গন্তব্য

নাহার তৃণা

 

বলা নেই কওয়া নেই, হুটহাট আকাশ ফুঁড়ে নেমে এল পেঁজা তুলোর মতো তুষার কণা। এত বড় মাপের স্নো ফ্লেক্ এর আগে দেখেনি নন্দিনী।

তাই একে ‘কণা’ বলাটা মনে হয় যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে না। যুতসই শব্দ হাতড়ে সময়মতো পাওয়া যায় না, ভাবনাটা ওর কপালে বিরক্তির রেখায় ফুটে উঠল। বিরক্তিটা রাগে পরিণত হতে সময় নিল না, যখন নন্দিনী টের পেল হাতে ধরে থাকা মগের চা জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে। মাত্র কিছুক্ষণ আগে ফুটন্ত চা মগে নিয়ে বসল, মুহূর্তেই জুড়িয়ে ঠান্ডা হয় কীভাবে! নীচের লিভিংরুম থেকে গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা সময় জানান দিয়ে ওর ভুলটার চোখে আঙুল না দিলে নন্দিনী এটা নিয়ে বেশ একটা গল্পই ফেঁদে বসত… নিমেষেই বিরক্তি উবে গিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। রঞ্জন ওর এই হাসিকে মোনালিসা হাসি বলে। চা নিয়ে বসেছে প্রায় দেড়ঘণ্টা হয়ে গেল। অথচ নন্দিনীর কাছে মনে হল এই কিছুক্ষণ হয়েছে। রঞ্জনের সাথে কথা বললেই ওর এই ঘোরলাগা ভাবটা আসে। সব যেন কেমন থমকে যায়। নন্দিনী নিজেও কি যায় না? এমন ঘোর জাগানিয়া কথা কীভাবে বলে রঞ্জন? সময়,পরিস্থিতি সব ভুলিয়ে দেয় ওর আধবোজা গলার ভরাট স্বর। আজ ভারী সুন্দর একটা কবিতা শুনিয়েছে রঞ্জন। যার আমেজে ডুবেছিল বলেই সময়ের বয়ে যাওয়াটা টের পায়নি নন্দিনী।

রঞ্জনের সাথে নন্দিনীর পরিচয় মেথোডিস্টের ডাঃ ইলরামের চেম্বারে ঢোকার মুখে। রঞ্জন ঢুকছিল, নন্দিনী বেরুচ্ছিল। সামনের সপ্তাহ থেকেই নন্দিনীর কেমোথেরাপি শুরুর কথায় মনটা কেমন করে উঠেছিল। এমনিতে নন্দিনী খুব শক্ত মনের মেয়ে। কিন্তু রোগটাই এমন, সব দৃঢ়তায় জল ঢেলে দেয়। নন্দিনী কিছু সময়ের জন্য ছুটে আসা আবেগের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল। ওর দীঘল চোখ জুড়ে জল জমতে দেখে ডাক্তার উঠে এসে হাত ধরে বলেছে, ‘ভেবো না, তোমার এমন চমৎকার চুলের কিচ্ছুটি হবে না… সব ঠিক থাকবে!’ যদিও দু’জনই জানে কথাটা কতটাই মিথ্যে! নন্দিনী চাইছিল যত দ্রুত সম্ভব ওখান থেকে পালাতে। ওর এখন খানিকটা একা থাকা দরকার। খানিকটা চোখের জল ফেলার জন্য, একটু একা হবার জন্য মরিয়া নন্দিনী দ্রুত ইলরামের কাছ থেকে পরবর্তী নির্দেশটুকু শুনে দরজা পেরিয়ে জুডির ডেস্কের দিকে যাচ্ছিল সামনের সপ্তাহের স্ক্যাজুলটা জেনে নেবার তাড়ায়। তখনই রঞ্জনের সাথে ছোটখাট একটা ধাক্কা। গোটা ফ্লোর কাঁপিয়ে রঞ্জন হেসে উঠেছিল। ‘আমাদের দু’জনেরই ভীষণ তাড়া, নয়?’ কী যেন ছিল মানুষটার দু’চোখের ভেতর… কিছু একটা প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছিল নন্দিনীর বুকে। সব ভুলে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল…

একটু আগেও কাঁদবার জন্য একটু একা হতে চাইছিল যে, সেই মেয়ে, সেদিন পাক্কা পয়তাল্লিশ মিনিট বসেছিল। ডাক্তারের রুম থেকে রঞ্জন কখন বের হবে তার প্রতীক্ষায়। সেই পরিচয় আজ প্রায় দেড় মাসে গড়িয়েছে। ওদের হাতে তেমন একটা সময় নেই। গণ্ডিতে বেঁধে গেছে দু’জনেরই জীবনের ঘড়িঘণ্টা। কিন্তু ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বড্ড অসময়ে চলে যাবার দুঃখবোধকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে পাওনা প্রতিটি দিন ভীষণভাবে বাঁচবে। প্রকৃতি তার এই দুই সন্তানকে নিয়ে যে রগড় করছে, তাতে ওরা হকচকিয়ে না গিয়ে বরং সেই রগড়ে সামিল হয়ে প্রকৃতিকেই বোকা বানিয়ে দেবে।

স্বল্পকালীন ছুটি কাটাতে গিয়ে সবাই যেভাবে কেবল আনন্দে ভাসতে চায়। নন্দিনী আর রঞ্জনও যেন সেরকম ছুটি কাটাতে এসেছে। ছুটি ফুরোলেই হাসিমুখে ফিরে যাবে নির্ধারিত গন্তব্যে। তাই যাবার আগে মন প্রাণ ভরে হাসি আনন্দ তুলে নিচ্ছে সঞ্চয়ের ঝাপিতে। মৃত্যুকে দু’হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনের এই ক্ষমতা প্রকৃতি সবাইকে না, গুটিকতক মানুষকে দান করে। রঞ্জন আর নন্দিনী সেই বিরল দু’জন মানুষ!

ঠোঁটের কোণে হাসিটা রেখেই নন্দিনী উঠে দাঁড়ায়। আজ সে শাওয়ার নেবে। নীচে মা এই সময় হয়ত রান্নার জোগাড়ে ব্যস্ত। তাঁকে আর আজ ডাকতে ইচ্ছে করল না। নিজেই প্রয়োজনীয় সব কিছু নিয়ে বাথরুমের দরজা আলতো করে ভিজিয়ে দিয়ে শাওয়ারের নীচে গিয়ে দাঁড়াল। কানের কাছে রঞ্জন গুনগুনিয়ে উঠল,

“এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া………”

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...