আসমা : একটি হয়ে ওঠা

মহম্মদ হানিফ

 

অনুবাদ : অপর্ণা ঘোষ

বেশ কয়েকবছর ধরে মহম্মদ হানিফ আসমা জাহাঙ্গিরের সাথে নিয়মিত বালুচিস্তান গিয়েছেন, আসমার বার্ষিক তথ্যানুসন্ধান মিশনের সঙ্গী হয়ে।

তিনি একজন লেখক ও সাংবাদিক। তার নতুন বই ‘রেড বার্ডস’ সেপ্টেম্বর ২০১৮-তে প্রকাশিত হবে।

পিশিনের সরকারি ডিস্ট্রিক্ট রেস্টহাউসের লনে তখন একশোর বেশি মানুষ গোল হয়ে বসেছেন। তারা বেশ গুরুত্বপূর্ণ মানুষজন। পাখতুন, মালিক, সুপ্রিম কোর্টের উকিলেরা, ইনটেলিজেন্স এজেন্সির হাতে নিখোঁজ হওয়া যুবাদের বাবারা, স্থানীয় টাউন কমিটির চেয়ারম্যান, স্থানীয় বাজার কমিটির চেয়ারম্যান… বিচিত্র মানব সমাবেশ।

পাকিস্তানের বড় শহরগুলোর বাইরে চিত্রটা এইরকম সর্বত্র। গুরুত্বপূর্ণ লোকজন তাদের সমান বা তাদের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ লোকদের সাথে কথা বলছে। এরকম একটি সমাবেশে আসমা জাহাঙ্গির সভাপতিত্ব করছেন।

তিনি এসেছেন পিশিন ও সংলগ্ন এলাকায় ঠিক কী ঘটছে তার তদন্তে। পুরো সমাবেশে তিন-চারজন মহিলার তিনি একজন। একটি বিড়ি তাঁর মুখে জ্বলছে আর তিনি শুনছেন মানুষের কথা — এই আকাশের নিচে যা কিছু ঘটছে সবকিছুর বিরুদ্ধেই তাদের অভিযোগ। সরকারের বিরুদ্ধে, প্রশাসনের বিরুদ্ধে, কাছাকাছি জঙ্গলে তালিবানরা ঘাঁটি গেড়েছে তার বিরুদ্ধে, মাদ্রাসার বিরুদ্ধে, পর্যাপ্ত মাদ্রাসা না থাকারও বিরুদ্ধে।

এদের মধ্যে অনেকের সাথে তিনি পরিচিত, এর আগে বেশ কয়েকবার এখানে আসার সুবাদে। বেশ কিছু পুরনো মানুষ তাঁকে চেনেন যবে থেকে লাহোরে আসমার বাবার সাথে তারা দেখা করতে যেতেন। বেশ কিছু আইনজীবিকে বার ইলেকশনে সহায়তা করেছেন, হারিয়ে যাওয়া ছেলেদের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। এইসব ছেলেদের বাবারা অন্যদের থেকে কথা বলার জন্য বেশি সময় পাচ্ছেন। কাছাকাছি মসজিদে আজান শুরু হল। আসমা মাথার উপরে দুপাট্টা টেনে নিলেন, বিড়িতে টান দিতে থাকলেন অনবরত।

আসমা অনেকটা গ্রামে আসা পীরের মতো। যাঁর কাছে সবাই পেশ করে আশাপ্রত্যাশার তালিকা। নবীন ও প্রবীণ বালোচ আইনজীবিদের কাছে তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো এবং তারা তাঁর সাথে প্রতিটা মুহূর্ত অতিবাহিত করতে চায়। তারা কেরিয়ারের জন্য পরামর্শ চায়, আগত বার ইলেকশনে কৌশল কেমন হবে জানতে চায়, এমনকি পুরনো সহকর্মীদের নিয়ে গপ্পোগাছা করতেও ছাড়ে না।

সমাবেশের মানুষজনের মনে অনেক প্রত্যাশা। টাউন কমিটির প্রধান আসমাকে বলেন “আই এস আই-তে রাজ করুন আর পিশিন বাজারে মহিলাদের জন্য আরও গণ-শৌচাগার বানিয়ে দিন।”

