নকশাল আন্দোলন অথবা ৭০ দশকীয় নব্য বাঙালি ব্রাহ্মণ্যবাদ ও তাহার পর

শৈলেন সরকার

 

বছর পনেরো আগে কলকাতা শহরতলির সোদপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। দুপুর। সম্ভবত মে কি জুন৷ চড়া রোদ বাইরে৷ আঙুর বা কলা নিয়ে বসে থাকা জনাকয়েক হকার, বেঞ্চে বসে বা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকা কিছু মানুষজন। শেডের গা থেকে ঝুলে শব্দ করে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রিকের পাখা৷ এক ভদ্রমহিলা হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করলেন, — এখানে ভাত বা রুটির হোটেল আছে বাবা? ভদ্রমহিলার বয়স অন্তত ষাট। শীর্ণকায়। পোশাকে দৈন্যের ছাপ। এ বয়সের এক মহিলা এই দুপুরে ভাত-রুটির হোটেলের খোঁজ করায় অবাক লাগে খুব। কোনও মহিলা হকার বা ফুটপাতের দোকানি বলেও মনে হচ্ছে না। প্লাটফর্ম থেকে নিচে নামার সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখি৷ একটা একটা করে পা ফেলা, একটু সতর্ক ভঙ্গি — তাঁর দু’পাশে তখন দেওয়াল, দেওয়ালে সাঁটা রাজনৈতিক দলের পোস্টার। এক পোস্টারে বাঙালির খুব পরিচিত টুপি পরা মাও সে তুঙ-এর গোলগাল মুখ। হয়ত সতর্ক আর ধীর পদক্ষেপের জন্যই দেওয়ালের পোস্টারে চোখ পড়ে থাকবে তাঁর। এরপর সেই টুপিপরা গোলগাল মুখের সামনে তাঁর আচমকাই থেমে পড়া। আর কিছু কথা বলাও। তিন-চার হাত পেছনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট কানে আসে আমার, প্রায় স্বগোতক্তিই তো, যেন নিজের কাছেই নিজের অবাক হওয়া। সেই টুপি পরা গোলগাল মুখের দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, — আবার, আবার সেই লোক!

ব্রতী চ্যাটার্জী, পদবীতেই প্রকাশ, ব্রাহ্মণ। এবং সর্বগুণান্বিত। কারণ, “এখন বাড়িতে আছে ব্রতীর স্কুল ও কলেজের বই, খাতা, প্রাইজের বই, সোনার মেডেল, দার্জিলিঙে বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ছবি, দৌড়বার জুতো, খেলার কাপ।” এমনকি “গর্ব ভরে ছেলেদের সঙ্গে ড্রাম আর বিউগল বাজিয়ে স্বাধীনতা দিবসে রাস্তা দিয়ে মার্চ করা, ফুটবল জিতে কাপ এনেছিল কিন্তু পা ভেঙে এসেছিল।” এবং “বিনি বলল, তুমি আচ্ছা বোকা মা। আমি হলে ও যেমন ন্যাশনাল স্কলারশিপের টাকাগুলো পেত অমনি বাগিয়ে নিতাম।” অর্থাৎ ব্রতী ন্যাশনাল স্কলারও। কিন্তু ব্রতী মৃত। মৃত অর্থে নিহত। নিহত, কেননা ব্রতী “এই সমাজে, এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস হারিয়েছিল। ব্রতীর মনে হয়েছিল যে পথ ধরে সমাজ ও রাষ্ট্র চলেছে সে পথে মুক্তি আসবে না। অপরাধের মধ্যে ব্রতী শুধু শ্লোগান লেখেনি, শ্লোগানে বিশ্বাসও করেছিল।”

মনে রাখতে হবে, “ব্রতীর মুখাগ্নি পর্যন্ত দিব্যনাথ ও জ্যোতি করেননি।” প্রকাশ থাক, দিব্যনাথ ব্রতীর পিতা। এবং “ব্রতী ওর বাবাকে শত্রু ভাবে। ঠিক অর্থে বাবাকে নয়, বরং ব্রতীর কথায়, উনি যে সব বস্তু ও মূল্যে বিশ্বাস করেন, সেগুলোতেও অন্য বহুজনও বিশ্বাস করে৷ এই মূল্যবোধ যারা লালন করছে, সেই শ্রেণীটাই আমার শত্রু। উনি সেই শত্রুরই একজন।”

