ইন আর্সেন আই ট্রাস্ট

শুভাশিস রায়চৌধুরী

 

আমরা বাঙালিরা সকলেই কমবেশি ফুটবলপ্রেমী। ফুটবলটা আমাদের যাকে বলে একেবারে মজ্জাগত। প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাঙালি মোহন-ইস্ট লড়াইয়ে মজে থাকলেও নয়ের দশকের মাঝামাঝি ঘরে ঘরে কেবল টিভির আগমনে তারা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বিলেতমুখো। রাতের বেলা অফিস থেকে ফিরে এসে স্ত্রীকে “কৈগো, চাটা দাও” বলে অনেকেই টিভির পর্দায় চোখ রেখে বসে পড়তেন ‘প্রিমিয়ার লিগ’ দেখতে। ১৯৯৬-৯৭ সালে সেখানেই তাদের প্রথম পরিচয় হয় লম্বা, ছিপছিপে চেহারার ফরাসি মানুষটির সাথে। পরে বাঙালি তথা ভারতীয় দর্শকদের মধ্য প্রিমিয়ার লিগের জনপ্রিয়তা বাড়লে সেই মানুষটির তৈরি করা ইতিহাস ফিরতে থাকে লোকমুখে। তিনি আর কেউ নন, প্রিমিয়ার লিগ তথা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার। আজ বিকালেই জানতে পারলাম উনি এই সিজনের পর আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবের ম্যানেজারের পদ থেকে সরে যাবেন। ছিন্ন করবেন বাইশ বছরের সম্পর্ক। বাইশ বছর যে অনেকটা সময়। ভাবলে অবাক লাগে টটেনহ্যাম হটস্পারের স্টার ডেলে আলি বা ম্যানচেস্টার সিটির স্টার লেরয় সানের যা বয়স, আর্সেন ওয়েঙ্গার ঠিক তত বছর ধরে আর্সেনালের ম্যানেজার রয়েছেন। এত বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করাটা সত্যিই খুব বেদনাদায়ক। আমি নিজে মনে প্রাণে চেলসি সমর্থক, তবুও খবরটা শোনার পর থেকে কোথাও যেন একটু আবেগে গা ভাসিয়ে ফেলছি। ঠিক যেমন স্যার আলেক্স ফার্গুসনের বিদায়বেলায় ফেলেছিলাম। তা ভেসে যখন পড়েইছি, তখন সেটার অনুভূতি সকলের সাথে ভাগ করে নেওয়াই মঙ্গল।

আর্সেনালে ওয়েঙ্গারের মূর্তি

১৯৯৬-এর অক্টোবরে আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবের দায়িত্ব নেন আর্সেন ওয়েঙ্গার। এর আগে তাঁর বারো বছরের ম্যানেজারিয়াল কেরিয়ারে সাফল্য বলতে ফরাসি লিগে মোনাকো আর জাপানের জে-লিগে নাগোয়া গ্র্যাম্পাস এইটকে সব মিলিয়ে চারটে ট্রফি দেওয়া। একেবারেই আহামরি কিছু নয়। তবুও তাকে কেন নিয়ে আসে আর্সেনাল ম্যানেজমেন্ট সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। শোনা যায় আর্সেনালের ম্যানেজার হওয়ার দৌড়ে তিনি পিছনে ফেলে দেন ডাচ কিংবদন্তি ফুটবলার এবং তৎকালীন বার্সেলোনার বিদায়ী ম্যানেজার য়োহান ক্রুয়েফকে। একজন মানুষ, যাকে সদস্য সমর্থকদের সিংহভাগই চেনে না, তাকে ম্যানেজার করে নিয়ে আসাতে ক্ষোভ ছিল অনেকেরই। এমনকি দলের খেলোয়াড়রাও খুব একটা খুশি ছিল না ম্যানেজমেন্টের এই পদক্ষেপে। তার ওপর ছিল ব্রিটিশদের বরাবরই ফরাসিদের নিচু চোখে দেখার একটা মনোভাব। সেই সময়ের আর্সেনাল অধিনায়ক ব্রিটিশ ফুটবলার টোনি অ্যাডামসকে একটা ইন্টার্ভিউতে আর্সেন ওয়েঙ্গারকে নিয়ে তার প্রথম মূল্যায়ন সম্পর্কে বলতে শুনেছিলাম:

