পায়ে পড়ি বাঘমামা — আবার

তিষ্য দাশগুপ্ত

 

অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়িতেছে বাহিরে, দূর পার্বত্যমালার আলোকরাশির প্রতি অপলক দৃষ্টে চাহিয়া আছি কোনও এক অলস শনিবাসরীয় সায়াহ্নে। ষষ্ঠ মাসাধিককাল অতিক্রান্তপ্রায়, তবু মনের কোনও গহীন প্রান্ত হইতে ক্ষণে ক্ষণে ভাসিয়া আসে সেই রুক্ষ শুষ্ক অরণ্যভূমির বনচারীদের কথা, নাথুলাল দাহিয়ার কথা, বিদায়কালে বনপ্রহরীদের অশ্রুসিক্ত মুখগুলি হঠাৎই ভারাক্রান্ত করিয়া তোলে মনকে।

না পাঠক, আমি নিমিত্ত মনুষ্য মাত্র, নিজ অক্ষমতা ঢাকিতে কমলাকান্তর বিড়ালখানি ধার করিয়া ভাবিয়াছিলাম মস্ত বড় এক বাঘ মারিলাম। সে বিড়াল বিদায় লইয়াছে কোন কালে, দেহরাদুনের আবহাওয়া তাহার সহ্য হয় নাই, আমার সাহিত্যিক হইবার ভূতখানি সঙ্গে লইয়া সে নিজ শহরের সেই বহুতলের নিচে আশ্রয় লইয়াছে — আমিও নিজ ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত হইয়া কলমখানি পাশটিতে রাখিয়া হেড আপিসের খাজাঞ্চিবাবুর ন্যায় কম্পিউটার যন্ত্রের কী বোর্ড সচল রাখিতেছি দিবারাত্র। তবু কখনও কখনও সেই সজল মুখগুলি মনে পড়িয়া যায়, দূর কোনও অরণ্যের অন্তর হইতে ভেসে আসে করুণ আর্তিখানি — কবে আসবে আবার?

নাহ, পূজার মরশুমে আপনাদিগের মনে করুণরসের সঞ্চার করা আমার উচিত কার্য নহে, পরের কথা পরে তোলা থাকুক — আপাতত আজ্ঞা করুন, বেড়ালখানি বগলদাবা করিয়াই এপ্রিল মাসের কোনও এক তপ্ত দুপুরে দেহরাদুন হইতে সোজাসুজি উপনীত হই মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপাল নামক জনপদে — সঙ্গে দুই বালা, একজন রাজস্থান নিবাসী, অপরজন রাজধানী শহরের সুবেশী সুকেশী তরুণী। এস্থানে আসিবার উপলক্ষ বনঅধিকর্তাদের সেলাম জানানো মাত্র, হুজুর… বান্দা উপস্থিত, এখন হুকুম করিলেই হয়।

দেখিয়া শুনিয়া চোখে ধাঁধা লাগিয়া যায়, বনদপ্তরের বড় ছোট মেজ সকল কর্তাব্যক্তি কী উদ্যমের সহিত কার্যে রত, কোথাও সামান্য আলস্যটুকু নাই — অবলা জীবগুলির প্রতি এই স্বতঃস্ফূর্ত কর্তব্যবোধ দেখিয়া আপনি শ্রদ্ধায় মাথা নত হইয়া যায়। নীল সাদা উড়ালপুলের খণ্ডগুলি একত্র করিতে করিতে মার্জারের চোখের কোণখানি হয়তো বা চিকচিক করিয়া ওঠে, লালগড়ের হতভাগ্য আত্মীয়ের কথা স্মরণ করিয়া হয়ত, তাহাকে বুঝাইতে বেশ বেগ পাইতে হয় যে সর্বনাশা রানির দেশে ছাত্রের পিঠে গরম সীসের দাগটি এখনও স্পষ্ট, সে স্থলে একখানি বিড়ালের জ্ঞাতির মৃত্যু রাজ্যচালনায় কীই বা পরিবর্তন আনিতে পারে!

