আমাদের দ্বন্দ্বের মুখ নিকানোর পাররা

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

 

আমি পাররা পরবর্তী চিলের গুরুত্বপূর্ণতম কবি রাউল সুরিতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম নিকানোর পাররা বিষয়ে। তাঁদের অগ্রজ হিসেবে কতটা প্রাসঙ্গিক নিকানোর। আর সেই প্রসঙ্গেই উঠে এসেছিল ভাষার উপরে নিকানোর পাররার অত্যাচারের কথা, বিপ্লবের কথা। নিকানোর তুলে এনেছিলেন প্রাত্যহিক মানুষের মুখের কথা। তাঁর কবিতা ছিল সেই বিপ্লবের মুখ যা চিলের মানুষ প্রতিদিন তাঁদের বেঁচে থাকা দিয়ে পিনোচেত-এর অত্যাচারের সময়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন।

কিন্তু আমরা দূর দেশে থেকেও কেন তাঁকে পড়ি? যেখানে কবিতা প্রতিনিয়ত নতুন দুনিয়ার ভাষা (আমেরিকা, ওশিয়ানিয়া মহাদেশ) ও পুরনো দুনিয়ার ভাষার মধ্যে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে বারবার, আমরা প্রাচীন দুনিয়ার কাব্যদর্শনে এতটাই অভ্যস্ত যে বেশিরভাগ সময় নতুন দুনিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারি না। মার্কিন সমসাময়িক কবিতার সঙ্গে একেবারেই সংযুক্ত হতে পারি না। অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে কোনও আগ্রহই দেখাই না।

এখানেই আসে নেরুদার কথা, যিনি ইস্পানো আমেরিকার কাব্যভাষার পিতা। তাঁর হুইটম্যানিয় উচ্চতায় তিনি আমাদের কাছের লোক হয়ে গিয়েছিলেন সহজে। কিন্তু নিকানোর? তাঁর কবিতা তো চিলের, একান্ত, বড়জোর দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের। যে মহাদেশ তার নতুন ভাষা, পুরনো দুনিয়া থেকে আলাদা হবার ভাষা খুঁজে পেয়েছে ২০ শতকে। এবং নিকানোর পাররা সেই ভাষার এক উজ্জ্বল স্থপতি।

নিকানোর পাররাকে স্পেনীয় ভাষার সর্বোচ্চ সম্মান সেরবান্তেস পুরস্কার দেবার সময় কমিটি জানায় তাঁকে পুরস্কৃত করা হল প্রায় মৌলিক কবিতা লেখা জন্য। এখানেই আমাদের প্রশ্ন জাগে মৌলিক কবিতা কী? ২০ শতকেও মৌলিকতা আসে? যেখানে নিকানোর নিজেই স্বীকার করেছেন তাঁর শিকড় সপ্তদশ শতকের স্পেনের কবি ফ্রান্সিস্কো দে কেবেদো?

আমাদের ঘুরে দেখার প্রয়োজন সেই ইতিহাস, কীভাবে এক মৌলিক কবি, তাঁর পুরনো দুনিয়ার  শিকড় ও ঐতিহ্য সমেত নতুন দুনিয়ার কাব্যভাষা ও দর্শন নির্মাণ করলেন এবং তা উভয় দুনিয়ার কাব্যপাঠকের কাছে পৌঁছে গেল।

কেবেদো তাঁর এক বিখ্যাত কবিতায় লিখছেন:

কাব্যদেবী শিষ দেয় দেয় না প্রেরণা

সে চেনে আসল প্রতারক

নিজের পকেটে হাত রাখা উদ্দীপক

তাঁর বীণার চাইতে হবে মহৎ এষণা

 

সে তো অ্যাপোলোর নয়, তারচেয়ে বড় কিছু অনৃত হয় না

এইখানেই ঢুকে পড়েন নিকানোর। তাঁর ঘোষিত রোলার কোস্টার কবিতা নিয়ে, এক ছদ্ম মধ্যবিত্তশ্রেণির পকেটে হাত দিয়ে চলার, পয়সা গুণে চলার পরিমিত সকাল ও বিকেল আসলে বিরাট ট্রেন যা এক স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে স্থির। নিকানোর লেখেন এক ভালো চোরের ভাষণ।

