রাগে-অনুরাগে

শ্যামলী আচার্য

 

লেকের ধারে লম্বা গাছগুলোর ছড়ানো ডালে রোদের লুটোপুটি। ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েক ফালি টুকরো রোদ্দুর এসে পড়ে আর্যর চোখেমুখে। চশমায় কৃষ্ণচূড়ার কুচো পাতার ছায়া। পাশে লেকের স্বচ্ছ জলেও তার নোয়ানো মাথা। একে একে ঝুঁকে পড়া গাছের পাতা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে মনের মধ্যে চেনা সুর আসে না কোনও। অথচ আর্যর এই সময় গান গাইতে ইচ্ছে হয়। চিরকালীন রেওয়াজের সময় ওর। এখন সব কেমন ওলট পালট। তাই কি চেনা গান ধরা দেয় না? মনেই পড়ে না কিছু। রেডিওতে শোনা, মায়ের মুখে, পাড়ার জলসায়, বন্ধুর বাড়ি, আড্ডা, পিকনিক, টিভি — গান তো নিজের পথ ধরেই চলে আসে। উৎসব-অনুষ্ঠান-নিমন্ত্রণের পথ বেয়ে কোনও না কোনও গান কখনও না কখনও আসতেই থাকে। পথঘাট-হাইওয়ে-শুঁড়িপথ-কানাগলি-ট্র্যাফিক সিগনালে গান ভেসে থাকে। তবু সকালের শান্ত রোদের টুকরো মাখানো কোনও গান মনে পড়ে না। জম্পেশ কোনও গান। লাগসই। যার মধ্যে লেগে থাকবে ভোরের শিশির, থাকবে কাঁচা রোদের রঙ, পাতার ঝিরঝিরে কাঁপুনি, সকালের হালকা হাওয়ার ফিসফাস। সব মিলিয়ে মিশিয়ে পঞ্চম থেকে কোমল ধৈবতে টুক করে গড়িয়ে যাবে। আলতো। তেমন কোনও বন্দিশ। যে কোমল রেখাবের পর্দা ছুঁয়ে গান্ধারকে একটুও বিরক্ত না করে মধ্যমে পৌঁছবে। কিচ্ছু মনে পড়ে না। কিচ্ছু না। হংসধ্বনি থেকে আড়ানা-হাম্বীর-মালকোষ সব কেমন টুপটাপ ঝরে পড়ে পাতার কিনারায়। রাতের দরবারী তখন ক্লান্ত। মারু বেহাগ এসে তার কোমল স্বরে আলতো হাত রাখে। সব দেখে শোনে, অথচ আর্য এইসময় সকালের কোনও রাগ মনে করতে পারে না।

সকালে বেশ কয়েক মাইল হাঁটতে হয় ওকে। আরও অনেককেই। রক্তের মধ্যে বাড়তি শর্করা নিয়ে যারা বিপর্যস্ত। শর্করাকে পুড়িয়ে ফেলতে পারলেই যাদের স্বস্তি। এইসব শর্করা পরিবার মিষ্টি মিষ্টি সোনাহানা মুখ করে এদিক সেদিক জড়ো হবেন। রসেবশে জমে উঠবে তাদের ভাণ্ডার। বিপদ বাধাবেন ক্রমশ। তার চেয়ে জ্বালিয়ে দাও। আগুনে নয়, পরিশ্রমে। খাটিয়ে মারো এদের। অতিরিক্ত স্নেহ, বাড়তি মিষ্টি, উপচে পড়া মেদ– সব ঝরিয়ে ফেলতে তৎপর সচেতন অনেকেই এসে ভিড় করেন এই অঞ্চলে। এরা স্বাস্থ্য-বিলাসী। দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশী। যৌবন ধরে রাখতে আগ্রহী। তবে সকলেই তো আর লেকের ধারে আসেন না। বাড়িতেই ছুটোছুটি। স্থির হয়ে থাকা যান্ত্রিক সুইচের চাপে চলমান রাস্তায় তাদের ঘড়ি মেপে হাঁটা-চলা-দৌড়-বিশ্রাম। স্কোয়ার ফুটের শক্ত মাপে বাঁধা সুখের আস্তানা ছেড়ে জলের ধারে শিশির মাখার সময় নেই ওদের।

