অন্তেবাসী

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

সেই কবে স্বচ্ছ আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্ব ঝাপসা দেখতে শুরু করেছি তার দিনক্ষণ মনে নেই। তবে কি সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তকেই অন্তেবাসী হয়ে যাওয়ার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত ধরে নেওয়া যেতে পারে? এরপর নিজেকে একটু একটু করে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এই প্রচেষ্টাকে বানচাল করে দেওয়ার জন্য নানান ষড়যন্ত্র। টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করিয়ে দেয় সেই আয়নার সামনে। দাঁড়িয়েই থাকি। এই দাঁড়িয়ে থাকাটা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে যাবার অপেক্ষায়। অন্ধকারেই যেন সব কিছুরই মুক্তি ঘটে যায়। শ্বাসরোধকারী ভয় থেকে মুক্ত হয়ে মনে করবার চেষ্টা করি আয়নাতে আমারই প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছিল নাকি অন্য কারও যাকে চিনি না।

দূরের কোনও বাড়িতে সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠলে প্রতিবিম্বে সেই আলোর ছটফটানি। শেষ পর্যন্ত আলো যদি বিন্দুতে পরিণত হয় তখনই স্বস্তি। কেননা খুঁজে পেয়েছি জীবনের উপাদানে কেবলমাত্র যুক্তি থাকে না — কল্পনাও থাকে। এই বিন্দুর মতো আলোর অনুবাদ করতে গিয়ে একসময় নিজেকে হারিয়ে বসি। অন্ধকার ঘরে নিজের কোনও প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠবার কথা নয়। অন্ধকার ঘরে নিজের কোনও প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠবার কথা নয়। বা বাহির যে অন্ধকারে ডুবে আছে তার মধ্যে আমার অন্ধকার অবয়বের প্রতিবিম্ব তুলতে অক্ষমতার মধ্যে গড়ে ওঠে যুক্তিপ্রবণ-কল্পিত সমাজ। একজন নগরের প্রান্তে বসবাসকারীর সভ্যতার এই যুক্তি কোন কাজে লাগবে? কোনও রকম পরম্পরা না মেনেই ক্রুদ্ধ হৃদয়ের অন্ধকারময়তা থেকে যা পাই সেগুলিই হয়ে দাঁড়ায় জীবনের সন্দর্ভ।

যেমন, নিজের বদ্ধমূল ধারণা বরেন্দ্রে চলে আসাও যেন অন্ধকারের মধ্য দিয়েই। প্রথম দিকে ধারণা ছিল লক্ষণ সেন নদীয়ায় বখতিয়ার খিলজির কাছে পরাজিত হয়ে ঢাকা বিক্রমপুরে যখন পালিয়ে আসে তখন আমাদের পূর্বপুরুষ রাজকর্মচারী হিসেবে তার সঙ্গে এসেছিলেন। কিন্তু পরিবারের ইতিহাস এর কোনও হদিস দেয় না। কেবল গয়ার এক পাণ্ডা বলেছিল গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলে আমাদের বসবাস ছিল। কোন সে অঞ্চল, কী বা তার নাম, কিছুই উদ্ধার হয়নি। শেষ পর্যন্ত ধরে নেওয়া হয়েছিল, জটিল এক অন্ধকার ওঁত পেতে ছিল শুরু থেকেই। সেটাই অনায়াসে আমাকে মুক্তি ও একাকীত্বের নির্জনে ঠেলে দেয়।

