বেড়াল

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

 

 

লেখক   :        বেড়ালটা কোথায় গেল দেখেছ?

১        :        বেড়াল?

লেখক   :        হ্যাঁ, একটু আগেই ছিল। ওই তো ওই দরজা দিয়ে ঢুকেছে।

২        :        এই দেখেছ নাকি বেড়াল কোনও?

৩       :        কি রকমের?

৪        :        আরে এখানে বেড়াল কোথা থেকে আসবে?

লেখক   :        কেন?

২        :        না, এখানে তো বেড়াল দেখিনি আমরা কোনদিন!

লেখক   :        বাতাস দেখেছ?

২        :        হ্যাঁ। মানে না। এটা কোনও কথা হল?

লেখক   :        ওটাও কোনও কথা হল না। এই যে এত বাতাস তুমি দেখতে পাচ্ছ না বলে নেই? নেই-ই?

৩       :        বাতাস আর বেড়াল এক হল?

১        :        এরপর বলবে বাতাস আর বাতাসা এক। হা হা হা… [নানারকমের হাসির শব্দ]

লেখক   :        না, তা বলছি না। তা আমি বলতে পারি না। [খানিক রেগেই। যাতে এখানে অচেনা কেউ মন্তব্য না করে]– বাতাস, বাতাসা আর বেড়াল যে…। থাক। একটা বেড়াল, হলদে সাদা, চোখটা কটা ওই দরজাটা দিয়ে ঢুকেছিল। আমি দেখেছি ওকে ঢুকতে। তুমি, তুই, আপনি, আপনারা দেখেননি। কেন? না আমি কৈফিয়ৎ চাইছি না। আমি জানাতে চাইছি কেন দেখেননি। মানে হঠাৎ বুঝলাম কেন আমিই দেখলাম এবং আপনার দেখলেন না।… আসলে বেড়ালটাকে আমি দেখতে চেয়েছিলাম, আপনারা দেখতে চাননি। দেখার কথা বা ইচ্ছে মাথাতেও আসেনি। এবারে বলবেন শ্রডিঙ্গারের বেড়ালের উল্টো হল তো! হল এবং হল নাও। বেড়াল নিয়ে একটা লেখার ইচ্ছে ছিল আমার। আমি বলতে কী বেশ ভালইবাসি বেড়াল। সেই লেখার কথা, মানে লেখা– ওই যে ব্যাপারটা– কেমন, কী জানব বলে এখানে এসেছি। অথবা জানতে চাই না, এখানে আসতে ভাল লেগেছে তাই এসেছি। কিম্বা এও বলতে পারেন এসেছি নামকরাদের সঙ্গে সেলফি তুলতে। যা ইচ্ছে বলুন, তবু আমি এসেছি। কিন্তু আমি বেড়াল নিয়ে লিখব তাতে অন্যকে দেখতে হবে কেন বেড়াল? একি বাধ্যতা? আমি কি স্বৈরশাসক? নইলে এ দাবী কেন? যাক গে… …জটিল হয়ে যাচ্ছে? তা ঠিক না কিন্তু। বেড়ালটা সত্যিই ঢুকেছিল। আপনারা কেউ নজর দিলেন না বলে ও এখন এখানে নেই হয়ে আছে। আপনারা যদি নজর দিতেন তাহলে দেখতেন এখানে, এই তো, এখানে ও ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওই যে দেখুন ওর চালে একটা কেমন যেন রাজসিকতা আছে। আছে না? হুঁ হুঁ সাধে বলে বাঘের মাসি? ঘাড়টা ওই যে টানছে পেছনের পা দুটো টান করে। যেন এক্ষুণি একটা হাই তুলে দিয়ে সামনের থাবাটা তুলে তাতে তুড়িও মেরে দিতে পারে। হা হা হা হা হা। মারলেই ওকে সুকুমার রায় লিখে ফেলবেন। যদি না মারে। যদি ওই অবস্থায় খানিকটা ঘাড় কাৎ করে আপনার দিকে তাকায়, বা আমার দিকে, আমি বুঝে নেব একটা মাছের ইচ্ছে ওর মনে প্রাণে। হয়তো ও তখন মাছ না আমাকে বা আপনাকে মাপছে। মানে ও ঠিক কী চাইছে তা জানার তো কোনও যো নেই না। সে জন্যই আমি যা চাইব তাই ভাবাব। চাওয়াব। বলাব। করাব। ক্রীতদাস এবং ক্রীতদাসী। এবং সম্রাট। এবং ও একটি চরিত্র মাত্র তখন। এই সব এই হাতের তালুতে রেখে আমি লিখতে বসে যাব। আপনারা এই সান্ধ্য বা বৈকালিক জমায়েতে বসে একটি বেড়ালকে দেখে নেবেন। যাকে আপনি আদর করলে, ঘাড়ের কাছে হাত দিলে আরামে চোখ বুজে ফেলবে। আর যদি সেই তাকেই আপনি একটা ঘরে কোণার দিকে ঠেসে দেন, তার দরজা-জানলা সব বন্ধ। ওর আর বেরোনোর রাস্তা নেই। ও কী করবে জানেন? জানেন? [মুখটা হিংস্র] ও আপনার বা আমার এই টুঁটি লক্ষ করে একটা ঝাঁপ মারবে। মরণ ঝাঁপ। ওর নটা প্রাণ আছে লোক বলে। বলে না? বলুক গে। কিন্তু মৃত্যু তো একটাই, তাই না? মরলে কিন্তু মেরেই মরবে।

