বস্তারে মাইনিং — দুই

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

(প্রথম পর্বের পর)

রাওঘাট মাইনের জন্য আইন ও সংবিধানকে যে’ভাবে তছনছ করছে সরকার

সংবিধানে যে সকল এলাকা পঞ্চম তফসিলভুক্ত — মানে যে সমস্ত জায়গার জনসংখ্যার গরিষ্ঠাংশ বাসিন্দা আদিবাসী, সেই সকল এলাকায় পঞ্চায়েতি রাজ জারি করা হয়েছে ১৯৯৬ সালে প্রণীত পঞ্চায়েত এক্সটেনশান টু শ্যেড্যুল্ড এরিয়াস (পেসা) অ্যাক্ট মাধ্যমে। উক্ত কেন্দ্রীয় আইন, ২০০৬ সালের দ্য শ্যেড্যুল্ড ট্রাইবস অ্যাণ্ড আদার ট্রেডিশনাল ফরেস্ট ডোয়েলার্স রেকগনিশান অব ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (এফ-আর-এ) এবং রাজ্য ছত্তিশগড়ে প্রযোজ্য ছত্তিশগড় পঞ্চায়েতি রাজ অধিনিয়ম ১৯৯৩ অনুসারে কোনও আরণ্যক গ্রামের মানুষের ব্যাবহারযোগ্য ব্যক্তিগত জমি মানে ভিটেমাটি, খেতি-আবাদি এবং গ্রামের নিস্তারী, মানে সেখানকার দেবদেবীদের থান, উৎসবের জায়গা, শ্মশান, গোচারণভূমি — সমস্ত কিছু যদি ‘বিকাশ’-এর ধ্বজিত উদ্দেশে হাপিস করতে হয়, তাহলে প্রভাবিত সমস্ত গ্রামের গ্রামসভার মাধ্যমে রেসল্যুশান পাশ করতে হবে, গ্রামবাসীদের গরিষ্ঠাংশের সম্মতি প্রয়োজন। এছাড়াও, উক্ত এফ-আর-এ আইন অনুসারে আরণ্যক গ্রামের গ্রামবাসীরদের নানাবিধ অধিকারজ্ঞাপক পাট্টা দেওয়া হয় — যেমন বসবাসের অধিকার, খেতি-আবাদির অধিকার, খাদ্য হিসেবে আহৃত ফল-মূল-ব্যাঙের ছাতা, পানীয় হিসেবে আহৃত মহুয়া, সালফি প্রভৃতি, জীবিকার উদ্দ্যেশ্যে আহৃত তেন্দু পাতা, গালা, ধুপ বানানোর রেসিন-সমূহের অধিকার, পরম্পরা-নির্দিষ্ট স্থানে পুজো, উৎসব অন্ত্যেষ্টাদি সকল রিচুয়াল-উদযাপনের অধিকার, অরণ্য ও জীববৈচিত্র বাঁচিয়ে রাখার অধিকার ইত্যাদি। এই পাট্টার আবেদনও করা হয় উক্ত গ্রামসভা মারফৎ। আবেদনগুলি যৌথ অরণ্যাধিকার সমিতি মারফৎ তেহসিল বা ব্লক স্তরে সাবডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যায়, এবং তারপর যুক্ত বন-প্রবন্ধন সমিতি বা জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি (জে-এফ-এম-সি)-র কাছে, যেটির তত্ত্বাবধানে থাকেন সংশ্লিষ্ট জেলার কলেক্টর, গ্রামবাসীদের তরফ থেকে সরপঞ্চ অথবা সচিব, প্রমুখ। এই আইনগুলি ছাড়াও, আরও বহু রাজ্যের মতো ছত্তিশগড় ভূ-রাজস্ব সংহিতার ধারা ১৭০খ মাধ্যমে আইন করা হয়েছে যাতে কোনও আদিবাসীর জমি কালেক্টরের লিখিত সম্মতি ব্যাতিরেকে অনাদিবাসীর হাতে না চলে যায়। আবার নিয়মগিরি-কেসে সুপ্রিম কোর্ট জাজমেন্ট দিয়েছে যে আদিবাসীদের কাছে পবিত্র ও পূজ্য পাহাড়-জঙ্গল এলাকায় মাইনিং করা যাবে না।

