লেখকের রজোনিবৃত্তি : শারদ সাহিত্য

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

 

এই বঙ্গদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে এরকম বিশেষ ঋতুকালীন সাহিত্য আর নেই। এর কারণটাও সুবোধ্য, হয়তো ইংল্যান্ডে বা খ্রিস্টান দেশগুলিতে খ্রিস্টমাসের সময় কিছু সাংস্কৃতিক চেতনার উৎপত্তি হতে পারত, নাটক এবং গানে তা হয়েছেও, কিন্ত সাহিত্যে তেমনভাবে হয়নি। কেননা যাকে বলে পাঠ, দীর্ঘ পাঠ, সেটা ওই শীতে বা ওইরকম আবহাওয়ায় আদৌ হওয়া সম্ভব কি না, এই নিয়ে অন্যান্য সংস্কৃতির ভিতরে কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, ভারতবর্ষে, বিশেষ করে বাংলার সংস্কৃতিতে শারদ সাহিত্য মহাসমারোহে এসেছে। এর একটা বড় কারণ, মস্ত কারণ, শারদীয় দুর্গাপূজার এক হাতে গোনা উদযাপন থেকে বারোয়ারি দুর্গোৎসব হিসেবে একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপান্তর। এর পেছনে ঔপনিবেশিক বাংলায় সামন্ত-জমিদারদের শ্রীবৃদ্ধি এবং বড়লোকেদের পৃষ্ঠপোষকতা খানিকটা দায়ী। আর আজ বড় বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো পুজোর সময় সাহিত্যপত্রিকা বার করে, এর একটা সহজ কারণ, যে তারা এইসময় প্রচুর বিজ্ঞাপন পায়। এই উৎসবের দিনে সাধারণ লোকের হাতে কিছু পয়সা আসে, বোনাস হয়, এক্সগ্রাশিয়া হয়, কিছু লাভের পয়সা আসে, আর তার ফলেই সেই টাকার কিছু উদ্বৃত্ত সাহিত্য বিষয়ে ব্যয় হতে পারে। তদুপরি বাঙালি সাহিত্যপ্রিয়, সুতরাং, সোনালি চশমা-পরা ইকনমিক্সের ছাত্র ফর্দ টুকে রাখে যে এ-বছর কোন উপন্যাস তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে, এই চিত্রকল্প রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও পাওয়া যায়।

এই বাংলায় শারদ পত্রিকার উৎপত্তি হল ৩০ দশকে, আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম শারদ সংখ্যা বের করল, তাতে সাড়ম্বরে প্রকাশ পেল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘শহরবাসের ইতিকথা’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ল্যাবরেটরি’। তারপর থেকে তা রেওয়াজে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু এরকম তো সম্ভব হতে পারে না যে, ভাদ্র-আশ্বিন এই দুই মাস বাঙালি লেখকরা বহুপ্রসবী হয়ে উঠবেন! তাই কার্যত দু’টো সমস্যা দেখা যাচ্ছে, এক-একজন লেখককে অনেকগুলো করে লেখা লিখতে হচ্ছে। আমরা প্রায়শই দেখি একজন নামী লেখক ৮-১০ টা করে লিখছেন। ৮-১০ খানা উপন্যাস, এ কি শরৎকালে লেখা সম্ভব? আমরা বুঝি, এটা তর্কের খাতিরে বলা হচ্ছে, কারণ নিশ্চয়ই অন্তত কিছু ক্ষেত্রে লেখাটা হয়তো জানুয়ারি মাসে বা আগে লেখা হয়েছিল, সেটা এই মে মাসে দেওয়া হয়েছে বা আগের বছরই জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এত লেখা সম্ভব কিনা, এত সংখ্যায় বহুপ্রজ লেখক পাওয়া সম্ভব কিনা, সেটা আরেকটা সমস্যা এবং এই সমস্যাটার একটা বাস্তবায়ন দেখতে পাওয়া যায়।

