‘বাড়লে বয়স ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে যায়’

নাহার তৃণা

 

আজীবন বুকের ভেতর রংধনু শৈশব বয়ে বেড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও, সবার পক্ষে সে স্মৃতি বয়ে বেড়ানো সম্ভব হয় না। সময়ের চাহিদা, জীবনের তাগিদে হাতের মুঠো খুলে কবে কখন ভাসান ঘটে সেসবের তারও ঠিকঠাক হদিশ থাকে না। বয়স বেড়ে বড় হবার আনন্দ, স্বাধীনতা পাওয়ার উচ্ছ্বাস, দায়িত্ব পালনের গুরুভারে দূরে ভেসে যায় শৈশবের মুখরতা। দায়িত্ববান মানুষটার বুক পকেটে বর্তমানের জন্য জরুরি আর প্রয়োজনীয় ফর্দের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠে না আর শৈশব। চিরন্তন রীতিতে নতুনকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। বিষণ্ণতায় জড়োসড়ো শৈশব, প্রিয়বন্ধুর স্মৃতি চাপা পড়তে থাকে আস্তে আস্তে। এতসব চাপ সরিয়ে উঁকি দেবার অবসর মেলে না তেমন। একসময় ভেতরের চিরন্তন শিশুটা হাঁটা দেয় দিকশূন্যপুরের ঠিকানায়… সাত সতেরো কাজের ভিড় ঠেলে অনেকেরই আর পৌঁছানো হয় না প্রিয় সময়ের কাছে। অনেকে বা পিটার প্যানের মিস্টার জর্জ ডার্লিংয়ের মতো পরিণত বয়সে পৌঁছে সযত্নে তৈরি গাম্ভীর্যের যে মুখোশটা সর্বক্ষণ বর্তমানের শরীরে এঁটে বসে থাকে, সেটা খানিক সময়ের জন্য খুলে শৈশব স্মৃতির হুল্লোড়ে মেতে ওঠাকে বালখিল্য মনে করেন। মন খুলে বলতেও কেমন দ্বিধা এসে ভর করে, পিটারকে আমি চিনি! ক্যাপ্টেন হুক কিংবা তার পাইরেট শিপের সন্ধানে আমার শৈশবও কম নাকাল হয়নি বাছারা! পাছে সযত্নে লালিত বর্তমানের গাম্ভীর্যের ভাসান ঘটে, জুড়ে বসে ছেলেমানুষি ব্যবহারের তকমা, সে আশঙ্কাই হয়তো ঘুরিয়ে বলিয়ে নেয়, “You know, I have the strangest feeling I’ve seen that ship before… a long time ago, when I was very young.”

এরই ভেতর অনেকের বুকে জেগে থাকে চাতক পিপাসা। শতেক দায়িত্বের চাপে ক্লান্ত মন কোনও আলুথালু দুপুরে পড়ে পাওয়া অবসরে টুক করে বুকের পাঁজর খুলে দেখে নিতে চায় স্হির হয়ে থাকা চির বসন্তকে। যে দিন গেছে সেদিনকে স্মৃতির সাঁকো ধরে ডেকে নেবার মন্ত্র যারা জানে তারা ঠিক পৌঁছে যেতে পারে ফেলে আসা হান্ড্রেড একর উড কিংবা ভুবনডাঙার মাঠে। কত কত মুখের ভিড়ে খুব প্রিয় বন্ধুর মুখটা চিনে নিতে তার বিন্দুমাত্র দেরি হয় না। যে কোনও একটা ছুতো ধরে শৈশবে ফিরে যাওয়া, আর সাথে যদি প্রিয় বন্ধুর সান্নিধ্য ঘটে তবে সেই ক্ষণটিকে ‘হিরন্ময়’ নামে ডাকা যেতেই পারে। এমন ক্ষণটির জন্য আমাদের বুকে জেগে থাকে এক পৃথিবী তৃষ্ণা।