‘প্রথম দিকে, আমি ভাবতাম, এই ফরাসি ব্যাটা কি ফুটবল সম্পর্কে আদৌ কিছু জানে? তার ওপর ব্যাটাকে চশমা পরে কিরকম স্কুলশিক্ষকের মতো দেখতে লাগে। লোকটা ঠিকঠাক ইংরেজি বলতে পারে তো?’এতসব প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল আর্সেনালের সাথে আর্সেনের পথ চলা। যখন তাঁর সাথে তিন বছরের চুক্তি হয় আর্সেনালের তখন হয়তো তিনি নিজেও ভাবতে পারেননি যে এই ক্লাবে তিনি বাইশটা বছর টিকে যাবেন। এই ক্লাবকে এনে দেবেন নানান সাফল্য। তৈরি করবেন ইতিহাস।দায়িত্ব নিয়েই ওয়েঙ্গার আস্তে আস্তে শুরু করলেন তাঁর জাদুকাঠি ঘোরানো। প্রতি ম্যাচের শেষে প্রেস কনফারেন্সে উত্তর দেওয়ার সময় দিতে থাকলেন তার ফুটবলবোধের পরিচয়। কেন তিনি এই ছকে দলকে খেলালেন, কেন একটি ম্যাচে নিয়মিত কোনও খেলোয়াড়কে বসিয়ে তিনি অন্য একজনকে নামালেন, দলের খেলায় কোথায় উন্নতি করতে হবে ইত্যাদির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দেওয়া শুরু হল প্রেস কনফারেন্সে। তিনি ভালোই জানতেন তার দেওয়া উত্তরগুলো সংবাদপত্রের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে সভ্য সমর্থকদের কাছে। তারা এগুলো শুনলে ভরসা রাখবেন যে তাদের প্রিয় দলের দায়িত্ব ভুল লোকের হাতে পড়েনি। এভাবেই ওয়েঙ্গার জিততে শুরু করলেন তাদের বিশ্বাস। জাপান থেকে আসা এক অচেনা ফরাসি ম্যানেজারের ফুটবলবুদ্ধির উপরে ভরসা রাখতে শুরু করল সকলে। একইভাবে তিনি দলের খেলোয়াড়দেরও মন জয় করে নিলেন। রাশভারি শিক্ষকের মতো শুধুই বকাঝকা না করে তাদের পিতৃসুলভ স্নেহে বোঝাতে শুরু করলেন নির্দেশগুলির পিছনে তার আসল উদ্দেশ্য। ছোট বাচ্চাদের কোনও কিছু করতে মানা করলে তারা ঠিক সেটাই করে, কিন্তু তাদের যদি কেউ বুঝিয়ে বলে যে সেটা করলে তাদের কী ক্ষতি হতে পারে তাতে কিন্তু কাজ হতে দেখা যায়। ওয়েঙ্গার ঠিক সেই কাজটাই করেছিলেন। জর্জ বেস্ট, গাজ্জা থেকে শুরু করে হাল আমলের ওয়েন রুনি — ব্রিটিশ ফুটবল খেলোয়াড়দের মধ্যে অতিরিক্ত মদ্যপানের চল বরাবরই ছিল। ওয়েঙ্গার আর্সেনাল থেকে আস্তে আস্তে ঝেড়ে ফেললেন এই ব্রিটিশ সংস্কৃতি। খেলার দিন তো বটেই, খেলার আগের দিনও বন্ধ হয়ে গেল আকণ্ঠ বিয়ার পানের রমরমা। ওয়েঙ্গার বেঁধে দিলেন ফুটবলারদের ডায়েট। বোঝাতে শুরু করলেন সেগুলোর উপকারিতা। হাতে হাতে ফল পেল আর্সেনাল। সেবারের লিগে গত ছয় বছরের মধ্যে সেরা পারফরমেন্স দিল ক্লাব। প্রিমিয়ার লিগে তৃতীয় হল আর্সেনাল। যদিও দ্বিতীয় স্থানাধিকারী নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের সাথে পয়েন্ট তাদের সমান ছিল। দ্বিতীয় স্থানের ফয়সালা হয় গোল পার্থক্যে। প্রথমবার এসেই প্রিমিয়ার লিগের ব্যাপারস্যাপার ঠিকঠাক জরিপ করে ওয়েঙ্গার নেমে পড়লেন পরেরবারের দল গঠনে। তিনি বুঝলেন মাঝমাঠে উঠতি ফরাসি যুবা খেলোয়াড় প্যাট্রিক ভিয়েরার সাথে বল হোল্ড করে খেলতে পারে এরকম প্রাজ্ঞ খেলোয়াড়ের অভাব। ওদিকে সামনে ডাচ জাতীয় দলে নিয়মিত ডেনিস বার্গক্যাম্পকে আরও বল বাড়ানো জন্য একজন গতিশীল উইঙ্গার চাই। বুদ্ধিমান ওয়েঙ্গার ভেবে দেখলেন এক বছর পরেই বিশ্বকাপ। অংশগ্রহণকারী দলগুলো ততদিনে বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ার খেলে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া অনেকটাই সেরে ফেলেছে। তাই দেরি না করে তিনি খোঁজ করলেন বার্গক্যাম্পের সাথে জাতীয় দলে খেলেছে এমন কোনও উইঙ্গারের। ওয়েঙ্গারের কথায় ডাচ ক্লাব আয়াক্স আমস্টারড্যাম থেকে সই করানো হল ডাচ জাতীয় দলে বার্গক্যাম্পের সতীর্থ মার্ক ওভারমার্সকে। আনকোরা ভিয়েরার পাশে খেলার জন্য ডেকে আনলেন নিজের পুরনো ক্লাব মোনাকোতে ওনার কোচিং-এ খেলা ফরাসি জাতীয় দলের খেলোয়াড় এমানুয়েল পেতিঁকে। এই দুটো বদলের সাথে প্যারিস সাঁ জাঁ থেকে ওয়েঙ্গার নিয়ে আসেন আঠেরো বছরের এক প্রতিভাবান ফরাসিকে যার নাম ছিল নিকোলাস আনেলকা। শুরুটা ভাল করলেও আর্সেনাল মাঝপথে খেই হারিয়ে ফেলে। নভেম্বর মাসে মাত্র একটা ম্যাচ জিতে তারা লিগ টেবিলে নেমে আসে ছয় নম্বরে। টিভিতে বার্গক্যাম্পের স্মৃতিচারণায় শুনেছিলাম ঘরের মাঠে ব্ল্যাকবার্নের কাছে হারার পর ওয়েঙ্গার নাকি এক জরুরি টিম মিটিং ডাকেন। দলের প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কে বলা হয় মন খুলে কথা বলতে, কাউকে দোষারোপ হোক বা প্রশংসা, যা ইচ্ছা বলার ছাড় ছিল সে মিটিঙে। ড্রেসিংরুম হয়ে উঠেছিল উত্তপ্ত। সবাইকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওয়েঙ্গার সকলের কথা মন দিয়ে শুনে তাদের চলে যেতে বলেন। স্বভাবতই সকলে একটু অবাক হয় এই ভেবে যে ‘এ কেমন মিটিং রে বাবা যেটার কোনও আউটকামই নেই।’ সবাই গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে গেলেও ওয়েঙ্গার আটকে রাখেন ভিয়েরা এবং পেতিঁকে। তাদের বলেন সকলের বক্তব্য শুনে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে ডিফেন্সে আত্মবিশ্বাসের অভাব। তাদের মাঝমাঠ থেকেও সাহায্য লাগবে এবং সেই দায়িত্বটা নিতে হবে ভিয়েরা এবং পেতিঁকে। তাদের যৌথ ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাস, পরের দিন থেকে দুজনের মাঝে বোঝাপড়া বাড়াতে আলাদা করে ট্রেনিং করাতেন ওয়েঙ্গার। সেই ছকে খেলে বাকি ম্যাচগুলোতে অবিশ্বাস্যভাবে গোল খাওয়া কমে যায় দলের। দুরন্ত খেলতে শুরু করে দুই ফরাসি মিডিও। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাকি ম্যাচে আশানুরূপ ফল করে আর্সেনালে নিজের দ্বিতীয় বছরেই প্রিমিয়ার লিগ জিতে নেন আর্সেন ওয়েঙ্গার। তার সাথে এফ এ কাপ জিতে ঘরে তোলেন আরেকটি ট্রফি। ১৯৯৭-তে আর্সেনালের হয়ে দারুণ খেলার জন্য ফ্রান্সের জাতীয় দলে ডাক পায় একুশ বছর বয়সী প্যাট্রিক ভিয়েরা। পরবর্তীকালে ডাক পায় ১৯৯৮-এর ফ্রান্সের বিশ্বকাপের দলে। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ফাইনালে ফ্রান্সের তৃতীয় গোলটা ভিয়েরা-পেতিঁর যৌথ বোঝাপড়ারই ফসল। কোথাও যেন ফরাসি বিশ্বকাপজয়ী কোচ এইমে জাঁকেকে এই জুটি তৈরি করতে অন্তরালে থেকে সাহায্য করে গেছিলেন তাঁর স্বদেশবাসী আর্সেন ওয়েঙ্গার।পরের তিনটি বছর ওয়েঙ্গারকে দ্বিতীয় হয়ে প্রিমিয়ার লিগ শেষ করতে হয়েছিল প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পেছনে থেকে। একবার তো মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে। প্রতিবছরই দলটা একটু একটু করে তৈরি করছিলেন ওয়েঙ্গার। এই তিন বছরে দলে যোগ দেন ফরাসি স্টার রবার্ট পিরেস এবং থিয়েরি অঁরি, সুইডিশ উইঙ্গার ফ্রেডরিক লুংবার্গ, ইংলিশ সেন্টারব্যাক সোল ক্যাম্পবেল। সেবার আর্সেনাল যুব দল থেকে মূল দলে স্থান পায় প্রতিশ্রুতিমান লেফট ব্যাক অ্যাশলে কোল। দলে নেওয়া হয় ২০০০ ইউরোতে ইতালির বিরুদ্ধে গোল করে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করা সিলভান উইলটোর্ডকে। এ হেন দলের কাছে প্রায় অসহায় আত্মসমর্পণ করে বাকিরা। মাত্র তিনটে ম্যাচ হেরে ২০০১-এ দ্বিতীয়বারের জন্য প্রিমিয়ার লিগ জিতে নেয় ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল। স্যার আলেক্সের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড শেষ করে তিন নম্বরে। এবারও প্রিমিয়ার লিগের সাথে ওয়েঙ্গার ঘরে তোলেন এফ এ কাপ। দলের সভ্য সমর্থকদের কাছে নয়নের মণি হয়ে ওঠেন ওয়েঙ্গার। ছয় বছরে দুবার চ্যাম্পিয়ন, চারবার রানার্স (একবার গোল পার্থক্যে তৃতীয়) হওয়া আর্সেনালের কাছে ছিল এক বিরাট প্রাপ্তি। আর্সেনাল পূর্ববর্তী কেরিয়ারের