এর থেকে স্পষ্ট যে শুধু পুলিশ-মিলিটারির মতো আল্ট্রা-মেগা-হেভিওয়েট ব্যাপারস্যাপারগুলিই নয়, এই রুল অফ ল্য অ্যাণ্ড দ্য কনস্টিটিউশন ভেঙে ফেলায় কমপ্লিসিট রয়েছে বিভিন্ন জেলার কালেক্টর, বিভিন্ন সদরের সাব-ডিভিশনাল অফিসা‌র, বিভিন্ন জনপদ পঞ্চায়েতের সি-ই-ও সহ স্বদেশি বিউরোক্র্যাসিও, এবং ছলে বলে কৌশলে বাধ্য করা হয়ে চলেছে বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের সরপঞ্চ এবং সচিবদেরও। ইতিমধ্যে একটি দূরাভাষ-কথোপকথন মারফৎ বস্তার জেলার কালেক্টর অমিত কাটারিয়া কাঁকেরের লব্ধপ্রতিষ্ঠ জার্নালিস্ট কমল শুক্লাকে ‘দো কৌড়ি কা ইনসান’ হিসেবে অভিহিত করে তাঁকে ‘কিড়া-মাকোড়া জ্যায়সা মসল’ দেওয়ার সদিচ্ছা প্রকাশও করে ফেললেন কিছুদিন আগেই। আরও নানান চব্য চারিদিকে।

গত ৭ই এপ্রিল ২০১৬-তে, গ্রামসভা ও ভুয়ো পাট্টাজনিত বিষয় খতিয়ে দেখতে কিছু বন্ধুর সাথে অধম উপস্থিত হয়েছিল কুরসেল, গোণ্ডবিনাপাল, ভৈঁসগাঁও ও কুমহারীতে। গ্রামবাসীরা পরিস্থিতিতে বেজায় খাপ্পা। প্রতিরোধে চোয়াল শক্ত। কিন্তু প্রতিরোধ করবার সমস্ত গণতান্ত্রিক পন্থাগুলি বন্ধ হয়ে এসেছে। প্রায় কয়েক কিলোমিটার যেতে না যেতেই একটা করে ফৌজি ক্যাম্প চোখে পড়ে। রাস্তা জুড়ে সার বেঁধে টহল দিতে থাকে এল-এম-জি, এক-৪৭ হাতে আধাসামরিক বাহিনী। বস্তার সম্ভাগ জুড়ে ফৌজায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা চাক্ষুষ না করলে সত্যিই অনুধাবনের বিন্দুমাত্র উপায় নেই। এসব খবরে ছাপে না। রাওঘাটে মাইন হলে শেষ হয়ে যাবে এইরকম একটা গ্রাম ভৈঁসগাঁও। সেইখানে পঞ্চায়েতের সচিব প্রশাসনের অনবরত চাপে তাঁর মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। এই রকমের ২০টা গ্রাম মিলে সেই ২০১৪ সালেই ২০০৭ সালে প্রণীত অরণ্যের অধিকার আইনের ফর্ম খ এবং গ অনুসারে যথাক্রমে কৌম-মালিকানাধীন ভূমির এবং বনজ-সম্পদের-ব্যাবহারিক অধিকার (কমিউনিটি রাইটস এবং ইউসুফ্রাক্টরী রাইটস) দাবি করেছিলেন — তাঁদের দাবি গ্রামসভা রেজল্যুশান মাধ্যমে স-কোরাম গ্রামস্তরের ফরেস্ট রাইটস কমিটি মারফৎ প্রণীত হয়েছিল নির্দিষ্ট উপরমহল তথা সরকারি মহলে তথা সাব-ডিভিশনাল অফিসারের কাছে। তারপর বহুদিন কোনও সাড়াশব্দ নেই।