জীবন জীবিকার চাপে ক্রিস্টোফার রবিনের হাত গলেও কখন, কবে, সযত্নে রাখা তার প্রিয় শৈশবের স্মৃতিগুলো বর্তমানের প্রয়োজনের সামনে ম্লান হয়ে ওঠছিল, সে খবর বড় হয়ে যাওয়া রবিনের পক্ষে রাখা সম্ভব হয়নি। হয়নি, কারণ শৈশব পেরিয়ে মধ্য বয়সের এই ক্রিস্টোফার রবিন এখন যতটা না ঘোরতর সংসারী মানুষ, তারচে’ বেশি কোম্পানির ব্যস্ত চাকুরে। যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর তাগিদে তার মাথা কোম্পানির ব্যয় সংকোচনের চিন্তায় জেরবার। যে কারণে গ্রীষ্মের পাওনা ছুটিতেও কোম্পানিকে সময় দেবার আবদারে তাকে রাজি হতে হয়। নইলে কর্মী ছাটাইয়ের খড়্গ তার সহকর্মীদের দিকে ছুটে যাবে। হান্ড্রেড একর উডের যে রবিন তার বন্ধুদের নানান সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসত, সে কীভাবে পারে বর্তমানের দায় এড়াতে! নিজের জন্য খানিক অবসর চাইতে ভুলে যাওয়া রবিনের কাছে স্ত্রী কন্যার সাথে অবসর কাটানোর পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে হলেও কিছু মানুষের রুজিরোজগারের বিষয়টা প্রাধান্য পায়। আর তাই, রবিনের পক্ষে সম্ভব হয় না স্ত্রী ইভলিন, কন্যা মেডেলিনের সাথে পূর্বপরিকল্পনা মতো শহুরে পরিবেশ ছেড়ে গ্রামের কজেটে গিয়ে ছুটির অবসর যাপনের।

স্বভাবতই স্ত্রী কন্যা রবিনের ব্যবহারে মর্মাহত। তাদের ধারণা রবিন সংসার, স্ত্রী-কন্যার বিষয়ে উদাসী। কন্যা মেডেলিনের ধারণা বাবা তাকে মোটেও ভালোবাসে না। নইলে বেডটাইম স্টোরি শোনাবার সময় তার পছন্দমতো ট্রেজার আইল্যান্ড না পড়ে হিস্ট্রি বই পড়ে নাকি। ভালোবাসলে একমাত্র মেয়েকে দূরের বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর জন্য মরিয়া হয় কেউ! একদিকে নাখোশ পরিবার, অন্যদিকে বিপদের ঝুঁকিতে থাকা চাকরিস্থলের টানাপোড়েনে কাহিল রবিন একদিন খানিক বসে পার্কের বেঞ্চে… জাদু বাস্তবতার ছোঁয়ায়, এদিকে সেই পার্কের বেঞ্চে রবিনের আগেই উপস্থিত হয়েছে শৈশবের প্রিয় বন্ধু উইনি দ্য পুহ! তখনও রবিন আর পুহের মুখোমুখি দেখা হয়নি, একটা ‘হিরন্ময়’ মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলা হল ভর্তি দর্শক… জাদুময় সে সময়ে হল জুড়ে দর্শকের মধ্যে কেমন এক শিহরণের ঢেউ ওঠে। দু’একজন চুপিচুপি নিজের আবেগ রুমালে লুকোতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ব্যাগ হাতড়ে রুমালের হদিশ না পাওয়া গ্র্যান্ডমা’টির ঠোঁট বিরক্তিতে নড়ে ওঠে, পিপল শ্যুড ব্রিং দেয়ার হ্যাঙ্কি…