উদ্ধৃত অংশগুলি পাঠক জানেন, মহাশ্বেতা দেবীর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ থেকে নেওয়া৷ পাঠক জানেন, কেননা ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসের জানুয়ারি ২০০১ পর্যন্ত মুদ্রণ সংখ্যা চৌদ্দ। জানুয়ারি ২০০১-এর মধ্যেই চতুর্দশ মুদ্রণ হয়ে যাওয়া থেকে বাঙালি পাঠক অর্থাৎ শহুরে হিন্দু মধ্যবিত্তের কাছে এই উপন্যাসের জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না৷ অর্থাৎ বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত চেতনার বড় প্রিয় চরিত্র এই ব্রতী। মনে রাখতে হবে যত উঁচু মাপের উপন্যাসই হোক না ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’, শহুরে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তকে ঢোঁড়াই-এর লড়াই কিন্তু টানে না কখনও। তাকে টানে ‘পথের পাঁচালি’-র অপু। আর ব্রতীও অপুর মতোই ব্রাহ্মণ এবং সর্বগুণান্বিত৷ গত শতকের গোড়ায় ব্রতীর মতো হিন্দু মধ্যবিত্তরা এর আগে আরেকবার প্রাণ দিয়েছেন দেশের জন্য। হ্যাঁ, তাঁদের নিজেদের দেশের জন্য, যে দেশ একান্তভাবেই — হ্যাঁ, একান্তভাবেই উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ্যবাদীদের৷ ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, মাস্টারদা। কোনও মুসলিম বা নিম্নবর্গীয় মানুষ নেই সেখানে। নেই অবশ্য এখানেও। যদিও বা থাকেন তা শুধুই উচ্চবর্গীয় হিন্দুর ত্রাণলাভের আশায়। নিম্নবর্গীয় মানুষের ত্রাণ করতে গিয়েই প্রাণ হারায় ‘হাজার চুরাশির মা’-র নায়ক ব্রতী৷ ব্রতীর মা সুজাতাকে জড়িয়ে একই ঘটনার অপর এক নিহত যুবক সমুর মায়ের ডুকরে কান্না — তার ভাষা এবং বক্তব্য লক্ষ করার মতো। ব্রতীর মাকে সমুর মায়ের বলা কথা, “আপনার পোলায় ত দিদি! ডাইকা জীবনটা দিল। অ ত আইছিল সমুগো সাবধান করতে। তা হেয় জানছিল সমু তারা চাইরজন পাড়ায় আইয়া পড়ছে, বুঝি রাতটুকু কাটব না আগে। আইয়া যখন ব্রতী জিগাই সমু কোথা? আমি এট্ট কথা কইয়া চইলা যামু।” (ভাষা ব্যবহারে একেবারে নিম্নবর্গ আইডেন্টিটি, তিনি অশিক্ষিত, এবং তাঁদের ত্রাণকর্তা হিসেবে ব্রাহ্মণ ব্রতীর ভূমিকায় রীতিমত গদগদ।) বা, “তা পোলারা এক কোণে রইল। সমুর বাপেও জাগা, বিয়ান না আইতে অদের তুইলা দিব। ঐ কোণে আমার ছিরা মাদুরে শুইয়া অগো কত কথা, কত হাসি। দিদি ব্রতীর হাসিখান আমার চক্ষে ভাসে গো। সোনার কান্তি পোলা আপনার।” পাঠে নামহীন ও কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী কায়দায় পুত্রের পরিচয়ে পরিচিত (হ্যাঁ, বিপ্লবী পুত্র ব্রতীর মৃত্যুর এক বছর পর প্রায় বিপ্লবী চেতনায় পৌঁছে যাওয়া লরেটোতে পড়া হাজার চুরাশির মায়েরও কিন্তু পুত্রহারা সেই নিম্নবর্গীয় নারীর নাম জানার ইচ্ছে জাগেনি কোনও) সেই মহিলার ব্রতীর মায়ের তাদের ঘরে আসায় কৃতার্থ হওয়ার প্রকাশ লক্ষ্য করার মতো। সমু বা সমুর মায়ের জন্য নয়, ওই একই ঘটনায় নিহত লালটু, বিজিত আর পার্থর জন্যও নয়, ‘হাজার চুরাশির মা’ নামের উপন্যাস পাঠে চোখে জল আসে ব্রতী বা ওর লরেটো থেকে পাশ করা মায়ের জন্য। (প্রসঙ্গত দিল্লির সাফদর হাসমির কথা মনে পড়ে — উত্তর ভারতের এলিট মুসলিম শ্রেণির মানুষ, সাফদর হাসমির সঙ্গে একই ঘটনায় নিহত নিম্নবর্গীয় মানুষ এবং শ্রমিক ‘রামলাল’-এর নাম মনেই নেই কারও। অথচ ভারতের বৃহত্তম কমুনিস্ট সংগঠন সি পি এমের ব্যবস্থাপনায় নাট্যকার সফদার হাসমির জন্য হাজারো মিছিল, সমাবেশ, স্মৃতি সংগঠন, ডি.লিট। সাফদার হাসমির পাশে নিম্নবর্গীয় মানুষ হওয়ার জন্য শ্রমিক ‘রামলাল’ শুধুমাত্র ভুলে যাওয়া একটি নাম মাত্র। (হে রাম)।