আসমা এদের কথাবার্তা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কোনও একটি নির্দিষ্ট বিষয় আরও পরিষ্কার করে বুঝতে চান, কাউকে একজন আইনজীবিকে দেখিয়ে দিয়ে তার সাথে কথা বলতে বলেন, অন্য কাউকে এইচ আর সি পি অফিসার, তিনি চান যে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলুক।

টাউন কমিটির চেয়ারম্যান বলেন পিশিনের বিধবাদের পরিবারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পুনর্বিবাহ করার অধিকার থাকা উচিৎ। আসমা বলেন যে আইন মোটেই এর বিপক্ষে নয়, বরং ইসলাম বিধবাদের পুনর্বিবাহে উৎসাহ দেয়। উপস্থিত মৌলানাদের দিকে হাত দেখিয়ে বলেন, “আমার কথা বিশ্বাস না হলে ওনাদের জিজ্ঞেস করে নিন।”

পরে, দুপুরের খাওয়ার সময় লোকজন নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করতে থাকে আসমার পাতে খাবার দেওয়ার জন্য, আবার অন্যরা তাদের বোঝায় যে তাঁকে শান্তিতে খেতে দেওয়া উচিৎ। সবাই তাঁর সাথে সেলফি তুলতে চায়। হাসিমুখে তিনি পোজ দেন। তিনি সবার আলিঙ্গন, প্রার্থনা, মাথায় আশীর্বাদের হাত এইসবের মধ্যে দিয়ে বিদায় নেন, প্রতিশ্রুতি দেন আবার দেখা হবে লাহোরে, ইসলামাবাদে, এবং অবশ্যই পরের বছর এইখানেই। হয়তো তাঁকে কেউ বাস্তবে ‘সুবো কা জঞ্জির’ (জেলাগুলির সংযোগকারী শৃংখল) বলে ডাকে না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনিই লাহোর বা ইসলামাবাদের সাথে এদের একমাত্র সেতু।

গপ্পো, আড্ডা, জীবনরক্ষা

তাঁর হোটেলের ঘরটি আইনজীবিদের আড্ডা, নবীন ও প্রবীণ। তিনি খাটের ওপর বসে বেনজির ভুট্টো, জারদারি এবং এক খ্যাতনামা সাংবাদিকের গল্প বলছেন। তিনি বসিয়ে গল্প বলতে ভালোবাসেন। মিমিক্রিতে তাঁর দক্ষতা পেশাদারদের মতোই এবং একটি বাক্যেই তিনি উর্দু, পাঞ্জাবি এবং ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করতে পারেন। গল্প বলার মাঝখানেই তাঁর ফোন বেজে ওঠে।

ফোনের দিকে তাকিয়ে তিনি উচ্ছ্বল, ক্রীড়ারত, ক্ষিপ্র একটি শিশুর মতো লাফিয়ে ওঠেন, যেন হঠাৎ করে মনে পড়ে গেছে হোমওয়ার্কের কথা। সকলের কাছে মাফ চেয়ে নেন যে তাঁকে একটি জরুরি ফোন করতে হবে এবং বাথরুমে চলে যান। ফিরে আসেন ১৫ মিনিট পর। কেউ একজন জিজ্ঞাসাও করে যে কার ফোন ছিল।

পাকিস্তানে জারদারির শাসনের সময় মৃত্যুদণ্ডের ওপর স্থগিতাদেশ বহাল হয়েছিল। আসমা খুব গর্ববোধ করতেন যে এই স্থগিতাদেশ আনার বিষয়ে তিনি একটি ভূমিকা পালন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর দণ্ডরোধ করার জন্য নানা কাগজপত্র তৈরি করতে হত, প্রেসিডেন্টের দপ্তরে আবেদন পাঠাতে হত। তার কর্মীদের স্মরণ করাতে হত যে স্থগিতাদেশ জারি আছে। আসমা ফোনে এমন এক দণ্ডপ্রাপ্তের প্রাণরক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন কারণ তার সব কাগজপত্র হারিয়ে গিয়েছিল।

ততক্ষণে তিনি খ্যাতনামা সাংবাদিকের গল্প ভুলে গিয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলখানার গল্প শুরু করে দিয়েছেন। খুব উৎসাহ নিয়ে বলছেন হরিপুর জেলের কথা, যেটা নাকি হলিডে রিসর্টের মতো — পাকিস্তানের একমাত্র জেল যেখানে ফাঁসিকাঠ নেই।

