ধারাপাত

ঊর্মি দাস   

 

নিজের কাছে ফিরব বলে বেরিয়েছিলাম।

বাইরে পা দিয়েই দেখি আষাঢ়ে মেঘে ধূসর চাদর মুড়ি দিয়ে আছে চারদিক। ঝাপসা দুপুর। রাস্তার দুধারের গাছগুলো মাথা ঝুঁকিয়ে আছে। সারা গা তাদের ভিজে চুপচুপ। পথের ওপর এলোমেলো পড়ে কিছু ছেঁড়াখোড়া কৃষ্ণচূড়া। ওপরে তাকাই। আকাশ আটকে ঝোলা ঝোলা তারের জট। তার ওপর ইতিউতি কয়েকটা চুপ-কাক। জমাটবাধা ধোঁয়ার মতো মেঘ আধোঘুমে নিথর। আমার হাঁটার ইচ্ছে নিভে যায়। কী দেখব আর যা চেনা নয়! জানি তো, একটু এগিয়েই ব্লক ব্লক ডিজাইন করা ফুটপাথের একদিকটা ভেঙে গেছে। ওইখানে জমা জল, সাবধানে পা ফেলতে হবে। মোড় ঘুরে দোকানপাড়া। দুপুরে সবকটারই ঝাঁপ ফেলা। একমাত্র শেষের সবথেকে গরীব গরীব মুদি দোকানটা সারাদিন খোলা থাকে। ওখানে অনেকদিন ধরে কাজ করে যে প্রৌঢ় মানুষটি, তার নাম খিতিদা। ক্ষিতিমোহন হবে হয়ত পুরো নাম, জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হয়নি কোনওদিন। ওর নামই হয়ে গেছে খিতিদা। মালিকও ডাকে, খিতিদা– আটা পাঁচ…  খিতিদা কালোজিরে পঞ্চাশ… খিতিদা কোনওদিন কোনও উত্তর করে না। ক্লান্ত মুখ, ভাঙাচোরা, লালচে লালচে ক্লান্ত চোখ… সেই চোখ রাগে না, হাসে না, এমনকি বিরক্তও হয় না। আধময়লা, ফতুয়ার মতো ঢোলা টিশার্ট আর পাজামার মতো বড়সড় প্যান্ট পরনে খিতিদা নিঃশব্দে দোকানের পেছনঘরে যায় আর আসে। জানি, এখনই যদি যাই, খিতিদা কাউন্টারের পেছনে নিচু একটা টুল থেকে জেগে উঠবে… প্রশ্নহীন চোখে তাকাবে, তারপর আধো অন্ধকার ভাঁড়ারে ঢুকে ঠিক জিনিসটা নিয়ে আসবে, আলো না জ্বেলেই। কিছু অজানা নেই খিতিদার। ওর ওই ছোট্ট ভুবনে সবটুকু জানা, চেনা, আর কিচ্ছু বাকি নেই যেন… শুধু নিত্যকর্মটুকু আধোজেগে পালন।

আর একটু এগিয়েই বড় রাস্তা। কিন্তু এই মেঘঢাকা দুপুরে সেও নিভন্ত। গাড়িগুলো নীরবে যায় আসে। লোক নেই, তাই হর্ন বাজে না। পাবলিক বাস স্টপে দাঁড়ায়। কন্ডাকটার এক পা নামিয়ে একটু ঝুঁকে দেখে ক্লান্ত হাতে ঘণ্টি বাজিয়ে দেয়। বাস এগোয়।

আমি ফিরি বাড়িতে। বৃষ্টি চেপে আসছে আবার। তেতলায় উঠি আস্তে আস্তে। সিঁড়ি ভাঙতে হাঁটুতে একটু ব্যথা হয়  আজকাল। ফের এক্সারসাইজ শুরু করতে হবে। তালা খুলি। একা ঘরে ঢুকি। আলো জ্বালতে ইচ্ছে হয় না। আন্দাজেই বসার ঘরটা পার হয়ে শোবার ঘরে জানলার পাশে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসি। ঝেঁপে বৃষ্টি এল। ঝরঝর শব্দ হচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। একটু একটু ঝাপট লাগছে জলের। জানলাটা টেনে দেব! ঠান্ডা না লেগে যায়।

মাটিতে চোখ রেখে তীরের তীক্ষ্ণতায় বৃষ্টি পড়ছে। গরাদের মধ্যে আমাকে আটকে রেখে জলের প্লাবন বওয়াচ্ছে। এসময় যেন বেশি বেশি একা লাগে। কোথাও যেতে পারব না…. কেউ আসতে পারবে না…. টিভিটা ঝিরঝির করবে…. রাস্তা ভাসিয়ে জল জমবে…. তুমি একা, একা আর একাই থাকবে ঝমঝম করে বলতে থাকবে ঝরাজল।