“আমার কথা মনে করো যখন তুমি তোমার রাজত্বে থাকবে

আমাকে সেনেটের প্রেসিডেন্ট মনোনীত করো

আমাকে বাজেটের ডিরেক্টার করে দিও

আমাকে প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রা করে দিও”

নিকানোর লেখেন:

কুড়ি মিলিয়ন লোক হাওয়া হয়ে যাবার পরেও

স্তালিনকে ঈশ্বর বানানোর বিজ্ঞাপনে

কত খরচা হয়েছিল বলে আপনার মনে হয়

যে টাকা গোনা যায় ও শব্দ করে

 

কারণ মনুমেন্ট বানাতে খরচ হয়।

লেখেন:

পোপ ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না।

 

কী? ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না!

পোপ কোনও কিছুকেই বিশ্বাস করেন না।

 

বা আরও লেখেন:

 

আমি পষ্ট বলে দি আমাদের আসলটা কী

বা আমরা তো আগে থেকেই জানি সব

বা আমরা আসলে কিছুই জানি না।

 

একটাই জিনিস আমাদের জন্য পড়ে থাকে

ঠিক করে কথা বলতে শেখা।

 

একই কবিতার ৪ নং অংশে লিখছেন একটিই লাইন:

আমিই সেই লোক যে সমস্ত রাজরথকে সেলাম করি

লেখেন কিছু টেলিগ্রাম:

টুরিস্ট হিসেবে আমি একেবারেই ফেল মেরে গেছি

বিজয় তোরণ নিয়ে ভাবতে বসে

আমার গায়ে কাঁটা দেয়।

 

আমি আসছি মিশরের পিরামিড থেকে।

 

সত্যি বলছি সত্যি করে বলছি

সমস্ত ক্যাথেড্রাল আমার বিচিতে সুড়সুড়ি দেয়।

এই সমস্ত উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয় নিকানোর পাররা এমন এমন এক অঙ্গীকারের নাম যিনি আমাদের সামনে আমাদের নগ্ন করে দেখান। আমাদের গোপনতম চাহিদাগুলো আমাদের সামনে মেলে ধরেন আমাদেরই রাস্তার ভাষায়, আমাদের খেউড়ে।