ঘটনাটা হল, যে ব্যক্তি এই জেলখানা তৈরির জন্য জমি দান করেছিলেন তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন যে ওখানে কখনও ফাঁসি দেওয়া হবে না। পাকিস্তান সরকারও সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে এসেছে। একজন পুরনো মানবাধিকার কর্মী অনুরোধ করলেন সামনের বার গ্রেপ্তার হলে যাতে ওখানে থাকতে পারেন সে ব্যাপারটা যেন আসমা নিশ্চিত করেন।

মন ভালো করে দেওয়া গল্প। ঘরের আদ্ধেক লোক হরিপুর জেলখানা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল।

২০১৫-তে ওই স্থগিতাদেশ উঠে যাবে এবং হরিপুর জেলে প্রথম ফাঁসি কার্যকর হবে।

আসমার মন ভালো করা গল্প ছিল সেই সব মানুষদের জন্য যাদের ভাঁড়ারে খুব বেশি মন ভালো করা গল্প মজুত নেই।

মিডিয়ায় বিদ্বেষীদের সঙ্গে বোঝাপড়া

“তখনও জিও বা অন্যান্য চ্যানেলগুলো আসেনি, অনেক আগের কথা” স্মৃতিচারণ করছিলেন আসমা, “জঙ্গ লাহোর নামে সংবাদপত্রটি আমার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করল। মূল বক্তব্য আসমা একজন আহমদী। আমি সকালবেলা উঠে কাগজটা দেখলাম, একদম প্রথম পাতার খবর। নির্বোধের দল। আমার কী-ই বা করার ছিল তখন? আমার বাচ্চারা ছোট, সারাদিনের ব্যস্ততা, অফিস, কোর্টে শুনানি। আমি জানতাম কাগজের মালিক মীর শাকিলুর রহমান লাহোরে থাকেন। বাচ্চাদের গাড়িতে তুললাম, সোজা ড্রাইভ করে তার বাড়ি গেলাম, বললাম ‘দেখুন আমার কাজকর্ম আছে, কোর্টে যেতে হবে, আমার বাচ্চাদের আপনার কাছে রেখে গেলাম, আপনি আমায় যথেষ্ট বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন, যদি আমার কিছু ঘটে যায়, তার জন্য আপনি দায়ী। আর আমার কিছু হলে এই বাচ্চাদের দায়িত্ব আপনার।’”

লম্পট ভোটখেলুড়ে

নিজের সংগ্রাম, বর্তমান বা অতীতের নানা যুদ্ধ নিয়ে বলতে তিনি কখনওই দ্বিধাবোধ করেননি। সুপ্রিম কোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনী ক্যাম্পেন নিয়ে বলতে খুবই গর্ববোধ করতেন। এ বিষয়ে খুবই আবেগপ্রবণ ছিলেন তিনি। দক্ষ রাজনীতিবিদের মতোই তার বির্বাচনী প্রচার ছিল বেশ বড় মাপের।

“ওখানে সুপ্রিম কোর্টের বেশ বিখ্যাত আইনজীবি আছেন, বেশ কিছু ভোট ওনার নির্দেশমতো পড়বে। এটা আমার প্রথম নির্বাচন, হারা চলবে না। ইজ্জত দা মাসলা (ইজ্জতের প্রশ্ন)। এই ভদ্রলোক আমায় পছন্দ করেন না, আমাকে সহ্যই করতে পারেন না। তিনি বেশ নামকরা লম্পটও বটে। তো উনি বার রুমে বসেছিলেন, সোজা ওর কাছে গেলাম। গালে মৃদু একটা টোকা মেরে সোজা সোফায় ওর পাশেই বসে পড়লাম। বললাম, আপনার লাহোরী বোন এসেছে ইলেকশনে সাহায্য চাইতে, আশা করি ফিরিয়ে দেবেন না। উনি ফিরিয়ে দেননি।”

স্নায়ুযুদ্ধ বিজয়িনী

বালোচ অফিসিয়ালদের সঙ্গে মিটিং-এ কখনওই ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব দেখাতেন না আসমা। তার মিশনের সদস্যদের সব ধরনের প্রশ্ন করতে দিতেন। কিন্তু যখন তিনি কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে খুঁটিনাটি জানতে চাইতেন — কোনও নিরুদ্দেশ কেসের ভিডিও প্রমাণ চাইতেন, ইনটেলিজেন্স অফিসিয়াল যারা কোর্টের শমন উপেক্ষা করছেন জানতে চাইতেন তাদের কথা — অফিসিয়ালরা তাদের সিটে বসে ঘেমেনেয়ে উঠতেন।

