প্রতি-কবিতার জনক নিকানোর পাররার প্রয়াণে

রাজু আলাউদ্দিন

 

ক্রিস্তোবাল কোলনের দিয়ারিও দে আ বোর্দো (ভ্রমণের দিনলিপি), আন্তোনিও পিগাফেত্তার প্রিমের বিয়াহে আলরেদেদোর দেল মুন্দো (পৃথিবীর চারিদিকে প্রথম ভ্রমণ) কিংবা হেরোনিমো দে বিবারের ক্রোনিকল দে লস রেইনোস দে চিলে (চিলি রাজ্য সম্পর্কে কালপঞ্জি)-র মাধ্যমে যখন এক অজানা মহাদেশের অদ্ভুতুড়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হল স্পানঞলরা তখন তাদের বিস্ময়ের কোনও সীমা ছিল না, কেননা এই অজানা মানচিত্রে যা কিছুই দেখা গেল তার সাথে মিল ছিল না তাদের চেনা বাস্তবতার। থাকবার কথাও নয়, কারণ তারা এসেছে অন্য ভূখণ্ডে, অন্য জাতি ও সংস্কৃতির ভিন্ন আবহে। এতই ভিন্ন যে তা অভিযাত্রীদের বাস্তববোধকে রীতিমত গুলিয়ে দিয়েছিল।

গোটা মহাদেশটাকেই স্পানঞলদের কাছে মনে হয়েছিল এক ‘মাতাল মানচিত্র’। এমনই ছিল লাতিন আমেরিকা আবিষ্কারের আদিপুরুষদের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা। তাদের দিনপঞ্জিগুলো অন্তত আমাদের সে কথাই বলে। ওই দিনপঞ্জিগুলো পড়লে মনে হবে বুঝিবা জাদুবাস্তবতার আদিরূপ মার্কেস বা কার্পেন্তিয়েরদের আগেই ওরা তৈরি করে রেখেছে। আর আছে ক্রুসেডের মতো নিধনের উন্মত্ততা।

১৪৯২ সালে লাতিন আমেরিকা আবিষ্কারের পর থেকেই শাসকরা এই মহাদেশ দখল ও লুটপাটের মাধ্যমে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল স্থানীয় বাস্তবতাকে নির্মমভাবে। তারা শুরু করেছিল এই বাস্তবতাকে নিজেদের মতো গড়ে নিতে। অতএব, এরপর বিস্ময়ের পালা লাতিন আমেরিকাবাসীদেরই। কেন না যে-বর্বরতার মাধ্যমে স্পানঞলরা নতুন পৃথিবীর বিদ্যমান বাস্তবতাকে তাদের আকাঙ্খা অনুযায়ী বদলে নিচ্ছিল তা পুরোপুরি  হতবাক করে দিয়েছিল আদি বাসিন্দাদেরকে। স্পানঞলদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণাই ছিল না। ফলে স্পানঞলরা যা করতে চেয়েছিল তাই করেছে সুপরিকল্পিতভাবে, কিংবা ইতিহাসের অনিবার্য প্রতারক টানে। সে ইতিহাস আজ আমরা সবাইই জানি।

তবে ইতিহাস বোধহয় প্রত্যেক জাতিকেই কোনও এক সময় একটি সুযোগও এনে দেয় প্রতিশোধের। লাতিন আমেরিকা এই প্রতিশোধটি নিয়েছিল, প্রতিপক্ষের বর্বরতার মাধ্যমে নয়, বরং সাহিত্যের মতো একটি মনোমুগ্ধকর অস্ত্রের মাধ্যমে।

কয়েক শতকের স্তব্ধতা ভেদ করে সাহিত্যে প্রথম যে কণ্ঠটি বিস্ফোরিত হয়েছিল তিনি চিলের মহান কবি পাবলো নেরুদা। গোটা লাতিন আমেরিকাবাসীর শোষণ বঞ্চনা ও নির্মম বাস্তবতার পাশাপাশি তাদের আত্মার মহিমাকে এমনভাবে রূপদান করলেন তিনি যা গোটা বিশ্বকে অভিভূত করে দেয়।