যেমন আমরা দেখেছি, আমরা বলতে আমরা যারা স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্ম, যাদের বাল্যকাল ৬০ দশকে কেটেছে, তখন ব্যাপক হারে শারদসাহিত্য পড়া হত। অর্থাৎ পুজোর ছুটির পর যখন স্কুল, কলেজ, আদালত খুলে যেত, তখন যাঁরা নিত্যযাত্রী তাঁরা কোন উপন্যাস ভালো হয়েছে, কোন উপন্যাস খারাপ হয়েছে সেই নিয়ে রীতিমতো আলোচনা করতেন। উপন্যাস এবং গল্প নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হত। রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর — এঁরা মূলত শারদসাহিত্যের লেখক ছিলেন। একটা খুব উল্লেখযোগ্য ঘটনা, সম্ভবত ১৯৬৫ সালে সমরেশ বসুর ‘বিবর’ এবং ১৯৬৬ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আত্মপ্রকাশ’ দেশ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এক আলোড়ন তৈরি করে। সেটা সত্যিই সামাজিক ঘটনা ছিল, এতদূর, যে আমরা দেখতে পাই মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’-তে চাকুরিপ্রার্থীকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, “‘বিবর’ পড়েছ, বাই সমরেশ বোস?” অর্থাৎ এই শারদ উপন্যাসগুলি সাহিত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটা সামাজিক পরিসরে প্রবেশ করে। ‘বিবর’ সত্যি কিংবদন্তিতুল্য ব্যবসা করে ও রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে যায়। আর আমরা অনেকেই প্রেমের প্রথম স্বাদ পেয়েছি ‘আত্মপ্রকাশ’ পড়ে, এই যে যমুনার দিকে তাকিয়ে আমাদের বুক ব্যথা করত, এই যে মনে হত এক বিশেষ বালিকাকে শিউলির মতো দেখতে, এইসব মনখারাপের লাবণ্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আত্মপ্রকাশ’ থেকেই শুরু হয়। অবশ্য ‘আত্মপ্রকাশ’-এর জনপ্রিয়তা শহরাঞ্চলেই ছিল। সুনীলের লেখার মধ্যে নাগরিকতার ছোঁয়া বেশি, কিন্তু তা হলেও এগুলো পঠিত ছিল। যেমন, শারদীয় গান, শোনা হত। এই যে সলিল চৌধুরীর অসাধারণ সুরগুলো, এবং এইচএমভি-র রেকর্ডগুলো, এগুলো আমরা এত পরিমাণ শুনেছি, “পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি/ সোজা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি”, পুজোর দিনে মাইকে এই গানগুলো শোনা যেত, আর শারদসাহিত্য পড়া হত। বিমল করের ‘যদুবংশ’ও শারদসাহিত্য এবং বহুপঠিত। তা নিয়ে জনপরিসরে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছিল। যেমন একটা গল্প শোনা যায়, এটা সম্ভবত গল্পই, যে যখন বিমল মিত্তিরের ‘সাহেব, বিবি, গোলাম’ ছাপা হচ্ছিল, সে সময় সীসের হরফে ছাপা হত, তখন ‘ভূ’ পাওয়া যাচ্ছিল না, তার ফলে ভূগোল বই ছাপায় সংকট তৈরি হচ্ছিল। তার কারণ, ‘সাহেব বিবি গোলাম’ বিক্রি এত বেশি হয়েছিল, ভূতনাথ শব্দটা এত বেশি ছাপা হয়েছিল যে সীসে সাপ্লাই দিতে পারছিল না।

