খেলা

নাহার তৃণা

 

১।

–তুরা না ইন্ডিয়া য্যাসছিসগে, ঢাকা কলেজ ক্যান যে ত্যালি ভর্তি হতি গেলি রঞ্জু! এহেবারে ইন্ডিয়া গিয়ে ভর্তি হলি তো ঝঞ্জাট কম হত তুগের, তাইনে?

রঞ্জুর পরিবারের আদৌ ভারত যাবার কোনও সম্ভাবনা না থাকলেও ধর্মীয় বৃত্তে আটকে থাকা কিছু মানুষ সময়ে সময়ে বর্ডার পার করে দেবার মহৎ উদ্দেশ্যে বহুদিন থেকেই এমন মনগড়া পরিকল্পনায় অযাচিতভাবে ওদের সামিল করে নেয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ আর রাজনৈতিক কূট চাল যে এসব মনগড়া কথায় ফুসমন্তর দেয়, সেটা বলাই বাহুল্য। যে কারণে মাহতাবউদ্দিনের মুখ নিঃসৃত বাক্যে খুব একটা বিচলিত মনে হয় না রঞ্জু নামের শ্রোতাটিকে। বরং বহুচর্চিত বাক্যের সাথে তার ভর্তির খবরটা জুড়ে বসতে শুনে কেমন একটা কৌতুক রঞ্জুর চোখে ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে যায়। বহু সাধনায় মনের কথা হাবেভাবে প্রকাশ না করবার নির্লিপ্ত ভাব সে আয়ত্ত করেছে। প্রতিকূলতা বিবেচনায় না এনে ক্ষণিকের ভাবাবেগে অনুভূতির প্রকাশ যে বোকামি, এ সত্যিটা রঞ্জু শুধু না, তার গোটা পরিবার বড়সড় মূল্য দিয়েই জেনেছে। এখন তাই এসব প্রশ্নকে ওরা সযত্নে পাশ কাটায়। তাছাড়া স্মৃতি ফুঁড়ে অতীতকে সামনে দাঁড়াতে দেবার মতো ইচ্ছা বা সময় রঞ্জুর হাতে নাই এ মুহূর্তে। জাগরণীর দিকে যাবার পথে এভাবে মাহতাবের খপ্পরে পড়ে যাবে ভাবেনি। কতক্ষণ ব্যাটার ভ্যানতারা শোনা লাগে কে জানে! আড়চোখে হাত ঘড়িটা দেখে নেয় রঞ্জু। আটটা বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি এখনও।

মনে মনে বিচলিত রঞ্জুর অবয়বে কোনও রকমের অস্থিরতা ফুটে উঠতে না দেখে হতাশ ও নাছোরবান্দা অভয়নগর পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স শাখার প্রভাবশালী পাণ্ডা মাহতাবউদ্দিন মিয়া রঞ্জুকে আরও খানিকটা খোঁচানোর উদ্দেশ্যে তার পান বিড়ির ছোপধরা বিচ্ছিরি দাঁতে ততোধিক বিতিকিচ্ছিরি একটা দেঁতো হাসি ঝুলিয়ে দ্বিতীয় দফা মুখ খোলে। এবার প্রশ্নের দিকে যায় না মাহতাবউদ্দিন। সরাসরি মতামত দেয়া শুরু করে।

–তোর বড় বুন্ডি, জ্ঞাতিগুষ্টি সবই তো ইন্ডিয়ায়। ভালো হবি তুগের জন্ন্যে, সবাই একসাথ থাকতি পারবি। চারিদিহিরে কিরাম এট্টা অরাজক কারবার শুরু হইয়্যেসে। হুটহাট ছাওয়ালপাওয়াল গুম, ক্রসফায়ারে মৃত্তুর ঘটনা। কতি তো পারিনে কার মরণ কুনডে। ইন্ডিয়াই নিরাপদ তুগের জন্ন্যে।