আমার পা আড়ষ্ট হয়ে যায়…. ওই চেয়ারের গদিটুকুতেই জুড়ে যাই….  চোখ বন্ধ হয়ে আসে……

 

ক্লাসের জানলা জুড়ে উদ্দাম বৃষ্টি পড়ছে। মন টেঁকে আর এই নিভু নিভু আলোজ্বলা ম্যাড়মেড়ে ঘরে! ছাত্রছাত্রী সবাই উসখুস, খুসখুস। ভেতরে আর্তনাদ– স্যার, ও স্যার। কিন্তু পি.সি.র মধ্যে একটা নাছোড় ইয়ে আছে। আমাদের বিড়বিড়ানি টের পাচ্ছেন বলেই উনি ছুটি দেবেনই না। ওনাকে দেখলে আমার জীবনস্মৃতির সেই মাস্টারমশাইকে মনে পড়ে… সেই যে বৃষ্টির সন্ধ্যায় গলির দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল বালক রবি… শেষ পর্যন্ত বাঁক থেকে দেখা দেবেই সেই অমোঘ কালো ছাতা…. পি.সি.রও একটা কালো ছাতা আছে লম্বামতন।

পেছনের দরজা দিয়ে নিঃশব্দে কেটে পড়ল অম্লান আর সঞ্জয়। নির্ঘাত কফি হাউস।

ইসস, এদিকে বাইরে…. আকাশ হারানো আঁধার জড়ানো দিন/আজকেই যেন শ্রাবণ করেছে পণ/শোধ করে দেবে বৈশাখী সব ঋণ।

ধৈর্যের কান টেনে পেঁচিয়ে শেষ হল ক্লাস। একদৌড়ে বাইরে এসে দেখি মোটা মোটা রেলিংওয়ালা বারান্দা ভিজে একশা। বাদামগাছটা হাওয়ায় মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কী যেন বলছে।

কী বলছে! কী বলছে!

পোর্টিকোর সামনের রাস্তায় গেরুয়াজলে কাদা ছপছপ। দেখলেই মনে হয় চটি খুলে পা ভিজিয়ে হাঁটি। অকারণ বেকারণ খুশিতে গান গাইতে ইচ্ছে হয় গলা ছেড়ে…..

আমি কী গান গাব যে ভেবে না পাই/মেঘলা আকাশে উতলা বাতাস খুঁজে বেড়াই…..

শ্রবণা মাঠের ওপার থেকে ছুটে ছুটে এল। দুজনে ভিজে ভিজেই চলে এলাম গেটে। ফুলে ফুলে ভরা কদমগাছটা  রোমাঞ্চিত। পাশের শিউলিগাছটির চোখ নামানো। ভেজা হাওয়া গা জড়িয়ে শিরশিরিয়ে চলে গেল। কিছু হবে আজ। কিছু ঘটবে। কী ঘটবে?

শ্রাবণ, তুমি বাতাসে কার আভাস পেলে….

চোখ চঞ্চল। হাওয়ায় হাওয়ায় ফিসফিসানি।

আষাঢ় মেঘের আজ ঘটা/প্রাকৃতিক স্বভাবকাজল/বার্তা যেন বৃষ্টির জল….
বার্তা যেন….

ধরে আসছে বৃষ্টি। এখন ধীর লয়ে ফোঁটা ফোঁটা ধারা। প্রতিটি ফোঁটাই কিছু বলে।

বলে, কিছু বলব বলেই তো এসেছিলেম। বলে, অঙ্গে বাজাব বাঁশি। বলে, হৃদয়খানি যাবে এবার ভেসে, যার পায়নি দেখা তার উদ্দেশে….

বড়রাস্তা হাঁটুজলে ডুবুডুবু। দুপাশ জুড়ে বইয়ের দোকানিরা বই টই সব তাকে তুলে উদাস চোখ। স্কুল কলেজ ইউনিভারসিটির রঙিন রঙিন কাঁচা পাকা ছেলেমেয়েরা দলে দলে হো হো হাসিতে রাস্তায় নেমে পড়েছে।

…. আবার এসেছে আষাঢ়; জলস্রোতে ঘোলাটে হলুদ রঙ…. বন্যমহিষের আক্রোশে জগদ্দল মেঘ ঘন ঘন ডাকে।

কিন্তু তাতে কী! আটকে যাওয়া ট্রামের পাশ দিয়ে, প্লাবন তোলা বাসের ছিটোনো জলে ভিজে নেয়ে পুলকিত চিত্তে আমরা মিছিলের মতো পথ হাঁটি। খুশিতে না লেখা কবিতা এলোমেলো গুণগুণ করে ভেতরে।….