এখন কেউ যদি আমাকে স্পষ্ট জিজ্ঞাসা করেন, এই মুহূর্তে বাংলাভাষায় শারদসাহিত্যের ভূমিকা কী, আমার উত্তর হবে, প্রায় কিছুই নয়। আমি নিজে শারদ পত্রিকায় লিখি… যে প্রতিষ্ঠানের কাগজগুলোতে লিখি সেগুলো বেশ নামকরা, তাদের হোর্ডিং বিজ্ঞাপন হয়, বিক্রিও হয়, ব্যবসাও প্রতিষ্ঠানের মনের মতো, দেখার মতো ব্যবসা। কিন্তু শুধু আমি নই, আজ এমন কোনও লেখক নেই যাঁরা শুনতে পান যে, তাঁদের লেখা নিয়ে পাঠকমহলে কোনও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলছে। যেটুকু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তাঁরা শুনতে পান, সেটা একান্ত পরিচিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেটুকু শারদসাহিত্য না হয়ে অন্য যে কোনও লেখা হলেও তাঁরা শুনতে পেতেন। লেখকদের কাছে পৌঁছতে পারা বেশিরভাগ প্রতিক্রিয়াই তাঁদের বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত মহলের প্রতিক্রিয়া। আমার মনে হয় এখন সোশাল মিডিয়ায় যেমন আমরা প্রতিক্রিয়া পাই, কেউ কিছু বললে বা লিখলে হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার বা ফেসবুকে সেই নিয়ে এক-দু’দিন কিছু কথাবার্তা হয়, সেটা অবশ্যই অনেক বেশি তাৎক্ষণিক বা সক্রিয়। কিন্তু সেখানেও ক’জন সত্যি সত্যি লেখাটি পড়ে মন্তব্য করছেন বা লাইক দিচ্ছেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। কিন্তু সাধারণভাবে সাহিত্য নিয়ে মৌখিক আলোচনা হওয়া বন্ধই হয়ে গেছে আমাদের সংস্কৃতিতে, ঠিক যেমন বন্ধ হয়ে গেছে বিজয়া দশমীতে আর পয়লা বৈশাখে প্রণাম ও শুভেচ্ছা বিনিময়। এ ঘটনাগুলো কিছুদিন আগেও বাস্তবে ঘটত, ভৌতিক স্তরে হত, অর্থাৎ ফিজিক্যাল লেভেলে ঘটত। কিন্তু এখন উপরাষ্ট্রপতি থেকে উপপত্নী সবাইকেই শুভেচ্ছা এসএমএস করা যায়, এবং তারও উপরে বিনা পয়সায় হোয়াটসঅ্যাপ এসে গেছে, ফলে শুভেচ্ছা বিনিময় আরও সহজ ও বায়বীয়। ফলে কোনও কিছু যে আদৌ ঘটছে তা বোঝার উপায় নেই।

সাহিত্য-লেখাপত্র যে বিশেষ পড়া হয় না, তার আর একটা উদাহরণ, বাঙালি একটা নতুন ক্রিয়াপদ আবিষ্কার করেছে, “লেখাটা একটু দেখবেন”। লেখাটা তো দেখার কিছু নেই, হয় পড়বেন, নয় পড়বেন না। ‘দেখবেন’ মানে? ‘দেখবেন’ মানে আমি আছি, যেন একটা হাজিরা দেওয়া, ‘দেখবেন’ মানে মলাটটাকে দেখানো। এইটে বলা, আমি নোট করলাম ও করালাম যে সাংস্কৃতিক স্তরে আমি আপনি উপস্থিত। এই উপস্থিতি-অনুপস্থিতির হার দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় এখন অবধি সাহিত্যের গুণমান নির্বাচন হচ্ছে।

২০১৮ সালে যখন বসে এই কথা বলছি, আমার মনে হচ্ছে ১৯৯০ সাল থেকে তেমন কোনও শারদসংখ্যা প্রকাশিত হয়নি, যার কোনও লেখার কথা আমি এই মুহূর্তে চোখ বুজে মনে করতে পারি। আমার মনে করাটা কিন্তু রাঁধুনি যেভাবে অন্য রেস্টুরেন্টের রান্না পরীক্ষা করেন, অনেকটা সেরকম, কারণ এক্ষেত্রে আমি নিজেই একজন অংশগ্রহণকারী। কাজেই আমাকে বিভিন্ন জায়গায় কীরকম লেখা হচ্ছে তা দেখতে হবে। আমি হিসেব করে দেখেছি, সিরিয়াস সাহিত্যপাঠের হিসেবে কলকাতা বড়জোর ৫০০০ লোকের শহর। এঁরাই অধ্যাপক, এঁরাই স্কুলশিক্ষক, এঁরাই শারদীয়া সাহিত্য পড়েন, এঁরাই নন্দনে যান, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ভিড় করেন, এঁরাই মঞ্চে প্রতিবাদ করেন, এই ৫০০০ হাজার লোকের বাইরে আর কিছু হচ্ছে না। ফলে এই যে সংস্কৃতিহীনতা, এই যে সাহিত্যহীনতা বাঙালিকে গ্রাস করেছে, এটা কেন করল, লেখকের অভাবে করল, নাকি লেখার অভাবে? ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট একটা কারণ হতে পারে, এই বিস্ফোরণ এত বেশি করে আমাদের সময়গুলোকে দখল করে নিয়েছে, যার ফলে সাহিত্যপাঠ আমাদের কাছে আর তেমন কার্যকরী বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের সমস্ত দিনটা চালু থাকে চার লাইনের ফেসবুক পোস্টের মধ্যে।