যে মহাদেশকে একদা পশ্চিম দখল করে নিয়েছিল বর্বরতার মাধ্যমে, সেই মহাদেশ গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে পালটা দখল শুরু করে দিয়েছিল বর্বরতার জবাবে তীব্র জীবনমুখিতা, ভালোবাসা, শিল্প, গান আর সাহিত্যের মতো আরও টেকসই ধারালো ও অব্যর্থ অস্ত্রের মাধ্যমে। এই পাল্টা-দখলের নেতৃত্ব দিয়েছিল চিলে, অন্তত কবিতার জায়গা থেকে তো বটেই। আর এতে কেবল নেরুদাই ছিলেন না, নেরুদার আগেও ছিলেন কেউ কেউ, যেমন গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, বিসেন্তে উইদোব্রো, পাবলো দে রোকা, উমবের্তো দিয়াস কাসানুয়েবা। আর নেরুদার পরে চিলিরই আরেক গুরুত্বপূর্ণ কবি নিকানোর পাররা।

যে-বিপুল কল্পনাশক্তি, ইতিহাস চেতনা, আর গোটা জনগোষ্ঠীর যৌথচেতনাকে অঙ্গীভূত করে নেরুদা হয়ে উঠেছিলেন আগ্নেয়গিরির মতো উদগীরণশীল এক কবি, তাঁকে এড়িয়ে স্প্যানিশ কবিতায় নতুন ধারা নির্মাণ পরবর্তীদের জন্য ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। পাররা সেই দুঃসাধ্য কাজটি করেছিলেন নেরুদার জীবদ্দশাতেই। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও নেরুদার কবিতার সর্বগ্রাসী প্রবণতার গোপন দংশন থেকে সুরক্ষা করেছেন নিজেকে। এটা খুবই আশ্চর্যের যে চিলে এবং আর্হেন্তিনায় গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে একাধিক সাহিত্যিক দল দেখা দিয়েছে কিন্তু এর কোনওটিই পাররাকে গণ্ডীভূত করে ফেলতে পারেনি। কিংবা তিনি হতে চাননি। লুইস ওইয়ারসুন, হোর্হে মিইয়াস, আলবের্তো বায়েসা ফ্লোরেস, বেনানসিও লিসবোয়া এবং বিক্তোরিয়ানো বিকারিওকে নিয়ে যে-দল গড়ে উঠেছিল তাদের মধ্যে নিকানোর পাররা, নিজের মুদ্রাগুণে আলাদা হয়ে পড়েছিলেন প্রায় শুরু থেকেই।

পাররার প্রথম কবিতার বই কানসিওনেরো সিন নম্ব্রে বা ‘বেনামী গানের খাতা’ বেরিয়েছিল ১৯৩৭ সালে। বিসেন্তে উইদোব্রো তখন খ্যাতি ও প্রতিপত্তির চূড়ায়। নেরুদাও ততদিনে পরিচিত। এদের প্রভাব এড়িয়ে সত্যিকারের নতুন ধরনের কবিতা লেখা ছিল প্রায় অসম্ভব। এদের লিরিক স্বভাবের প্রভাব, আখ্যানধর্মিতা, এমনকি লোর্কার রোমান্সেরো হিতানো গ্রন্থের প্রভাবও এই বইয়ের মধ্যে পাওয়া যাবে।

কিন্তু আবার এই প্রথম বইটির মধ্যেই, পরবর্তীতে তিনি যে প্রতি-কবিতা বা এ্যান্টি পোয়েমস-এর ধারণা নিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন তার বীজও অতলে বুনে রেখেছিলেন। ১৯৫৪ সালে সেই বীজ পরিণত বৃক্ষ ও ফলে শোভিত হয়ে প্রকাশিত হয় পোয়েমাস ই আন্তিপোয়েমাস নামে। এই বইয়ে পাররা তার চোখধাঁধানো নিজস্ব বৈশিষ্ট নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।