কবিতা লেখার চেয়ে কবিতা লিখব এই ভাবনা
আরও প্রিয় লাগে….. দূর নীলাকাশ থেকে আসে প্রিয়তম হাওয়া….. না লেখা কবিতাগুলি আমার সর্বাঙ্গ জড়িয়ে আদর করে, চলে যায়, ঘুরে ফিরে আসে…. না হয়ে ওঠার চেয়ে, আধোফোটা, ওরা
খুনসুটি খুব ভালোবাসে….

 

ঘুম ভাঙল। কিন্তু বুঝতেই পারছি না দিন না রাত। দিনই তো হবার কথা। তবে অন্ধকার কেন এত? ছোট্ট বোনটা ঠেলা দেয়। দিদি,ওঠ না! বিসটি পচ্ছে। বেরুবি না? একলাফে উঠে দেখি, চাদ্দিক আঁধার। সকাল। আলোও আছে। কিন্তু মেঘ মেঘ আলো। আলো আলো অন্ধকার। ভেজা ভেজা খড়খড়িওয়ালা জানলা আধাখোলা। সেখান থেকে একটু জলের ছাঁট, একটু আলো, একটু হাওয়া ঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে ঢুকছে। বাবা বাজার থেকে ইলিশ মাছ এনে মহা উৎসাহে দুপুরের খাবারের মেনু ঠিক করতে ব্যস্ত। মা গ্রামাফোনে রেকর্ড চাপিয়ে নিজেও পাগলা হাওয়া বাদল দিনে মাথা দুলিয়ে গাইছে, চায়ের কাপে চামচ আর মায়ের চুড়ি একইসঙ্গে বাজছে ঠুনঠুন।

ঘরে কেমন একটা ছুটি ছুটি গন্ধ।

দুই বোনকে টেনে নিয়ে দুধের কাপ ধরিয়ে দিদা হাসল– এলরানি ঘণ্টা, বেলরানি ফুল/চলে ঘণ্টা মধুপুর/মধুপুরের কাচারি/ডাল ভাত খিচুড়ি।

দিদা খুব ছড়া বলে। আর এখন যেমন আমরা বুঝেই গেলাম আজ খিচুড়ির দিন। আজ ইলিশ মাছ ভাজা।

এক ছুট্টে বারান্দায়। নিচে তাকিয়ে দেখি রাস্তা জলে জলে জলাক্কার। মাঝে মাঝে বাজও পড়ছে দমাদ্দম। গাছের পাতা স্রোতের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে চলেছে। দেখেই নৌকো বানাবার কথা মনে পড়ল। উল্টোদিকের বাড়ির বারান্দায় আমাদের মতোই ঝুঁকে আছে নীনা আর তাতা। তৎক্ষণাৎ চোখেচোখে কথা সারা। ঘরে এসে রাফ খাতার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে নৌকো বানাচ্ছি আর মাঝে মাঝেই ইস্কুলে শেখা গানের তালে পা নেচে উঠছে… কেয়াপাতার নৌকো গড়ে সাজিয়ে দেব ফুলে…. ফুল পাব কোথায়! ছেঁড়া মালা থেকে পুঁতি খুলে সাজানো হল নৌকো। নিচে নেমে সদর দরজা একটু খুলে হাত বাড়িয়ে নৌকো ভাসাচ্ছি… চোখ পড়ল আমাদের রোয়াকে বসা এক মেয়ের দিকে– আমার সমানই হবে, ছেঁড়াখোড়া জামা, ময়লা গাল, কেমন কেমন করে তাকিয়ে আমার দিকে। পাশে বড় দুজন, হয়ত বাবা মা। ওরাও ছেঁড়াখোড়া, ওরাও নোংরা, ভেজা। একটা পুঁটুলিতে আর একটা বাচ্চা। আরও পুঁটুলি কোলে। কী যেন বলল আমাদের…

মা বাবা নেমে এল। ওরা কাঁদছিল। বন্যা, গ্রাম, ত্রাণ এসব কথা বলছিল। ত্রাণ মানে কী!

মা ওদের নিয়ে এল নিচের ঢাকা বারান্দায়। পুরনো শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি আর আমার একটা টেপফ্রক দিল। পুরনো থালায় খিচুড়ি আর তরকারি।

আমরাও খেলাম, চুপচাপ।

বাড়িতে সবাই মনমরা। গান বন্ধ। দুই বোন ভাবছি কাকে বলে জলে ভাসা গ্রাম, কাকে বলে খাবার নেই…. ভাঙা বাড়ি…..। আর একটা শব্দ শিখলাম– নিঃস্ব। মানে জানি না!

বিকেলে লোডশেডিং।

মা দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। ভেজা ভেজা অন্ধকারে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ওদের দিতে যাব… দেখি সেই  মেয়েটার মুখে আলো পড়েছে…. সেই কেমন কেমন চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে…. গায়ে আমারই টেপজামা…..

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*