ব্রতী নকশাল ছিল। এককালে বাঙালির গল্পে যেভাবে নিম্নবর্গীয় মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে সর্বত্যাগী, দেশের জন্য জীবনব্রত করা হিন্দু উচ্চবর্গীয় বাঙালির দেখা মিলত, ‘৭০-এর নকশাল আন্দোলনের নেতা ও কর্মীরা বলা যেতে পারে সেই ধারাবাহিকতার নতুন আর কয়েকটি ছবি মাত্র। সেই ব্রাহ্মণ, সেই উচ্চবর্গীয় হিন্দু, আর নেতৃত্বের সেই অভয়দান — আমার আশ্রয়ে এস, আমি ত্রাণ করব, আমি — একমাত্র আমিই –। এবার কিন্তু শুধু ভালো ছেলে বলা হল না, বলা হল প্রেসিডেন্সির একদম হিরের টুকরো ছেলে — আর শহরকেন্দ্রিক উচ্চবর্গীয় বাংলা সংস্কৃতিতে এদেরকে নিম্নবর্গীয় মানুষের ত্রাণকর্তা ও নায়ক বানিয়ে গল্প তৈরি হল অনেক — বলা যেতে পারে আধুনিক শহুরে রূপকথা। কিন্তু বৃদ্ধ কৃষ্ণ ভক্ত — চারু মজুমদারের আন্তঃপার্টি সংগ্রামের আটটি দলিল নিয়ে যিনি (ভারতবর্ষের জনগণের জন্য) হাঁটাপথে চিনে গেলেন, একটানা বাহাত্তর দিন হাঁটার পর চিনা গণমুক্তি ফৌজের হাতে ধরা পড়ে চিনা পার্টির দপ্তরে পৌঁছে তার কর্তব্য সারলেন — নকশাল আন্দোলনের গল্পে বা অতিকথনে কৃষ্ণ ভক্তের মতো মানুষেরা কোথায়? শুধু নকশাল আন্দোলন কেন, ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা কমুনিস্ট আন্দোলন নিয়ে প্রচারিত সবকটি অতিকথনেই থাকে এলিট শ্রেণির সেই সাফদার হাসমি, বা ব্রাহ্মণ সন্তান অপুর মতোই ব্রতী। ঢোঁড়াই রামলালের মতো কৃষ্ণ ভক্তের জায়গা নেই কোথাও৷

উত্তরবঙ্গের এক ভূমিহীন কৃষক পরিবারে ১৯৩৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন বাবুলাল বিশ্বকর্মকার। মাত্র ১৫ বছর বয়সে সুদখোর ও অত্যাচারি জোতদারদের বিরুদ্ধে আধিয়াদের এক প্রতিবাদী সমাবেশে অংশ নিয়ে আহত ও গ্রেপ্তার হন, ১৯৫৫-তে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির শাখা সংগঠন কৃষক সভার সর্বক্ষণের কর্মী, ১৯৬৫-তে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী, ১৯৪৯-‘৬০ সালে কৃষকসভার নেতৃত্বে জোতদারদের বেআইনি জমি দখলের লড়াইয়ের অগ্রগণ্য নেতা, ১৯৬৪-তে সি পি আই ছেড়ে সি পি আই (এম)। ১৯৬৭-তে খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া থানা এলাকায় জঙ্গি কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন ১৯৬৮-এর ১৮ সেপ্টেম্বর। এত বড় এক সংগ্রামীও কিন্তু জায়গা পান না ১৯৬৮-এর মে মাসে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া তৈরি হওয়া ভবিষ্যতের সি পি আই (এম-এল)-এর পূর্বসূরি কেন্দ্রীয় বা রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে। সেখানে সব রায়চৌধুরী, দাশগুপ্ত, ঘোষ, সেন, মিত্র। আর জঙ্গল সাঁওতাল? তিনিও নেই কোথাও, সেই ‘৭০ সালে ১৫-১৬ মে-তে সি পি আই (এম-এল)-এর পার্টি কংগ্রেসে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধি দলের একজন হওয়ার সুযোগ; এছাড়া ১৯৬৯-এর ২২ এপ্রিল জন্ম নেওয়া চারু মজুমদারের সি পি আই (এম-এল) পার্টির কেন্দ্রীয় বা রাজ্য কমিটি কোথাও জায়গা নেই তাঁর, বা তার মতো অন্য কোনও নিম্নবর্গীয় মানুষ, আদিবাসী নিম্নবর্গের হিন্দু, বা কোনও মুসলমানেরও। আর একেবারে গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদের সূচক হিসেবে অনুপস্থিত নারীও।