আমি নিকানোর পাররার একমাত্র সম্পাদক নিয়াল বিনস সঙ্গে কথা বলেছিলাম নিকানোর পাররার বিশ্বজনিনতা নিয়ে। সঙ্গে জুড়ে ছিল আমার নিজস্ব নতুন ও পুরনো দুনিয়ার ভাষ্য। নিয়াল আমাকে বুঝয়ে দিয়েছিলেন নিকানোর-এর মূল প্রবণতা অর্থাৎ আমাদের অন্তরতম ঈশ্বরহীনতাকে ফুটিয়ে তোলা। এছাড়াও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ও সমাপতন নিকানোর এর “অবান্তরতা”-কে স্বীকৃতি দেয়। তা হল চিলেতে পিনোচেতের শাসন। যখন প্রায় সমস্ত বুদ্ধিজীবি দেশ ছেড়েছেন, নিকানোর থেকে গিয়েছিলেন। অদ্ভুতভাবে তাঁকে সাধারণ ঝামেলা ছাড়া তেমন কিছু কষ্ট পেতে হয়নি। যেমনটা বা ঘটেছিল সহস্র সাধারণ চিলেনোর জীবনে, যেমনটা বা ঘটে থাকে আমাদের দেশেও বা প্রতিটা দেশে। আমরা চুপ করে দেখে যাই, শুনে যাই যতক্ষণ নিজেদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে হিংসা। নিকানোরের ক্ষেত্রে কিন্তু হিংসা বাড়িতে ঢুকেছিল। তাঁর বোন বিওলেতা পাররা আত্মহত্যা করেন রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপে। যেমনটা বা ঘটেছিল প্রায় প্রতিটি ঘরে, চিলেতে। প্রায় প্রতিটা পরিবার থেকে কেউ  না কেউ “হারিয়ে গিয়েছেন”, যাঁদের দেহাবশেষ খুঁজতে দেখা যায় শত মানুষকে, আতাকামা মরুভূমিতে। নিকানোর কীভাবে থেকে গিয়েছিলেন সেই দেশে। কেনই বা তাঁকে মেরে ফেলেনি রাষ্ট্রযন্ত্র? যেমনটা বা দেখা যায় কুবাতে, ফিদেল কাস্ত্রো সবাইকে দেশ থেকে তাড়ালেও বুর্জোয়া কুবার প্রতীক দুলসে মারিয়া লোইনাস-কে ছাড় দেন। এর উত্তর আমরা পাই ২০১২ সালে। যখন নিকানোর-এর উপর দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নির্মিত তথ্যচিত্র “প্রতিকবির প্রতিকৃতি” (পরিচালনা: বিক্তোর খিমেনেস আতকিন) দেখি। যেখানে নিকানোর বলছেন “এক অর্থে তিনি এক ত্রাতা, কারণ পিনোচেত না এলে আমদের অবস্থা কুবার মতো হত। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা ভুলে যেতে পারি না তাঁর হত্যাকাণ্ডের কথা”। কেন চিলেতে সালবাদোর আইয়েন্দে সফল হননি, কেন পিনোচেত ক্ষমতায় এসেছিলেন তার পিছনে আছে এক বুর্জোয়াতন্ত্রের ইতিহাস। চিলের মানুষ ভয় পেয়েছিলেন যে তাঁদের দেশ কুবা হতে চলেছে। নিকানোর পাররা এই বুর্জোয়তন্ত্রেরই কবি, যিনি ভিয়েতনামের সময়ে নিকসনের স্ত্রীর সঙ্গে চা খেয়েছিলেন। নিয়াল বিনস এইসব ঘটনাক্রমকে বলেন সত্যের কাছে যাওয়ার চাবিকাঠি। হ্যাঁ। আমরা প্রতিনিয়ত যে অবান্তরতার মধ্যে ঢুকে পড়ি, ক্ষমতার সামনে এলে আমাদের বুক শুকিয়ে যায়, আমরা দল বদলে ফেলি চকিতে, এবং পরমুহূর্তেই নিজেদের ঘনিষ্ঠ মহলে ছড়া কাটি, নিকানোর পাররা সেই আমাদের প্রতিনিধি। তফাৎ শুধু একটাই তিনি কবিতায় ধরেছেন সেই দ্বন্দ্ব। শুধু বন্ধুদের মধ্যে নয়, সর্বজনে ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই অবান্তর দুনিয়ার ভাষ্য। আর এখানেই তিনি হয়ে উঠেছেন আমাদের কবি। আমাদের সকলের কবি।

আর এখানেই আসে ভাষার প্রসঙ্গ। যেভাবে ফ্রান্সিসকো দে কেবেদো স্পেনীয় ভাষার কবিতার লিরিকটানকে অগ্রাহ্য করে ভাষার শরীরে চালান করে দিয়েছিলেন মাদ্রিদের রাস্তার কথা সেভাবেই নিকানোর পাররা আমাদের সুপ্ত অভিপ্রায়কে ধরে ফেলেছেন আমাদেরই ভাষায়, যে ভাষা কোনও কবিই লিখতে সাহস পাবেন না। আর এখানেই তিনি হয়ে ওঠেন মৌলিক। আমাদের দ্বন্দ্ব, আমাদের ভয় ও আচরণ তিনি লিখে গেছেন এক দক্ষ বিজ্ঞানীর মতো। কোনও কথা বলতেই ভয় পাননি। ব্যবহার করেছেন প্রাচীন ও নতুন শব্দ। ঢুকে গেছেন আমাদের শিরায়, যা শিরা বহন করেন ধনতান্ত্রিক সমাজের প্রতিটা মানুষ। তিনি হয়ে উঠেছেন সেই সময়ের আয়না যখন গোটা চিলে ভেবেছিল পিনোচেত দেশটাকে শুধরে দেবেন। হয়ে উঠেছেন সেই সময়ের বিবেক যখন মানুষ তার ভুল বুঝে সংগ্রাম করেছে। এবং এই সবকিছু তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এক কবিতার ভাষায় যা অশ্রুতপূর্ব আর তাই তাঁর কোনও উত্তরসূরি নেই। শুধু আছে ভাষায় তার ছাপ যা সমসাময়িক চিলের কবিকে আর কাব্যিক ভাষা ও বিষয় খুঁজতে দেয় না। সে সব কিছু নিয়েই কবিতা লিখতে পারে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...