পাবলো নেরুদার প্রভাবে ইতিমধ্যে যে কাব্যধারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে সেই ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল এই গ্রন্থের কবিতাগুলো। ঠাট্টা মশকরা, ব্যাজস্তুতি, আর প্রতিনায়কধর্মী চরিত্রের অস্তিত্ব — এইসব উপাদানের হুল্লোড় পাঠকদের মনোযোগকে সচকিত করে তুলেছিল। আর এর ভাষাও ছিল আগের কবিদের কাব্যিক ভাষার জবরদস্ত চর্চার বাইরে, বাইরে মানে একেবারে কথ্যভাষার আদলকে অবলম্বন করেছিলেন পাররা। এর মধ্যে অঙ্গীভূত করে নিয়েছিলেন সংলাপ, দৈনন্দিন আপাত তুচ্ছ বিষয়গুলোকেও। পাররার প্রতি-কাব্যিক স্পর্শে, তির্যক পর্যবেক্ষণে আর ঠাট্টায় এসব উপাদান  জ্বলে উঠেছিল তারাবাত্তির মতো। তার কবিতাকে বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন বুদ্ধির দীপ্তি, হাস্যরস, উল্লাস আর নিরাবেগ এ্যাবসার্ডিটির মাধ্যমে।

তাঁর প্রতি-কবিতার ধারণা গোটা লাতিন আমেরিকায় কাব্যতত্ত্বের ধারায় যেমন নতুন, তেমনি তা গভীরভাবে প্রভাব সঞ্চারীও হয়ে উঠেছিল। প্রভাবের প্রধান কারণ এর সম্মোহনী সারল্য। তবে সারল্য ছিল বুদ্ধিমত্তা আর রসবোধের দ্বারা শাণিত। পাররার আগে স্প্যানিশ কবিতা নেরুদা বা উইদোব্রোর কাব্যিক আভিজাত্যের বাইরে যাওয়ার হিম্মত দেখাতে পেরেছে — এমন নজির প্রায় বিরল। যদিও ‘প্রতি-কবিতা’ শব্দবন্ধটি পাররা ব্যবহার করার আগে থেকেই ছিল। পেরুর কবি এনরিকে বুস্তামেন্তে বাইয়িবিয়ানের আন্তিপোয়েমাস শিরোনামে ১৯২৬ সালে একটি বই বেরিয়েছিল। কিন্তু পাররার প্রতি-কবিতা বিষয়ক কাব্যতত্ত্বের সাথে এর মিল আছে খুব কমই। আরও একজন এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন, চিলের উইদোব্রো তাঁর ১৯৩১ সালে প্রকাশিত আলতাসোর কাব্যগ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে।

বলাই বাহুল্য, পাররার সাথে শব্দের মিলটুকু ছাড়া আর কোনও মিলই তাতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। চিলির সুপরিচিত সাহিত্য সমালোচক হোসে মিগেল ইবানঞেস লানলোইস পাররার প্রতি-কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছিলেন, “পাঁচের দশকের প্রথমদিকে প্রতি-কবিতা যখন বিস্ফোরিত হল তখন পাররা আমাদেরকে বিস্মৃতপ্রায় এই সচেতনতার কাছে নিয়ে গেল — ‘আবার! কবিতায় তাহলে সবই বলা যায়!’”

আসলেই তাই। আশ্চর্য যাদুবলে সবকিছুকেই তিনি কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। প্রচলিত কাব্যিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়েই কবিতাকে জনগ্রাহী করে তুলেছেন তিনি। আর্হেন্তিনার লেখক ও সাহিত্য সমালোচক রিকার্দো পিগলিয়ার ভাষায়, “আমরা সবাই বিশ্বাস করি চিলির সাহিত্য — প্রথমত এবং মুখ্যত — আসলে চিলির কবিতা: উইদোব্রো, নেরুদা…. আর ঐ মহৎ কবিদের গোটা ধারার মধ্যে আমার কাছে যিনি অন্য সবার উপরে তিনি নিকানোর পাররা।” (নিকানোর পাররা,এন্টিপোয়েমস: হাউ টু লুক বেটার এ্যান্ড ফিল গ্রেট, (অনুবাদক: লিজ ওয়ার্নার), নিউ ডিরেকশনস, ২০০৪, পৃ: ভূমিকাংশ-১১)”