যাহা হউক, মাথায় থাকুক নবান্ন, উহাকে পশ্চাতে ফেলিয়া কর্মকর্তাদের সবুজ সঙ্কেত সহিত যাত্রা করা গেল বান্ধবগড় জাতীয় উদ্যানের অভিমুখে — বান্ধবগড় — যেখানে দক্ষিণরায় নিরাশ করেন না কোনও পর্যটককেই, ছোট বড় মাঝারি নানা প্রকারের নানা আকারের বাঘ বিচরণ করিতেছে প্রায় ১৫০০ বর্গ কিমির বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়িয়া, তাহার কলিজা ঘেঁষিয়া শ্যোন নদী বহিয়া চলিয়াছে আপন গরিমায়।

আকারে প্রকারে অতি ক্ষুদ্র একখানি জনপদ তালা এই বনানীর প্রাণকেন্দ্র, যাহার চাবি লইয়া অধিষ্ঠান করেন এ অঞ্চলের হর্তা কর্তা বিধাতা — স্বয়ং এই পরিক্ষেত্রের সঞ্চালক। ছোট বড় বিঘে দুই তিন জমি লইয়া পনেরো বিশখানি গ্রাম সুখে দুখে দিন গুজরান করিতেছে এ অরণ্যভূমির অভ্যন্তরে, কখনও বনবিবির সখ্যতা কখনও বা চরম সংঘাত — দারিদ্রের সহিত প্রতিনিয়ত এক অসম ছায়ার লড়াই, ইহা সব লইয়াই তাহাদের জীবনের নিত্যনৈমিত্ত।

তালা নামক স্থানটি অতীব ক্ষুদ্র বটে, কিন্তু বিপুল পরিমাণ পর্যটকের নিত্য আনাগোনার দরুণ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সমস্ত উপকরণ উপলব্ধ এ স্থানে — অক্টোবর হইতে এপ্রিল পর্যন্ত পর্যটকের আনাগোনার সাথে ছন্দ মিলাইয়া চলে এ অঞ্চলের দিন গুজরান। তৎপরে বর্ষারানির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ঘুমাইয়া পড়ে জঙ্গল, দিন আনি দিন খাই মানুষগুলির রুটি রুজি বলিতে সামান্য কিছু খেতিবাড়ি, জমিজিরেত — অথবা কাহারও শুধুই বা নিরন্তর অপেক্ষা, ঘরের দুয়ারে অপেক্ষারত অনেকগুলি ছোটবড় মুখ — এত দুঃখ কষ্টেও মুখে হাসি লাগিয়া আছে তাহাদের সর্বসময়।

দেখিতে দেখিতে দিন বহিয়া যায় আপন গতিতে, চক্রধারা ময়দানের কোল ঘেঁষিয়া বান্ধবগড় দুর্গ হাতছানি দেয় — আইস, ইতিহাসের পথে বিচরণ করি দুইজনে, হাতে হাত রাখিয়া। দেখ, এই সেই স্থান — কবে কোন আমলে শ্রীরামচন্দ্র তাহার ভ্রাতা লক্ষণকে উপহার দেন এই দুর্ভেদ্য দুর্গখানি, ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন স্বরূপ। দেখ, দুচোখ ভরিয়া দেখ — এই সেই ঘোড়াশালে ঘোড়া, হাতিশালে হাতি — আরও কয়েক শো বৎসর উত্তরে ওই দেখ বসিয়াছেন বাঘেল সম্রাট তাহার রাজদরবারে, বিচার চলিতেছে বোধ হয়। বড় নিদারুণ সেই হতভাগ্যের অন্তিম পরিণাম, শাস্তি পর্বতের প্রান্ত হইতে অর্ধচন্দ্র প্রদান, মৃত্যুপথযাত্রী দুর্ভাগার অন্তিম আর্তনাদ মিলাইয়া যায় রাজার পাশবিক উল্লাসে। বান্ধবাধীশ মন্দিরের সদাজাগ্রত বিগ্রহের আশীর্বাদ লইয়া রাজা সখীদিগের সহিত জলকেলি করিতে নামেন রানিপুকুরে, কখনও বা বাকি একাদশখানি জলাশয়ের কোনও একটিতে। এই যে নৃসিংহ অবতারের মূর্তি দেখিতেছ, স্বয়ং সম্রাট ঔরঙ্গজেবও তাঁহার গৌরবে কালিমালেপন করিতে সক্ষম হন নাই, শ্রী বিষ্ণুভগবানের দ্বাদশ অবতারের মূর্তি ছড়াইয়া রহিয়াছে এই দুর্গে — কখনও কুর্ম, কখনও বরাহ কখনও বা শেহশাইয়া নামে স্বয়ং তিনি অনন্তনাগের উপরে অবস্থিত, রাত্রের অন্ধকারে পরম শান্তিতে সেখানে খেলা করে ব্যাঘ্রশাবকেরা, অনতিদূরে মাতা তাহাদের নিশ্চিন্তে শয়ান। ধর্মের ভিত্তিতে বর্ণের ভিত্তিতে বিভক্ত এই সমাজে ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতরাজের আধিপত্য সেই প্রাচীনকাল হইতে আজও অমলিন। আজও এই জনপদে দাহিয়া বৈগা প্রভৃতি তথাকথিত জাতির মানুষ পণ্ডিতদের ভয়ে তটস্থ হইয়া থাকে। মনে পড়িয়া যায় সেই হতভাগ্য কর্মঠ যুবকের কথা, জঙ্গলমহালের কোনও এক আপিসে কম্পিউটার যন্ত্রচালনায় পারদর্শী ছিল সে, অপরাধ তাহার কেবল একখানি, ভালোবাসিয়াছিল সে.. নিম্নবর্ণের যুবকটিকে পণ্ডিত মেয়েটি বিবাহ করিয়াছিল সম্পূর্ণ আইন মানিয়া, তবু………

