তমান দুই ধরনের তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দিনাজপুর জেলার কথাই ধরা যাক। এই জেলার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে শাওন আকন্দ লিখছেন, “দিনাজপুর অঞ্চলে মুঘল ও বৃটিশ আমলে কিছু কিছু রেশমের চাষ হত বলে জানা যায়। বিশেষ করে এন্ডি রেশমের চাষ হত এই অঞ্চলে। ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে বুকানন দিনাজপুরে ৪,৮০০ তাঁতে রেশমবস্ত্র বয়ন করতে দেখেছেন। তবে তাঁতশিল্পের নিরিখে দিনাজপুর অঞ্চলের গুরুত্ব মূলত সুতি বস্ত্রবয়ন এবং পাটের সুতা থেকে চট তৈরির জন্য। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের সরকারি প্রতিবেদনে জানা যায়, খানসামা থানার খানসামা; বীরগঞ্জ থানার দেবীবাজার, ঝাড়বাড়ি, ডাঙ্গাপাড়া; ঠাকুরগাঁও থানার গড়েয়া, কেশুরবাড়ি, বড়গাঁ; বালিয়াডাঙ্গি থানার জাউনিয়া, শাবাজপুর, গোহালগাড়ি, কাশিয়াডাঙ্গা; রাণীশংকইল থানার রাণীশংকইল, বান্দ্রা; কোতোয়ালি থানার রাণীগঞ্জ, চিনিরবন্দর (চিরিরবন্দর) এবং পশ্চিম দিনাজপুরের (বর্তমান ভারতের অংশ) ইটাহার থানার চাবোট, তিবিলা, জালিগ্রাম, নামতার, ভবানীপুর, শাহাভিটা, ধানশোল, ভরত ইত্যাদি গ্রামে সুতিবস্ত্র বয়নের কাজ হত। তবে এই শিল্পের মূল কেন্দ্র ছিল দেবীবাজার, জাউনিয়া, শাবাজপুর, চিরিরবন্দর, রাণীশংকইল, খানসামা, কেশুরবাড়ি, রাণীরবন্দর, চূড়ামন, ভরত ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, অবিভক্ত দিনাজপুরের সুতিবস্ত্র বয়নের মূল কেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্গত।” আবার একই সাথে তিনি এই অঞ্চলের বর্তমান ইতিহাসের তথ্যও পরিবেশন করছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আর্থিক সংকট মোকাবেলার জন্য এই গ্রামের মানুষ কম্বল তৈরি শুরু করে। স্থানীয় সুনীল দেবনাথ নামক জনৈক তাঁতি এই গ্রামে প্রথম কম্বল তৈরি শুরু করেন বলে স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়।” বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার এই প্রয়াস অত্যন্ত জটিল এবং কষ্টসাধ্য। শাওন আকন্দ সেই কষ্টসাধ্য কাজটিই করার চেষ্টা করেছেন।

শাওন আকন্দের “বাংলাদেশের তাঁতশিল্প” নামের এই বইখানাকে বলা যেতে পারে ‘বহুমুখী সম্ভাবনার’ বই। প্রচুর তথ্য যেমন আছে এই বইয়ে, তেমনি রয়েছে প্রচুর নতুন বিশ্লেষণ। রয়েছে বিষয়ের ভেতর থেকে বিষয়কে দেখার এক সৎ প্রচেষ্টা। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বসার এক ভীষণ সাহসী পদক্ষেপ দেখা যায় “বাংলাদেশের তাঁতশিল্পে।” সে কারণে এই বইকে আলাদাভাবে চেনানোর প্রয়োজন রয়েছে পাঠকের কাছে।

ধরতাই : 

১। ইতোমধ্যে আমরা বলেছি যে বাংলাদেশে একসময় যে সূক্ষ্ম সুতা হাতে কাটা হত, তার অন্যতম কারণ ছিল এই অঞ্চলে উৎপাদিত ফুটি কার্পাস। এই ফুটি কার্পাস ছাড়া অন্য তুলা দিয়ে এত সূক্ষ্ম সুতা হাতে কাটা সম্ভব হত না। ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট যখন কিছু কার্পাস আমেরিকা থেকে আমদানি করে ঢাকার তাঁতিদের দিয়েছিলেন সুতা কাটার জন্য, তখন তারা অনেক চেষ্টা করেও তা দিয়ে সুতা কাটতে পারেননি এবং তারা একযোগে রায় দিয়েছিলেন যে আমদানি করা আমেরিকান কার্পাস ঢাকার তাঁতের অনুপযোগী। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশে আমেরিকান তুলা চাষের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তা সফলতা লাভ করতে পারেনি।