শুধু স্প্যানিশভাষী সমালোচকদের কাছেই নন, ইংরেজিভাষী সমালোচকদের কাছেও তিনি সমাদৃত হয়েছেন তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য। মার্কিন সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম মনে করেন, “অবশ্যই আমি বিশ্বাস করি সাহিত্যের জন্য পাররার নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত… নিঃসন্দেহে তিনি পশ্চিমের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন (নিকানোর পাররা, এন্টিপোয়েমস: হাউ টু লুক বেটার এ্যান্ড ফিল গ্রেট, (অনুবাদক: লিজ ওয়ার্নার), নিউ ডিরেকশনস, ২০০৪, পৃ: ভূমিকাংশ-১১)”

বলা হয়ে থাকে নেরুদার শেষের দিকের কোনও কোনও কবিতায় রয়েছে এই অনুজের ছায়া। কী ভাবতেন এই অনুজ সম্পর্কে নেরুদা? স্পষ্টতই যে-নেরুদার বিরুদ্ধাচারণ করে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে দিলেন কবিতার জগতে, তাঁকে তিনি কীভাবে নিয়েছেন? শেলডেল রোডম্যানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে পাবলো নেরুদা পাররার কবিতা  সম্পর্কে বলেছেন, “পাররা হচ্ছে আভিজাত্য আর জনপ্রিয়তার মিশ্রণ। এটা তার ভাষাকে দিয়েছে দুর্দান্ত অভাবনীয়তা। সে আমাদের সবচেয়ে উদ্ভাবনাময় চিলীয় কবি। সে সাম্যবাদী না, তবে লাতিন আমেরিকার সব কবির মতোই সে বামপন্থী।” (শেলডেন রোডম্যান, টাংস অব ফলেন এ্যানজেলস, নিউ ডিরেকশনস, ১৯৭৪, পৃ:৭০)

বহু বছর যাবতই তিনি নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য তালিকায় ছিলেন। অনেকেই ধারণা করেছিল তিনি এই পুরস্কারটি পাবেন। ১০৩ বছরের দীর্ঘ জীবন পেলেও শেষ পর্যন্ত তাকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়নি। তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক পাররা সাধারণ মানুষকে কবিতামুখী করে তুলেছিলেন এমন এক যুগে যখন মানুষ কবিতাকে প্রায় ভুলতে বসেছিল। নাচ, গান, খেলাধুলা ও উৎসবের মতোই কবিতাকে — কাব্যগুণের প্রাথমিক ও মৌলিক শর্তকে পূরণ করেই — সাধারণের কাছে আকর্ষণীয় করার ঝুঁকি নেওয়া ছিল এক বিরাট ব্যাপার। ঝুঁকি এই জন্যে যে কবিতাকে শ্লোগানে পরিণত করতে গিয়ে বহু কবি শ্লোগানের ভারে লুপ্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু পাররা এই ঝুঁকি উৎরে গিয়েছিলেন প্রতিভাগুণে।

 

নোবেল পুরস্কার

স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ : রাজু আলাউদ্দিন

পড়ার জন্য নোবেল পুরস্কার
উচিত হবে আমার হাতে দেওয়া
আমি হলাম আদর্শ পড়ুয়া
হাতে যা পাই সবই পড়ে ফেলি:

 
রাস্তা ঘাটের নাম ঠিকানা পড়ি
এবং যত পথের নিয়নসাইন
টাট্টিখানার দেয়াল লিখন পড়ি
পড়ি নতুন মূল্য তালিকাও

 
এবং পড়ি বার্তা অপরাধের,
আবহাওয়ার পূর্বাভাসও পড়ি

 
গাড়িঘোড়ার প্যাটেন্টও বাদ নেই

 
আমার মতো লোকের কাছে, ভাই,
শব্দরা সব পুতপবিত্র

 
জুরি সভার ভদ্রমহোদয়
মিথ্যা বলে আমার কিবা লাভ
আমি তো এক তুখোড় পড়ুয়া
পড়ি সবই — বাদ পড়ে না কিছু
এক কলামের ক্ষুদ্র বিজ্ঞাপনও

 
সত্য বটে অল্প পড়ি হালে
কারণ সময় পাই না খুব একটা
ওমা, আগে কত্ত যে পড়েছি

 
এই কারণেই নোবেল পুরস্কার
চাচ্ছি, আমায় পাঠের জন্য দিন
এক্কেবারে স্বল্প কালের মাঝে

 
পাররার পাতা (সান্তিয়াগো, হানিমেদেস, ১৯৮৫) নামক গ্রন্থ থেকে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...