“তোমাকে নিয়া এই হইয়াছে এক সমস্যা, সময়ে সময়ে নিজেকে সমাজসংস্কারক বিদ্যাসাগর ভাবিয়া বস, লিখিতে বসিয়াছিলে বাঘের কাহিনী — তাহা মাথায় উঠিয়াছে, এখন সমাজের দুঃখ কষ্ট বেদনা লইয়া নিজেকে কথাসাহিত্যিক প্রতিপন্ন করিতে চাহ।” শরৎ চাটুজ্জে মহাশয় পূজ্য ব্যক্তি, তিনি মাথায় থাকুন — অবোধ মার্জারের দোষ নাই, আজকাল মহুয়ার ঘোরে কখন যে কী বলিয়া বসে তাহা মা গঙ্গাই জানেন। দুগ্ধ এখন তাহার আর মুখে রোচে না, মহুয়ায় মাতাল মন কখনও কখনও নিয়ে চলে অরণ্যের সেই দিবারাত্রের কাব্যে, ঘন জঙ্গলের মধ্যে মনে পড়িয়া যায় সেই মেয়েটির মুখ, প্রখর রৌদ্রের আঁচলে মুখ ঢাকিয়া গুটিকয় গবাদি পশু চড়াইতে আসে গ্রামের প্রান্তে — এছাড়া জীবিকা বলিতে কিছু মহুয়া ফুল সংগ্রহ, আর কিছু বা তেন্দুপাতা — জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশের জন্য বেশ ধমক খাইতে হইল তাহাকে সেইদিন, ত্রস্ত হরিণীর মতো পলায়মান সেই মেয়েটির দিকে তাকাইয়া নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হইল সেইদিন। জঙ্গলের মধ্যে পাতায় ছাওয়া ছোট ছোট গ্রামগুলি, অথচ আধপেটা খাওয়া মানুষগুলির আতিথেয়তার অন্ত নাই, সামান্য সম্বলটুকু উজাড় করিয়া দিয়া বুকে টানিয়া লয়। অবোধ মার্জারকে বুঝাইতে পারি না, নিয়ন আলোয় সুসজ্জিত আধুনিক শহরের ইট কাঠ পাথরের শবদেহে এ আন্তরিকতা কোথায়! বুক ভার করা আবেগ লইয়া ঘন হয়ে আসা স্বরে কেউ তো কখনও ডাকিল না, “আবার কবে দেখা হবে?”

এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান আশা ভরসার কেন্দ্রস্থল মানপুর নামক ছোট্ট এক জনপদ। গুটিকয় দোকানপাট ঘরগেরস্থালির কাব্য, এছাড়া একখানি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কিছু জীবনের কোলাহল — শুক্রবারে হাট বসে ছোট একখানি। দূর দূরান্তের মানুষের আনাগোনায় মুখরিত হইয়া থাকে গোটা দিনখান, আর নিশুতি রাত ঘন হইয়া আসে বাঘের গর্জনে।