উত্তরের আন্তরিক প্রত্যাশা প্রসূত প্রশ্নের কিছু একটা উত্তর দেয়ার বাধ্যবাধকতা হয়ত থাকে। কিন্তু যেসব প্রশ্নের পেছনে উত্তর পাওয়ার চেয়ে উত্ত্যক্ত করার অসৎ উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে সেখানে উত্তরদাতার নীরব থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। বয়সের তুলনায় রঞ্জু যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছেলে, স্বল্পবাকও। মাহতাবের আপাত নিরীহ কথার শেষ মোচড়ে ঘাপটি দিয়ে থাকা বিষাক্ত আঁচ রঞ্জুকে আরও খানিকটা সতর্ক করে দেয় যেন। যে কারণে বড় বোন ঊর্মিমালার শ্বশুরবাড়ি কলকাতা হলেও বিয়ের পরপরই ঊর্মিমালা যে তার ডাক্তার স্বামীর সাথে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বহুদিন যাবত, এই সর্বজন জ্ঞাত বিষয়ে নতুন করে কিছু বলবার আগ্রহ দেখায় না রঞ্জু।

আরেকবার ঘড়িতে আলতো চোখ বুলিয়ে, নির্লিপ্ত ভঙ্গিটা ধরে রেখে এই প্রথম রঞ্জুর এঁটে থাকা ঠোঁটজোড়া মাহতাবউদ্দিনের উদ্দেশ্যে নড়ে ওঠে।

–দেখা যাক চাচা, কী হয়। দোয়া রাখবেন। এখন যেতে হবে যে চাচা?

–সে তো নিসচয়। তা ক্লাবঘরের দিকে যাতিছিস, তাইনে? বিশ্যাল নয়া টিবিতে খেলা দেখপার মজাই আলাদা! তুগের জন্ন্যে কত কারবার করি বায়ন্ন ইনসির টিবি কিনসু সে যদি…

মুখের কথা শেষ না করেই মাহতাবউদ্দিন রঞ্জুর পেছনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা শরীরদুটোকে এতক্ষণে গ্রাহ্যে নেবার আগ্রহে পূর্ণ দৃষ্টি ওদের দিকে মেলে ধরে। মাহতাবউদ্দিনকে মোটামুটি রাজনীতির ভালো জাতের খেলোয়াড় বলা যায়। তুখোড় হবার দীক্ষায় বড়ভাইকে গুরু মানে সে মনে মনে। কখন কার দিকে নজর ঘুরিয়ে কথা বলা দরকার সেটা মাহতাবউদ্দিন ঢাকার প্রভাবশালী জনৈক এমপি বড়ভাইয়ের কাছ থেকে ভালোই রপ্ত করেছে। শফি, বদি  রঞ্জুর ন্যাংটাকালের বন্ধু। রঞ্জুর সাথে ওরা প্রায় ছায়ার মতো লেগে লেগে থাকে। এ দুটোকে রঞ্জুর পাশ ছাড়া করা গেলে তার কাজটা বেশ সহজ হয়ে যায়। নইলে কেটে রাখা ছকে ওদেরও সামিল করা লাগবে। তাতে সমস্যা হয়ত খানিকটা হবে, কারণ শফি, বদির বাপ চাচা আইন ব্যবসায় জড়িত। সন্দেহ জাগলে ছেড়ে কথা কবে না তারা। অবশ্য সেসব সামাল দেয়াও খুব কঠিন কাজ না এ দেশে। ক্ষমতা থাকলে দিনকেও রাত বলে চালিয়ে দেয়া সম্ভব। সরকারি বা বিপক্ষের অনেক প্রভাবশালী লোকের কাজেই মাহতাবউদ্দিন লাগে। তার বিনিময়ে খানিক সাহায্য সে আশা করতেই পারে। তবে অত দৌঁড়ঝাপের প্রয়োজন পড়বে না তার। সমস্ত ঝক্কি সামলানোর জন্য আপাতত ঢাকার এমপি বড়ভাই যথেষ্ট।

–তা তুগের কোন দল, আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল?