ইতিমধ্যে নাছোড়বান্দা গ্রামবাসীরা চিঠি লিখেই চলল — তাঁকে, কালেক্টরকে, এমনকি রাজ্যপাল, কেন্দ্রীয় আদিবাসী মন্ত্রক এবং কেন্দ্রীয় পরিবেষ মন্ত্রকেও! ব্যাপারটা তুঙ্গে উঠলে, মানে, এ’বিষয়ে পরিবেশমন্ত্রক ছঃগঃ সরকারকে চিঠি দিলে, উক্ত মহোদয়ীর স্বয়ং এবং ভানুপ্রতাপপুর তহসিলের তহসিলদার মারফৎ একাধিকবার একাধিক অ্যাপ্লিকেশানের জবাব অথবা ‘অফিসিয়াল অর্ডার’ মাধ্যমে এবং সাক্ষাতেও গ্রামবাসীদের জানানোর চেষ্টা করতে থাকলেন যে তাঁদের করা অধিকারের দাবিগুলো আইনি প্রকরণের চোখে সিদ্ধ নয়। সরপঞ্চ ও সচিবদের চাপ দিতে থাকলেন পুরনো আবেদনগুলো রেজল্যুশন-মারফৎ খারিজ করে নতুন করে আবেদন করতে। এ’বিষয়ে তাঁর এবং কালেক্টরের দৃঢ় অভিমত যে আলোচ্য আইনলব্ধ প্রতিটা অধিকারের জন্য আলাদা আলাদা করে আবেদন দিতে হয় এবং সামুহিকভাবেও কোনও গ্রামের গ্রামসভা ১ হেক্টরের বেশি জায়গা পেতে পারে না, গ্রামস্তরের অরণ্যের অধিকার সমিতির সদস্য গ্রামবাসীদের না হলেও চলে যদিও গ্রামের সরপঞ্চ, সচিব, বনদপ্তরের ফরেস্ট রেঞ্জার, রেভিন্যু দপ্তরের রেভিন্যু অফিসার ও পাটওয়ারি, এস-ডি-এম এবং কালেক্টরকে হতেই হয়, এবং সেই সমিতি গ্রামস্তরে না হলেও চলে এবং তার নাম নাকি অরণ্য অধিকার আইন অনুসারে ফরেস্ট রাইটস কমিটি না হয়ে পুরনো অরণ্য সংরক্ষণ আইন অনুসারে বন প্রবন্ধন সমিতি তথা ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি হওয়া উচিত, ইত্যবিধ। এই সকল অভিমত কোথা হইতে আসিয়াছে প্রশ্ন করলে রাষ্ট্র হয়তো এই পুরাতন স্বরে উত্তর করিবে — ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টের পকেট হইতে। আফটার অল, ২০১২ সালে দ্য হিন্দু প্রতিবেদনে প্রতিভ — সেই সময়ের মধ্যেই রাওঘাট অঞ্চলে ১২টি কেন্দ্রপুলিশ (সি-আর-পি-এফ, বি-এস-এফ, এস-এস-বি মিলিয়ে) ব্যাটেলিয়নের ক্যাম্প বানানোর জন্য ২৫০ কোটি টাকা খরচ করেছে ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট।

ইতিমধ্যে, সরকারি মহল থেকে সরপঞ্চ সচিবদের চাপ ও প্রলোভন মাধ্যমে বারবার চেষ্টা করা হয়েছে রাওঘাট মাইন কবলিত বিভিন্ন গ্রামে গ্রামসভার আয়োজন করে এই মর্মে রেজল্যুশন পাশ করাতে যে পুরাতন সামুহিক ও ব্যবহারিক অধিকারের আবেদনগুলি খারিজ হওয়ার দরুণ গ্রামবাসী আবার নতুন করে অবেদন করবে বা করছে। নতুন আবেদনের অভিপ্রায়ে না ভরা আবেদন ফর্মে সরপঞ্চ-সচিবদের সই বসিয়ে সেই ফর্মগুলি দেখিয়ে গ্রামে গ্রামে গ্রামসভা মারফৎ উক্ত মর্মে রেজল্যুশন পাশ করাতেও কসুর করা হয়নি।