এমনকি আমাদের কুলদেবতা পূজিত হন ঘোর অমানিশায়। কোনও আলো নেই, অন্ধকার, দেবীমূর্তির দুপাশে দুটি প্রদীপ জ্বলছে। ভালো করলে লক্ষ না করলে বোঝা যায় না এ প্রদীপের শিখা! কিন্তু প্রথম দেখাতেই মনে হবে ভাসমান আলোক বিন্দু — কোনও বিচ্ছুরণ নেই — স্থির আলো যতটুকু দেবতার জন্য বরাদ্দ ততটুকুই। চতুর্দিক নিষ্প্রদীপ। অন্ধকারের গর্ভ থেকে উচ্চারিত মন্ত্রধ্বনি যা শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। তার পরিভাষা বাঁচাও বাঁচাও। যে নারী লুণ্ঠিত মগেদের দ্বারা, মুক্তি চাইছে। কিন্তু আমরা যেন তাকে উলঙ্গ বেশে দেবতা বানিয়ে দিয়েছি নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকবার জন্য। তাই মন্ত্র-উচ্চারণ নিছক ফিসফিসানি ভিন্ন কিছু নয়। এইভাবে পরাজিত হয়ে, সমাজচ্যুত হয়ে পতিত এক রক্তধারা বইছে নিজের মধ্যে। পুজো মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে পূর্বপুরুষ অন্ধকারের মধ্যেই বেরিয়ে পড়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে যদি কোনওদিন থিতু হওয়া যায়। থিতু হতে চাইলেই কি তা হওয়া যায় — এ এক অমোঘ প্রশ্ন। দিনের আলোতে নিজেদের লুকিয়ে ফেলত জঙ্গলে — পতিত এই মুখের জন্য কোনও আলোর প্রয়োজন নেই। সূর্যালোকে ঝলসে উঠত শরীর। অন্ধকারের মধ্যে চলতে চলতে অন্ধকারের শরীর নিয়েছিল এক রূপকায়িত স্বদেশের ধারণা। নিজের তো মনে হয় ক্রমাগত উদ্বাস্তু হতে হতে এখানে। উদ্বাস্তুর কোনও মহান স্বপ্ন থাকে না — সেরকম আমারও নেই। একটি মহান অন্ধকারের ভিতর থিতু হতে চাই। যখন এখানেই স্থিতি তখনই আশ্চর্যভাবে অন্ধকার আয়নায় সেই লুণ্ঠিত নারীর প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে কোনও কোনওদিন। সে দেখা দেয় সপরিবারে। পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে সে আসে তা জানা না থাকায় মশারির ভেতর থেকে তাকে দেখি। একসময় মনে হয় অদৃশ্য এক জালে তারাও আবদ্ধ। এ দেখা শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় এক জালে বন্দি অপর এক জালে বন্দিদের দেখা। ইচ্ছে করে ঘরের আলো জ্বেলে তছনছ করতে। তা না করবার একমাত্র কারণ অদৃশ্য জালে বন্দিরা আমার আত্মীয়। নিষ্ক্রিয়তাই যে অমোঘ প্রতিরোধ।

ইতিহাসের নিষ্ঠুরতার খপ্পরে পড়তে হয়েছে বারবার। চরম অস্থিরতা জন্ম নিয়েছে যে কখন তা বুঝে উঠতে না পারার ফলে শুরু হয় স্বাভাবিক দিনযাপন। চিহ্নিত করতে হয়েছে সময়ের বিপজ্জনক অস্তিত্বকে। এ কোনও অনুসন্ধান নয়। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া মাত্র।