আর্য এই পথে দলছুট।

এই পথ অন্য বয়সের। তেমন অন্য গানেরও। বাঁধাধরা কোনও গৎ তাই হয়ত এই সকালের সূর্যের কাছে ধরা দিতে চায় না। গলা বুজে যায়। একের পর এক স্বর এলোমেলো। রাগ-অনুরাগ জড়ামড়ি করে লুটিয়ে থাকে মগজের কোন ধূসর কোষের আড়ালে।

বহুদিন গান করে না আর্য। অনেকদিন। মাসখানেক তো হবেই। টিনাও আজকাল আর বলে না কিছু। কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে টিনা। ‘শ্রী’-এর চলন গাইছিল আর্য। টিনা তখন এ বাড়িতে আনকোরা নতুন। শ্রী। লক্ষ্মী। লক্ষ্মী ভেবে যতটা, তার চেয়েও শ্রী রাগে সা-রে-মা-পা-নি-সা’র পরপর আরোহণে কেমন বুঁদ হয়ে যাচ্ছিল আর্য। বারে বারে ফিরে আসছে ঋষভ আর পঞ্চম স্বর।

ভবানীপুরে গুরুমা’র ঘরের লাল সিমেন্টের মেঝেতে কালো বর্ডার। সবুজ কাঁচের চারটে গুলি কেমন অনায়াসে চলে গেল যে যার ইচ্ছেমতো। শ্রী সেভাবেই। হারমোনিয়ামের ঘিয়ে রঙা রিডে যেমন গুরুমা’র অনায়াস আঙুল-চলন, এক গালে পানের পুঁটলি ঠেসে অনায়াসে বলেন ‘পিয়া বিনা জিয়া তরসায়’। আর্য তো তেমন করেই বলতে চায়। বলতে চেয়েছিল, ‘আয়ী বদরিয়া বিজুরী চমকে… উন বিনা জিয়া তরসায় রে’। ওর বলায়, ওর চাওয়ায় খামতি আছে নিশ্চয়ই। থাকতেই হবে। তা’ না হলে রাতের পর রাত মিঞা মল্লার গেয়েও এক ফোঁটা জল ঝরে পড়ে না কোথাও।

খাদের ধারে দাঁড়িয়ে রইল আর্য। নিচু পর্দায়। মন্দ্র সপ্তকে ‘পিয়া বিনা’ বলার জন্য যত অভিমান, যত আকুতি, যত বিরহ চারিয়ে দেওয়া দরকার — তত আকুলতা ওর গলায় নেই তো! গলায়-বলায়-উচ্চারণে-শরীরী ভাষায়। তবু টিনার মুগ্ধ দৃষ্টি। টিনা তাকিয়ে থাকে। টিনা কম কথার মানুষ। আর্যর সঙ্গে থাকতে এসেছে স্বেচ্ছায়। ভালোবেসে। তেমন কোনও শর্ত নেই। দেনা-পাওনার হিসেব করা হয়নি কখনও। একাকী গায়কের গান নয়। আর্য’র গান। টিনার দৃষ্টি। দুই মিলেই তো সঙ্গতি। সামান্য আয়াসে মসৃণ মেঝেতে কাঁচের গুলির গড়িয়ে চলার মতো কোমল গান্ধার-নিষাদ মেখে উঠে আসবে বিষণ্ণ বাগেশ্রী।

দৌড় শেষ। আজকের মতো। অনেক ভোরে ওঠে আর্য। সকালের আলো নিজেকে মেলে ধরার আগেই চুপচাপ ফ্ল্যাটে ঢুকে যায়। তিনতলা ফ্ল্যাটবাড়ির একেবারে ওপরের তলায় ছাদের একটুকরো খোলা অংশ সহ ওদের ছোট্ট আস্তানা। নীচে দোতলায় এক দক্ষিণী পরিবার। বৃদ্ধ দম্পতি। প্রায়ই এদিক-সেদিক। দূরে থাকা ছেলে-মেয়েদের কাছে। গত মাস দেড়েক ধরে যেমন মুম্বই বা কানপুর কোথাও একটা। একতলায় বাঙালি পরিবার। মধ্যবয়সী। চুপচাপ। তেমন মিশুকে নন। অনেকটা আর্যর মতোই। নিরুত্তাপ। নিরুদ্বেগ। মুখোমুখি দেখা হলে স্মিত হাসি, সামান্য কুশল ছাড়া আর তেমন কিছু বিনিময় হয়নি এই কয়েক বছরে।

