মণীন্দ্র গুপ্ত-র একক যাত্রা

কালীকৃষ্ণ গুহ

 

১.

মণীন্দ্র গুপ্ত ৯২ বছর বয়সে বিদায় নিলেন। এ নিয়ে আমাদের কোনও আক্ষেপ থাকার কথা নয়। তবু ফাঁকা লাগে। আক্ষেপ হয়। বা শুধু এইজন্য যে তিনি প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত সর্ব অর্থে জীবিত ছিলেন। বাংলা কবিতায় তাঁর আবির্ভাব নিঃসন্দেহে কিছুটা বিলম্বিত, কিন্তু আবির্ভাবের পর তিনি আর বিরতি নেননি। নিরন্তর কাজ করে তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও উপস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছেন আমাদের। তিনি কাজ শুরু করার পর, সারাক্ষণের সাহিত্যকর্মী হিসেবে স্রষ্টা হিসেবে সম্পাদক হিসেবে সংকলক হিসেবে প্রবন্ধকার হিসেবে আত্মজীবনীকার হিসেবে চিত্রকর হিসেবে এমনকি ঔপন্যাসিক হিসেবেও বিরাজমান থেকেছেন। সবই করেছেন নিজস্ব শর্তে, নিজস্ব ভাষাবোধে আর চিন্তাধারায় বৃক্ষের মতো সুস্থির থেকে। তাই আমাদের যুগে তাঁর গুরুত্বের কথা কোনওভাবেই বাড়িয়ে বলার সুযোগ নেই। তিনি কম পেয়েছেন, বেশি দিয়ে গেছেন। বস্তুত তাঁর অবদানের তুলনায় অর্থ খ্যাতি প্রতিপত্তি প্রায় কিছুই পাননি — যেমন পাননি সাম্প্রতিককালে প্রয়াত কবি আলোক সরকার এবং নারায়ণ মুখোপাধ্যায়। হয়তো এটাই স্বাভাবিক ছিল এঁদের মতো পুণ্যবানদের জন্য। এই যাত্রাপথে মণীন্দ্র গুপ্ত ছিলেন প্রথমত এবং সর্বতোভাবে একজন চিন্তক। একজন চিন্তক হিসেবে পরিচিতি পাবার জন্য চিন্তার যে মৌলিকতা প্রয়োজন তা তাঁর ছিল। মনে হতে পারে, তাঁর কবিতায় ভাবের বিরাট কোনও উচ্চতা ছিল না, কিন্তু মনে রাখতে হবে, তাঁর চিন্তনের যে উচ্চতা পাওয়া যায় তাঁর কবিতায় এবং যাবতীয় সৃষ্টিকর্মে, তা ‘কবিত্ব’-র চেনা ভঙ্গুর পরিসরটা ছাড়িয়ে যায়। তিনি শব্দ বা ছন্দের মায়ায় আটকা পড়ে থাকেননি, ভাবের বা অনুভূতির স্পর্শকাতরতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে থাকেননি। তিনি আশ্চর্য সব চিন্তা উপহার দিয়ে গেছেন। স্বীকার করি, ভাব এবং চিন্তার পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন। তবু কথাটা বলে রাখা।