ওদিকে, পুহ আসলে নিজের তাগিদেই সমস্যা সমাধানে সদা নিবেদিত রবিনের শরণাপন্ন হয়। হান্ড্রেড একর উডের সোনালি দিন পেছনে রেখে কিশোর ক্রিস্টোফার রবিনকে চলে যেতে হয়েছিল বোর্ডিং স্কুলে। তারপর তো সময় পেরিয়ে গেছে কত! কৈশোর পেরিয়ে যুবক রবিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়। লন্ডন শহরে সংসার জীবনে এক কন্যার বাবা, উইন্সলো লাগেজ কোম্পানির একজন কর্মব্যস্ত চাকুরে এখন রবিন। অন্যদিকে হান্ড্রেড একর উডে পুহ হারিয়ে ফেলে তার বাকি বন্ধুদের। ভয়কাতুরে পিগলেট, বাউন্সি টিগার, সদা বিষণ্ণ ইয়্যোর, জ্ঞানী অ্যাউল, র‍্যাবিটকে খুঁজে বের করবার জন্য পুহের একজনের কথাই মনে পড়ে, ‘ক্রিস্টোফার রবিন’! ভাবনা আসামাত্রই পুহ গাছের ফোঁকড় গলে পৌঁছে যায় সেই বন্ধুর কাছে, যে তাকে ফেয়ারওয়েল শেষে বলেছিল, ‘Silly old bear. I wouldn’t ever forget about you, Pooh, I promise. Not even when I’m a hundred.’

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে দুই বন্ধুর দেখা, ‘বন্ধু কী খবর বল, কতদিন দেখা হয়নি’র অব্যক্ত ঘোরে দর্শক বুঝিবা আক্রান্ত। দর্শক আসনে বসে বুকে কেমন এক ব্যথা টের পাই, শৈশব স্মৃতি আর হারিয়ে ফেলা বন্ধুর কথা মনে করে। ঘাড়ের কাছে কারও সঘন নিঃশ্বাসে নিঃশব্দে বাজে বুঝি চিরন্তন হাহাকার, ‘বাড়লে বয়স ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে যায়।’ বড় হবার আনন্দের পাশাপাশি প্রিয় শৈশব আর প্রিয় বন্ধু হারানোর আফসোসে কাতর অভিজ্ঞ মন একই সাথে প্রত্যক্ষ করে নেয়, পর্দায় উইনি দ্য পুহ’র উপস্থিতিতে কচিকাঁচাদের নির্মল উচ্ছ্বাস।

পলকা মেঘের মতো টুপ করে দুঃখ ঝরে পড়তে সময় লাগে না শিশুদের উচ্ছ্বসিত কলকলে। পার্কের বেঞ্চে বসতে বসতে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রবিনের ‘হোয়াট টু ডু, হোয়াট টু ডু, হোয়াট টু ডু’র স্বগোক্তিতে পুহের ‘হোয়াট টু ডু ইনডিড’ বলে ওঠায় ‘আনন্দ ধ্বনি জাগাও’-এর ঢেউ হল জুড়ে। দীর্ঘ অদর্শনে প্রিয় বন্ধুকে ভুলে গিয়ে ‘কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে’ বলে বসে কিনা একে অন্যে, এমন উৎকণ্ঠা উবে যায় রবিন আর পুহের অকপটে একে অন্যকে চিনে নেবার আন্তরিকতায়। সব বয়সী দর্শক ‘ক্রিস্টোফার রবিন’-এর অনেকটা আনন্দ, খানিকটা বেদনার রোলারকোস্টারের ভ্রমণ মন ভরে উপভোগ করেন, সাথে কখনও হো হো হাসি, কখনও ফশ্ করে ছেড়ে দেয়া দীর্ঘশ্বাসের অর্কেস্ট্রার সঙ্গতে সময়টা দারুণ কেটে যায়।