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই যেন এ দুটো দলকে অবধারিতভাবে সাপোর্ট করা লাগবে। তার প্রশ্নে ওদের মুখে মেঘের আড়াল ভেঙে হঠাৎ দেখা দেয়া রোদের মতো চিকন একটু  হাসি ফুটে ওঠেই মিলিয়ে যেতে দেখা যায়। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কেউ কিছু বলে না।

–খেলা শুরু হতি ত দেরি ন্যেই। জলদি পা চালায়ে যা দিনি। আমি বাজারের দুকানথে তুগের সপের জন্য গরম গরম জিলাবি আর চায়ের ব্যবস্থা করতে পারি কিন্যা দেখি, বুছস্য?

স্বাভাবিকভাবেই খেলা দেখবার চেয়ে এ মুহূর্তে অন্য কিছু বুঝতে চাওয়ার আগ্রহ দেখা যায় না রঞ্জু কিংবা এতক্ষণ ওর পেছনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা শফি বা বদিউলের মধ্যে। মাহতাবউদ্দিনকে সালাম জানিয়ে ওরা দ্রুত ক্লাবের উদ্দেশ্যে পা চালায়।

২।

–শালা একটা আখাস্তা হারামি! নিশ্চিত কোনও ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে বিশাল স্ক্রিনের টিভি, জিলাপি-চায়ের টোপ ফেলা।

দ্রুতলয়ে হাঁটতে থাকা শফি মনের ক্ষোভ জানান দেয়।

–সে আর বলতে। ও ব্যাটা ফায়দা ছাড়া এক পা নড়ে নাকি! কিন্তু এক্ষেত্রে হারামির মতলবটা কী হতে পারে?

প্রশ্নটা বদি দুজনের মধ্যে ঠিক কাকে করে সেটা স্পষ্ট হয় না।

এতক্ষণ চুপ থাকা শফি আর বদি’র কথোপকথন রঞ্জুর মধ্যে কোনও হেলদোল আনে না। সেও ওদের সাথে দ্রুত পা চালাতে চালাতে কিছুর একটা হিসাবনিকাশ মেলানোর চেষ্টায় নিজের মধ্যেই কেমন ডুবে থাকে।

ক্লাবঘরে এসে রঞ্জুরা তিনজনে খানিক ভড়কে যায়। আজকের ম্যাচে এত মানুষ হবে ওরা ভাবেনি। সচরাচর আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের খেলা থাকলে সেদিন ঘরে তিল ধরার জায়গা থাকে না। আজ সেরকমটা না হলেও প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মানুষ জুটেছে। তারই মধ্যে সবুর, রাশেদকে ওদের জন্য জায়গা দখলে রেখে বসে থাকতে দেখে রঞ্জুর কেমন একটা লাগে, তবে খুব অবাক হয় না। অন্যদিন রঞ্জুরা বেশ আগেভাগে চলে আসে। যদিও শুরুর খেলাগুলো রঞ্জুরা তিন বন্ধু বাড়িতে বসেই দেখেছে। রাশেদদের পীড়াপীড়িতে এখন ওরা ক্লাবে খেলা দেখতে আসছে। সাধারণত এখানে যে আগেভাগে আসবে সে জায়গা পাবে। আগে থেকে অন্যের জন্য জায়গা রাখবার নিয়ম নাই। কিন্তু রঞ্জুদের জন্য রাশেদরা ঠিকই জায়গা বরাদ্দ রাখে, আর এটা নিয়ে কেউ টু শব্দও করে না। উড়ে আসা কেমন লাগাটা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের জন্য বরাদ্দ জায়গায় বসতে বসতে রঞ্জু, শফি আর বদির দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘরের ভেতরটায় চোখ বুলিয়ে নেয় একবার। বদি কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে ওঠে —

–আজ বেশ কিছু অচেনা মক্কেল দেখা যাচ্ছে। এরা এল কোত্থেকে!

