সঙ্ঘীরা তাদের ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলায়

শৈবাল দাশগুপ্ত

 

দিল্লিতে বেড়ে ওঠা আমার। দুর্গাপুজো আর বাড়িতে বাংলা বলা — তার মধ্যেও অবশ্যম্ভাবী ব্যাকরণ-গণ্ডগোল এবং কঠিন শব্দগুলোর বদলে তার হিন্দি বা উর্দু প্রতিশব্দ ব্যবহার — এই হল আমার বাঙালিয়ানার দৌড়। বেশিরভাগ প্রবাসীদের মতোই বাংলায় ফিরে আসাটাও কখনওই আমার জীবনে কোনও সম্ভাবনা হিসেবে আসেনি। ওই ঘেমো আবহাওয়া, আর চারপাশে এমন সব লোক যারা গড়গড় করে বাংলা বলে — এক হিন্দিভাষী পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা ছেলের জন্য এর চেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন আর কী হতে পারে?

কিন্তু, এক সময় বাংলায় ফিরলাম, আর সেটাই আমার জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দিল। আমি যখন কলকাতায়, তখন বিট্টুদার সঙ্গে পরিচয় হল আমার। একসময়ের নাস্তিক সিপিএম বিট্টুদা এখন সঙ্ঘী। সবসময় গেরুয়া কুর্তা আর গেরুয়া টুপি পরে ঘোরে। বৃষ্টিতেও চোখ থেকে সানগ্লাস খোলে না। বাংলা বলে, কিন্তু তাতে আমার মতোই ‘কেয়া বাত হ্যায়’ বা ‘মজা আগেয়া’ প্রায় প্রতি বাক্যে লেগে থাকে লেজুড়ের মতো। ঘরের লেনিন-স্তালিনের ছবির জায়গায় এখন উত্তর ভারতের রাম আর দুর্গা (আট হাত, বাহন বাঘ)। বস্তুত বিট্টুদার ঘরে যত উত্তর ভারতের দেবদেবীর ছবি দেখলাম, উত্তর ভারতে বড় হয়েও আমি অত দেখিনি। সিপিএমের নেতা হওয়ার জন্য বিট্টুদা বিস্তর চেষ্টা করেছিল, তার সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে বিজেপিতে ঢুকে। আমার সঙ্গে যখন দেখা হয় তখন বিট্টুদা জেলাস্তরের নেতা। বিট্টুদার এহেন প্রভাব দেখে, বা হয়তো বিট্টুদার ওপর সঙ্ঘের এতটা প্রভাব দেখে আমি তাকে জানালাম যে আমার উপন্যাসের জন্য কিছু ‘শিশু মন্দির’ স্কুলশিক্ষকের ইন্টারভিউ দরকার, সে যদি ব্যবস্থা করে দেয়। কিছুক্ষণ ভেবে বিট্টুদা জানাল, যদি আমি আরএসএসে যোগ দিই তবেই এটা সম্ভব।

বাপরে! নিজেই নিজের গলায় ফাঁস লাগানোর মতো এত সাহস আমার স্বভাবতই ছিল না। ফলে মানে মানে সেই উপন্যাসকে সরিয়ে রেখে নতুন থিম ভাবা শুরু করলাম। কিন্তু… কী যে হল… শেষ অব্দি যেটা করা আমার উচিতই ছিল না, করে ফেললাম সেটাই। আরএসএসে ঢুকে পড়লাম! সেটা খুব একটা কঠিন নয়, কিন্তু ঐ যে আমি বলেছিলাম আমি লেখক, ওতেই একটু সমস্যা হল। অন্তত ২০ বার আমাকে জেরা করা হয়েছিল ঘুরিয়েফিরিয়ে একই প্রশ্ন দিয়ে। আমি কি সাংবাদিক, আমি কি জ্যোতি বসু এবং মমতা ব্যানার্জীকে ঘৃণা করি, এবং সর্বোপরি আমি বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদিকে ভালোবাসি, না বাসি না? আসানসোলের একজন বরিষ্ঠ নেতা বিপ্লব রায় আমাকে পরিষ্কার জানালেন, বাংলায় আরএসএস এবং বিজেপি-র মধ্যে কোনও তফাত নেই। ‘যদি তুমি আরএসএস করতে চাও, তবে বিজেপির হয়ে কাজ করার জন্যও তৈরি থাকো।’ আমি তাকে বলেছিলাম যে আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই হল হিন্দুত্বের জন্য কাজ করা, কিন্তু তিনি খুব একটা বিশ্বাস করেছিলেন বলে মনে হয়নি।

