তাহলে একটু সৎ হওয়া যাক, নাকি?

সব্যসাচী দাস

 

গঢ়চিরোলির পুরো ঘটনাটা পড়ছিলাম। বেশ রোমহর্ষক কিন্তু। ঠিক আমার ওই প্রথম বাক্যে ব্যবহৃত ‘পুরো ঘটনা’ শব্দবন্ধটার মতো।

ফলে ‘পুরো ঘটনা’ জানার অহং থাক। আপাতত প্রকাশিত যেটুকু, তাতে মন দিই।

মাওবাদীরা এসেছিল একটি গ্রামে। মিটিং-ফিটিং করতে নয়, নিছকই একটি বিয়ে খেতে।

কী মুশকিল! একটা রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে বসে পদে পদে বাধা! প্রথমে পুরো ঘটনা, এবার মাওবাদী। মাওবাদী কারা? ক্ল্যাসিকাল অর্থে বলা যায়, যারা মাও সেতুং-এর রাজনীতি এবং তত্ত্ব অনুসরণ করেন তারাই মাওবাদী। সে যাক গে, এখানে ক্ল্যাসিকাল অর্থ কেউই খুঁজছেন বলে মনে হয় না। এখানে যে বিশিষ্ট অর্থের প্রয়োগ, তা হল, এরা সি পি আই (মাওবাদী) পার্টির …। নাহ্‌, বাক্যটা সম্পূর্ণ করা গেল না! সি পি আই (মাওবাদী) পার্টির কে? নেতা? কর্মী? সদস্য? সমর্থক? সহানুভূতিশীল? গণ সংগঠনের কর্মী? আজ্ঞে হ্যাঁ, একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এরকম বিভিন্ন স্তরে মানুষ সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে ঠিক কাদের কাদের আমাদের রাষ্ট্র, সরকার এবং সংবাদমাধ্যম ‘মাওবাদী’ বলে দাগাচ্ছে? এটা ঠিক শিশুসুলভ প্রশ্ন নয়। জানাটা জরুরি। কারণ এই দাগানোর ওপরেই নির্ভর করছে যে তুমি বিয়ে খেতে গিয়ে মেনুতে পুলিশের গুলি পাবে নাকি! ঠিক কোন স্তরের ‘মাওবাদী’ হলে দেশের মহান আইন শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তোমাকে নিকেশ করাটা আশু প্রয়োজন হয়ে পড়ে?

এখানে শুধু গুলি নয়, সি আর পি এবং পুলিশ ব্যারেল গ্রেনেড লঞ্চারও ব্যবহার করেছিল বলে খবরে প্রকাশ।

যাহোক, গল্পটাই বলা হচ্ছে না! আমরা এসব কূটতর্ক সরিয়ে ধরে নিই এই বিয়ে খেতে যাওয়া লোকগুলো সি পি আই (মাওবাদী) পার্টির ফৌজি সংগঠনের সব দুর্ধর্ষ এবং খতরনাক যোদ্ধা। পুলিশ বলছেও তাই। ২২ থেকে ২৪ এপ্রিল, এই বাহাত্তর ঘণ্টায়, ১৯ জন মহিলা সহ মোট ৩৭ জন নিকেশ হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। পুলিশ এদের মধ্যে ১৬ অনকে চিনতে পেরেছে এখনও অবধি। আর এই ১৬-র মধ্যে ৪ জন সি পি আই (মাওবাদী)-র গঢ়চিরোলি ডিভিশনাল কমিটির সদস্য। যে কমিটিতে ছিল ৫ জন ছিল বলে পুলিশ জানে এবং জানিয়েছে। ফলে খতরনাক তো বটেই। এবং এদের নিকেশ করাটাও খুবই ভালো কাজ নিঃসন্দেহে।

সি আর পি, পুলিশ নাচছিল। সে ভিডিও-ও ভাইরাল হয়েছে।

হ্যাঁ, গল্পটা। আসলে ওই যে বললাম প্রথমেই, রোমহর্ষক। ফলে এই বারবার এদিকওদিক ছিটকে যাওয়ার দোষ আমার কথনের নয়, বিশ্বাস করুন। এ দায় একান্তই ঘটনার চমৎকারিত্বের।