বিশাল টিভি পর্দায় ততক্ষণে আজকের নির্ধারিত দু’দলের খেলোয়াড়দের সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যার যার দেশের জাতীয় সঙ্গীতের পালা চুকিয়ে খেলা শুরু হল বলে। রঞ্জু খেয়াল করে আজও ওদের জন্য জায়গা রাখা নিয়ে আশেপাশের কেউ কোনও অভিযোগের ফুটকি কাটল না।

রঞ্জুর বাবা জয়েশ্বর রায় অভয়নগরের বেশ পসার জমানো ডাক্তার হবার সুবাধে প্রকাশ্যে বাড়তি খাতির পায় যেমন আড়ালে তেমন নানান হুমকি ধমকিরও কমতি হয় না। প্রায় প্রায় ক্লাস এইট পড়ুয়া ছোটবোন শর্মিমালার উদ্দেশ্যে নানান উড়ো চিঠি পড়ে বাড়ির উঠানে। তাকে যে কোনও সময় উঠিয়ে নেবার হুমকিসহ নানান কুৎসিত কথা লেখা থাকে সেসব চিঠিতে। একইভাবে বড়বোন ঊর্মিমালার উদ্দেশ্যেও চিঠির ঢিল পড়ত উঠানে। যে কারণে মেধাবী ঊর্মিমালার পড়াশোনার পাট চুকে যাবার আগেই কলকাতাবাসী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে আসা সম্বন্ধে তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। রঞ্জুর বাবার এমন হুট বিয়েতে সায় ছিল না। মেডিক্যাল প্রথম বর্ষে পড়ুয়া বড় ছেলে মঞ্জুর অপঘাতে মৃত্যু তাঁর স্ত্রীর মনে সন্তানদের নিয়ে দারুণ ভীতি সৃষ্টি করায় মেয়ের বিয়ে নিয়ে আর তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। তাঁর পক্ষ থেকে বিয়ের একটাই শর্ত ছিল, বিয়ের পর মেয়েকে যেন পড়বার সুযোগ দেয়া হয়। তাঁর ডাক্তার জামাই শ্বশুরের ইচ্ছার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে কার্পণ্য করেনি। ঊর্মিমালা বর্তমানে ইম্পেরিয়াল কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করছে। শহরের সবচে’ শিক্ষিত পরিবার হিসেবে অন্যের সমীহ পেয়ে অভ্যস্ত রঞ্জুর কাছে এসব আচরণ যে কারণে খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না।

তাই যখন ক্লাবে উপস্থিত কমিটির সবুজ ভাই নিজে এসে জানতে চায় বসবার জন্য বরাদ্দ জায়গায় তাদের কোনও অসুবিধা আছে কিনা, সেরকম হলে সে রঞ্জুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারে… তাতে খুব একটা অবাক হয় না রঞ্জু কিংবা ওর বন্ধুরা। কিন্তু রঞ্জুর ভেতরে থমকে থাকা কেমন লাগাটা অস্বস্তিতে রূপ নেয় যখন সবুজ পেছন থেকে অপরিচিত কিছু ছেলেকে ইশারায় ডেকে রঞ্জুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

–ভাডি, এডা হছসে আমাগের রঞ্জু। ওর আগে আমাগের অঞ্চলে এস এস সি’তে কেউ গোল্ডেন এ প্লাস পায়নি বুছস্য। কিছুদিনের মধ্যে ঢাকা পড়তি যাতিসে রঞ্জু। ওর আশেপাশে থাকাটাও গর্বের, বুছস্য? খেলা দেখপার ফাএ ফাএ রঞ্জুগের চা পানি লাগপে কিনা সিডার খপর ন্যিবা মিয়ারা। অ রঞ্জু ব্যসে ব্যসে এহন থে ডাক দিও কিসু ল্যাগলি, বুছস্য?