বারো বছরে চারটে ট্রফি জেতা মানুষটা আর্সেনালে তার অর্ধেক সময়ে জিতে নিলেন সমসংখ্যক ট্রফি। খ্যাতির মধ্যগগনে বিরাজ করতে শুরু করলেন ওয়েঙ্গার। তখনও তিনি জানতেন না যে তিনি কী ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছেন দুবছর পর। পরের বছর স্যার অ্যালেক্স যথারীতি ফিরে এলেন নিজস্ব মেজাজে। প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। সারা বিশ্বের নজর তখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। দুই অসম্ভব পরিপক্ব ফুটবল মগজের অধিকারী দুই ম্যানেজারের লড়াইয়ে দুনিয়া তখন মশগুল। এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ। প্রকৃত অর্থে যারা খেলার টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলোর খুঁটিনাটি জানতে চাইতেন তাদের জন্য এই সময়টা ছিল স্বর্ণযুগ। অনেক কিছু জানা এবং শেখার এক অদ্ভুত ভাণ্ডার ছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। দেখতে দেখতে চলে এল ২০০৩-০৪ সিজন। ততদিনে দলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন অঁরি, পিরেস, লুংবার্গ, ক্যাম্পবেল, কোল। সাথে বার্গক্যাম্প এবং ভিয়েরার মতো সিনিয়র। আগের বছরই তাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন সদ্য বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান মিডিও গিলবার্তো সিলভা এবং আইভরি কোস্টের সেন্টার ব্যাক কোলো টুরে। প্রথম দলে নতুন বলতে শুধু জার্মান গোলকিপার য়েন্স লেম্যান। এত বছর ধরে ধাপে ধাপে বানানো ওয়েঙ্গারের এই দলটাই তৈরি করল ইতিহাস। ১৮৮০-র প্রেস্টন নর্থ এন্ডের প্রায় ১২৩ বছর পরে সেই প্রথম কোনও দল পুরো সিজন একটাও ম্যাচ না হেরে শেষ করে। সেবার ৪ ম্যাচ বাকি থাকতেই প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় আর্সেনাল আর আদায় করে নেয় “The Invincibles” ডাকনাম যার অর্থ অজেয়। ইংলিশ ফুটবলের ৩৮ ম্যাচের লিগে অপরাজেয় থাকা এখনও একটা রেকর্ড। ক্লাবে আসার আট বছরের মাথায় এত বড় উপহার দিয়ে সমর্থকদের কাছে আর্সেন ওয়েঙ্গার হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রিমিয়ার লিগের ট্রফির সোনালি রেপ্লিকা দেয় সেবার আর্সেনালের এই কৃতিত্বকে সম্মান জানিয়ে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়ে গেল আর্সেন ওয়েঙ্গারের নাম। তিনি এমন একটা কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে গেলেন তিনি যেটা স্বয়ং স্যার অ্যালেক্সেরও নেই।