এই সময়ে তিনি ফেমিনিজমকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতেন। বলতেন, দেখুন আমি একজন মহিলা, তো আমি কি জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে দু-একটা প্রশ্ন করতে পারি? কারণ আপনারা এ বিষয়টা খুব ভালো করে দেখছেন না।

আগ্রা সামিটের ব্যর্থতার পর ফিরে এসে মুশারফ একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন, সেখানে তার ভিডিও প্রদর্শন হচ্ছিল, আসমা নিজে সেখানে ছিলেন এবং এমন কিছু বলেছিলেন যা মুশারফের বিরক্তি উৎপাদন করেছিল। সাংবাদিকরা আসমার পরিচয় মুশারফকে দেওয়াতে তিনি বেশ অস্বস্তিতে পড়েন, নার্ভাস বোধ করতে থাকেন। তার মুখ নড়লেও কোনও আওয়াজ বেরোয় না। ঠিক যেন মৃগীরোগী!

পরে আই. এ. রহমান বলেন আগ্রা ট্রিপ চলাকালীন জেনারেল মুশারফ নাকি আসমাকে একটি চড় মারার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কল্পনা করুন। একজন মিলিটারি একনায়ক, নিজের খেলায় যিনি চূড়ান্ত ক্ষমতাশালী, তার চরম শত্রু ভারতীয়দের কাছ থেকে তিনি সংবর্ধনা পেয়েছেন, তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন, কিন্তু একটাই কাজ — যেটা তিনি করতে চেয়েছিলেন — কিন্তু করতে পারলেন না — সেটা হল আসমা জাহাঙ্গিরকে একটা চড় মারা!

এটাই ছিল আসমার ক্ষমতা। প্রত্যেকের ভেতরে থাকা নারীবিদ্বেষী সত্তাটাকে তিনি ঠিক বাইরে বের করে আনতে পারতেন — সে বর্ষীয়ান সাংবাদিক থেকে শুরু করে প্রতিদ্বন্দ্বিতারত আইনজীবি, বিচারক — সব্বার। ভেতর থেকে নিজেকে ক্ষমতাহীন অনুভব করার আস্বাদনটা নিতে তাদের বাধ্য করতে পারতেন তিনি।

অনেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা বাপমায়ের কিনে দেওয়া ফোনে ঝড়ের গতিতে টাইপ করে যেত: আসমা পাকিস্তানের জন্য কী করেছেন? পশ্চিমের পুতুল, ভারতের দালাল, বেঘইরাৎ আউরৎ (সস্তা মহিলা), উকিল মহিলা, বিধর্মী মহিলা, মানে মহিলা শব্দের আগে যা যা যোগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু ঘরের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি পুরুষদের স্নায়ু অবশ করে দিত। আর্মির বড় বড় পদাধিকারী নীরবে সহ্য করতেন আসমার উপস্থিতি, তাঁর কথা বলা বা শোনা, ক্রমাগত বিড়িতে টান দেওয়া — যদিও এসব তাদের পক্ষে হজম করা খুব কঠিন ছিল।

একটি ভোজসভা “ফাদ্দা”

কোয়েটাতে এক হাজারা এম পি এ-র বাড়িতে দারুণ দ্বিপ্রাহরিক ভোজসভা চলছে, সবাই মাটিতে বসে, হাজারা ভিক্টিমদের পরিবার, মানবাধিকার কমিশনের সদস্যরা, স্থানীয় রাজনৈতিক লোকজন। বেশ কিছু উলেমাও ছিলেন এলাকার।

গণহিংসা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষজনদের আয়োজনে এটাই ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে সেরা ভোজসভা। সকলেই খাবারের প্রশংসা করছিল। খাওয়া শুরু হওয়ার পরেই এক শিক্ষার্থী সকলকে উদ্দেশ করে বলল, “ইরান একটি অসাধারণ দেশ। সবাই প্রার্থনা করুন যাতে পাকিস্তান ইরানের মতো হতে পারে।”