তা এইসব খতরনাক লোকজন দল বেঁধে চলে এল বিয়ে খেতে। স্বাভাবিক। জঙ্গলে মঙ্গলে থাকে… কী গাছ পাতা হয়তো খায়… সেখানে একটা বিয়ের নেওতা কি ছাড়া যায়! ফলে যেতেই হবে। এখন এই সি পি আই (মাওবাদী) পার্টিকে অতীতে আমরা বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে পার্টি কংগ্রেস বা রাজ্য সম্মেলন এসব করতে দেখেছি। এদের একটু প্রচার আসক্তি আছে বলেই মনে হয়। মনে করুন কিষেণজি বা আমাদের জঙ্গলমহলের ঘটনা। একজন মোস্ট ওয়ান্টেড লোক প্রায় প্রতিদিনই মুখে গামছা বেঁধে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলত! কিন্তু মজাটা হচ্ছে, সেই পার্টি কংগ্রেস বা সম্মেলনে সমস্ত খতরনাক লোক জড়ো হওয়া সত্ত্বেও, মানে যেখানে নাকি আপনি এই ‘মাওবাদী’ কারা বলে তর্কটাও তুলতে পারবেন না, পুলিশ এবং রাষ্ট্রীয় ফৌজ তাদের কিছুই করতে পারত না। আমরা শুনতাম, জঙ্গলের যে গহীনে এই ঘটনা ঘটছে তার চারদিকে বহু আগে থেকে মাইন বিছিয়ে রেখে দিয়েছে সি পি আই (মাওবাদী)। ফলে ওখানে ঘেঁষা মুশকিল। আর এমনিতেও মাইনের ব্যবহারে এরা যে সিদ্ধহস্ত তার নমুনাও আমরা অতীতে দেখেছি বটে।

কিন্তু সেদিন বোধহয় জিলেটিন স্টিক, বা ফিউজ, বা ডিটোনেটর, বা সবগুলোই ফুরিয়ে গিয়ে থাকবে। তাই অতগুলো দামী দামী লোক এক জায়গায় জড়ো হওয়ার থাকলেও কোনও মাইন প্রোটেকশন নেওয়া যায়নি! জড়ো তো হতেই হত। বিয়ের নেমন্তন্ন বলে কথা! আর দামী যে, সেটাও পুলিশ জানিয়েছে। যে ১৬ জনকে তারা চিনতে পেরেছে তাদের সম্মিলিত মাথার দাম ছিল বলছে, ১ কোটি ৬০ লাখ। আরও আস্তে আস্তে চিনতে পারবে, এবং দামটাও আরও বাড়বে আমরা আশা রাখতেই পারি।

নীরব মোদি-মেহুল চোকসিদের এদিকওদিক ১৫০০০ কোটি টাকার কিছুটা তো ক্ষতিপূরণ হল! এরকম আর হাজারখানেক হলেই…। আমরা আশা রাখি।

যাই হোক, পুলিশ তাদের দুর্ধর্ষ ইন্টেলিজেন্স মারফৎ এই জমায়েতের খবর পেল এবং জায়গাটা ঘিরে নিল সন্তর্পণে। একদম কাকপক্ষীও জানতে পারল না। সি পি আই (মাওবাদী)-র ইন্টেলিজেন্স তো জানতে পারবেই না! ওরাও তো বিয়ে খাচ্ছে। ফলে… ব্যাস…! ঘিরে ফেলে নিখুঁত অপারেশন। থুড়ি, এনকাউন্টার।

এনকাউন্টার কী এবং কাকে বলে, সে আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কল্যাণে আমরা সবাই অল্পবিস্তর জানি। এখানে সে নিয়ে গল্পটাকে আবার বিচ্যুত করে বা লেখা ভারী করে লাভ নেই। উৎসাহী পাঠকদের জন্য একটি লিংক লেখার শেষে দিয়ে দেব ’খন। আপাতত একটা ছোট্ট তথ্য দিয়ে রাখি। ২০১৫ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছিল, ১৯৯৩ সাল থেকে তাদের গোচরে আসা ২৫৬০টি এনকাউন্টারের ঘটনার মধ্যে ১২২৪টি ভুয়ো। অর্থাৎ সাজানো বা ফেক এনকাউন্টার। অর্থাৎ এগুলিতে পুলিশ ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। এবং আরও অর্থাৎ, এই হিসেবে মোটের ওপর দেশে ঘটা এবং গোচরে আসা প্রতি দুটি এনকাউন্টারের ঘটনার একটি ভুয়ো। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সরকারি সংস্থা। অতএব, একে আমরা সরকারি তথ্যই বলতে পারি।