আর্য আর টিনা এই তিনতলার খোলা ছাদসহ ফ্ল্যাটটিতে বড় তৃপ্ত। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামান্য কিছু টাকা, ব্যাংক লোন, টিনার পীড়াপীড়ি — অনেক কিছু মিশে আছে দেওয়ালের গাঁথনিতে।

আর মিশে আছে গান। জড়িয়ে আছে ওর একলা রেওয়াজের বহু মুহূর্ত।

সে গানও এখন থমকে দাঁড়িয়ে।

মোড়ের মাথায় বাবলুর দোকান থেকে আর্য পাঁউরুটি কেনে রোজ। একটা কোয়ার্টার পাউণ্ড। একটা দুধের প্যাকেট। হাফ লিটার। কদিন পরপর গোটা ছয়েক ডিম। যে কেউ নিয়মিত দেখলেই বুঝবে, দু’জনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। ঝাড়া হাত-পা। কম জটিলতা।

বাবলু আজ পয়সা গুনতে গুনতে কেমন করে তাকায়। আর্য তখন হাতড়ে বেড়াচ্ছে কোমল ঋষভ। এই তো ছিল শুদ্ধ গান্ধারের পাশেই দাঁড়িয়ে। গেল কোথায়? তাকে ঠিকঠাক না পেলে তো ভৈরব অসম্পূর্ণ। কোমল রে আর কোমল ধৈবত লাগাতে হবে মোক্ষম। তবেই না সেই সাবরী সুরত। মোহনী মুরত। বাবলুর চোখের দিকে না তাকিয়েই আর্য গুনগুন করে সুর খেলিয়ে তোলে। বাবলু দেখে, বিড়বিড় করে কী যেন বলে যাচ্ছেন ভদ্রলোক। দাড়ি কাটেন না অনেকদিন। কেমন উসকোখুসকো। অপরিচ্ছন্ন।

‘বউদি কোথায়?’ বাবলু জিগ্যেস করে।

বাবলুর প্রশ্ন আর্যর কানের কাছে একটা বিরক্তিকর মাছির ভনভনানির মতো। বউদি, বউদি… ধুস। কে বউদি? রেওয়াজের সময় হয়ে যাচ্ছে। যত অবান্তর প্রশ্ন। বাঁ হাত দিয়ে বিরক্তির কারণগুলোকে ঝেড়ে সরিয়ে দিতে দিতে আর্য হেঁটে এগিয়ে যায় পরের গলির শেষে ওদের তিনতলা ফ্ল্যাটবাড়িটির দিকে।

বাবলু অস্ফুটে বলে, স্‌সালা পাগল পুরো।

আর্য এগোতে এগোতেই ভাবে, রে আর ধা কোমল স্বরে বসিয়ে ভৈরব আজ ধরে ফেলার পালা। সকালের রাগ। বেশি দেরি করা যাবে না। সে এসেই গেছে প্রায়। এবার কেবল একটু একটু করে বিস্তার। মুঠোয় আসা রাগ ছড়িয়ে দেওয়া আলাপে-তানে।

পা চালিয়েই এগোয় আর্য। দেরি হলেই হাত ফসকে পালাবে।

‘এই আর্য, আর্য, শোন’—

কে যেন ডাকে। চেনা মুখ। আর্য একটু ঠাহর করে দেখে। দেবমাল্য। দেবমাল্য রক্ষিত। সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার। অফিসে আর্যর পাশেই কিউবিকল। বয়সে আর্যর চেয়ে সামান্য বড়। পদমর্যাদায় সমান। কিন্তু ও এখানে কেন?

‘কি রে আর্য! চোখমুখের এ কী অবস্থা! দাড়ি কাটিস না কদিন? শরীর খারাপ?’

দেবমাল্যর চোখেমুখে উদ্বেগ।

আর্য ফ্যালফ্যালে চোখে দেখে কোমল ঋষভ সুড়ুত করে সেঁধিয়ে পড়ল ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে। আজ আর ধরা যাবে না ওকে।

‘কি রে, কথা বলছিস না কেন? অফিসে আসছিস না যে? ফোনটা কোথায় তোর? মোবাইল?’