বাঙালি আজকাল খুব লম্বা চিঠিও লিখতে ভুলে গেছে। অবশ্য এটা শুধু বাঙালিদের বিষয় নয়, এটা এখন একটা ভারতীয় ব্যাপার৷ তবে সর্বভারতীয় কথাটা বলে বিষয়টাকে লঘু করব না এই কারণে যে, গোটা ভারতবর্ষে আলাদা করে বাংলা সাহিত্যের একটা অবদান ছিল। কিছুদিন আগে দিল্লিতে হিন্দি সিনেমা নিয়ে সাহিত্য একাডেমি আয়োজিত একটা সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম — হিন্দি সাহিত্যিকদের একটাই অনুযোগ যে, মুম্বই চলচ্চিত্র তাঁদের যথেষ্ট খাতির করে না বা পাত্তা দেয় না। তারপর দুপুরের বিরতিতে বা বিকেলের আলোচনায় দেখা গেল যে, তাঁদের মূল অভিযোগ হল, মুম্বই চলচ্চিত্র যেভাবে শরৎচন্দ্র বা তাদের অনুসারীদের লেখাকে যতটা গুরুত্ব দেয়, অর্থাৎ ‘দেবদাস’ উপন্যাসকে মুম্বই চলচ্চিত্র যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, ‘সাহেব বিবি গোলাম’কে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, ততটা কিন্তু মুন্সি প্রেমচাঁদ বা ফণীশ্বরনাথ রেণুসহ সমগ্র হিন্দি সাহিত্যসমাজকে দেয়নি। অর্থাৎ তাঁদের বক্তব্য এই যে, মুম্বই হয় অ-সাহিত্য থেকে ছবি করে অথবা সাহিত্য থেকে যখন ছবি করবে বলে ঠিক করে, তখনই শরৎচন্দ্রের মডেল বা অন্য কোনও বাঙালি রোলমডেলকে বেছে নেয়। আমি চমৎকৃত হলাম এই ভেবে যে, এখনও সর্বভারতীয় মহলে বাঙালিদের সাহিত্যপ্রীতি বা বাঙালিদের জীবনে সাহিত্যের উপস্থিতি একটা বিশেষ জায়গা অধিকার করে আছে।

একটা মজার জিনিস লক্ষ করি, বাঙালি হলে, সে আপনি মুখ্যমন্ত্রী হন, অথবা প্রধানমন্ত্রীই হন, বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা হন, কিংবা যাই হন না কেন, আপনাকে সাহিত্য লিখতেই হবে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে কবিতা লিখতে হয়েছে, আজকেও আমাদের মুখ্যমন্ত্রী তার ব্যতিক্রম হলে চলে না। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মুখ্যমন্ত্রী, শুধুমাত্র বিধানচন্দ্র রায় ও জ্যোতি বসু ছাড়া, সবাই অন্তত কয়েক লাইন লিখেছেন এবং তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, তাঁরা লিখতে পারেন। ‘আম’ এর সঙ্গে যদিও ‘খাম’ মিলিয়েছেন, কিন্তু তিনি কবি। বাংলাদেশে কেউ যা কিছুই করুক না কেন, এমনকি স্বামী বিবেকানন্দ হলেও তাঁকে কবিতা লিখতে হয়। কবিতা না লিখলে বাঙালি কাউকে স্বীকার করে না। স্মরণীয় পংক্তির জন্ম আপনাকে দিতেই হবে। কিন্তু এখন সেটাই পংক্তিসর্বস্বতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক, হোয়াট্স‌অ্যাপ বা অন্য ইলেকট্রনিক আদানপ্রদান, এত তাৎক্ষণিক এবং ক্ষণস্থায়ী যে, আমাদের আর সময়ই নেই উপন্যাস পড়ার। সবচেয়ে বড় কথা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে না হয় ছেড়েই দিচ্ছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পরে বাঙালির একমাত্র কাউন্টারসোল্ড লেখক বলতে সমরেশ মজুমদার ও তাঁর ‘কালবেলা’ উপন্যাস। তারপরে আমি কোনও উপন্যাস দেখিনি যা লোকে বাধ্যতা ছাড়া পড়েছে বা বাড়িতে কিনে নিয়ে গেছে। সাধারণভাবে সাহিত্য যে কত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, শুধু শারদসাহিত্য নয়, আমরা সেটা দেখতে পাই বিয়ের অনুষ্ঠানে। বিয়েতে সবরকম উপহার আছে, কিন্তু বই নেই। মাসের বাজারে সবরকম জিনিস কেনা হয়, শুধু বই নেই। এই যে বাঙালিরা আজকাল বলে, চলুন আগামী রবিবার একটু বসা যাক, এই বসা যাক মানে একটু হুইস্কি পান এবং কিছু সাধারণ রসিকতা বিনিময়, সেটা যে পর্যায়েরই হোক না কেন, এবং তাতে সাহিত্যের কোনও উপকরণ থাকবে না। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তাও খবরের কাগজ আলোচনার মধ্যে ছিল৷ এখন খবরের কাগজও তো ডিজিটালি পাওয়া যায়, সুতরাং তা থেকে সামান্য কিছু কিছু মন্তব্য, সামান্য কিছু জিনিস। আসলে আমরা চিন্তা করতে ভুলে গেছি। আমাদের বোধ এবং ব্যবহার এখন জিজ্ঞাসা চিহ্ন মুক্ত হয়ে গেছে। আমরা কোনও কিছুকেই জিজ্ঞাসা করি না, বা কোনও কিছুকেই অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক, অসম্ভব এরকম ভাবি না। সুতরাং, আমরা যেহেতু নিয়মিতভাবে ঠিক করেছি যে, সান্ধ্য বা প্রাতঃকালীন অথবা অবসরকালীন আলাপ ইলেকট্রনিক মাধ্যমের সাহায্যে আদানপ্রদান করব, সেই আদানপ্রদানটুকুই হয়। ইলেকট্রনিক মাধ্যমে উপন্যাস লেখার কথা না, যায়ও না। এবং উপন্যাস লিখতে গেলে যে একটা আয়তন করতে হবে, তারও কোনও মানে নেই, সন্দীপনেরও ছোট উপন্যাস আছে, তারাশঙ্কর অনেক বড় মাপের উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু এগুলোর প্রধান শর্ত হচ্ছে ইলেকট্রনিক ই-বুক, বাংলা ই-বুক কমই হয়, কমই আছে। ই-বুক পড়লে আমাদের স্মৃতিতে সেগুলো শিরোধার্য করে রাখতে হয়। এখনও পর্যন্ত যেভাবে কম্পিউটার স্ক্রিনটা আছে, তাতে পঠন অভ্যাসও বদলাতে হয়, আমরা যেভাবে বই পড়ি টেবিলে রেখে, সেভাবে কম্পিউটার থেকে পড়া যায় না। যেভাবে পড়া হয় সেই পদ্ধতিটা এখনও পর্যন্ত বাঙালি আয়ত্ত করে উঠতে পারেনি এবং যে কোনও কারণেই হোক, আমি খুব নিশ্চিত এবারও কোনও শারদীয়া উপন্যাস কোনও ধরনের আবেদন রাখবে না, এটা আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক নয়, এটা আমাদের অ্যাডিশনাল কোয়ালিফিকেশন, অতিরিক্ত যোগ্যতার মতো। যে “জামাই কী করে?” “চাকরি করে, তবে মাঝে মাঝে লেখেও।” এই মাঝে মাঝে শারদসংখ্যা বার হয়, বসন্ত সংখ্যা, দোল সংখ্যা বার হয়, আমরা তাতে লিখি, এইমাত্র, চেক আসে কখনও, কখনও আসে না, আমরা নিজেরা আত্মগর্বে স্ফীত হই, যে, আমি কিন্তু বুদ্ধিজীবীও।