যাই হোক, আমি চিনার পার্কে শাখার মিটিংগুলিতে যোগ দেওয়া শুরু করলাম। সেগুলিতে কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্রও ছিল না। যা আলোচনা হত সবই জাতীয়তাবাদ, ঐক্য, দেশের সেবা… এই সব। নরেন্দ্র মোদির সমস্ত ব্যর্থ পলিসিগুলিকে রংচঙে করে হাজির করাটা ছিল একটা রুটিন কাজ। কিন্তু আমার শিশু মন্দির স্কুলে পৌঁছনো হচ্ছিল না।

এর পরই বিশ্ব আয়ুর্বেদ কংগ্রেস এল আর আমি দেখলাম বাঙালিদের এরা কী পরিমাণে বেইজ্জত করে। আগেই বলেছি আমার বাঙালিত্ব নিয়ে অত কিছু ভড়ং নেই, কিন্তু আমিও এই অসম্মানের হাত থেকে রেহাই পেলাম না। ওদের কাছে আমরা বাঙালিরা হলাম কুৎসিত, অভদ্র, মাছখেকো, দুর্গন্ধযুক্ত সাপের মতো, যারা বাকি ভারতীয়দের ছোবল মারার জন্য ঘুরঘুর করছি! আয়ুশ মন্ত্রকের সঙ্গে যুক্ত একজন বরিষ্ঠ সঙ্ঘী নেতার কথায়, ‘ওপর থেকে নিচ অব্দি প্রত্যেকটা বাঙালি পাল্টিবাজ! দেখো ওদের দিদি (মমতা ব্যানার্জী)-র দিকে!’ আমি আরও অবাক হয়ে দেখলাম বাঙালি সঙ্ঘীরা চুপচাপ এগুলি হজম করে নিচ্ছে। ওখানে অন্তত পাঁচজন সিনিয়র বাঙালি সঙ্ঘী ছিলেন, কেউ কোনও ট্যাঁ ফোঁ করলেন না।

সেই রাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিই যে হিন্দুত্বের এইসব স্বঘোষিত মুরুব্বিদের মুখোশ খুলব। কংগ্রেসের বাকি কদিনে আমি নিজের ভাবমূর্তি ‘ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নয়নপন্থী সঙ্ঘী’ থেকে পালটে ‘মুসলিম-বিদ্বেষী সঙ্ঘী’ করে নিলাম। এতেই কাজ হল ম্যাজিকের মতো। গত কয়েক মাসের মুখোশ খুলে ফেলতে শুরু করল সঙ্ঘীরা। তারা আমাকে বোঝাল বাঙালি এবং দলিতরা কতটা অবমানব। আরএসএস আইটি সেলের একজন প্রমুখ ব্যক্তিত্ব দেবেশ পান্ডের কথায়, ‘হয় তুমি বাঙালি, নয় হিন্দু। মাত্র ১০ শতাংশ বাঙালি হিন্দু। বাঙালি সংস্কৃতি আসলে এক সামাজিক অবক্ষয়।’ পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই বাঙালিদের দিয়ে অভ্যাগতদের ব্যাগ বওয়ানোর মতো কাজগুলো করানো হচ্ছিল। সংগঠকদের একজন শুভ্রদীপ রায়কে আমি জিজ্ঞেস করাতে তিনি বলেছিলেন আরএসএস বাঙালিদের বিশ্বাস করে না।

এরপরে কেবল চমকের পালা! কংগ্রেসে প্রতিনিধি হিসেবে গুজরাট থেকে একজন বয়স্ক ডাক্তার এসেছিলেন। তিনি আমাকে ভারতীয় সংস্কৃতির — যা নাকি আসলে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি — ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভূমিকা’ নিয়ে অনেক কিছু বোঝালেন। তার মধ্যে যেমন মনুষ্য শরীরে আমিষ ভোজনের কুপ্রভাব ছিল, তেমনই ছিল এমন কিছু মন্ত্রের কথা যেগুলি দিয়ে নাকি যে-কাউকে (পুরুষকেও) গর্ভবতী (বা বান) করা যেতে পারে!