এ’দিকে ২০১৬-র এপ্রিলে ডঃ আম্বেদকরের জন্মদিন উপলক্ষে মোদী সরকার দেশব্যাপী গ্রামসভার আয়োজন করে। কাঁকের জেলাতে রাওঘাট মাইন প্রভাবিত যে অন্তাগর সাবডিভিশান-ভুক্ত ভানুপ্রতাপ তহশিল-ভুক্ত অঞ্চল, সেইখানের গ্রামগুলিতেও হয়েছিল। যদিও এ’বিষয়ে অধমদৃষ্ট কোনও গ্রাম পঞ্চায়েতের আপিসঘরেই নোটিশের নজির মিলল না, যদিও আইন বলে যে গ্রামসভা আয়োজনের নির্দিষ্ট তারিখের সাত দিন আগে পঞ্চায়েতে নোটিশ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আইন এও বলে যে প্রতি গ্রামসভাতে সর্বসম্মতিক্রমে একজন করে অধ্যক্ষ নির্বাচিত হবে, যদিও এ’রকম কোনও নির্বাচন অধমদৃষ্ট একটিও সভায় হল না, যদিও একটিতে লোকাল এম-এল-এবাবু এসেছিলেন বলে তাঁর জন্য বানানো মঞ্চ থেকে বিনা-নির্বাচনেই ঘোষিত হল কোনও এক স্থানীয় মানুষের নাম অধ্যক্ষ হিসেবে।

আরও একটা কালান্তক ব্যাপার হচ্ছে, গ্রামসভার রেজিস্ট্রি তথা হাজিরা-খাতায় রেজল্যুশনের জায়গাগুলো ব্ল্যাঙ্ক থাকা অবস্থাতেই গ্রামবাসীদের সই নেওয়া হতে থাকল। এখন সেইসব ফাঁকা রেজল্যুশনের জায়গাগুলোতে ‘বাক্স না গরম না ছাগল’ লেখা হবে বোঝা যাচ্ছে না। অরণ্যের অধিকারের নতুন এবং গ্রামবাসীদের করা আবেদনগুলি নামঞ্জুর এবং কদ্যপি না করা আবেদনগুলি মঞ্জুর হয়ে গেলে, অবাক হওয়ার বিশেষ অবকাশ রাখা যায় না তাই।

উপরের প্যারাগ্রাফগুলোতে এত আইনি কচকচানি এল কারণ, রাওঘাটের পরিস্থিতির থেকে স্পষ্ট হচ্ছে কীভাবে এই সব আইনগুলি লঙ্ঘনের মাধ্যমে স্বীকৃত। একই পরিস্থিতি অন্যত্রও। জিন্দালের মাইনি অত্যাচারে একদা বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে পূর্ণ জেলা রায়গড় পরিণত হয়েছে ধূ-ধূ মরুভূমিতে, আবার সরগুজা জিলার হাঁসদেও জঙ্গল ও নদী চলে গিয়েছে আদানির কয়লাকলুষ কবলে।