কিন্তু এখানে আমরা গল্প শুনতে বসেছি, অতএব সেসব কূটতর্কেও যাব না। একটা রোমাঞ্চকর এনকাউন্টারই হল! পুলিশ-সি আর পি গুলি ছুঁড়ল, গ্রেনেড ছুঁড়ল, খতরনাক জঙ্গিগুলোও…। এখানে একটু ডট ডট রাখতে হবে। কারণ ওরা ঠিক কী ছুঁড়েছিল জানা যাচ্ছে না। ছোঁড়ার প্রত্যক্ষ অভিঘাত কিছু নেই, কারণ সরকারি বাহিনীর কারও গায়েই কোনও আঁচড় লাগেনি বলে জানা যাচ্ছে। সে হোক… মানে হতেই পারে। সুশিক্ষিত, প্রশিক্ষিত বাহিনী আমাদের। তা ওইসব বিয়েবাড়ির পাট চোকার পর পুলিশ খতরনাকদের লাশ গুনতে বসল। ১৫ জন। তব্‌বে?

আর তারপরই বৃষ্টি নামল!

আড্ডায় কেউ কোনও গল্প শুরু করলে আশপাশ থেকে নানান অন্য কথা এনে তাকে ব্যাঘাত দেওয়ার খুচরো রসিকতা করার অভিজ্ঞতা বোধহয় আমাদের সবারই রয়েছে। তারপর সে যখন বিরক্ত হয়ে বলবে, যাঃ… বলবই না! তখন আবার তাকে বল, বল করে খোঁচানো হবে। আমাদের মধ্যে যেটা চলে, তখন সে বলবে, তারপর খুব বৃষ্টি হল… গল্প শেষ! এখানেও বৃষ্টি নামল। কিন্তু গল্পটা শেষ হল না।

এবার গল্প ইন্দ্রাবতী নদীতে। আদিবাসী উপকথা অনুযায়ী টিরকা মালুর মেয়ে ইন্দ্রো দেশে খরা ঠেকানোর জন্য মারাং বুরুর কাছে মাথা ঠুকে নিজে ভেসে গিয়ে যে পবিত্র নদীর জন্ম দিয়েছিল। সেই পবিত্রতাকে রসিকতা করে দুদিন পর সেই নদী দিয়ে ভেসে আসল ১৬টা পচতে শুরু করা লাশ। এসে বলল, আমরাও গেছিলাম বিয়ে খেতে। আমরাও খতরনাক। আমাদেরও এনকাউন্টার করা হয়েছে। বাদ দিও না। আমাদেরও গোনো।

ফলে ২১ আর ১৬, একুনে ৩৭। ওঃ হো! ২১ কোত্থেকে? ১৫ বলেছিলাম যে! আরে বলতে ভুলেই গেছি! ওই যে ভিড় ঠিড় ঠেলে কোনও বড় পুজো দেখে বেরিয়ে দেখা যায় পাশে গলিতে গ্রহের মতো এক-আধটা ছোটখাটো পুজোও হচ্ছে, বিয়েবাড়ির কি তেমন হতে নেই? তেমনই একটা ছোট বিয়েবাড়িতে ওই ৬ জন। এ সম্পর্কে বেশি জানা যাচ্ছে না। শুধু ওই লাশগুনতি ছাড়া। ৬ জন।

ও হ্যাঁ, টাকাটাও ৮২ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৬০ লাখ।

তবে ৩৭টা লাশ আসলেও ৩৭টা অস্ত্র আসেনি শোনা যাচ্ছে। সেও হতে পারে। মনে রাখতে হবে, তারা বিয়ে খেতে এসেছিল।

এনকাউন্টারের গল্প, যাকে বলে, নিখুঁত একদম!

