আমার যত বিত্ত প্রভু…

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

আকুলতা। চার অক্ষর। যার ভেতর পুরনো গন্ধ, ইতিহাস আর বেঁচে থাকা টিমটিম আলোর মতো জ্বলছে। কোথায় আকুলতা? কিসের জন্য আকুলতা? বলি…। নকুবাবুকে চেনেন? রাস্তার, পাড়ার সবাই কিন্তু চেনে। রাস্তা মানে উত্তর কলকাতা। তস্য গলি। ঝগড়া, ব্যস্ততা, হলদে বায়োস্কোপের শহরে দৈনন্দিনতা, আর তার মাঝে প্রাণ। হ্যাঁ, প্রাণ। সিঁড়ি দিয়ে উঠে পেরোতে হবে গভীর ব্যারিটোনের জর্জ বিশ্বাস, প্রেসার কুকারের সিটির এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তা। এককামরার ঘর। ‘নকুবাবুর মিউজিয়াম’। পুরনো ফিল্ম প্রোজেক্টর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন সূর্যঘড়ি, পুরনো ডাক্তারি মাইক্রোস্কোপ কিংবা নীলকর সাহেবদের পেপারওয়েট — নকুবাবুকে এসব রোজ নিয়ম করে ধুলো মোছার আগে অব্দি পেরোতে হয় ভোর সাড়ে চারটের ঘুম ভাঙা, জোড়া টুনটুনি পাখির সঙ্গে চা ভাগ করে খাওয়া, ব্যায়াম, কাপড় কাচা এবং এখনো শরীর কিংবা বেঁচে থাকা জিইয়ে রাখার জন্য এটা ওটা সেটা।

মিউজিয়াম। নকুবাবু, নকুবাবুরা এদের সন্তানস্নেহ দেন। ধুলো। সে তো না হয় নিয়ম করে সাফ করছেন এঁরা। এঁদের পর? আমরা যারা চল্লিশেই কাত জীবনযুদ্ধে, অবসাদে, তাঁদের ভেংচি কেটে নকুবাবু ৯৩ পেরিয়েছেন। একদিন কড়া নাড়বেই সে? তখন? তারপর? নকুবাবু আলো দিতে জানেন। সেই আলো জ্বালবে কারা? পুরনো কলকাতায় ছড়ানো ছেটানো এরকম আরও অনেক আলোর কারবারিরা ফিল্মের স্লো-মোশনে ঢুকে চোখ মোছেন। গলা কাঁপে। একা পড়ে থাকা গভর্নমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল মিউজিয়াম। এবং তার ওয়েলথ। আংটির মধ্যে দিয়ে গলে যাওয়া পুরনো বাংলার মসলিন শাড়ি। কালমেঘের শিশি। নীল সাদা ম্যাগনেশিয়া। পুরনো কলকাতার ফারমাসিউটিকাল ম্যাজিকেরা। পোর্ট ট্রাস্ট মিউজিয়ামে হাওড়া ব্রিজ তৈরির সময়ে ব্যবহৃত স্টিলের টেপ, উষ্ণতা বাড়লেও বিজ্ঞানের বইয়ের প্রায় ব্যতিক্রম হওয়া প্রায় একদমই দৈর্ঘ্য না বাড়ার বেনজির অ্যান্টিকতা। কোথায় থাকবে, কে নেবে এঁদের? রাজা রামমোহনের পৈতৃক ম্যানসন ঢেলে সাজালেও সরোবর আর পাশে কল্পিত সমুদ্রভ্রমণের কথা ভেবে সি-সিকনেস কাটানো রেনেসাঁ-ম্যানের ঐতিহাসিক দোলনা। এসব থাকল না। একটা সুতি গ্যালারি আছে যদিও। সেভাবে আসে না লোকে। কলকাতা পুলিশ মিউজিয়ামে তেরঙ্গা, কুচকাওয়াজ, লেফট রাইট, কিংবা অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগো ছাড়িয়ে অন্য ভারতবর্ষ। বীণা দাসের রাইফেল। ইন্সপেক্টর এন এন ঘোষের শরীর থেকে বেরনো বুলেট। ম্যাজিস্ট্রেটকে পাঠানো বইবোমা। এখনও শুঁকলে টাটকা বারুদের গন্ধ পাওয়া যাবে কি? নাকটা জ্বালা করবে কি? চোখের কোনা একটু হলেও জলীয় হতে শুরু করবে কি?

