হাঙ্গেরির হৃদয়-হ্রদ বালাটন ও রবীন্দ্রনাথ

কৌশিক লাহিড়ী

 

দেশটার যেকোনও জায়গায় মাটিতে লাঠি ঢুকিয়ে দিলেই নাকি গরম জলের ফোয়ারা বেরিয়ে আসে। আর নানা খনিজে সমৃদ্ধ সে জলের ভেষজ গুণ নাকি অসামান্য। সর্বরোগহর।

সত্যি মিথ্যা জানি না। আমি চেখে বা মেখে দেখিনি।

খনিজ জল ছাড়াও এদের গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। সেন্ট স্টিফেনস ব্যাসিলিকা, ক্যাসেল, ম্যাথিয়াস গির্জা, চেইন ব্রিজ আর দানিয়ুবের ওপারে ওই পার্লামেন্ট ভবনটা। সৌন্দর্যের দিক থেকে দুনিয়ার সেরা সংসদের তকমাটা কিন্তু হাঙ্গেরির এই প্রাসাদটারই। শুনলাম শহরের সবচেয়ে উঁচু বাড়িও নাকি ওইটাই।

এবার এসেছি বুদাপেস্টে। মোহময় নীল দানিয়ুবের দু’ধার জুড়ে অপূর্ব সুন্দর রাজধানী। এদিকের পাহাড়ি দিকটা বুদা, আর ওপারে সমতল পেস্ট। দেশ ছাড়ার আগে, নানা ব্যস্ততায় হোমওয়ার্কটা সেভাবে ঠিক করে উঠতে পারিনি। কিচ্ছু না জেনে, না পড়ে গিয়েছিলাম। আক্ষেপটা সেখানেই। শুধু এটুকুই জানা ছিল যে গ্রামের দিকে যাওয়া হবে। এবং সেই ছুতোয় এদেশটার অন্দরমহলকে একটু ছুঁয়ে দেখা যাবে।

কিন্তু সে অন্দরমহলে যে এমন একটি অভাবনীয় চমক অপেক্ষা করছিল, কে জানত!

বুদাপেস্ট থেকে ঘণ্টা দুয়েকের পথ। পথ বলতে MH7 বা মোটরওয়ে সেভেন। এ রাস্তা জার্মানির অটোবানের মতো অতটা ঝাঁ চকচকে নয়, আর আটলান্টিকের ওপারের ফ্রিওয়ের দানবীয় বিস্তারের সাথেও আদৌ তুলনীয় নয়। বরং অনেকটা স্কটল্যান্ডের মোটরওয়ের মতো। চোখ আর মনভরানো।

বাসের জানলার কাচে নাক ঠেকিয়ে বাইরেটা দেখছিলাম। আদিগন্ত সূর্যমুখী ফুলের ক্ষেত। পথ গিয়েছে তার ভেতর দিয়েই। মেঘলা আকাশকে ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝেই ঝকঝকে রোদ্দুর এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে বিশ্বচরাচর। সে দৃশ্য বর্ণনা করি এমন ভাষা আমার নেই। ভিনসেন্ট হয়ত পারতেন তাঁর রং তুলি দিয়ে।

হাঙ্গেরি দেশটা স্থলবেষ্টিত। ইংরেজিতে যাকে বলে ল্যান্ড লকড কান্ট্রি। কোনও সমুদ্র নেই। তাই লেক বালাটনের কদর ওদের কাছে একটু বেশি। আর সেই কদর, আদর হয়ে কখনও কখনও আদিখ্যেতায় পৌঁছে যায়। হাঙ্গেরি তো বটেই, গোটা মধ্য ইউরোপের বৃহত্তম হ্রদ এই বালাটন। প্রায় দু’হাজার বর্গমাইল আয়তন আর ঈষৎ লম্বাটে আয়তাকার আকৃতি নিয়ে এর বিস্তার আড়াআড়িভাবে, দক্ষিণ পশ্চিম থেকে উত্তর পূর্বে।

গাইড গ্যাবোর বলল, আদতে বালাটন কথাটা নাকি এসেছে একটা স্লাভ শব্দ থেকে। ব্লাতো। বা কাদা অথবা জলাভূমি। জনৈক স্থানীয় স্লাভ রাজা ৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলে একটি দুর্গ আর বেশ কিছু গির্জা তৈরি করেন। জায়গাটার নাম লোকমুখে চালু হয়ে যায় বালাটন হ্রাদ (Balaton hrad)। শুনে চমক লাগল, হ্রদের সাথে শব্দটার মিল শুনে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এই পেল্লায় হ্রদটির কথা জানা থাকলেও সাধারণ মানুষের পা পড়েছে এই সেদিন। তার আগে শুধু হেভিজ আর বালাটনফুরেড এই জনপদ দু’টিই ছিল অভিজাত হাঙ্গেরিয়দের অবসরযাপনের জায়গা। ১৮৬১ আর ১৯০৯ সালে এই অঞ্চলটায় রেলপথ বসে যাবার পর, অবস্থার বদল হল।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষদিকে, ১৯৪৫ সালের শেষদিকে নাজি বাহিনীর সাথে প্রবল লড়াই হয় লাল ফৌজের। ঠিক এইখানে। লাল ফৌজ জিতে যায়। পতন হয় হিটলার তথা অক্ষশক্তির। হাঙ্গেরি চলে আসে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের ছত্রছায়ায়। গত শতকের ছয় আর সাতের দশক। বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অঞ্চলটা। বহু পর্যটকের পদার্পণে বালাটন হয়ে ওঠে সারা ইওরোপের এক প্রধান পর্যটনস্থল। শুধু পূর্ব নয়। ঠান্ডা যুদ্ধে বিভক্ত পশ্চিম থেকেও মানুষ আসতেন এখানে। তেমন কোনও বাধানিষেধ ছিল না, ফলে ঊননব্বইয়ে বার্লিন প্রাচীর পতনের আগে অবধি বালাটনই ছিল দ্বিধাবিভক্ত জার্মান পরিবারগুলির এক অনবদ্য মিলনক্ষেত্র।