মাইনিং কীভাবে প্রাকৃতের সর্বনাশ সাধন করে নমুনা রাওঘাট

এ’বার ফিরে আসা যাক মাইনিং-জনিত সর্বাঙ্গীন সর্বনাশের প্রসঙ্গে। গোণ্ড আদিবাসীদের মধ্যে একটি সম্প্রদায় হল নুরুটি। নুরুটি-গোঁড়েরা রাওঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যুগযুগান্ত ধরে থেকে এসেছে। তাঁদের বস্তারিয়া সংগঠন নুরুটি গোণ্ড মহাপঞ্চায়েত ২০১৫-র রাওরাজার মেলার সময় দাবিপত্র জারি করে — নুরুটি ও অন্যান্য গোণ্ড গোষ্ঠীর কাছে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে মহাগুরুত্বপূর্ণ রাজারাওয়ের মেলা এবং রাওঘাট পাহাড়ের মন্দির-থানগুলির ঐতিহ্য যেন মাইন মারফৎ নষ্ট না করে ফেলা হয়। দাবিপত্রে আঞ্চলিক পূজারী-মুখিয়াদের সই পড়েছে। ওড়িশাতে নিয়মগিরি পাহাড় বেদান্তের কবলে আসার সময়েও এইভাবেই মোচ্ছব-পার্বণ ঘিরে, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে একত্র হয়েছিল ডোঙ্গারিয়া-কোঁধ সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা। এই প্রতিরোধে এরা ভীষণ একা। একদিকে মাওবাদীরা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জিগির তুলে পরম্পরাগত গাইতা-মাঝি-মোড়লদের বিস্তীর্ণ পরগণায় পরগণায় ব্যাপ্ত যুগযুগান্তের স্বশাসন-পদ্ধতিতে ইতিহাসবিমুখতার কলুষ লেপেছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সমর্থনে আর-এস-এস-বাহিনী বস্তার সম্ভাগ সহ সমগ্র পঞ্চম তফসিলী বিস্তার জুড়ে গণেশ-হনুমান-সতী প্রভৃতি মন্দির তুলে আদিবাসীদের বুঝিয়েছে যে তারা আসলে হিন্দু, অন্যদিকে যিশুর নাম নিয়ে পাদ্রীরা অদিবাসীদের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে সভ্যতার আলোয় উত্থিত করতে করতে প্রবল আর্থ-সামাজিক চাপে গাছ-দেবতাদের কেটে ফেলতে হচ্ছে বলে বিবেকদংশনে ক্লিন্ন আদিবাসীদের মননে প্রলেপ লাগিয়েছে এই বলে যে অন্ধকার প্রকৃতিকে পরাস্ত করে সভ্যতার আলোয় আসাই প্রগতির পথে উত্তরণ (প্রকৃতি = অন্ধকার, পিছিয়ে থাকা; সভ্যতা = আলো, অগ্রগতি; এই ইকুয়েশনটার যথার্থতার বিষয়ে মনু-মুশা-ইশা-মহম্মদ-মার্ক্স-লেনিন-মাও সকলের অন্ধভক্তেরাই একমত); আবার অন্যদিকে ভারতরাষ্ট্রের আইনব্যবস্থায় কোনও জায়গা রাখা হয়নি আদিবাসীদের, আদমসুমারিতে ধার্য করা হয়েছে হিন্দু বা খ্রিশ্চান হিসেবে। তাই বস্তারের গেজেট সহ জনগণনা-বিষয়ক দস্তাবেজ দেখলে বোঝা যায় ইতিহাসে এক কুটিল মিথ্যা সরকারি তকমা পেয়েছে — যে বস্তার সম্ভাগের গরিষ্ঠাংশ মানুষই নাকি হিন্দু।

রাওঘাটের খনির কবলে পড়বে টোটীন-ডাংরা গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা চন্দ্রীবাহার নদী, জৈতপুরী গ্রাম ছুঁয়ে চলা তুমীরকশা ও ওটাএকেট্টা নদী, মেণ্ডকী নদী, ঝরণাগুণ্ডি ঝর্ণা এবং অসংখ্য তালাও ও কান্দর। রুক্ষ তাপে হয় শুকিয়ে যাবে, নয় স্বচ্ছতোয়া পরিণত হবে ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্ট-বাহী নর্দমায়। রায়গড় জেলা জুড়ে তাই তো হয়েছে। এই সব নদীতে স্থানীয় মানুষেরা মাছ, কাঁকড়া, সুতাই, গুগলি, ধোন্দী ধরে, স্নান করে, গরু-মোষেদের স্নান করায়, জল খাওয়ায়, আর জীববৈচিত্রে ভরপুর অরণ্যানীর পশুপাখিরাও বেঁচে আছে এই নদী-নালা-জলাশয়গুলির উপর নির্ভর করে। অরণ্য সরে গেলে, নদী লুঠ হলে, একে একে, দলে দলে, তারাও উন্নয়নপুজোরই ভোগে লাগবে।