সম্ভবত নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’ শেষ ‘বিক্রি হওয়া’ উপন্যাস, এবং মনে রাখা দরকার, ‘হারবার্ট’ কিন্তু কোনও মূল ধারার বাণিজ্যিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। আজ যদি একটা সমীক্ষা করা যায় যে, কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে একটা চালু বইয়ের দোকানের সামনে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, ঘণ্টাদুয়েক দাঁড়িয়ে থেকেও দোকানটি থেকে কোনও সাম্প্রতিক উপন্যাসের কপি বিক্রি হচ্ছে তা খুঁজে পাব না। যদি বা খুঁজে পাই, ক্রেতার পেছন পেছন গিয়ে তাঁকে যদি জিজ্ঞেস করি যে কে, তা হলে জানতে পারব তিনি হয়তো ওই ঔপন্যাসিকের প্রেমিকা, আত্মীয় বা অনুরাগী পরিচিত কেউ। একজন সম্পূর্ণ বাইরের লোক, একজন পাঠক যার সঙ্গে লেখকের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই, এসে লেখাপত্রের খোঁজ করছেন, জিজ্ঞেস করছেন অমুকের অমুক লেখাটা কি পাওয়া যাবে — এমন লোক আজকাল খুঁজেই পাওয়া যায় না। একটা এডিশনও শেষ হয় না। আবার আজকাল এডিশনেরও আলাদা গল্প আছে। আগে যখন সীসের হরফে ছাপা হত, এডিশন বলতে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝাত, এগারোশো কপি। আজ এডিশনটা কী, কেউ জানে না। পুরোটাই কম্পিউটারে সেভ করা আছে, প্রয়োজনবোধে ছাপা হল, সেটা একশো কপিও হতে পারে। পঞ্চম সংস্করণ শেষ হয়ে গেছে বলা হচ্ছে, অথচ দেখা যাবে প্রতিবার দুশো করে কপি ছাপা হয়েছে। মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ‘চৌরঙ্গী’ যত বিক্রি হয়েছে, অথবা বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’ যত বিক্রি হয়েছে (যদিও ‘সাহেব বিবি গোলাম’ শারদীয় উপন্যাস নয়, ধারাবাহিক উপন্যাস, যা দেশ পত্রিকার বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছিল), তার ধারেকাছে কোনও বাংলা উপন্যাস আজ বিক্রি হয় না। একই কথা বলা যায়, নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ সম্বন্ধে। এসব সাহিত্যের মান নিয়ে কোনও কথা বলছি না, বিক্রি হওয়া বা জনপ্রিয়তার নিরিখটা উল্লেখ করছি। আমি যখন ছোট ছিলাম, ক্লাস ফাইভ সিক্সে পড়তাম, তখন দেখেছি আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি পাশ বা বিএ, বিএসসি-পড়া দাদাদের রোলমডেল ছিল একটা উপন্যাস। যাযাবরের লেখা ‘দৃষ্টিপাত’। একেবারে প্রেমের ম্যানিফেস্টো যাকে বলে। এমন অনেক লোক ছিলেন যাঁরা ওই বইয়ের শেষ লাইনগুলো মুখস্থ বলতে পারতেন এবং সেগুলো বিভিন্ন প্রেমপত্রে প্রয়োগ করা হত। ঠিক যেমনভাবে সুনীলদার কবিতা প্রয়োগ হত ‘ভ্রূপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে’। মনে পড়ে যাচ্ছে, বুদ্ধদেব বসুর ‘তিথিডোর’-এর কথাও। এখন কোনও শারদ উপন্যাস এমন জনপ্রিয় হতে পারে কি? অথচ এখনও হাতে গোনা হলেও এমন উপন্যাস প্রকাশ পায় যে, আজ থেকে দশ বিশ বছর পর হয়তো তার কথা আমরা আলোচনা করব। যেমন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে গত বছর ‘শিলাদিত্য’ পত্রিকায় মণীন্দ্র গুপ্তের লেখা উপন্যাস ‘নেংটি’র কথা, যা নেংটি দাশগুপ্তের জীবনবৃত্তান্ত। যদিও শারদসংখ্যায় প্রকাশ পাওয়া লেখা, তবে লেখক শারদ উপন্যাস হিসেবে লেখেননি, আগেই লিখেছিলেন, কারণ তার আগে দীর্ঘদিন ধরে উনি অসুস্থ ছিলেন। এই উপন্যাসটি একটি সত্যিকারের