তিনি বলেছেন, ‘যদি আমার কবিতার প্রসঙ্গ ওঠে, আমি কি নিজেকে এইভাবে বোঝাতে পারব যে আমি ভাববাদী নই, বস্তুবাদী নই, হয়তো নাগাকুকিদের মতো সর্বপ্রাণবাদী। কোনও বস্তুকে ভাবতে গেলে আমার কল্পনা তার আদিরূপের দিকে, তার আদিম অবস্থার দিকে যায়।’ তিনি কোনও জিনিসকে উপর থেকে বুঝে নিয়ে স্বস্তি পাননি, তাঁকে তার আদিরূপের সন্ধান করতে হয়েছে। তিনি মনে করতেন ‘কবিতা একটি জীবিত প্রক্রিয়ার ফল, এবং সে স্বয়ংও প্রচণ্ডভাবে জীবন্ত।’ কবিতার বীজ কোথা থেকে আসে, এই প্রশ্নে মণীন্দ্র গুপ্তর উত্তর মনে রাখার মতো, ‘এই বীজ, প্রত্যক্ষ ও প্রাথমিক অবস্থায়, আমাদেরই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে স্মৃতি — অভিজ্ঞতা বা অভিজ্ঞতাজাত স্মৃতি এবং কবিতা যেহেতু অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংলগ্ন থেকে লেখা যায় না, অর্থাৎ লৌকিক অভিজ্ঞতা যতক্ষণ না দ্বিতীয় ভুবনের অলৌকিকতায় প্রবেশ করছে ততক্ষণ কবিতার জন্মচক্র সঠিকভাবে আরম্ভ হয় না।’ অলৌকিকতায় প্রবেশ? হ্যাঁ, অনুভূতিলোকই তো অলৌকিক! কবিতা যে অভিজ্ঞতা ছাড়া লেখা যায় না এবং তা যে অভিজ্ঞতায় সংলগ্ন থেকেও লেখা যায় না — তার সঙ্গে দূরত্ব রচনা করে নিতে হয়, এই কথাটা মনে রাখতে হবে, যদিও কথাটা বহুবার পূর্ব-উচ্চারিত। তবু বারবার উচ্চারিত হবার মতো। তাঁর আরও একটি কথা, ‘কবির নিকট বন্ধু হতে পারে নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, সমুদ্রতত্ত্বের লোকেরা — ভূবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, আর জ্যোতির্বিদ্যার লোকেরা।’ এই ধারণাকে কবি হবার পূর্বশর্ত হিসেবে মানতে বলেননি তিনি অবশ্যই, কিন্তু বহুদূর পর্যন্ত দৃষ্টি বিস্তার করতে হলে এইসব অঞ্চলে, অন্তত কয়েকটি বিচিত্র জ্ঞানচর্চার অঞ্চলের লোকের বন্ধুত্ব সত্যিই কাম্য হতে পারে। ধরে নেওয়া যায়, মণীন্দ্র গুপ্ত এইসব অঞ্চলে তাঁর বন্ধু খুঁজে পেয়ে তাঁর ভাবনার বিস্তার ঘটাতে পেরেছিলেন। কবি হিসেবে আবির্ভাবের আগে তাঁর ছিল একটি সম্প্রসারিত প্রস্তুতিপর্ব, যা অধিকাংশ কবিতালেখকেরই থাকে না। তিনি পাশাপাশি এই বিবৃতিটি স্থাপন করে গেছেন, ‘বই এবং যৌবনসংসর্গের মতো আর কী আছে এই মায়ার জগতে।’ মরণশীলের কাছে এই জগৎটা মায়া। শেষ পর্যন্ত বই এবং যৌবনসংসর্গের মতো আর যে কিছু নেই — অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও — তা যে কতখানি সত্য!

আমরা তাঁকে একজন চিন্তকের স্থানে রাখতে চেয়েছি যা তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকর্মের সম্প্রসারিত ভিত্তিভূমি — বলা যায় তা একটা নতুন সূর্যস্নাত নক্ষত্রখচিত প্রান্তর। তাঁর ‘চাঁদের ওপিঠে’ বইটি প্রত্যেক কবির হাতে অভিজ্ঞানের মতো থাকতে পারে।

২.

শরতের মেঘ আর কাশফুলের চেয়ে ভারি কোনও কিছুর সঙ্গে
আমি আর জড়িয়ে পড়তে চাই না।
অতএব, আমি খুব গভীরভাবে চিন্তা করি তাঁবু, দড়ি, ছুরি, হ্যামক,
জলের বোতল, রন্ধনপাত্র আর কম্বলের কথা–
চেষ্টা করি ওদের ওজন কমাতে, কার্যকারিতা বাড়াতে,
কী করে নকশায় আরও সারল্য আনা যায়।
শীতে আর বর্ষায় ক্যাম্পিং শেখাতে পারে এমন জন্তুদের খোঁজে বেরোই
রমতা সাধু, বেদে আর জলার পাখিদের আহার, নিদ্রা, বিশ্রাম খুঁটিয়ে দেখি।

ভাবি, কত কমে চালানো যায়, কত হালকাভাবে চলা যায়।
গা থেকে রঙিন পালক, বাড়তি পালক ঝেড়ে ফেলি
কেননা আমি যে-উঁচুতে যাব সেখানে এখনও কোনও পাখি ওড়েনি…