আসমা হাত থেকে রুটিটা নামিয়ে রেখে বাধা দিলেন, “না, ইরান পাকিস্তানের রোলমডেল হতে পারে না। পাকিস্তানের চেয়ে ঢের বেশি রাজনৈতিক বন্দি ইরানের জেলে পচছে। অনেক কষ্ট করে একনায়কের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে, মোল্লাতন্ত্র দিয়ে সেটাকে প্রতিস্থাপিত করতে আমরা চাই না।”

ছাত্রটি ইসলামি শাসনের গৌরব নিয়ে বলতে থাকে আর আসমা ক্রমাগত তাকে বাধা দিতে থাকেন। অনেকে ভোজ ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হন। আসমা কিন্তু তর্ক করতেই থাকেন, খেতে খেতেই। পরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন “এই মোল্লাগুলো তোমাকে শান্তিতে খেতেও দেবে না।”

সোজা কথা সোজা বলার জেদ

গভর্নর জুলফিকার ম্যাগসি ক্ষমতায় এসে আসমা ও তাঁর অনুগামীদের চায়ের আসরে নেমন্তন্ন করলেন। নিরুদ্দিষ্ট মানুষজন, বালুচিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা সাম্প্রদায়িকতা এসব নিয়ে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে জুলফিকার একটুও আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন না। উপস্থিত সাংবাদিকদের উলটে নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন তিনি। একসময় বিরক্ত হয়ে বললেন “আপনারা আমায় এসব প্রশ্ন করছেন কেন? আপনারা বলেন যে আমি উপজাতীয়। আপনারা জানেন বালুচিস্তানে সবচেয়ে বড় উপজাতি কোনটা? আর্মি।”

আসমা সবচেয়ে জোরে হেসে উঠলেন। পরে কেউ একজন বললেন ম্যাগসির ব্যাপারে আসমা একটু নরম। আসমা বলেন “আমার কী মনে হয় জানো? এখানকার রাজনীতিতে ম্যাগসি হল শাহরুখ খান।” একজন জিজ্ঞাসা করল “কোন ফিল্মের শাহরুখ?” “জানি না, আমি অনেকদিন সিনেমা দেখিনি।”

“আমি পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাব”

গুজব ছড়িয়েছিল আসমাকে নাকি কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রীর পদ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিকরা, যারা আসমাকে অপছন্দ করতেন, তারা খুব খুশি হয়ে উঠলেন — এবার আসমাকে বাগে পাওয়া যাবে। আসমা প্রধানমন্ত্রী হতে চাইছে।

একজন মানুষ — সে সাংবাদিক হোক বা বিচারক বা আইনজীবি বা আমলা — এই ধরনের পদ পেলে সবাই গর্ববোধ করে। কিন্তু আসমা প্রধানমন্ত্রী হবে? এরা বলতে লাগল “বলেছিলাম না ও ক্ষমতালোভী!”

যখন আসমাকে বলা হল তিনি ধীরে ধীরে কেটে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন যাতে নির্বোধেরও মাথায় ঢোকে — “আমি কখনও পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবিনি। কিন্তু সরকারি পদ দিয়ে যদি আমাকে প্রলোভিত করার চেষ্টা চলে, আমি পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাব।”

আসমা ক্ষমতা চাইতেন না, কারণ ক্ষমতা তাঁর আগে থেকেই ছিল। সময় আর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তা অর্জন করেছিলেন। তিনটে মিলিটারি একনায়ক দেখার অভিজ্ঞতা এবং মানুষের শৃঙ্খলমুক্তির অভিজ্ঞতা থেকেই এই ক্ষমতা তিনি লাভ করেছিলেন।

কেনাকাটা

তথ্যানুসন্ধানের কাজ শেষ। প্রত্যেকেই গোছগাছ সেরে নিয়েছে, যাবার জন্য প্রস্তুত। আসমা সকলকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন “তোমরা সবাই উপহার কিনেছ? দেখো, আমি এই সুন্দর শালগুলো কিনেছি। যাও তোমরা পরিবারের জন্য কিছু কিনে নিয়ে এসো। হাতে এখনও সময় আছে কয়েকঘণ্টা।”

 

মূল লেখার লিংক : https://www.dawn.com/news/1390063/the-importance-of-being-asma

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1907 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...