বরেন্দ্রে কোনওরকম প্রমাণ ছাড়াই প্রচলিত, তা যেভাবে ছিল সেভাবেই থেকে গেছে। আমার এক পূর্বপুরুষের ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল দিবানিদ্রার তারই ছোটছেলে। সে সবেমাত্র ‘া’ শিখেছে। ‘ই’ পর্যন্ত শিক্ষা হয়নি। প-এ আকারে পা, য়-এ আকারে য়া, র-এ আকারে রা পায়ারা নয়, পেয়ারা খাবি-তে চল বন্ধুদের ডেকে এনে পেয়ারাগাছে উঠেছিল। নিদ্রা ছুটে যায় ছেলেদের হল্লায়। তরতরিয়ে গাছে উঠে মগডাল থেকে ছুঁড়ে ফেলেন নিজেরই ছেলেকে। সন্তানের মৃতদেহ ঘিরে স্ত্রীর কান্না ছাপিয়ে বড়ছেলেকে হুকুম করেন পাঁজিটা নিয়ে আসবার জন্য। মৃত কোনও গ্রহনক্ষত্রের দোষ পেয়েছে কিনা শুধু তা দেখবার জন্য না, তিনি দেখেন অশৌচের কাল শেষ হলে গর্ভসঞ্চারের কোনও দিনক্ষণ আছে কিনা। আছে। তারপর নির্লিপ্ত ঘোষণা : ‘তোমার ছোটখোকা আবার ফিরে আসবে আগামী শুক্লপক্ষে তোমারই গর্ভে।’

সেই ছোটখোকাকে তারই বংশধর আমার ঠাকুর্দা কুয়োতলায় দেখে ফেলেন। পেয়ারা দেখিয়ে ডাকছে পেয়ারা খাবার জন্য। আসলে ওই গাছের পেয়ারা পাখপাখালি খায়, বাড়ির কেউ দাঁতে কাটে না। পাকা পেয়ারার সুবাস এতটাই থিকথিকে মনে হয় কেউ প্রাচীর তুলে দিয়েছে। ঠাকুর্দা এক ছুটে রেললাইন ধরে হাঁটতে শুরু করেছিলেন। সম্ভবত এ ঘটনা ১৮৭৮-এর পর। নীলফামারি সাবডিভিশন ১৮৭৫-এ। ঠাকুর্দার চলে আসা ব্রিটিশ ভারতের অধীনে নীলফামারির ধোবাডাঙ্গা জমিদারি সেরেস্তায় কাজ পাওয়ায়। জমিদারির মধ্যেই পড়ে নীলসাগর। যা বিরাটরাজা খনন করেছিল তার গরুদের জল খাবার জন্য। আমরা অবশ্য বৈশাখী পূর্ণিমায় ওখানে স্নান করতাম। জলে ডুব দিতাম কিছু না ভেবে প্রথম প্রথম — পরে জলের তল পাবার আকাঙ্খায়। যখন জানলাম এই জলস্তর পেরিয়ে আরও অনেক জলস্তর আছে, সেখানে পৌঁছাবার কোনও দরজা নেই, কল্পিত এক দরজা জলের গভীরেই আছে ভেবে নিয়ে দমবন্ধ হয়ে মরে যাবার উপক্রম হলে ভেসে উঠি।

কিন্তু ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে মায়েদের মৃত সন্তানের উদ্দেশে দীঘির জলে দুধ ঢালা — সেই দুধ সরলরেখায় দীঘির গভীরে চলে যেত। যেন দীঘির তলদেশে এই সব মৃতরা আছে, সেই তলদেশ অবধি পৌঁছেছিলাম একবার। আমার পিঠোপিঠি এক ভাই ছিল — সে নেই। সে বোধহয় অন্য জলস্তরে যাবার রাস্তা খুঁজে পেয়ে গেছে — আর আমি পেলাম না। এই হতাশাই আমাকে প্রশ্ন করতে শেখায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে। আমার ঈশ্বর এমন একজন হতে পারে, যে আমার সব যন্ত্রণাকে বুক পেতে নিতে সক্ষম।

তাই আমি সেই নারীর অপেক্ষায় থাকি প্রতি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে। যেন তার আঙুলের যাদুতে ফুটে উঠবে পৌষের রাতে আলপনা। এ আলপনা তো বৃত্তের খেলায় মেতে ওঠা। আমি সেই যাদুবৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছতে চাই।  সেখানেই তো গতি ও স্থিতির মিলিত সত্তা।

এদিকে প্রতিবিম্বহীন আয়না অন্ধকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্ধকারে মিশে যায়।

(ক্রমশ)

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*