এটা কিন্তু শুধু যে তার ভাবনা এমনটা নয়। বস্তুত, সঙ্ঘে থেকেই আমি বুঝেছি এই শাকাহার-ধ্বজাধারীরা কী পরিমাণে নারীবিদ্বেষী এবং জাতিবিদ্বেষী হতে পারে। সঙ্ঘীদের তত্ত্ব হল, আমিষভোজন নারীদের মধ্যে কামোদ্দীপনা জাগ্রত করে এবং বিপরীত ফল দেয় পুরুষদের ক্ষেত্রে। এর কারণেই বাঙালি পুরুষরা নারীদের সন্তুষ্ট করতে পারে না। আর যেহেতু বাঙালিদের মধ্যে লম্বা ঘোমটা দেওয়ার চল নেই, তাই নারীদের চোখ থেকে এই কামতরঙ্গ প্রবাহিত হয় এবং মুসলিম পুরুষদের আকৃষ্ট করে ও লাভ-জিহাদ ঘটে। বিজেপি-আরএসএসের চোখে বাঙালি মহিলারা যৌনসামগ্রী ছাড়া আর কিছু নয়। তাদের এই দৃষ্টিকোণ থেকে কিন্তু কেউই ছাড় পান না, এমনকি নেত্রীরাও। পার্টির ওপরতলায় বাঙালি নেত্রীদের ‘লাল বেশ্যা’ বলা হয়। লাল, গায়ের রঙের জন্য; আর বেশ্যা তো যে কোনও আত্মপ্রত্যয়ী বাঙালি মহিলাদের জন্য সঙ্ঘীদের সাধারণ বিশেষণ! রাজ ত্রিপাঠীর মতো উঁচুস্তরের নেতারাও এই কথাই ব্যবহার করেন। তৎকালীন মুখপাত্র কৃশানু মিত্র এসব যে শুধু জানতেন তাই নয়, তার উত্তর ভারতীয় প্রভুদের অনুকরণে তিনিও এগুলি বলতেন।

আমি আরএসএসের আইটি সেলে উন্নীত হলাম। আমাকে ফেক ভিডিও বানানোর দায়িত্ব দেওয়া হল। মুসলিমরা হিন্দুদের মারছে, এমন সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক ভিডিও। আর এর মধ্যেই আমাকে হাতিয়ারার শিশু মন্দির স্কুলে কল্পতরু দিবস পূজায় আমন্ত্রণ জানানো হল।

এখানেও বাঙালিদের প্রতি একই ব্যবহার দেখলাম। তাদের আলাদা খাওয়ার ব্যবস্থা এবং সেখানে কোনও বসার জায়গা নেই। ওদিকে উত্তর ভারতের উঁচু জাতের (মূলত ব্রাহ্মণ এবং রাজপুত) নেতাদের জন্য শুধু যে আলাদা চেয়ার টেবিলই রয়েছে তা না, তার সাথে বাঙালি ছেলেদের একটি দলকে রাখা হয়েছে তাদের উচ্ছিষ্ট এবং থালা গেলাস পরিষ্কার করার জন্য। সঙ্ঘে উত্তর ভারতের উঁচু জাতের এবং জৈন নেতাদের জন্য এইরকম বিধিই প্রচলিত। বিকেলের দিকে একটা ঘটনা দেখলাম। সঙ্ঘের অশীতিপর নেতা কেশব রাও দীক্ষিত রাজার মতো বসেছিলেন। তখন তার কাছে এক মহিলা নেত্রী এসে জাতিগত বৈষম্য নিয়ে অভিযোগ জানালেন। দীক্ষিত যেমন বসেছিলেন, তেমনই রইলেন, এবং তার কিছু চেলাচামুণ্ডা, বেশিরভাগেরই বয়স পঁচিশের কম, মহিলাটিকে ওখান থেকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন। দীক্ষিতের মুখে কেবল এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। আর সেই চেলারা বলল, ‘পাগল হ্যায় শালি…!’

যাই হোক, সেখান থেকে স্কুলের শিক্ষকদের ইন্টারভিউ নেওয়ার শর্তাধীন অনুমতি পেলাম। স্কুল সেক্রেটারি বললেন, ‘ইন্টারভিউ হবে আমার সামনে।’ রাজি হলাম আমি। কিন্তু, যেদিন আমার যাওয়ার কথা, সেদিন একটু দেরি করে গেলাম যাতে সেক্রেটারি এবং অন্যরা বেরিয়ে যায়। কাজ হল। স্কুলের কেয়ারটেকার কাম কো-অর্ডিনেটর কালিদাস ভট্টাচার্যের কাছ থেকে জানলাম কেমনভাবে সঙ্ঘ জালিয়াতি করে রামকৃষ্ণ মিশনের নাম এবং ঝাণ্ডা ব্যবহার করে বাংলায় একাধিক স্কুল চালাচ্ছে। এবং অবশ্যই — ‘কোনওভাবেই সঙ্ঘের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু শেখানো যায় না। যেমন, বাঙালি সংস্কৃতি।’