কেউ একজন সবুজ ভাইকে ডেকে নিয়ে গিয়ে রঞ্জুদের খামোখাই কথা শোনা থেকে বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু আজ এত বেশি সমাদরের ঘটা কেন! অজানা রহস্যের গন্ধ পায় রঞ্জু।

এদিকে ষণ্ডামার্কা ছেলেগুলো গর্বে, নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্যে রঞ্জুর পাশে ঘন হয়ে দাঁড়ায়। ওদের চোখেমুখে লেপ্টে থাকা হিংস্রতা রঞ্জুর বুকের ভেতরের অস্বস্তিকে আরও খানিক গড়িয়ে দেয়।

এই গরমেও রঞ্জুর কেমন শীত শীত লাগতে থাকে। ওর এটাও কেন জানি মনে হতে থাকে আজ ক্লাবে না এলেই পারত। ছোটো বোন শর্মিমালা এত করে বলল —

–ছোট’দা আজ আর ক্লাবে গিয়ে কাজ নাই, ঘরে বসেই খেলা দেখ বরং। খেলা দেখে অত রাত করে বাড়ি ফিরিস, মা চিন্তায় মরে। বাবা কত করে বুঝায়, মা তাও না ঘুমিয়ে অবুঝের মতো জানলায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

৩।

রাত গাঢ় হতে না হতেই শহরের এ অঞ্চলটা কেমন দিনের গমগমে চেহারার জৌলুশ হারিয়ে হতদরিদ্র হতে থাকে। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে চোখ আর মাঝে মাঝে ডেকে ওঠা কুকুর শেয়ালের হাঁক গোটা পরিবেশটাতে গা ছমছমের একটা আবহ তৈরিতে মগ্ন হয় তখন। রাতের সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবেশের রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে। নিজের হাতের তালুর মতো মাহতাবউদ্দিনের চেনা এই অঞ্চল। গভীর রাতের ছমছমে রহস্যময়তা কখনও তাকে খুব একটা বিচলিত করে না। নিজের ক্ষমতার উপর আস্থাশীল মানুষ সাজানো ভয়ের বাড়িয়ে রাখা হাতে হুটহাট ধরাশায়ী হয় না।

মাহতাবউদ্দিন নিজেই অন্যের জন্য ভয়ের কারণ। কূটবুদ্ধি আর সময়মতো তার চালের বাজিমাতে প্রাপ্য ক্ষমতা আর রাজনীতির পক্ষ বিপক্ষ দু’দিকেই সময়মতো তেল আর তাল ঠুকে যাওয়ার দক্ষতায় অত্র এলাকার এখন দাপুটে মানুষ সে। চাইলে দু একজন বডিগার্ড সে রাখতেই পারে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতাহেতু সেদিকে না হেঁটে, কিছু ক্যাশ খসিয়ে নিজের স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য একখানা আগ্নেয়াস্ত্র যোগাড় করে নিয়েছে। কোমরের সাথে বেল্টে বাঁধা অস্ত্রটি তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। টাকার বিনিময়ে সঙ্গে ছায়ার মতো লেপ্টে থাকা মানুষও সময়ে বেইমান হয়ে ওঠে। অস্ত্র বেইমানি জানে না। অস্ত্র যার হাতে থাকে তার হুকুমে চলতে অভ্যস্ত। অপঘাতে মৃত ঠিকাদার রহিম শেখের একদা বডিগার্ড, অধুনা অভয়নগর উপশহরের প্রভাবশালী মাহতাবউদ্দিন মিয়া নিজের অতীতটাকে মাটিচাপা দিয়ে দ্রুত হাত ধুয়ে নিয়েছে। ত্বরিত কর্ম সাধনে ওস্তাদ বলেই না মাত্র কয়েক বছরে কোথাকার মাহতাব কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। সামনে অভয়নগর পৌরসভার চেয়ারম্যানের পদটা হাসিল করা তার মনের গোপন খায়েশ। বুদ্ধিমতো এগোতে পারলে সেটা বাগানোও কঠিনসাধ্য কিছু না। আপাতত বড়ভাইয়ের নেকনজরে থাকাটা জরুরি। যে কারণে জয়েশ্বর রায়ের জমি সংক্রান্ত বিষয়ে মাহতাবউদ্দিন বিশেষ কোমর বেঁধে নেমেছে। এবার একটা হেস্তনেস্ত করা চাই।

