আষাঢ়-শ্রাবণ, ভাইবোন

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

 

উনিশ বছরের মেয়ে। গৃহবধূ বলতে বাধো-বাধো ঠেকে। বালিকাই তো! লক্ষণরেখার মতো শাসনের ইলেক্ট্রিক তার, ওকে ঘিরে। ইতিউতি এগোলেই কারেন্ট ফোঁস করে উঠবে। কিন্তু এখন তো ঐ তারের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ চলছে না আর। ছলোছল বইছে বৃষ্টিজল। অন্ধকার মাঠ, ওপারে মন্দ্রস্বরে কে যেন পড়ে যাচ্ছে ‘রূপসী বাংলা’। ঝড়জল ছাপিয়ে, যা, মেয়ের শরীরে ‘কদমফুল ফোটাচ্ছে’ বলতে পারলে ব্যাপারটা অনেক নান্দনিক হত, কিন্তু তা তো নয়, বস্তুত অর্গাজম বাজাচ্ছে। ছাড়া পাওয়া আষাঢ়ে বৃষ্টি। ওই কবিতা-বলা ছেলেটিকে ওর এখনই চাই।

পেয়েছিল। ভরা শ্রাবণে। মেয়েটি মস্ত গোল আর নীল ছাতা নিয়ে ফুচকা খাওয়ার নাম করে পথে নামল, প্লাস্টিকের চটি পায়ে। কাছে, পুঁতিবসানো পার্স, শুধু। ছেলেটি সোঁদা ঘাসপাতা পেরিয়ে ওর গন্ধ পেল। সে-ও রাস্তায় নামল। একটু দূরে, ভেড়ির পাশে ধানক্ষেত। আলপথে আলকেউটে এড়িয়ে ওরা উঠল এক খড়-ছাওয়া ঘরে। রূপকথার মতো, অথৈ জল তারপর ঘিরে থাকল ওদের, সারারাত।

একযুগ পেরিয়ে আবার ভারি বৃষ্টিতে মুখোমুখি সেই মেয়ে আর তার অন্য এক সঙ্গী। এবার তো বয়স বেড়েছে ঢের। আকাশ কিন্তু সেই আগের মতোই বৃষ্টি-উপুড়। তাহলে মন আর প্রাচীন হয় কী করে। তো, চালাও দ্বিচক্রযান, সমুদ্রপথগামী…। ওই অপার, অগাধ জলে, ঢেউ নিমন্ত্রণ পাঠাল আর বৃষ্টি নির্লজ্জের মতো অমনি ঝাঁপিয়ে এল। কাক-ভেজা আমরা চোখে জলের ফুলকি দেখতে দেখতে সমুদ্রে গেলাম৷ পিঠে বর্শাফলকের মতো বর্ষা বিঁধছিল। আর মেঘে-ঢাকা সিন্ধুপারে চাঁদ উঠল না যখন, শহরে ফিরলাম। কী দিল তোমাকে বৃষ্টি? ধুমজ্বর, টইটম্বুর টনসিলব্যথা, নব-নব। সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম স্ফূর্তি, বর্ষাকাল তো, তাই সমুদ্রের নিয়ম তুচ্ছ করে, সে আর ফিরল না।

এ-দুয়ের মধ্যে এসেছিল আরেক বৃষ্টিদিনের ঝমঝম। ইরেজার ঘষে ঘষে তাকে মুছে ফেলার কত না চেষ্টা! তবু আউটলাইন সমেত সে-ছবি রয়ে গেছে। একটু মোছা-মোছা, ঝাপসা। তবুও! গাড়ি থামল বর্ধমান স্টেশনে৷ মাঝরাত৷ অঝোর বৃষ্টির মধ্যে গার্ডসাহেব সব কামরায়, সশব্দ, বলে গেছেন, তুমুল বৃষ্টিতে লাইন খারাপ, আর যাবে না ট্রেন। ঘুমের ঘোরে, বৃষ্টির তোড়ে মিলেমিশে যাওয়া সে-ঘোষণা। আমি, প্রায়-ছোটটি। তাই ভয় না পেয়ে অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিলাম। হেঁটেছিলাম। প্রচুর হেঁটেছিলাম বৃষ্টিতে, রেললাইন ধরে-ধরে। কালভার্ট। ছোটখাটো সাঁকো। দু’লাইনের মাঝখানের মাটি সরে গিয়ে জল চোখে পড়ছে। একটুও ক্লান্ত হইনি। জিভ বের করে বৃষ্টি চেটে নিচ্ছিলাম সমানে। শুধু বৃষ্টি। কী ভীষণ বৃষ্টি। পুকুর-ডোবানো বৃষ্টি। ট্রামরাস্তা-ভাসানো বৃষ্টি। বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে ছিপনৌকো চলেছিল সেদিন। জন্মাষ্টমীর দিব্যি, এমনটাই ঘটেছিল। ফুলে ঢোল হয়ে গেছিল পা। আজ বৃষ্টিনেশাভরা স্বপ্ন মনে হয়।

আষাঢ়-শ্রাবণ দুই ভাইবোন মিলে অভিশাপ দিয়েছিল কি কোনও? তাই সে মেয়ের বিরহ রয়েই গেল। সে-বিরহে ধুলো উড়ল, রোদ্দুর পড়ল। আর বৃষ্টি? পরিপ্রেক্ষিত যেন।

বর্ষা মানে নির্জন। বিষাদ। নিঃসঙ্গ। কে বলে! আমি বলি, উদ্দাম উল্লাস। আছড়ে-পড়া যৌনতা। বলব না-ই বা কেন? ভেসে গেছিল কোলকাতা। রিক্সার পাদানির ওপরে উঠেছিল জল। মুহুর্মুহু বাজ পড়ছিল। হ্যাঁ গো, ওই ওইটেই যে আমার জন্মমুহূর্তের শঙখধ্বনি!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*