১৯ থেকে ২২ এপ্রিল ১৯৬৯-এ এ আই সি সি সি আর-এর বর্ধিত মিটিং-এ চারু মজুমদারের রাজনৈতিক প্রস্তাবে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল, সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাথে যুক্ত যে সব কমরেডরা সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছেন তাদের মধ্যে থেকে কমরেডদের নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় প্রস্তুত কমিটি গঠন করতে হবে। এই প্রস্তুত কমিটিতে বলাই বাহুল্য নিজেদের একজনকে নিম্নবর্গীয় মানুষদের ত্রাণকর্তা অবতার তৈরি হতে চাওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্রাহ্মণ্যবাদী গোষ্ঠীর পক্ষে জঙ্গল সাঁওতালকে আনা সম্ভব নয়। এলেন — মানে Co-opt হয়ে এলেন Presidency Consolidation-এর অসীম চ্যাটার্জী। অর্থাৎ নিম্নবর্গীয় মানুষের ত্রাতা হিসেবে ব্রতী চ্যাটার্জীদের যাত্রা শুরু। আমাদের কবি অবশ্য আগেই লিখে গেছেন ‘ঐ মহামানব আসে –‘।

সময়টা ১৯৬৯ সালের ১মে, ‘দেশব্রতী’ লিখল, (৮ই মে, ১৯৬৯) — “শ্রেণি সংঘর্ষের তপ্ত আবহাওয়ায় ঐতিহাসিক সমাবেশ।” কলকাতার মনুমেন্ট ময়দানে কমরেড মাও সে তুঙ-এর বিরাট প্রতিকৃতির নিচে দাঁড়িয়ে কমরেড কানু সান্যাল যখন ভারতের বিপ্লবকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সে তুঙ-এর চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ ভারতের বিপ্লবকে সঠিক পথে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ভারতের কমুনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-র আবির্ভাবের কথা ঘোষণা করলেন তখন সুবিশাল জনসমাবেশের হাজার হাজার মানুষ বিপুল করতালি ও হর্ষধ্বনিতে ঐ ঘোষণাকে স্বাগত জানালেন। মুহূর্তের মধ্যে এই জনসমুদ্রে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার ঘোষণার একটা বিপ্লবী তরঙ্গ বয়ে গেল। এই হর্ষধ্বনির সাথে কণ্ঠ মেলালেন কমরেড কানু সান্যাল ও মঞ্চে উপস্থিত অন্যান্যরা। দেশব্রতী আরও লিখল — “কমরেড কানু সান্যাল রেডবুক হাতে বক্তৃতা করতে উঠলেন। কানু সান্যালের বক্তব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি অংশ ছিল — কমরেড চারু মজুমদারের নাম ও ভূমিকার উল্লেখ, সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটির নাম ও ভূমিকার উল্লেখ, পার্টি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা, মধ্যবিত্ত বিপ্লবীয়ানার ভিত্তিতে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন গ্রুপ ও বিপ্লব বিরোধী ঝোঁকের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত যুদ্ধ ঘোষণা এবং একবিংশ শতকের সূচনায় বিপ্লব বিজয়ী হবে বলে চীনা পার্টির ঘোষণা”।

(নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রামাণ্য তথ্য সংকলন : অমর ভট্টাচার্য)