[শরৎমেঘ ও কাশফুলের বন্ধু, নামকবিতা]

এই কবিতাটিতে কবি হিসেবে তাঁর একটি আত্মপরিচয় লুকোনো আছে। কী দেখেন তিনি? অনেক কিছুর মধ্যে জলার পাখিদের আহার, নিদ্রা, বিশ্রাম খুঁটিয়ে দেখেন। কীভাবে বাঁচতে চান তিনি? সেই সূত্রে ভাবেন, ‘কত কমে চালানো যায়, কত হালকাভাবে চলা যায়।’ সেইভাবেই চলেছেন তিনি। 

আরও একটি কবিতা পড়া যাক তাঁর:

তুমি একটি ঐশী আণবিক রিঅ্যাকটার।
সেই বহুদিন আগে তোমার দু’ভরি ছাই
নিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে শরীরে নিয়েছিলাম।
তারপর থেকেই আমি বাঁশপাতা মাছের মতো
নদীর কালো জলের তলায় গিয়ে
বিচ্ছুরিত হতে থাকি।
এই তেজস্ক্রিয়া অক্ষয়।
আমাকে যে পাবে তার মধ্যে আবার
প্রবেশ করবে এটি — হয়তো সে
প্রভাময় পতঙ্গের মতো, গাছের খানিকটা আলো করে
এসে বসবে তারপর।

[তেজস্ক্রিয়া]

শুধু অভিজ্ঞতা-নির্ভর কবিতা লেখেননি তিনি। তিনি চিন্তা আর কল্পনার সাহায্য নিয়ে জীবনের রূপক তৈরি করেছেন। যেমন এই কবিতাটি। এই ‘তুমি’ কে তা নিয়ে আমাদের আপাতত কোনও প্রশ্ন নেই। এই ‘অক্ষয় তেজস্ক্রিয়া’ অর্জন করে তিনি যেন জীবন কাটিয়ে গেছেন — ভোগীর জীবন, সাত্ত্বিকের জীবন — এক সর্বহারার স্বাধীন অবাধ জীবন।

৩.

তাঁর কবিতায় প্রবন্ধে, যেমন বলেছি, অনেক আশ্চর্য চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়, অনেক সাহসী কল্পনার বিস্তার পাওয়া যায়, অনেক সৃষ্টিশীলতার মৌলবাদী (আশা করি, শব্দটা পাঠক সদর্থে নেবেন) ঘোষণা ও নৈতিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। প্রকাশ্য কবিত্বকে তিনি বর্জনীয় মনে করেছেন। সবই একজন চিন্তকের কাছে প্রত্যাশিত। আমাদের মনে পড়ে, একসময় কলকাতা বইমেলায় একটি টেবিলে তিনি নিজের বই ও পত্রিকাগুলি নিয়ে নির্বাক বসে থাকতেন। তখনও তাঁর অগণিত ভক্ত তৈরি হয়নি, যেমন সাম্প্রতিক কয়েক বছরে হয়েছে। তাঁর নিঃসঙ্গতা অতিক্রম করে চলে যেতেন কত খ্যাতিমান লেখক — তাঁর দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ না-করেই। মনে হত না তাঁরও কারও দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করার কোনওরকম আগ্রহ ছিল। মনে হত, তিনি চিৎকার করে বলতে পারতেন, ‘আমি একা–‘। কিন্তু না, তা তিনি কখনও বলেননি। বলতে পারতেন না।

যে-দীর্ঘ আলোচনা ছাড়া তাঁর কবিতার বিভিন্ন স্তর বুঝে ওঠা সম্ভব নয়, তা করার পরিসর আর প্রস্তুতি আমাদের নেই এই মুহূর্তে। তাঁর সঙ্গে যেটুকু সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা দূরত্ব রচনা করে মুগ্ধ হয়ে থাকার। তাই ছিলাম। তাই আছি আজও।

তিনি এই ‘মায়ার জগৎ’ ছেড়ে নিঃসীম বাস্তবের সঙ্গে নীরবে মিশে গেলেন। আমরা তাকিয়ে রইলাম শুধু।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*