নকুবাবুর গল্প বলছিলাম। মজার কথা হল, সবই তো নকুবাবুর নিজে থেকে খুঁজে তৈরি করা ব্যক্তিগত সংগ্রহ নয়। অজস্র মানুষের দেওয়া। যে আকুলতার কথা বলা হল, নকুবাবু সেই আকুলতার এপিটোম। ১৯৪৮ থেকে ২০০০ অব্দি মোটরবাইকে করে দেশ ঘোরা নকুবাবু যাত্রা দলে পার্ট করেছেন। সেভাবে চাকরি নেই। ইচ্ছেটুকু আছে। ভালোবাসতে জানেন। যার জন্য কোনও ক্যাটালগ লাগে না। মেমরি ম্যাপ আছে। একটা ঘর আছে। মাথার ওপর ছাদ। কেউ ভালবেসে এখনও কিছু এটা ওটা দিয়ে যায়। এটা ওটা হলেও নকুবাবুরা জানেন তাদের ইতিহাস। ছুঁয়ে দেখেন সাল, তারিখ, উষ্ণতা। উষ্ণতা। আচার্য ভবনের চেয়ারগুলোর ওপরও। ৯৩ এপিসি রোডে জগদীশচন্দ্র বসুর ম্যানসনে এর কোনওটায় রবীন্দ্রনাথ বসে চা খেয়ে গেছেন। অবলা বসুর দস্তানা, মানি ব্যাগ, আচার্যর ক্রেস্কোগ্রাফ — আছে, সব আছে, তবু হপ্তায় দুদিন খুলতে হয় দুঘণ্টার জন্য। কেন? লোকবল নেই। কে দেখবে আগলাবে ইতিহাস? নিরাপত্তা কোথায়? ইন্ট্যাকের সাহায্যে রেস্টোরেশনটুকু হয়েছে, বাকিটুকু? কর্পোরেট সাহায্য নেই। বিজ্ঞাপনী স্বচ্ছ ভারতের সঙ্গে লড়তে লড়তে লাস্ট বেঞ্চের ছেলের মতো হাত তুলেও পড়া ধরতে এগিয়ে না আসা বেবাক চোখের ইতিহাস আর লেগ্যাসি। গুরুসদয় মিউজিয়ামের পুরনো কাঁথা, মনসামঙ্গল — কালো পর্দার মতো অল্প হাওয়ায় দুলছে। কেউ আসুক, কেউ তো আসুক। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের বাইশ হাজার সদস্যের খুব কমজন সাবর্ণ সংগ্রহশালা বাঁচাতে আগ্রহী। জাহাঙ্গীরের হীরের আংটি, সারদা মা’র অস্থিভস্ম, ১৮১২ সালের চরকা, ১৮৪০ সালের ২৪০ কিলো ধান রাখার পাত্র — এসব ধরে রাখতে গেলে অনেকটা ছেড়ে আসতে হয়। ত্যাগটুকু জরুরি যে। দেবর্ষি রায়চৌধুরী এবং টিকে থাকা ইতিহাসসচেতন উত্তরসূরিদের এসব ভোলবার জো নেই। পরিবার আছে। সংসারও। আর আছে একা লড়ার স্বপ্ন ও হারানোর দুঃস্বপ্নবোধ। স্মরণিকা ট্রাম মিউজিয়ামের ফাঁকা, জনবিরল মুহূর্তের পাশেই লোক টানার জন্য বাধ্য হয়ে চালানো ঝকঝকে জমজমাট এসি ক্যাফেটারিয়া। ১৯৮৮ সালে বর্ধমান থেকে আসা জালালউদ্দিন শেখের টালিগঞ্জের মেসজীবন, সেদিনের ৩৫ পয়সা থেকে এখনও প্রতিদিন ট্রামভ্রমণ করা মানুষটির চোখে একটু যেন ভিড় খোঁজার চেষ্টা মিউজিয়ামে। জালালউদ্দিন ভিড় পান না।

কী পান? জীবন। ভালোবাসা। সরকারি উদ্যোগ আসতে আসতে বছর ঘুরবে। নটেগাছটি মুড়োবার সময় আসবে। এসব জিনিস? কে দেখবে? নকুবাবু জানেন না। তিনি শুধু জানেন, তিনি আদৌ এদের দেখছেন না। এরাই তাকে দেখছে। ভালোবাসছে। ঝোলানো অ্যান্টিক লন্ঠন, ব্রিটিশ যুগের বাইনোকুলার তাকে ভালোবাসছে। তাঁর চোখ বোজার পর অন্য কেউ ভালোবাসবে। ভালোবাসা পাবে।

অল্প হেসে লুঙ্গি পরা কৃশকায় সাদা দাড়ির নোনাজেনেরিয়ান ‘যুবক’ সুশীলকুমার চট্টোপাধ্যায়রা জীবন খোঁজেন। সুশীলকুমার। পাড়ার লোকে নকুবাবু বলেই যাকে বেশি চেনে…          

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1907 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...