জগদলপুর-নিবাসী মাখনলাল সোরির হিসেব অনুসারে, এই সমস্ত মাইনগুলির ৯৮%-এর মালিক বহিরাগত অনাদিবাসীরা। নানাবিধ অপব্যবহার মাধ্যমে ২০০৭ সালে প্রণীত ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (পোষাকি নামে — দ্য শ্যেড্যুল্ড ট্রাইবস অ্যাণ্ড আদার ট্রেডিশানাল ফরেস্ট ডোয়েলার্স রাইটস টু ফরেস্টস অ্যাক্ট, ২০০৭)-এর শিরদাঁড়া ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন এবং একের পর এক পিলে চমকানো নোটিফিকেশান বের করে এর কফিনের শেষ পেরেকগুলি মন দিয়ে ঠুকে চলেছে দিল্লির মসনদে আসীন মোদীবাহিনী। কাঁকেরে দেখা গেল, যতটুকু যা কৌমভূমের অধিকার পাট্টা দেওয়া হচ্ছে গ্রামগুলোকে, দেওয়া হচ্ছে ১৯৮০-র বনসংরক্ষণ আইন মারফৎ গঠিত ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি মারফৎ বনদপ্তরকে, অথচ ২০০৭-এর আইনটি স্পষ্টতই বলেছে এই সব অধিকার প্রাপ্য গ্রামসাভাগুলির। বেশিরভাগ আবেদন খারিজ করে দিচ্ছে সাব ডিভিশনাল অফিসার, এবং কালেক্টরের মাধ্যমে যে ডিস্ট্রিক্ট লেভেল কমিটি গঠিত হয়ে এই ২০০৭-এর আইনটির প্রয়োগোপযোগিতার তত্ত্বাবধান করার কথা, সেই কমিটি গত পাঁচ বছরে একবারও কোনও মিটিং বসানোর ফুরসৎ পায়নি। নারায়ণপুরের অবস্থা আরও তথৈবচ। এমনিতেও নারায়ণপুরের একটা বিরাট অংশ হল অবুজমাড় — যেখানে সিংহভাগ গ্রাম ভারত সরকারের শাসনাধীন নয়। যদিও এখন হুহু করে তৈরি হচ্ছে পাকা রাস্তা।

এই রাস্তার এক কোণা ধরে মাতলা জঙ্গল। রাওঘাটের খনি এসে গিলে নেবে এই জঙ্গলটাকে। আরও অনেক জঙ্গলকে আরও অনেক খনি এসে গিলে নেবে। তোড়জোড় চলছে। রাওঘাটে মূল মাইনিং যেইখান থেকে চালু হবে — তার আশপাশ দিয়েই দুটো গ্রাম ছিল — আঞ্জ্রেল আর পাল্লাকসা। দেশ ও ডেভেলপমেন্টের সেবায় নিযুক্ত ফৌজিরা এসে লুঠতরাজ খুনধর্ষণ সমেত ‘এরিয়া ডমিনেশন’-এর জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু করে গিয়েছে। খাঁ খাঁ গ্রাম। খালি খালি বাড়িঘর সারি সারি। হাওয়া দিলে শোঁ শোঁ শব্দ হয়, দরজার পাল্লা খোলে বন্ধ হয়। খাতায় কলমে, তথা ‘এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’-এ প্রতিভ — রাওঘাট মাইনের জন্য কোনও গ্রাম নাকি বিস্থাপিত হবে না। আসলে, আইনি পথে জমি অধিগ্রহণ ও গ্রামবাসীদের পুনর্বাসন দেওয়ার অনেক হ্যাপা। নকশাল দমনের জিগির তুলে ফৌজি সন্ত্রাসের মাধ্যমে গোটা গোটা গ্রাম ফাঁকা করে দিলে আর ‘রিলিফ অ্যাণ্ড রিহ্যাবিলিটেশন’ জনিত আইনি ঝামেলার মধ্যে যেতে হয় না রাষ্ট্রকে।

(এরপর আগামী সপ্তাহে)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*