‘দেশব্রতী’ নয় এবার শ্রীচৈতন্য পরম্পরায় দশম অধস্তন আচার্য-ভাগবত পরমহংস শ্রীল ভত্তিবিলাস তীর্থ মহারাজের অনুকম্পিত শ্রী অনিরুদ্ধ ব্রহ্মচারী, ভক্তিপ্রকাশ কর্তৃক সংকলিত ও প্রকাশিত, ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু’ পুস্তক দেখুন। বিষয় : শ্রীনিত্যানন্দের ব্যাসপূজা। “শ্রীনিমাইয়ের ইচ্ছা অনুসারে আষাঢ় পূর্ণিমায় বা গুরু পূর্ণিমায় (ভগবান ব্যাসদেবের আবির্ভাব তিথিতে) শ্রীশ্রীবাস ভবনে শ্রীশ্রীবাস পণ্ডিতের পৌরোহিত্যে ব্যাসপূজার আয়োজন হইল।…..। শ্রীশ্রীমহাপ্রভু তাঁহাকে শীঘ্র ব্যাসপূজা সম্পন্ন করিতে বলায় শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু অকস্মাৎ ভাবভরে শ্রীনিমাইকেই আদি গুরু শ্রীবাস জ্ঞানে পুষ্পমাল্য প্রদান করিলেন। সেই কালে শ্রীনিমাই-এর বদন মণ্ডলে এক অপূর্ব দ্যুতি দেখা খেলিয়া গেল। তিনি শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম-হল-মুষক-ধৃক ষড়ভূজা মূর্তিতে দর্শন দিলেন।”

১৯৬৯ ১ মে-র শহিদ মিনারকে ষোড়শ শতকে একেবারে প্রথম দিককার নবদ্বীপের শ্রীশ্রীবাস ভবনের স্থলে ভেবে আন্তর্জাতিক মে দিবসের জায়গায় ব্যাসদেবের জন্মতিথি ধরলে শ্রীনিত্যানন্দ বা শ্রীনিমাইকে খুঁজে পাওয়া এমন কিছু কষ্টকর নয়। শ্রীনিমাইকে প্রোজেক্ট করার ক্ষেত্রে শ্রীনিত্যানন্দ ছাড়াও ছিলেন শ্রীবাস, অদ্বৈতাচার্য। আধুনিক শ্রীবাস বা অদ্বৈতাচার্যের খোঁজে ফের আসা যাক ১৯৭০-এ। ১৫-১৬ মে, ১৯৭০….এর সন্ধ্যাবেলা শুরু হল সি পি আই (এম-এল)-এর পার্টি কংগ্রেস। “চারু মজুমদার খসড়া সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক রিপোর্ট পেশ করেন। এই বিষয়ের উপর বক্তৃতা পার্টি দলিল হিসাবে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অন্ধ্রের কিছু কমরেড প্রস্তাব দেন যে, চারু মজুমদারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা এই রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করার জন্য। সৌরেন বোস বলেন যে রিপোর্টে চারু মজুমদারের কর্তৃত্ব (Authority) হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্য কয়েকজন, যেমন শিবকুমার মিশ্র এর পক্ষে ছিলেন না। অসীম চ্যাটার্জী ঘোষণা করলেন যে, যদি সমস্ত কেন্দ্রীয় কমিটি একদিকে যায় এবং C.M. (চারু মজুমদার) অন্যদিকে যায়, তবে তিনি C.M.-কে অনুসরণ করবেন।”

(নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রামাণ্য তথ্য সংকলন : অমর ভট্টাচার্য)

আর ১৯৬৯-এর মে-এর সেই বিখ্যাত সমাবেশে কানু সান্যালের “মধ্যবিত্ত বিপ্লবীয়ানার ভিত্তিতে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন গ্রুপ ও বিপ্লব বিরোধী ঝোঁকের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত যুদ্ধ ঘোষণা”-কে মিলিয়ে দেখতে গেলে চৈতন্যচরিতামৃত খুলুন, “বেদ না মানিয়া বৌদ্ধ হয়ত নাস্তিক। বেদাশ্রয় নাস্তিক্যবাদ বৌদ্ধকে অধিক।” (৬/১৬৮) তখনকার ব্রাহ্মণ্যবাদী উঠতি মধ্যবিত্তদের হয়ে উঠতে থাকা নেতা প্রগতিশীল(?) চৈতন্যদেবের প্রতিক্রিয়াশীল(?) বৌদ্ধদের প্রতি ধিক্কার একেবারে লক্ষ করার মতো। কিন্তু কে সেই ব্রতী চ্যাটার্জীদের মনোজগতের ব্যাসদেব? তাদের মনোজগতের বিপ্লব রচনার মহাভারত কার মস্তিষ্কপ্রসূত? হ্যাঁ, সেই মাও সে তুঙ। পোস্টারে যার গোলগাল মুখ দেখে সত্তরের দশকের তিন দশক পর প্রবীণ এক নিম্নবর্গীয় নারীকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়, বলতে হয় আবার, — আবার সেই মুখ!

অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনের ‘জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি’ বই-এর ‘খাদ্যের লড়াই : অন্ন সংস্থানের সংঘাত’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “একথা পরিষ্কার যে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চীনদেশে ব্যাপক মাত্রায় দুর্ভিক্ষ ঘটে গেছিল, তথাকথিত Great Leap Forward-এর বিফলতার পর। তার ফলে যে পরিমাণ মৃত্যু হয় তার একটা মূল্যায়ন করা সম্ভব অন্যান্য দেশের ব্যাপক দুর্ভিক্ষগুলির সঙ্গে তুলনা করে। এই শতাব্দীতে ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষ ১৯৪৩-এর বাংলার মন্বন্তর৷ সরকারি হিসেবে প্রাণহানি ঘটেছিল ১৫ লক্ষ যা প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু যা হয়েছিল তার থেকে কম। সম্ভবত মারা যায় ৩০ লক্ষ মানুষ৷ চীন থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত সমজাতের তথ্যের মধ্যে মৃত্যুসংক্রান্ত যে সংখ্যা পাই তা খুবই বড়। Ansley Coale হিসাব করেছেন মৃত্যু হয়েছিল ১ কোটি ৩৫ লক্ষর। John Aird-এর মতে বিভিন্ন তথ্য আরও অনেক বেশি মৃত্যুহারের ইঙ্গিত দেয়, (প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষের মত)।” অর্থাৎ যে লোকের নেতৃত্ব বিশ্বইতিহাসের ভয়ঙ্করতম দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী, মানবসভ্যতার ভয়াবহতম বিপর্যয় ঘটানোর জন্য যার স্বদেশ শুধু নয় বিশ্ববিবেকের কাছে জানু পেতে শাস্তি প্রার্থনা করার কথা, সেই লোক তার মতবাদ প্রচারের মধ্য দিয়ে ভারতে ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ শুনতে পাচ্ছেন। পাওয়ার-ই কথা। একই প্রবন্ধে অমর্ত্য সেন লিখেছেন, “আশ্চর্যের কথা চীনের সেই দুর্ভিক্ষ এবং মৃত্যুর সংবাদ সরকার বহুদিন স্বীকার করেননি। ঘটনার প্রায় ২০ বছর পরে সম্প্রতি (প্রবন্ধের রচনাকাল) বিপর্যয়ের গুরুত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।……। দুর্ভিক্ষে মৃত্যু এর চেয়ে কম হলেও ভারতবর্ষের সংবাদপত্রগুলিতে ঝড় উঠত, সংসদ তুমুল বিক্ষোভে আন্দোলিত হত, শাসক পার্টি খুব সম্ভব পদত্যাগ করতে বাধ্য হতেন।……। চূড়ান্ত বিচারে দুর্ভিক্ষ এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রশ্নটিও জড়িত। ৩০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাও একই শিক্ষা দেয়৷ সাম্প্রতিককালে কাম্পুচিয়ার প্রচন্ড দুর্ভিক্ষও ওই বিচার সমর্থন করে।” আর ব্রতী চ্যার্টার্জীদের অবতার মাও সে তুঙ-এর বিপ্লবী তত্ত্ব? কী সেই আধুনিক ব্যাসদেব লিখিত বিপ্লবরসামৃত? হাজার চুরাশি নম্বর হওয়া ব্রতী চ্যাটার্জীদের একজন শহুরে নতুন ভদ্রলোক শ্রেণির বাঙালি ব্রাহ্মণ প্রেসিডেন্সি খ্যাত অসীম চ্যাটার্জীর প্রয়োগ : “পরবর্তীতে সি পি আই (এম-এল) কেন্দ্রীয় কমিটি ও চারু মজুমদারের সঙ্গে মতপার্থক্যের সময়ে B. B. O. B. R. C-র সম্পাদক অসীম চ্যাটার্জী তার দলিলে বলেছিলেন, ১২০টা খতম করেও তিনি সংগ্রাম টিকিয়ে রাখতে পারেননি। যদিও পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, শুলিপদা, চাকুলিয়া, বহরগোড়া অঞ্চলকে ধরে বিস্তৃত B. B. O. B. R. C. এলাকা থেকে মোট ৮০ জনের বেশি শত্রু খতম হয়নি।”

(নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রামাণ্য তথ্য সংকলন : অমর ভট্টাচার্য)

হ্যাঁ, ইনিই সেই ২২ এপ্রিল ১৯৬৯-এর জন্ম নেওয়া সি পি আই (এম-এল)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটিতে Co-opted হওয়া সত্তর দশক নিয়ে প্রচারিত অতিকথনগুলির জনপ্রিয়তম নায়ক এবং Presidency Consolidation-এর বিখ্যাত অসীম চ্যাটার্জী।