২। হিন্দু তাঁতি বা তন্তুবায়রা বর্ণবিন্যাসের দিক থেকে শূদ্র পর্যায়ভুক্ত, তা আগেই বলা হয়েছে। যে নয়টি বিশুদ্ধবর্ণ নিয়ে বল্লাল সেনের নবশাখ গঠিত হয়েছিল, তাঁতিরা তার অন্তর্গত ছিল। জেমস ওয়াইজ (১৮৮৩) তাঁতিদের চিত্তাকর্ষক বিবরণ দিয়েছেন, ‘বঙ্গদেশে হিন্দুদের বিভিন্ন জাতের মধ্যে তাঁতিরা হল এক কৌতূহলোদ্দীপক জাত।… তাদের নিজেদের মধ্যে প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মালদা থেকে তাদের নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় আনা হয়।’ উল্লেখ্য, এ ধরনের গল্প বা কিংবদন্তি হিন্দু তাঁতিদের মধ্যে যারা ‘বসাক’ উপাধি ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এখনও (২০১০) প্রচলিত আছে। তবে তাঁতিদের বসাক উপাধি গ্রহণ বিষয়ে জেমস ওয়াইজ প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘তাঁতিরা সবাই গ্রহণ করত বসাক পদবি। শুরুতে এই পদবি গ্রহণ করত একমাত্র ধনী তাঁতিরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধনী তাঁতিরা এই পেশা ছেড়ে দিয়ে কাপড়ের ব্যবসা করত। এই তাঁতিদের অনেকেরই পূর্বপুরুষ আড়ং-এ যেসব উপাধি গ্রহণ করত এখনও এরা তাই করে। যেমন : যাচানদার — যে যাচাই করে; মুখিম — পরিদর্শক; দালাল, সরদার। পারিবারিক ডাক নাম হত অন্য জাতের মত।’

৩। সাধারণত মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা তাঁতে কাপড় বোনেন, তাদের ‘জোলা’ নামে ডাকা হয়। কিন্তু সব মুসলমান তাঁতিই ‘জোলা’ নয়। জেমস ওয়াইজ লিখেছেন, ‘জোলাদের থেকে মুসলমান তাঁতিদের ‘কওম’ স্বতন্ত্র।’ এর কারণটাও তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘তাঁতিরা বানায় জামদানি বা নকশা তোলা কাপড়; আর জোলারা বানায় মোটা মসলিন। একসঙ্গে এরা খাওয়াদাওয়া করলেও এদের মধ্যে বিয়েশাদি হয় না। তাঁতিদের জোলা বললে ভীষণ চটে যায়। কারিগর কিংবা জামদানি তাঁতি বললে খুশি।’ জেমস টেইলরের ভাষ্যানুযায়ী, ‘খুব সম্ভবত মুসলমানরাই জামদানি মসলিনের বুননের প্রচলন করেন এবং আজও তাদের হাতেই প্রধানত এর উৎপাদন একচেটিয়া।’

জামদানি বয়নের এই মুসলমান তাঁতিদের তাঁত জোলাদের তাঁত থেকে আলাদা। তাঁতিদের তাঁত হল দুই সানা ও দুই প্যাডেল-বিশিষ্ট। এই তাঁতে তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট কাপড় বোনা যায়। জামদানি তাঁতে মূল তাঁতির সাথে কাজ করে একজন বালক, শিক্ষানবিশ হিসেবে, যে কিনা কাজ করতে করতে শিখে নেয় কয়টি সুতা ছাড়তে হবে, কয়টি সুতা ধরতে হবে ইত্যাদি। এভাবে উস্তাদের কাছে জামদানি বয়ন শেখে ছেলেটা। ক্রমে সেও পাকা তাঁতি হয়ে ওঠে।

জেমস ওয়াইজ উনিশ শতকের শেষার্ধে মুসলমান তাঁতিদের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা স্পষ্টতই জামদানি তাঁতিদের নিয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘বিশেষ করে এরা বাস করে ডেমরা-নবীগঞ্জ ও লক্ষ্যা নদীর পার বরাবর। ব্যবসার মন্দা মরশুমে এরা হালচাষ করে। কখনও তাঁতে কাপড় বোনে না এদের মেয়েরা। তার বদলে ওরা জামদানিতে চিকনের কাজ করে অর্থাৎ নকশা তোলে। জোলা-বৌরা কাপড় ধোয়া, আঁশ সাফ করা ও সুতা বোনার কাজ করে বলে তাঁতি-বৌরা ওদের মনে করে ছোট জাত।’

জেমস ওয়াইজের ভাষ্যমতে, হিন্দু তাঁতিরা জামদানি বানায় খুবই কম। হিন্দু তাঁতিদের অর্ডার মুসলমান তাঁতিরা নেয়। হিন্দু পুঁজিপতিকে বলা হয় মহাজন বা সর্দার আর মুসলমান হলে সাওতা। এরা বিশেষ কাজের জন্য টাকা অগ্রিম দেয়। কাজ ভাগ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে।কথা থাকে, একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করে দিতে হবে। জামদানির বিরাট বাজার হল লক্ষ্যার তীরে ডেমরায়। প্রতি শুক্রবারে বসে এক বিরাট মেলা। জামদানি কেনাবেচা হয় বহু টাকার।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1907 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...