হঠাৎ প্রবল কোলাহলে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হওয়ায় যারপরনাই বিরক্ত হইয়া উঠি। নেশা কাটাইয়া চোখ কচলাইয়া দেখিতে পাই মার্জার বলিতেছে, “”এই হইয়াছে তোমার সবথেকে বড় সমস্যা। কোথায় শান্তিতে বৃক্ষছায়ে বসিয়া মনোরম অপরাহ্ন উপভোগ করিবে, মৃদুমন্দ বাতাসের হালকা আমেজ আস্বাদন করিয়া আপন পাত্রে দুই তিনখানি তৃপ্তির চুমুক মারিবে — তাহা নহে, নিজেকে মস্ত হনু ভাবিয়া বস.. অকারণে ভারতবাসীদিগকে গালমন্দ করিতে থাক। দেশের সৈন্যগণ সিয়াচেন নামক দুর্গম স্থানে কাঁপিতে কাঁপিতে ভারত নামক দেশকে রক্ষা করিতেছে, আর তুমি কিনা জুকু সাহেবের আনুকূল্যে আপন দেশোয়ালি ভ্রাতৃদিগকে গালমন্দ করিয়া ভাবিলে মস্ত বড় এক বাঘ মারিয়াছি।” এতদূর বলিয়া একখানি দীর্ঘশ্বাস ছাড়িল মার্জার। একে তো মধ্যপ্রদেশের অহেতুক তপ্ত পরিবেশ, তাহার দোসর এই মহাপণ্ডিত মার্জারকূলশিরোমণি। ইচ্ছা করিল উহাকে আচ্ছা করিয়া প্রহার করি, কিন্তু অহেতুক হিংসা আমার ধর্মে নয় — তাহা সে অবোধ মার্জার হোক অথবা নির্বোধ বিহারী। অকারণ রক্তপাতে কাজ নাই ভাবিয়া মহুয়ার পাত্রে চুমুক মারিলাম। মার্জারের বিরাম নাই, নেশাতুর অভব্য বিড়ালের জ্ঞানপ্রদানের পর্ব এখনও শেষ হয় নাই, উহাকে অগ্রাহ্য করাই শ্রেয় অতএব। গতকল্য রাত্রে যখন পানের মাত্রা একটু অতিরিক্ত হইয়া গেল তখন চাঁদের আলোয় অনুপম রায়ের সুরে একখানি কবিতা লিখিয়া ফেলিয়াছিলাম — শোনাইবার বিশেষ ইচ্ছে ছিল না কিন্তু মার্জার ছাড়িবার পাত্র নহে, অতএব শুরু করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম।

আমার কোনওরূপ ধারণা ছিল না বিড়ালের পূর্বপুরুষ দুধ ডিম সংগ্রহার্থে পশ্চিমবঙ্গের বাহিরে আপন বুদ্ধিবৃত্তিকে সেই আকবর বাদশাহের আমল হইতে বন্ধক রাখিয়া বসিয়া আছে, জানা থাকিলে আমি এ কবিতার অবতারণা কদাপি করিতাম না। শুনিয়া খানিক গম্ভীর হইয়া কহিল, “আরও কিছুটা শুনাও দেখি, তোমার কাব্যপ্রতিভা প্রজ্জ্বল হউক।” আমি আধুনিক শহরের নিতান্ত সাদাসিধে সেকেলে মানুষ — নরেন মুদি আর সারকাজমের তফাৎ বুঝি না বিশেষ, অতএব উৎসাহিত হইয়া বলিলাম.. “এই অংশটি বেড়ে হইয়াছে, শুনিয়া বিচার কর দেখি”….

“থামো হে নির্বোধ মনুষ্য” — ঝাঁঝিয়া উঠিল মার্জার। অতঃপর গতকাল হইতে সেই যে ডিমনিটাইজেশনের সুফল আর যোগী আদিত্যনাথের ফরেন পলিসির গুণপনা কীর্তন শুরু হইয়াছে এখনও থামে নাই। তাহা সে কী লিখিয়াছিলাম, কেনই বা লিখিয়াছিলাম  — অহেতুক বিতর্কের স্ফুলিঙ্গ জ্বালাইয়া আর কাজ নাই। আপনি বুদ্ধিমান বিচক্ষণ পাঠক, যাহা মনে চান ভাবিয়া লইতে পারেন। তবে মন বলিতেছে শীঘ্রই তাহার সহিত তাহার বোনপোর দর্শন হইবে, সেই রোমহর্ষক কাহিনী শুনাইতে আবার আপনাদের সম্মুখে ফিরিয়া আসিবার সম্যক ইচ্ছা রাখি। আপাতত, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় চড়িয়া মা আগতপ্রায়, সবার পূজা শুভ হউক, মঙ্গলময় হউক।

শুভ শারদীয়া।।

পুনঃ — ঐ যে কহিলাম — আবার আসিতে পারি…

পুনঃপুনশ্চ – গতবার যাহা প্রলাপ বকিয়াছিলাম…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*