মজা লাগছে না? চরিত্র হিসেবে এবারে ওকে পছন্দ হচ্ছে? এমন চরিত্র নিয়ে তাকে দাস সাজিয়ে কারবার করবেন? না করবেন না। করতে পারবেন না। কেন না সেখানে ছিনিমিনি। কেন না সেখানে আসলে আপনার নিকেশ হয়ে যাবার সম্ভাবনা। আপনিও জানেন না টুঁটি ছিঁড়ে নেবে কী না! অথবা যদি করেন তাহলে আপনি একজন… মানে সেই একজন ভয়ঙ্কর মানুষ… বা লেখক যার কোনও রসিকতাবোধ নেই। যে কেবল একটা সৃষ্টির জন্য মরে যেতে পারে। মরে যেতে পারে কথাটাকে মনে মনে আওড়ে দেখুন আস্তে– খুব ধীরে– দেখবেন কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। মরে যেতে পারি বলে দেখুন, দেখবেন আরও অস্বস্তি বাড়ছে। লেখকের বাড়ে। কমে। অমন গোঁয়ার লেখকরা আসলে আত্মহত্যা করে। বাকীরা রসিক। তারা জীবনের রস জানে। তারা বলে যে বেড়ালটা ছিলই তো, কিন্তু আপনি দেখতে চাইলেন, তাই আলো পড়ল, আর তাই ও উবে গেল! চমৎকার? এবারে হাততালি। হাততালি দেবার সময় মনে রাখবেন যে আসলে ওই বেড়ালটিকে আপনি দেখতে চাইলে হবে না, পাবেন না দেখতে। আমাকে লাগবে। আমি মাধ্যম। আমি বেড়ালটিকে বানাব। যেমন বানাব যেভাবে বানাব সেভাবেই দেখাব। আমি লেখক। আমি রসিক। আমি বাঁচি।

এবং হা হা– এবং আমি মরি। একবার আমি ওকে রাণী ভিক্টোরিয়ার বেড়াল বানাই তো একবার রাজা বোনাপার্টের। একবার চারুর কোলে দিলে পরক্ষণেই তাকে তুলে দিই রমেনের সাইকেলের সামনের হ্যান্ডেলে, যাতে রমেন ওকে কোথাও এমন ছেড়ে দিয়ে আসতে পারে যেখান থেকে ও আর ফিরতে পারবে না। এই সব খেলা খেলতে খেলতে আমার নানা রঙের বিড়াল আপনার দেখা হয়ে যায়। আপনাদের দেখা হয়ে যায়। আমি আরেকটি বিড়াল নিয়ে আসি। সে বেড়াল আপনার/আপনাদের পছন্দ হল না। ব্যস। আমি পিছলোতে শুরু করি ভিকট্রি স্ট্যান্ড থেকে। আমি দেখতে পাই যে আরেকজন এনেছে ময়না। ‘ময়না বল তুমি কৃষ্ণ রাধে’। ময়না কথা বলে, ময়না কথা বলে না’র খেলাতে সে মেতেছে। আপনাদেরও খেলাচ্ছে। আপনারাও বেড়ালের একঘেয়েমি ছেড়ে এবারে ময়নাকে। তারপর আরেকজন উঠে আসে যে ময়না আর বেড়াল দুজনকেই নিয়ে খেলবে। একবার ময়নাকে উড়িয়ে দেবে, অন্যবার ছিঁড়িয়ে দেবে ময়নার টুঁটি। আপনারা হাততালি হাততালি হাততালি এবং আমি পিছিয়ে পিছিয়ে পিছিয়েই। আমার প্রেসার বাড়ে, সুগার বাড়ে, ঈর্ষা বাড়ে, ঘোর বাড়ে। আমি আরও পিছলে পিছিয়ে। আমার জেদ বাড়ে। আমি ঘাপটি মেরে থাকি। যেন এক জানলায় চড়ি। অথবা দূর থেকে নজর রাখি গেরস্তের মাছভাজাটি শেষ হলে কখন আনমনা হবে সে। হলেই আমি ঝাঁপ দিয়ে তার মাছভাজা নিয়ে দেব দৌড়। আমার বেড়ালপনা ওইখানে ওইভাবে বেড়ে ওঠে আমার ভিতর। ছিলাম রুমাল হলাম বিড়াল।

একে বলে স্লো পয়জনিং। জানি। আপনারাও জানেন। আমি মরি। লেখক মরে। লেখকেরা মরে। শতাব্দী, সহস্রাব্দ জুড়ে এই তো চলছে। এবং মৃত লেখকদের সুতোগুলো যাকে সাহিত্য বলেন, তাকে গুটিয়ে সুটিয়ে একেকটা উলের বল তৈরী হয়, যে বলগুলো নিয়ে আপনারা– আপনারা খেলতে থাকেন। বেড়াল যেমন পায়ে করে, মানে তার তো আবার হাত নেই– অতএব থাবায় করে খেলতে থাকে চোখে অসীম জিজ্ঞাসা নিয়ে– তেমন করেই লেখককে নিয়ে খেলতে খেলতে ঠেলতে ঠেলতে– পাঠক, আপনি বেড়াল হয়ে যান।

এসে একটা সহজ কথা বলেছিলাম। বেড়ালটা কোথায় গেল! কেউ দেখতেই পেলেন না তাই তো? পাবেন কী করে? আয়না ছাড়া কবেই বা আমরা আমাদের দেখেছি। এত এত বেড়ালদের বেড়াল দেখতে বলাটাও… [ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে বলতে বলতে]

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...