সিওফোকে এসে বাসটা থামল। থামল বলাটা ঠিক হবে না। বলা যাক, ভেসে পড়ল। লেকটা এখানেই সবচেয়ে সরু। মাত্র দেড় কিলোমিটার। যদি সর্বাধিক বিস্তার চোদ্দ কিলোমিটার কথাটা মাথায় রাখি তবে একে ‘মাত্র’ই বলতে হবে।

এখান থেকে ফেরি করে বাসসমেত জল পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম তিহানি উপদ্বীপে। ছবির মতো ছোট্ট জনপদ। এখানে একটি গির্জা আছে। আর আছে বাদাসকোনি পাহাড়ের গায়ে গড়ানো আঙুরের ক্ষেত। শুনলাম এখানকার ওয়াইন খুব বিখ্যাত।

বারোক-শৈলীর এই গির্জাটি তৈরি হয়েছিল ১৭৫৪তে। তবে সেই ১০৫৫ সালে এখানে একটি বেনেডিক্ট মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। তার প্রতিষ্ঠা সনদে আজও পাওয়া যায় হাঙ্গেরিয়ান ভাষার প্রথম লেখ্য প্রমাণ।

পায়ে পায়ে উঠে পড়লাম পাহাড়ের ওপরে গির্জার প্রাচীন-প্রাঙ্গনে। সময় যেন থমকে আছে এখানে। ওপর থেকে হ্রদের বিস্তারের একটা আশ্চর্য রূপ চোখে পড়ল। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।

এরপর বালাটন ফুরেড। তখনও জানি না, সেখানে কী বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে।

গ্যাবোর জাবর কেটেই চলেছে। কাউন্টিটার নাম ভেজপ্রেম। মেরে কেটে তেরো হাজার লোকের বাস এখানে। ছোট বড় বাংলো, ভিলা। ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা। গাছের ফাঁকে ফাঁকে হ্রদটা চোখে পড়ছে বারবার, চলন্ত বাস থেকে। রোমানরা বলত, লুকাস পেলসো বা অগভীর হ্রদ। এই পেলসো কথাটাতে আবার আইলেরিয়ান ভাষার ছোঁয়া। সেটা একটি প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। ইওরোপের অন্যান্য ভাষাগুলির চেয়ে হাঙ্গেরিয়ান ভাষার আত্মীয়তাটা এশিয়ার সাথে বেশি। বা ভারতের সাথে। হোটেলে ব্রেকফাস্টের টেবিলে আনারসের বাটির ওপর হাঙ্গেরীয় ভাষায় ANANASZ কথাটা দেখে সেই সন্দেহটাই হয়েছিল।

বাস এসে যেখানে থামল সেখানে সার সার দোকান, ‘স্যুভেনির শপ’। নানা উপহার সামগ্রী, হাঙ্গেরীয় স্মারক, হাতে বোনা টেবিল ক্লথ, টি-শার্ট। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি ক্যামেরার ব্যাগ সামলে ধীরে সুস্থে নামি। এদিকটা বেশ নিরিবিলি। অনেক গাছ। পাখি ডাকছে। যেখানে নামলাম সেখানে একটা কাচ আর কাঠের ছোট্ট ঘর। আর কাঠের বেঞ্চ। বোঝাই যাচ্ছে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করার জায়গা।

নীল আর হলুদ সাইনপোস্টে তিনটি লাইন। প্রথম আর তৃতীয়টি হাঙ্গেরীয় ভাষায়। কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল মাঝখানের লাইনটায়।

Tagore Setany.

সেটানি শব্দটা অচেনা। কিন্তু টেগোর শব্দটা নয়।

গাইড গ্যাবোরের তো জিভ টিভ কেটে অস্থির।

–ইস! খুব ভুল হয়ে গিয়েছে। আমার বলা উচিত ছিল যে মহান ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ টেগোর এখানে এসেছিলেন তাঁর হার্টের অসুখ সারাতে। সেটানি বরাবর হেঁটে চলে যাও। দেখবে জলের ধারে ওঁর একটা মূর্তি আছে। তুমি কি পড়েছ ওঁর কোনও লেখা? কোন ভাষায় লিখতেন উনি?