ভালো লেখা, এবং এই লেখাটি একদিন আলোচিত হবে। তাই বলা যেতে পারে, এখনকার বাংলা সাহিত্য কোনও কেন্দ্রীয় অবস্থান না রেখে পরিধির দিকে সরে গেছে। যেমন আজকের কালচারাল আইকন যাঁরা, যাঁদের কিছু সাংস্কৃতিক বিক্রয়যোগ্যতা আছে, তাঁরা কিন্তু কেউ মূল প্রতিষ্ঠানের লোক নয়, তাঁরা পেরিফেরি থেকে উঠে এসেছেন। যেমন নবারুণ ভট্টাচার্য, যিনি আধুনিক সময়ের হিসেবে একজন জনপ্রিয় লেখক, যুবসমাজ এখন তাঁর লেখা পড়ে, কিন্তু তাঁর দুটি জনপ্রিয় উপন্যাস — ‘হারবার্ট’ বা ‘কাঙাল মালসাট’, এরা কিন্তু কোনও জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি৷ আজ যাঁদের কথা আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনি বা পড়ি, তাঁরা প্রায় মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে কাজ করেন। মূল ধারার প্রতিষ্ঠান তাঁদের মাঝে মাঝে ডাকে, তা তাঁদের এই প্রতিষ্ঠান-অতিরিক্ত নির্ভরযোগ্যতাটাকে ব্যবহার করার জন্য।

পরিশেষে, সেইসব শারদ সাহিত্যের নস্টালজিয়া আজও রয়ে গেছে, যেগুলি একসময় পুজোর ঠিক আগেই বেরোত, যা তখনও আজকের মতো চৈত্র শেষে বাসন্তী পুজো হয়ে যায়নি৷ দ্বিতীয়ত, সেই সময় শিশুদের জন্য একটা আলাদা ব্যবস্থা ছিল৷ দেবসাহিত্য কুটির এ ব্যাপারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ‘দেবদেউল’, ‘দেবায়ন’, এরকম নানা নামে শিশুদের জন্য শারদসংখ্যা বেরোত। ‘দেব’ কথাটা পত্রিকার নামের প্রথম অংশে থাকতই। সেগুলো যে শিশুমহলে কীভাবে সমাদৃত হত, তা আজ বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের তো বিনোদনের উপকরণ অনেক কম ছিল, আমরা ওই পত্রিকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। দেবসাহিত্য কুটিরের বর্তমান সত্ত্বাধিকারী যিনি, শ্রীমতী রূপা মজুমদার, তাঁকেও ব্যক্তিগতভাবে বলেছি এইধরনের শারদসংখ্যা ওঁরা বন্ধ করলেন কেন? বিমল কর বা রমাপদ চৌধুরীর ছোটগল্পে যেমন খুব অদূরে এক ধরনের বেড়ানো আছে, সাঁওতাল পরগনা, হাজারিবাগ — বাঙালির পশ্চিম বলে খ্যাত এইসব জায়গাগুলোকে আমরা না গিয়েও তাঁদের লেখা পড়ে চিনি, বাঙালির শারদসাহিত্য ঠিক সেইরকম একটা অবসরযাপন ছিল। শারদসাহিত্য একসময় মহৎ সাহিত্যও ছিল। বিমল করের ‘যদুবংশ’ উপন্যাসটি তো আজকের দিনের অনুপাতে প্রায় এক হীরকখণ্ড বলে মনে হয়। তাই শারদসাহিত্যের এই বহুপ্রজনন ও সংকটের দিনে একটা কথাই মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে দু’টি উপন্যাস থেকে বাংলাভাষার শারদসাহিত্যের জয়যাত্রার সূচনা হয়েছিল, সেগুলি শারদসাহিত্য হিসেবে লেখা হয়নি, মোটা পুজোসংখ্যার পাতা বাড়াবার প্রয়োজনে লেখা হয়নি, তা সত্ত্বেও সাহিত্য হিসেবে সেগুলি জনপ্রিয় ও একইসঙ্গে উচ্চমানের সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ভাদ্র-আশ্বিন এক চতুষ্পদী প্রাণীর মিথুনকাল, কিন্তু মানুষ উচ্চতর প্রাণী, তাই আশ্বিন মাস এলেই বাঙালি লেখকের বহুপ্রসবা না হওয়াই বুদ্ধিদীপ্তি ও সাহিত্যের স্বাস্থ্য — উভয় দিক থেকেই সমীচীন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*