তদন্ত শুরু করলাম। চমকে গিয়ে দেখলাম কীভাবে রামকৃষ্ণ মিশনের নাম অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে আরএসএস-বিজেপি তাদের যাবতীয় বেআইনি এবং ষড়যন্ত্রমূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রাজ্য কমিটির এক সদস্য ড. স্বরূপ প্রসাদ ঘোষ মিশনের সন্তদের মতো পোশাক পরে বিজেপির হয়ে ভোট চেয়ে বেড়ান। একই কাজ করেন স্বামী অপূর্বানন্দ ওরফে অবধূত বাবাজী। তিনি বেলুড় মঠের একটা ফটোশপড ছবি নিয়ে চাঁদা তোলেন। শুধু এটুকুই নয়। বিজেপি-র আইটি সেল মিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বামী প্রভানন্দের নামে একটি ফেক প্রোফাইল চালায়, যার থেকে এই সম্মাননীয় সন্তের নামে যাবতীয় সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক এবং নারীবিদ্বেষী প্রচার চালানো হয়।

আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য আমার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। আমি একদিকে তথ্য পাওয়ার জন্য একটা হিন্দু স্টাডি সার্কেল তৈরি করলাম, আর অন্যদিকে বিজেপির ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচিকে সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ করার জন্য একটি টিম বানালাম। খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করতে হল। আমরা এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করতাম এবং কথাবার্তা চালাতাম কোডেড ভাষায়। দ্রুতই অনেক জিনিস নজরে আসতে শুরু করল। এই ফেক প্রোফাইল যে শুধু সাধুসন্তদেরই বানানো হচ্ছে তা না, আর্মির লোকজনের নামেও এমন অনেক প্রোফাইল আছে। জানতে পারলাম বাঁকুড়ার বিজেপি সদস্য বিকাশ তিওয়ারি লজিস্টিক সাপোর্ট পায় রাজনাথ সিং-এর নিরাপত্তারক্ষীদের কাছ থেকে। দেখলাম, বিজেপিকে আমি বাঙালিদের জন্য যতটা বিষাক্ত ভেবেছিলাম, বিজেপি তার থেকেও বেশি বিষাক্ত। এই এন আর সি-র বহু আগেই বিজেপির জাতীয় কাউন্সিল সদস্য উমা শঙ্কর আগরওয়াল আওয়াজ দিয়েছিলেন দিল্লি বাঙালিদের জন্য একদমই নিরাপদ নয় বলে। আরও অনেক বিজেপি নেতাই একই কথা বলেছিলেন যারা এখন পার্টিতে বাঙালিদের সমান অধিকার দেওয়ার ওকালতি করছেন।

এখনও অব্দি আমি আমার স্টিং অপারেশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু এখন অনেক বাঙালিই এই কাজে এগিয়ে এসেছে। হিন্দু স্টাডি সার্কেলের মারফত আমরা একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছি যার মাধ্যমে এই ভিডিও রেকর্ডিং, কল রেকর্ডিং জাতীয় জিনিসগুলির আদানপ্রদান করা হয়। হাওড়া মহিলা মোর্চার একজন বর্তমান নেত্রী যেমন জানালেন, উত্তর ভারতের নেতারা গরিব মহিলাদের হিউম্যান শিল্ড হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য ভাড়া করে। মুসলিম এলাকায় মিছিল নিয়ে গিয়ে উত্তেজনা ছড়ানো হয়। এরপর যখন পিছিয়ে আসা হয়, তখন পেছনোর রাস্তা আটকে দিয়ে সেই মহিলারা যাতে আহত বা নিহত হন সেই চেষ্টা করা হয়। কারণ সেগুলি দেখিয়ে সিমপ্যাথি কোড়ানো যাবে। ‘আমি নিজেই আমাদের নিজেদের লোকেদের হাতেই ছুরি খেয়েছি!’ বললেন তিনি। মনে রাখা দরকার, ইনি কিন্তু তথাকথিত জিহাদি হামলার একজন শিকার বলে প্রচারিত।