এবং গল্প মোটের ওপর, এখন অবধি, এখানেই শেষ। সবাই মোটামুটি বুঝে গেছেন আমি খুবই খারাপ গল্পবলিয়ে। তবে যা বলেছি, সবই যে বেশ ভালো ভালো কথা, তাতে নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না।

এবার পষ্টাপষ্টি কটা কথা বলা যাক।

সি পি আই (মাওবাদী) সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী। সে কথা তারা গোপনও করে না। এও গোপন করে না, যে তারা অস্ত্র ধরেছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। অতএব, যা চলছে, সেটা একটা যুদ্ধ। এখানে হতাহত দু’ পক্ষেই হবে। এ নিয়ে বিলাপের কিছু নেই। যারা নিহত হলেন, তারা যদি সি পি আই (মাওবাদী)-র কর্মী হন, তবে তারা শহীদ হয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানাই। আর যদি না হন, তবে রাষ্ট্রকে জানাই ধিক্কার।

মিডিয়া, দুই কিসিমেরই, মানে প্রচলিত ছাপা এবং বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম, এবং বর্তমানে আমাদের বিবেক হিসেবে অবতীর্ণ হওয়া সোশাল মিডিয়া, দু’ জায়গাতেই এই ঘটনা সম্পর্কে এক বোধগম্য নীরবতা। প্রচলিত সংবাদমাধ্যম খবর করেছে, তবে ওই, অনেকটা করতে হয় বলে। আর সোশাল মিডিয়ায় লোকজন বোধহয় ঠিক বুঝেই উঠতে পারছে না কী বলা উচিত! একই অবস্থা রাজনৈতিক দলগুলির। একমাত্র সি পি আই (এম-এল) লিবারেশন ছাড়া অন্য কোনও পার্টির কোনও বিবৃতি অন্তত আমার নজরে আসেনি। আমার নজরের খামতিও হতে পারে অবশ্য। এই নীরবতার অনেক ব্যাখ্যা হয়। আপাতত তাতে যাচ্ছি না, ঘটনাটা জানিয়ে রাখলাম মাত্র।

আদিবাসীদের জন্য বিলাপ করার একটা সুর নজরে পড়ছে। এও নিরর্থক। এই পরিচয়ে সি পি আই (মাওবাদী)-র সদস্যরাও বোধহয় পরিচিত হতে চাইবেন না। ঘটনাচক্রে তাদের ওখানকার সংগঠন আদিবাসীদের নিয়ে। এর জন্য ‘সরকার আদিবাসীদের মেরে ফেলছে বলে’ কান্নাকাটি করা চলে না। কাশীপুর-বরানগর নিয়ে কি কেউ পুলিশ বাঙালি ছেলেদের মেরে ফেলল বলে কাঁদে?

আর শেষে যেটা বলার, সি পি আই (মাওবাদী)-র রাজনীতি, মত, পথ মানি না-মানি, সততাটা অনস্বীকার্য। যেমন ছিল আদি সি পি আই (এম-এল)-এর। কিন্তু উলটো পক্ষে আমাদের রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক, তার সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, ভোটব্যবস্থা… সব সমেত সে গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের শ্লাঘার শেষ নেই। আবার একই সাথে আমরা জানি চারু মজুমদার অসুস্থ হয়ে মারা গেছিলেন, সরোজ দত্ত নিখোঁজ এখনও, আমরা দেখেছি কাশীপুর-বরানগর, দেখেছি অপারেশন গ্রিন হান্ট, আর এইসব গঢ়চিরোলির মতো ছোটখাটো ঘটনাও তো দেখতেই থাকছি। তা দেশদুনিয়ায় অনেক কিছুই তো নতুন ঘটছে এখন। এটাও হয়ে যাক না। রাষ্ট্র একটু সৎ হোক। গণতন্ত্র, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন জাতীয় ভড়ংগুলো সরিয়ে রাখুক। বলে দিক, ‘যাহারা আমাদের সুরে সুর মিলাইবেন তাহাদের জন্য আমাদের গণতন্ত্র। অন্যদের জন্য আমরা এনকাউন্টার বিশারদদের দিয়া প্রকৃত এবং সাজানো এনকাউন্টার করাইয়া থাকি।’

ফুটনোট : এনকাউন্টার, https://crpcdecoded.wordpress.com/2015/05/19/legality-of-encounters/

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. hyan kaw. baw. dekhlam…

    apnakeo dhonyobad Sharifus bhai… apnar proshnota joruri… ebar oi je bollam, ei ghotonay beshirvag manush-i neerobata palon korchhe. asole shuvobuddhi-o bodhhay shreni-niropekkho hoy na, janen!

আপনার মতামত...