পেতি এবং ওভারমার্সের সঙ্গে

নিকোলাস আনেলকার সঙ্গে

তবে ভাগ্যের কুটিল কটাক্ষের হাত থেকে আজ পর্যন্ত কেউ রেহাই পেয়েছে কি? ওয়েঙ্গারও পাননি।

কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন:

চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। আজিকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়।

২০০১-০২-এর ওয়েঙ্গার

২০০৩-০৪-এর “The Invincibles” সিজনের পর আজ চোদ্দ গিয়ে পনেরোতে পড়ল বছর কিন্তু ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল আর কোনওদিন প্রিমিয়ার লিগ জয় করতে পারল না। কীসের অভিশাপে কে জানে? ওয়েঙ্গারের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক, ম্যানেজমেন্টের জলের মতো টাকা ব্যয়ের পরেও লিগ এল না লন্ডনের ক্লাবটায়। যদিও এই পনেরো বছরে চারটে এফ এ কাপ এবং চারটে কমিউনিটি শিল্ড জিতেছেন ওয়েঙ্গার। কিন্তু একবার যে বাঘ মানুষের রক্তের স্বাদ পায় তাকে কি আর হরিণের মাংস দিয়ে ভুলিয়ে রাখা যায়? ঠিক এমনটাই হয়েছে আর্সেনাল সমর্থকেদের। ২০০৬-এ ইউরোপের ক্লাবেদের শ্রেষ্ঠ টুর্নামেন্ট উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের বার্সেলোনার সাথে এগিয়ে গিয়েও শেষ চোদ্দ মিনিটে দুটি গোল খেয়ে ভেঙে চুরমার হয়েছে তাদের স্বপ্ন। শুরুতে ব্যর্থতা এলেও তারা ওয়েঙ্গারের ওপর থেকে বিশ্বাস হারায়নি। তাঁর নামে ব্যানার বানিয়ে মাঠে এসে জানান দিত যে তারা ভরসা রাখে তাঁর ওপর। ক্লাবের স্টেডিয়ামে বসেছে তাঁর আবক্ষমূর্তি। কিন্তু যত দিন গেছে সেই বিশ্বাসে একটু একটু করে চিড় ধরেছে। ক্লাবের প্রতি তাঁর অবদান মানুষ ভুলতে শুরু করেছে আর সেটা খুব স্বাভাবিক। লেখাটা শুরু করার সময় লিখেছিলাম যে বাইশ বছর খুব লম্বা সময় হয়। সেই সময়ে যে জন্মেছে তার কাছে আজ ঠুনকো আবেগের কোনও মূল্য নেই। সে ওয়েঙ্গারের মূল্যায়ন করবে পনেরো বছর লিগ না পাওয়া একজন ম্যানেজার হিসাবে। এবার তারা ঠিক না ভুল সেটা অন্য বিতর্ক তবে সমর্থকদের বাড়তে থাকা ক্ষোভেই বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিলেন ওয়েঙ্গার। তিনি বলেছেন নিজে থেকে না সরলে তাকে তাড়ানো হতে পারে আর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ম্যানেজারদের একজন হয়ে সেটা হজম করা তার পক্ষে অপমানজনক হবে। যদিও আর্সেনালের সি ই ও ইভান গ্যাজিডিস ওনার কথার সাথে একমত নয় বলেই শুনলাম, উনি এখনও ওয়েঙ্গারকে রেখে দেওয়ারই পক্ষে। লিগে আর্সেনালের শেষ হোম ম্যাচে ওনাকে ধুমধাম করে সম্মানের সাথেই বিদায় জানাবেন বলে মন্তব্য করেছেন গ্যাজিডিস। উগ্র সমর্থকদের গালিগালাজ খাওয়া, “Wenger Out”-এর ব্যানার দেখা আর সোশ্যাল মিডিয়াতে কুরুচিকর মিম হওয়ার চেয়ে সম্মান থাকতে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্তকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন ওয়েঙ্গার। এই সিদ্ধান্তে ওনার স্বর্ণযুগের খেলা দেখে অভ্যস্ত একজন ফুটবলপ্রেমী হিসাবে কিছুটা কষ্ট পেয়েছি। তবে মন বলছে ম্যাজিক এখনও বাকি আছে। বাইশ বছরের সম্পর্ক এভাবে ছিন্ন হবে না। প্রবল ঝড়ে নিভে যাওয়ার আগে বেয়াড়া প্রদীপের শিখার মতো জ্বলে উঠবেন আর্সেন ওয়েঙ্গার।

এবারে লিগে ষষ্ঠ স্থানে থাকলেও ইউরোপের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ টুর্নামেন্ট ইউরোপা লিগে সেমিফাইনালে উঠে এসেছে ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল। সামনে প্রতিপক্ষ আরেক ধুরন্ধর ম্যানেজার ডিয়েগো সিমিওনের অ্যাটলেটিকো দে মাদ্রিদ। আর মাত্র তিনটে ম্যাচ। আমি বিশ্বাস রাখি কাঁচাপাকা চুলের লম্বা ছিপছিপে ফরাসি প্রৌঢ় আজ বৃদ্ধ হলেও তার মস্তিষ্ক একইরকম ক্ষুরধার রয়েছে। বাইশ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে শেষবারের মতো সেই মস্তিষ্কের জাদু বিশ্ববাসী আরেকবার দেখবে বলেই ভরসা রাখি, স্বপ্ন দেখি, শিহরিত হই কারণ “In Arsene I Trust”!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...