গ্যাবোরের শেষের কথাগুলো আমার আর কানে ঢোকেনি। সম্মোহিতের মতো আমি হেঁটে চললাম। অথবা ভেসে। বাতাসে ভাসছে অ্যাকর্ডিয়নের সুর। ওদিকে মাছ ধরা শেখার চেষ্টা করছে আমার মতো এক আনাড়ি। জলে ভেসে বেড়াচ্ছে বিরাট বিরাট রাজহাঁস। কয়েকটা বাচ্চা হাঁসগুলোকে খাওয়াচ্ছে।

একটা বাঁধানো আয়তাকার মালঞ্চ। তার একপাশে বাতাবিলেবুর ছায়ায় আবক্ষ রবিঠাকুর। দৃষ্টি হ্রদের ওপারে প্রসারিত। আমি নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটা সাদা মর্মরফলকে লেখা কয়েকটা খুব চেনা শব্দ “তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ, তাই তব জীবনের রথ/পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারম্বার।” ‘শাজাহান’ কবিতা থেকে। অন্যদিকে ইংরেজি আর হাঙ্গেরীয় ভাষায় লেখা, “When I am no longer on this earth, my tree,/Leth the ever-renewed leaves of thy spring”। তারিখ দেওয়া আছে দেখলাম ৮ নভেম্বর ১৯২৬।

ঝাপসা চোখে ঝাঁপ দিলাম অন্তর্জালে। হাত ফোনের হাত ধরে।

কবি হাঙ্গেরিতে এসেছিলেন ১৯২৬-এর হেমন্তে। বুদাপেস্টে একটি কবি সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে। সাথে ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। তেরো বছর আগে নোবেলজয়ী কবি তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। ইউরোপের অন্য দেশের মত হাঙ্গেরিতেও তুমুল জনপ্রিয় তার লেখা। হাঙ্গেরির তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধিকর্তা এবং সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা ডঃ ইমরে লাজারের মতে, কবি তখন আক্ষরিক অর্থেই সুপারস্টার।

বুদাপেস্টে কবিসম্মেলন এবং আনুষঙ্গিক ভ্রমণের ধকলে অসুস্থ হয়ে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে নিয়ে আসা হল এই বালাটন ফুরেডের স্টেট হার্ট হসপিটালে। কবির তখন বয়স ঠিক পঁয়ষট্টি। ভর্তি হলেন ডাঃ স্মিডের অধীনে। রুম নাম্বার ২২০। তিন সপ্তাহ চিকিৎসার পর কবি সুস্থ হয়ে উঠলেন। হাঙ্গেরির শিল্পী এলিজাবেথ ব্রুলারকে একটি চিঠিতে লিখলেন, “আমি পৃথিবীর প্রায় সব দেশই দেখেছি, কিন্তু বালাটন ফুরেডের এই বেলাভূমি, আকাশ ও জলের এমন অপূর্ব ঐকতান উপভোগের সৌভাগ্য আমার অন্তরাত্মাকে উন্মিলিত উদ্ভাসিত করে তুলেছে।”

যে বাতাবি লেবু গাছটির নিচে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তিটি, সে গাছটি স্বয়ং কবি নিজে হাতে এখানে রোপণ করেছিলেন। মূর্তিটি শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের। ১৯৮৩ সালে এখানে স্থাপিত হয়।

আজও এই পার্ক, রবীন্দ্রনাথের নামাঙ্কিত বনবীথি টেগোর সিটানি তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে।

আর আছে সেই হাসপাতালটি। টেগোর সিটানি থেকে অল্প দূরে Geogy Ter, সেখানেই সেই হাসপাতাল। ২২০ নম্বর রুমে আজও সেই বিখ্যাত রোগীটির নামফলক। ১৯২৬-এর হেমন্তে ঠিক যেমনভাবে ছিল, ঘরটি আজও সেইভাবে রাখা আছে।

–তুমি এখানে বসে মোবাইল করছ, আর ওদিকে আমরা তোমাকে খুঁজছি। বাস তো ছেড়ে যাবার সময় হয়ে গেছে।

উত্তেজিত একটা গলা শুনে চমকে উঠলাম। গ্যাবোর। আমাদের গাইড। ও আরও কী সব বলে যাচ্ছে। ওর ঠোঁট নাড়া দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু কোনও কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। নির্বাক যুগের ছবির মতো। স্বপ্নোত্থিতের মতো আমি অস্ফুটে বললাম,

–কিন্তু, হসপিটালটা…

–হসপিটাল? কেন? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?

–নাঃ, চলো। আমি ঠিকই আছি।

আমার আর বালাটন ফুরেডের স্টেট হার্ট হসপিটালটা দেখা হয়নি।

২২০ নম্বর রুমটাও না।

আক্ষেপটা থেকেই যাবে।

আজীবন।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা :

  1. Finding Tagore in Hungary, Viren D’Sa, Hindustan Times, June 21, 2013
  2. A Tagore — Hungary Love Story, Birendra Suri, Business Line, The Hindu, October 10, 2013
  3. ইন্টারনেট।

ছবি :

  1. লেখক।
  2. www.oldIndianPhotos.in
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*