ক্রিস্টোফার রবিন কি পারে তার সহকর্মীদের চাকরি খোয়ানোর বিপদ থেকে রক্ষা করতে? পুহ’র ফিরে পাওয়া হয় কিনা তার হারানো বন্ধুদের… মেডেলিন কি জানতে পারে সেই প্রাচীন পুরনো কথা, ‘বাবা তোকে ভালোবাসে মেয়ে’? কিংবা খোদ ক্রিস্টোফার রবিনের ফিরে পাওয়া হয় কি প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে নিজের জন্য খানিকটা অবসর? এতশত বলে মজা নষ্ট করতে চাই না। যারা এখনও ‘ক্রিস্টোফার রবিন’ দেখেননি তারা সপরিবারে দেখুন। পয়সা নষ্টের আক্ষেপে হাত কামড়াতে হবে না বলেই মনে করি। সমালোচকেরা কী বলছেন, না বলছেন, তার তোয়াক্কা না করে শুধু এটুকুই বলতে পারি ‘ক্রিস্টোফার রবিন’ সব বয়সীদের মন ভরিয়ে দেবার মতো একটা সিনেমা। যে সিনেমায় অযথাই হাঙ্গামা আমদানির বালাই নেই। নেই উৎকট সংলাপ কিংবা যৌন সুড়সুড়ি। তবে ভীষণ আবেগী দর্শক বাড়তি সর্তকতা হিসেবে একখানা রুমাল সঙ্গে নিতেই পারেন। সিনেমা শেষে ‘বাজল বুকে সুখের মতো ব্যথা’র অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মন চাইবে প্রিয় শৈশব, ছোট্টবেলার বন্ধুদের খোঁজে পুহের মতো বেরিয়ে পড়ি। ‘ক্রিস্টোফার রবিন’ আমাদের ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে ফেলবার দামী দুঃখের প্যান্ডোরায় আলতো করে হাত রাখে যেন… মনকে ভাসিয়ে নিতে চায় দূরের শৈশব আর ফেলে আসা ভুবনডাঙ্গার মাঠ কিংবা হান্ড্রেড একর উডে… ‘মন চলো রূপের নগরে’ বলে হয়ে যাক না একটা চমৎকার ভ্রমণ সেই চির বসন্তের দিকে। কী বললেন? খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই! নেইকাজকে এতটা হালকা বলে উড়িয়ে দেবেন না বাপু। আমাদের বন্ধু পুহ কিন্তু এ নিয়ে ভারি দামী কথা জানাচ্ছে — ‘Doing nothing often leads to the very best kind of something.’ ভেবে দেখুন এখন কোনও কাজের সূত্রপাত ঘটাতে নেইকাজে মন দেবেন কিনা — অর্থাৎ সিনেমা হলের দিকে যাত্রা করবেন কিনা।

এ এ মিলানের ফিকশন চরিত্র উইনি দ্য পুহ-ক্রিস্টোফার রবিন অবলম্বনে নির্মিত ‘ক্রিস্টোফার রবিন’ চলচ্চিত্রের পরিচালক মার্ক ফস্টার। বইয়ের রবিন কিশোর, সিনেমার রবিন পূর্ণবয়স্ক এক পিতা, দায়িত্ববান একজন নাগরিক মানুষ। রবিনের চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন ইয়েন ম্যাগ্রেগার। ইয়েনের সাথে পাল্লা দিয়ে স্ত্রী ইভলিনের চরিত্রে  হেইলি এ্যাটওয়েল, মেয়ে মেডেলিনের চরিত্রে ব্রোটি কারমাইকেল যথাযথ অভিনয়ের যোগ্যতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যান্য চরিত্রগুলোও মানানসই। পুহের আদুরে আধবোজা কণ্ঠটি দিয়েছেন জিম কামিংস (টিগারের কণ্ঠটিও এঁর দেয়া)। হান্ড্রেড একর উডের চনমনে সজীবতার পাশাপাশি ব্যস্ত সাদামাটা লন্ডন নগরের সিনেমাটোগ্রাফির কাজ চিত্তাকর্ষক। চমৎকার আবহসঙ্গীত। বিশেষ করে রিচার্ড এম শ্যারমেনের পিয়ানোয় ‘Busy Doing Nothing’-এর সাথে পুহ আর তার বন্ধুবাহিনীর আনন্দের হুল্লোড় সত্যিই উপভোগ্য। ‘ক্রিস্টোফার রবিন’ বন্ধুত্ব, মানবিক সম্পর্ক, আর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্পের চলচ্চিত্র। যে গল্পের আবেগ কিছু সময়ের জন্য হলেও আমাদের করে শৈশবমুখী। ছোট্টবেলার হারিয়ে ফেলা বন্ধুর জন্য কাতরতা জমা হয় আমাদের অনেকের বুকের ভাঁজে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...