অভয়নগর এলাকায় বড়ভাই মাল্টিস্টোরেড কমপ্লেক্সের জন্য মেলা জমিজমা বাগিয়েছেন। তার নকশার ডিজাইন মতো প্রায় সবটা জমিই হাতের নাগালে। বাধ সেধেছে জয়েশ্বর ডাক্তারের দুই বিঘার উপর বাড়িটা। ডাক্তারকে কিছুতেই জমিটা বিক্রির ব্যাপারে রাজি করানো যায়নি। বড় ভাইয়ের হয়ে জমিটা কব্জা করার পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে মাহতাবউদ্দিন। এই জমি সংক্রান্ত এক ক্যাচালে দু’ বছর আগে ডাক্তারের মাথা গরম বড় ছেলেটা মারা পড়ল। অপঘাতে মৃত্যুর মামলা রুজু করা পর্যন্তই এগিয়েছিল সে ঘটনা। মাথার উপর ক্ষমতাসীন বড়ভাই থাকলে আমজনতার সাধ্য নাই বাল ছেঁড়ে। জয়েশ্বর ডাক্তার শিক্ষিত হলেও এসব ক্ষেত্রে আমজনতার কাতারেই। যে কারণে পুত্র হারানোর সঠিক হদিশ বা বিচার তাঁর ভাগ্যে আজও জোটেনি। তবুও কেমন মাটি কামড়ে পড়ে আছে আকাটার গুষ্টি! কতভাবে লোক লাগিয়ে, উড়ো চিঠি ছেড়ে ভয় দেখানো হয়। কিছুতেই কিস্যু হচ্ছে না। তবে বড়ভাই এবার যে চাল চেলেছেন, তাতে করে জয়েশ্বর রায়ের শেষরক্ষার উপায় নাই।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ডামাডোলকে ঢাল করে সাজানো নকশার আসল হোতা মাহতাবউদ্দিন না। সে হুকুম তালিমের চাকর মাত্র। আড়াল থেকে গুটির চালটা বড়ভাইয়ের নির্দেশ মতোই হচ্ছে। ক্লাবের বাহান্ন ইঞ্চির টেলিভিশনটা তার পরামর্শ এবং টাকায় যোগান দেয়া। ফুটবলের দলাদলি নিয়ে এখন কেবল ছেলেপুলেদের উস্কে দিয়ে তাদের মধ্যে একটা ক্যাচাল পাকিয়ে দেয়া গেলেই বাকি কাজের দায়দায়িত্ব ঢাকা থেকে আগত বড়ভাইয়ের কর্মী ছেলেগুলোর। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে সবুজ আর রাশেদকে খেলা দেখবার অজুহাতে রঞ্জুদের ক্লাবে টেনে আনবার কাজে টোপ হিসেবে কব্জা করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। ওদের ঝুলাঝুলিতে রঞ্জু ক্লাবঘরে শফি বদিকে নিয়ে সবার সাথে খেলা দেখতে রাজি হয়েছে। কয়েকদিন বাদেই তো সব বন্ধুদের ছেড়ে ঢাকা চলে যাবে রঞ্জু।

বড়ভাইয়ের কথা হল বিশ্বকাপের মাঠে দু’পক্ষের খেলোয়াড়েরা মনের সাধ মিটিয়ে লাথালাথি, হাতাহাতি করুক। ওদের ফাউল ঠেকাতে মাঠে রেফারি আছে। ফুটবল আসরের মওকা তুলে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি এখন  জয়েশ্বর রায়ের বুক বরাবর মোক্ষম লাথিটা ঝাড়তে চান। ফাউল বলার কিংবা লাল কার্ড দেখাবার জন্য এ খেলায় কোনও রেফারি থাকবে না। বাঁশ আর বাঁশি দুটোই তার গোলপোস্ট সামাল দেবে। বড়জোর পত্রিকার এক কোণে ঘটনার মামুলি একটা সংবাদ ছাপা হবে।

–এইটারে বলে খেলার ছলে রাজনীতি, বুঝলা মাহতাব?