‘ফোন… ফোন তো আসলে… ফোনটা খারাপ হয়েছে…’ কোনওরকমে বলে আর্য। রেখাবের পাশ দিয়েই গান্ধার টুক করে গলে গেল না! আজকের মতো ছাড়া পেয়ে পালাল যেন।

‘আরে, ফোন খারাপ হলে সারাতে এতদিন লাগে নাকি! কী আশ্চর্য! এক মাসের ওপর হয়ে গেল কোনও খোঁজখবর নেই তোর। অফিসে জানাসনি। কী হয়েছে তোর?’

বিরক্ত গলা দেবমাল্যর। বাড়ি চিনে এতদূর এসেছে। সহকর্মীর খোঁজ নিতে আজকাল কেউ আর এভাবে ছুটোছুটি করেই না। তার ওপর আর্য বড্ড চুপচাপ, সরল। আনমনা সর্বক্ষণ। গানের রাজ্যে ডুবে থাকে। কারোর সঙ্গেই তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই। তবু দেবমাল্য বরাবর ওকে পছন্দই করে এসেছে। চুপচাপ ঘাড় গুঁজে কাজ করে ছেলেটা। উচ্চাশা নেই, আবার অপদার্থও বলা যায় না। নির্বিরোধী। সে মানুষটা হঠাৎ অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। ফোন বন্ধ। মেল করলে উত্তর আসে না। কোনও বিপদ-আপদ হল কিনা জানতেই তো…।

‘টিনা কোথায় রে? তোরা ঠিকঠাক? সুস্থ?’

আপাতনিরীহ প্রশ্নটির পাশে কোমল গান্ধার আর নিষাদ যোগ হলেই তো ভৈরব থেকে ভৈরবী। আর্য রে-গা-ধা-নি চার স্বর খুঁজে পেতে চায়। বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।

আর্য হঠাৎ খুব জোরে ছুট লাগায়। ছুট ছুট ছুট। দেবমাল্য চেনে না ওর বাড়ি। নাগাল পাবে না ওর। তার আগেই দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেলতে হবে সব কটা স্বর। একটা গলি ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে আবার ফের অন্যদিকে। দেবমাল্য পিছনে আসছে কিনা দেখে নেয় একবার। টুক করে ঢুকে পড়ে নিজের ফ্ল্যাটের চৌহদ্দিতে। একবার ছাদে পৌঁছলেই নিশ্চিন্ত। সেখানেই নিশ্চয়ই ধরে ফেলা যাবে ওদের।

একটা-দুটো করে সিড়ি টপকে টপকে ওঠে আর্য। হাতের প্লাস্টিকে দুধ-পাঁউরুটি। প্রথম ল্যান্ডিঙে ওঠার সময় একতলার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে কে যেন বলেন, ‘বড্ড বাজে একটা পচা গন্ধ পাচ্ছি কদিন ধরে, দেখবেন তো ইঁদুর-টিদুর কিছু….’

আর্য দৌড়ে দৌড়ে উঠতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে। ওর তালা দেওয়া বন্ধ দরজা একবার খোলে। পরক্ষণেই সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়। একটু হাঁফ ছাড়ে আর্য। বড্ড ধকল গেল আজ। কিন্তু সকালের স্বরগুলোকে তো ঠিকঠাক চেনা গেল। আরোহ-অবরোহ ধরে একবার গেয়ে ফেলতে পারলেই……। টিনা শুনবে। শুয়ে শুয়েই শুনবে। খুব খুশি হবে আজ।

টিনাকে খেতে দিতে হবে। টিনার চামড়া ফুলে উঠছে। হাঁ হয়ে থাকা মাড়ির ওপর মাছি। হাতদুটো বুকের ওপর ভাঁজ করে রাখা। শক্ত। ঘরে মৃদু আলো। আর্য ধূপদানিতে আবার একমুঠো ধূপ জ্বেলে দেয়। মাছি উড়িয়ে দিয়ে পারফিউম স্প্রে করে অনেকটা। কে বলেছে বাজে গন্ধ। এ ঘরে শুধু ধূপ, ধুনো। রোজকার মতো খাটের পাশে টেবিলে পাঁউরুটি দুধ।

আর্য তানপুরায় টান দেয়। তারছেঁড়া তানপুরা খুঁজে বেড়ায় ভৈরবের কোমল স্বর। আজ সারাদিন স্বরসাধনা। শুধু টিনার জন্য।                  

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*