তথ্যগুলি সংগ্রহ হয়েছে এবং আমি এখন সেগুলি প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত। বছরখানেক আগে তথাগত ভট্টাচার্যের ফেসবুক ওয়ালে একটা পোস্ট দেখি যাতে ন্যাশনাল হেরাল্ডের জন্য লেখা চাওয়া হয়েছিল। আমি যোগাযোগ করি। তিনি খুবই সাপোর্ট দেন আমাকে। একদম সেন্টার স্টোরি লেখার প্রস্তাব দেন। এবং অবশেষে আমার তথ্যগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করে। এই সময়েই খবর পাই যে দুর্গাপুজোর সময় বিজেপির একটা দাঙ্গা বাধানোর পরিকল্পনা আছে। আমি হস্তক্ষেপ করি। যেহেতু আমি আরএসএস আইটি সেলের ওপর দিককার একজন সদস্য ছিলাম, আমি তাদের সমস্ত দুর্বল জায়গাগুলি জানতাম। আরএসএসের থেকে শেখা কৌশলগুলি তাদের বিরুদ্ধেই কাজে লাগালাম। স্বীকারোক্তির সাথে সাথে পেয়ে গেলাম দরকারি তথ্যগুলিও। বিশেষ করে সেই সেই জায়গাগুলির তালিকা যেখানে যেখানে তাদের হামলা করার পরিকল্পনা ছিল। এর জন্য অবশ্য হিন্দু সংহতির একজন নেতার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। বাঙালি-অধ্যুষিত হিন্দু সংহতি এবং অবাঙালি-সমর্থিত বিজেপির আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে তিনি এই তথ্যগুলি আমার কাছে ফাঁস করেছিলেন।

আমি তথাগতদার সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তিনি আমাকে আমার তথ্যাদির ওপর নিবন্ধ লিখতে বলেন। আমি লিখি, এবং তাদের দাঙ্গা লাগানোর আগেই আমার লেখাগুলি, জায়গার তালিকা এবং সন্তোষ কুমারের স্বীকারোক্তি সহ প্রকাশিত হয়। ফলত, যদিও সঙ্ঘীরা একাদশীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জনের সম্মতি আদালত থেকে আদায় করেছিল, যেটা রাজ্য সরকার আগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ওদিন মহরম পড়ছে বলে, তা সত্ত্বেও কোনও দুর্গাপূজা কমিটি, এমনকি যারা সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ তারাও, ওদিন প্রতিমা নিরঞ্জন করতে চেয়ে আবেদন করেনি। কয়েক মাস ধরে চাপা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চলার পরেও এবং দাঙ্গার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও দূর্গাপূজা-মহরম পালিত হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবেই। এর পরেই খবরের কাগজগুলিতে আমাকে হিরো বানিয়ে হইচই শুরু হয়, কিন্তু আমি স্পষ্ট করেই বলতে চাই, এ কোনওভাবেই আমার একার কৃতিত্ব নয়, বরং এক যৌথ বিজয়। এই বিজয় অর্জিত হয়েছিল, কারণ যাবতীয় মতাদর্শগত বিভাজনকে পাশে সরিয়ে রেখে আমরা একসাথে কাজ করতে পেরেছিলাম।

ঠিক এই সময়ে, যখন এই লেখাটা লিখছি, সঙ্ঘ পরিবারের আরও একটি দাঙ্গা লাগানোর পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে। তাদের পরিকল্পনা জন্মাষ্টমীর দিন একটি রাম মন্দিরের দাবিতে মিছিল বের করে তা থেকে একটা ভয়ঙ্কর দাঙ্গা লাগানো। ওদের হিসেব, এভাবেই ২০১৯-এ বিজেপির জয়ের রাস্তা পরিষ্কার হবে। কিন্তু ওরা একটা ছোট্ট ভুল করে ফেলেছে। আমাকে গিরিরাজ সিংহের ব্যক্তিগত সচিব ঠাউড়ে মিছিলের কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন এই মিছিলের উদ্দেশ্য ও তাতে নিজেদের ভূমিকা স্বেচ্ছায় আমার কাছে ফাঁস করেছে। আসানসোল দাঙ্গার সময় আমি বাংলায় ছিলাম না, থাকলে এ দাঙ্গা আমি হতে দিতাম না। কিন্তু আমি যখন এসে গেছি ও বাংলাতেই রয়েছি, আসন্ন জন্মাষ্টমীর সময় আর কোনও দাঙ্গা আমি হতে দেব না।

চিত্র পরিচিতি : সঙ্ঘীদের সঙ্গে লেখক

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. জানি। তবু, আরও সহজ করে জানলাম। কথাগুলো জানুক ভারতবর্ষ।

  2. এই সংক্রান্ত প্রথম রিপোর্ট কোন ইংরেজি কাগজের লিঙ্কে পড়ি। তারপরও রাজ্য প্রশাসন কতটা গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপারটাকে দেখেছে জানা নেই।
    এই লেখাটা পড়ে যদি কিছু বাঙালীর চৈতন্যোদয় হয় সেটাও অনেক হবে।
    সম্পাদক মণ্ডলীকে এইরকম দরকারি লেখা প্রকাশের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  3. Shaibal babu bolchilam Malda, Dhatrigram, Dhulagarh, Basihaat riot er kotha bolte apnar ki pant holud hoye jai naki tokhon it cell e chilen na…

আপনার মতামত...