ফোন ফাটিয়ে ভেসে আসা ঠা ঠা হাসিটা মাহতাবকে বড় শান্তি দেয়। বড়ভাই খুশি থাকা মানে তার বাড়তি প্রাপ্তিসংযোগ।

বড়ভাইয়ের সাথে বিস্তারিত আলাপ সেরে অভয়নগর বাজার থেকে বের হতে হতে রাত প্রায় সোয়া দশটা হয়ে যায় মাহতাবউদ্দিনের। বিশ্বকাপ নিয়ে হাদুমপুদুম ক্লাবঘর ছাড়া আশেপাশে খুব একটা নজরে পড়ে না। এ মুহূর্তে ক্লাবঘরের বিশাল পর্দায় বেশিরভাগের চোখ আটকে আছে। বাকিরা বাজারের সারাদিনের হিসাবনিকাশ মিলানোর কাজ সেরে যে যার ঘরে ফিরে গেছে। বড়ভাইয়ের সাথে কথোপকথনের পর মনের ভেতর তৈরি হওয়া আলগা আনন্দটা উপভোগ করতে করতে মাহতাবউদ্দিন স্কুলের লাগোয়া রাস্তাটায় এসে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই তার মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। জানতে পারে ওদিকে সব কিছুই ছক মেনে হয়েছে। তার ছেলেদের বাকি অংশটা এখন ডাক্তারের বাড়ির আশেপাশের অন্ধকারে ঘাপটি দিয়ে মাহতাবের অপেক্ষায় আছে। সময় দেখে মাহতাবউদ্দিন মনে মনে হিসাব কষে নেয়। প্রায় পনেরো মিনিটের মতো হয়ে গেছে অভয়নগর স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান জহর আলীর বুকে ব্যথার কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে জয়েশ্বর রায়কে ডেকে নিয়ে যাওয়ার। ফাঁকা বাড়িতে এখন মা আর মেয়ে।

বেশিমাত্রায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতানির জন্য কিনা কে জানে, মাহতাবউদ্দিনের মনে কেমন সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, তার নিজের যন্ত্রটাই বিকল হতে বসেছে হয়ত। নইলে মেয়েমানুষের কথায় চট করে আগের মতো শরীর গরম হয় না ক্যান! সমবায় ব্যাঙ্কের মাজেদুর রহিমের সুন্দরী বউটা তার লোভের আগুনে পুড়ে যাওয়া শেষ পতঙ্গ। সেও প্রায় কুড়ি দিন হতে চলল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোর নিচে দাঁড়িয়ে, ক্রূর চোখে আশপাশটা পরখ করতে করতে শর্মিমালার কচি শরীরটার কথা মুহূর্তকালের কম সময় নিয়ে ভাবল মাহতাবউদ্দিন। বেশ ডাগরডোগর। তার মেয়ে আলেয়ার সমবয়সী শর্মিমালা। এ পর্যন্ত কোনও হিন্দু ঘরের মেয়ে ভোগ করেছে কিনা, সেটাও স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করে মাহতাবউদ্দিন। তার যন্ত্র কতটা সচল বা বিকল আজ সেটা পরখ করে নিলে কেমন হয়? কচিটার সাথে ফাও হিসাবে ডাক্তারের বউটাও আছে। ভাবনাটা তার চোখেমুখে পাশবিক এক হিংস্রতা নিয়ে ঝলসে ওঠে। শুনশান রাতের নীরবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অবিকল বড়ভাইয়ের মতো ঠা ঠা হাসিতে ফেটে পড়ে সে আচমকা। মাহতাবউদ্দিনের নষ্ট হাসির ত্রাসে রাতের ঘনায়িত রহস্যময়তা চমকে দূরে সরে যেতে চায় বুঝি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*