এক সি. এ ফার্মের মালিক বাবা এবং লরেটো পড়া মায়ের একেবারে ন্যাশনাল স্কলার হয়ে খেলাধুলাতেও ফার্স্ট এবং সর্বগুণান্বিত ব্রাহ্মণ সন্তাননিম্নবর্গীয় মানুষজনকে চৈতন্যদেব বা রামকৃষ্ণদেবের মতো ত্রাণ করবে বলে স্লোগান লিখেছিল, “বন্দুকের নল থেকেই……., এই দশক মুক্তির দশকে পরিণত হতে চলেছে……ঘৃণা করুন! চিহ্নিত করুন! চূর্ণ করুন মধ্যপন্থাকে!…..আজ ইয়েনানে পরিণত হতে চলেছে।”

(হাজার চুরাশির মা : মহাশ্বেতা দেবী)

হাজার দেড়েক বছর আগে উত্তর ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়েই বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতির পিছু হটা শুরু। পিছু হটা অর্থে হেরে যাওয়া। শশাঙ্ক থেকে অন্তত সেন আমল পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস কার্যত জয়ী উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির বাংলা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল দখলে রাখার জন্য ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্গীয় কায়স্থদের নিজেদের মধ্যেকার অন্তর্দ্বন্দ্বের ইতিহাস৷ এরপর ইসলাম এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীদের রাজনৈতিক ক্ষমতার সিংহাসন চ্যুতি। বা বহিরাগত ইসলাম সংস্কৃতির হাতে অভিবাসিত ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির সাময়িক পিছু হঠা৷ আমরা দেখব ইসলামের হাতে রাজনৈতিক পরাজয়ের পর সামাজিক প্রাধান্য রক্ষার চেষ্টায় বাংলায় এই অভিবাসিত ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্রেণির কৌশলগত পরিবর্তনও। আসবে বৈষ্ণব আন্দোলন, চৈতন্যদেব। বৈষ্ণব কবিদেব রচনায় চৈতন্যদেবের জয়গান গাওয়াটাই ছিল মূল বিষয়। ত্রাণকর্তা চৈতন্যদেব এবং ব্রাহ্মণ বা বড়জোর কুলীন কায়স্থ সমাজ। ঈশ্বরকে সরাসরি প্রার্থনা জানাবার অধিকার রইল ব্রাহ্মণদেরই হাতে, কীর্তনের সময়টুকু শুধু নিম্নবর্গীয় মানুষকে কাছে ঘেঁষে দাঁড়াবার অধিকার দেওয়া হল৷ বলা যায়, তৃতীয় চতুর্থ শতকে উত্তর ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের বাংলায় সামন্ততন্ত্রের প্রতিষ্ঠার অন্তত বারোশো বৎসর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকা সত্ত্বেও তথাকথিত এই বৈষ্ণব আন্দোলনের মাধ্যমে উত্তর ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্তরসূরিরা বাংলার স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে রীতিমত কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনেন। সাহিত্যরচনারীতি, নাট্যরীতি, বিবাহরীতি, শ্রাদ্ধ — প্রতি ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দ এবং একান্ত প্রয়োজনীয় রীতিগুলি স্থানীয় সমাজকে মানতে বাধ্য করেন। আঠারো শতকে খ্রিস্টিয় সংস্কৃতির ধাক্কায় স্থানীয় সমাজে অভিবাসিত ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোরতা কিছু হ্রাস পায়। ব্রাহ্মরা আসেন৷ ব্রাহ্মণ্যবাদী কায়স্থতন্ত্রের উত্থানের জন্য এবার প্রয়োজনে অবতার হয়ে উঠে আসবেন রামকৃষ্ণ। অর্থাৎ রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দ — বিশুদ্ধ উত্তর-ভারতীয় ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় সমঝোতার জায়গায় ব্রাহ্মণ এবং কুলীন কায়স্থ। একদিকে রামমোহন থেকে কেশব সেন, অন্যদিকে বিবেকানন্দ আর রামকৃষ্ণ। ইংরেজ আমলে জন্ম নেওয়া সম্পূর্ণ আধুনিক এক ধরনের সংস্থার মাধ্যমে এই লড়াই-এর রাজনৈতিক দিকটিও কিন্তু প্রকাশ পেতে থাকবে। এক আধুনিক সংস্থা অর্থাৎ রাজনৈতিক দল! বহিরাগত খ্রিস্টিয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বাঙালি ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্গীয় কায়স্থদের সম্মিলিত লড়াই ছাড়াও থাকবে নিজেদের মধ্যে লড়াই। নিম্নবর্গীয় মানুষের ত্রাণ করার একচেটিয়া অধিকার লাভের লড়াই। থাকবে লড়াইয়ের বিবরণ ও নেতৃত্বের দেবত্ব প্রাপ্তির ও স্থানীয় নিম্নবর্গীয় মানুষের অবচেতনায় দাসত্ব নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবতার তৈরির বিবরণও। থাকবে চরিতামৃত, কথামৃত। আসবেন চৈতন্যদেব, আসবেন রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ। আর গত শতকের মাঝামাঝি থেকে খ্রিস্টিয় সংস্কৃতির বিদায়ের পর আমরা দেখব শুধুমাত্রই ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যে লড়াই। রাজনৈতিকভাবে ক্ষয় হতে থাকা কংগ্রেস আর উঠে আসতে থাকা কমুনিস্ট। দেখব এই লড়াই-এ অবিকল চৈতন্য আন্দোলনের মতো করে নিম্নবর্গীয় মানুষের সমর্থন পাওয়ার জন্য “আমরা তোমাদেরই লোক” জাতীয় প্রচারের মাধ্যমে জয়ী হয়ে ক্রমে জেগে উঠতে থাকা কমুনিস্টদের দল বা গত শতকের প্রথমদিকের মাঝারি জমিদারদের উত্তরসূরিদের। আবার এই উত্তরসূরিদের নিজেদের মধ্যে লড়াইও দেখব। আর কিছুদিন আগে হেরে যাওয়া ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরনো ভদ্রলোক শ্রেণিকে নতুন এই যুযুধান সাংস্কৃতিক শ্রেণিদুটির একটিকে সমর্থন করতে বা সহানুভূতিশীল হয়ে পাশে দাঁড়াতেও দেখব। এবং এক্ষেত্রে যা অবশ্যম্ভাবী অর্থাৎ হেরে যাওয়া সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী অর্থাৎ পুরনো ভদ্রলোকের উত্তরসূরি আধুনিক শহুরে এলিটরা দাঁড়াবে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকা নতুন সাংস্কৃতিক শ্রেণির বিরুদ্ধেই। অর্থাৎ নিম্নবর্গীয় শ্রেণির কাছে ব্রতী চ্যাটার্জীদের প্রকৃত ত্রাণকর্তা দেখিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরনো ভদ্রলোকদের রাজনৈতিকভাবে জয়ী নতুন ভদ্রলোক উচ্চবর্গ কায়স্থদের খাটো প্রমাণের একটা চেষ্টা অন্তত হবেই। আর হয়ও। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যে কর্তৃত্বের লড়াইয়ে নতুন অবতার তৈরির চেষ্টার সঙ্গে তাদের মহিমান্বিত জীবন নিয়ে জয়গাঁথা তাই অবশ্যম্ভাবীই। ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাস হিসাবে কেমন তা থাকুক সাহিত্য সমালোচকদের বিচারের অপেক্ষায়। কিন্তু নতুন ব্রাহ্মণ্যবাদী এক চারু মজুমদার বা তার সম্প্রদায়ের জন্য ব্রাহ্মণ সন্তান ব্রতী চ্যাটার্জীদের প্রাণদান যে মহতি ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে তাতে আর কোনও সন্দেহ থাকে না।

পুনশ্চ: নতুন অবতার দূরবর্তী প্রাচীন অবতারকে কখনও ঘাঁটায় না। ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি যে কারণে কৃষ্ণের পাশে জায়গা দেয় বুদ্ধকে। রামকৃষ্ণ প্রচারকেরা উৎসাহী থাকেন চৈতন্যদেবের সঙ্গে তাঁর রক্ত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে। আর ‘৭০-এর দশকের চারু মজুমদারকে অবতার তৈরিতে উৎসাহী ব্রাহ্মণ্যবাদী কায়স্থদের মূর্তি ভাঙ্গার আন্দোলনে গান্ধি, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ধূলিসাৎ হলেও রামকৃষ্ণ বা বিবেকানন্দ অটুট থাকে।

 

ঋণস্বীকার:

ক. হাজার চুরাশির মা : মহাশ্বেতা দেবী।

খ. নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রামাণ্য তথ্য সংকলন : অমর ভট্টাচার্য।

গ. জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি : অমর্ত্য সেন।

ঘ. শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু : শ্রী অনিরুদ্ধ ব্রহ্মচারী।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*