ভূমিকা: শিবের গীত

পূর্ণা চৌধুরী

 

যখন লিখিতে বসিয়াছি, তখন স্পষ্ট কথা বলা ভাল– আমি প্রসন্নের একটু অনুরাগী বটে। তাহার অনেক কারণ আছে– প্রথমতঃ প্রসন্ন যে দুগ্ধ দেয়, তাহা নির্জ্জল, এবং দামে সস্তা; দ্বিতীয়, সে কখন কখন ক্ষীর, সর, নবনীত আমাকে বিনামূল্যে দিয়া যায়; তৃতীয়, সে একদিন আমাকে কহিয়াছিল, “দাদাঠাকুর,  তোমার দপ্তরে ও কিসের কাগজ?” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “শুনবি?” সে বলিল, “শুনিব।আমি তাহাকে কয়েকটি প্রবন্ধ পড়িয়া শুনাইলাম– সে বসিয়া শুনিল। এত গুণে কোন্‌ লিপিব্যবসায়ী ব্যক্তি বশীভূত না হয়? প্রসন্নের গুণের কথা আর অধিক কি বলিব– সে আমার অনুরোধে আফিম্‌ ধরিয়াছিল।

 

অনেকদিন ধরেই কলম সুড়সুড় করছে। এই অবস্থাটার জন্যে আমিই যে সম্পূর্ণ দায়ী তা বলতে পারব না। আমাকে ঘিরে একটা কুমন্ত্রণার বলয় আছে। এই বলয়ের বাসিন্দারা আদতে মজাখোর। তাঁরা নিজেরা কিছু লেখেন না অথবা দু-দশ লাইন লিখে ঊর্ধ্বনেত্র হ’ন। কিন্তু “আরও লেখ, আরও লেখ” প্যালা দিতে তাঁরা সদাই তৎপর। সত্যি বলতে কি, মূলতঃ এদেরই দোষে আমার দশা রবিবাবুর সন্দীপের মত :

“সেই আমার ঘোড়া আজ দরজায় দাঁড়িয়ে অস্থির হয়ে খুর দিয়ে মাটি খুঁড়ছে, তার হ্রেষাধ্বনিতে সমস্ত আকাশ আজ কেঁপে উঠল, কিন্তু আমি করছি কী? দিনের পর দিন আমার কী নিয়ে কাটছে? ও দিকে আমার এমন শুভদিন যে বয়ে গেল।”

যেন বাংলা সাহিত্য আমারই জন্যে শবরীর প্রতীক্ষায়। তবে এই ব্যাধিটির দায় আমারও খানিক আছে। শুরু কতকটা এইভাবে : বছর দুয়েক আগে আমি একটা উপন্যাস গোছের লেখা শুরু করি। সেটা শেষও হয় কোনও গতিকে। সন্ধের ঝোঁকে আলো জ্বালিয়ে টুকটুক করে ছবিগুলো সাজাতে সাজাতে ভারী একটা মৌজ হত। সন্দীপের স্বদেশী নেশার মতো কথা বলার নেশাও নেহাৎ মন্দ না। ধুনকি প্রায় একইরকম জোরালো। বলার মতো কথাও তো বহু আছে।  হাজার হোক, মেয়েমানুষ বই তো নই! তারপর এও দেখলাম গোল হয়ে বসে শোনার লোকও দু’ পাঁচটা পাওয়া শক্ত হয় না। সেই পর্ব শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন হয়েছে। যা পড়ি বা ভাবি তার অনেকটাই মনে গেঁথে যায়। সেসব দিয়ে আর একটা উপন্যাস না হলেও সে কিছু এমন ফেলে দেওয়ার মতোও নয়।  মনে হল বেসাব্যস্ত চিন্তাগুলোর একটা গতি করা যাক।

সেই শুরু।  এরপর নামকরণ। এই কর্মটি সহজ নহে। মনে এল ‘বিন্নি ধানের খই’। আমার এক বিশ্বনিন্দুক কটুভাষী বান্ধব আছেন। তিনি আমার মুখ্য উপদেষ্টা এবং সমালোচক। বাদ বিসম্বাদ আদি প্রয়োজনীয় এবং সাহিত্যকৃতি, নাগা মতে শুকর রন্ধন প্রণালী ইত্যাকার ফালতু কাজে তিনি আমার সাথ  দিয়ে থাকেন। তাঁকে আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, “হ্যাঁরে, বিন্নি ধানের খই নামটা কেমন?” জ্যামুক্ত তীরের মতো জবাব এল, “Why not কাঁদি কাঁদি কলা?!” বলা বাহুল্য, “গড়গড়ার মা লো” নাম তাঁরই প্রদত্ত। মনে ধরল। এই ছেলেভোলানো ছড়াটি সবার জানা। অনেক চোয়ালভাঙা পণ্ডিতি হয়ত ফলানো যেতে পারে এর সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিয়ে। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম সে চেষ্টা যে একেবারে হয়নি তা নয়। কিন্তু আমি এই ছড়ায় শুনতে পাই একটা মেয়েলি গলার ডাক। যে জানে সে জানে। আর ঐ যে বাঙাল ভাষায় একটা কথা আছে, “যার মনে যা / ফাল দিয়া উঠে তা”, আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম গড়গড়ার মাকে। মাটির দাওয়ায় বসে তার গুড়ুক গুড়ুক তামাক খাওয়া আর মাঝে মঝে টানের ফাঁকে ফাঁকে চাট্টি চাট্টি কথা বলা। তার হালের গরু বা পিঁপড়ে কোনও দিকেই মন নেই। চেঁচিয়ে গলা ফাটালেও সে শুনতে পাবে না। তামাকের নেশা আর কথা বলার নেশা তাকে খেয়েছে। আমার এই লেখাও খানিকটা গুড়ুগুড়ুনির ভেতর দিয়ে ঘোরের মাথায় দু’ চার কথা বলা। মানে থাকলে আছে, না থাকলে নেই। তবে হ্যাঁ, মৌতাতে কথা জমে ভালো। কমলাকান্ত চক্রবর্তী সাক্ষী।

কীভাবে বলব জানি না, কী বলব জানি না। কাজ আর সময়ের ফাঁকে ফাঁকে যা বুড়বুড়ি কাটবে তাই জাল ফেলে ধরব মৌতাতের কালে, এমনই ইচ্ছে।

আজ এ পর্যন্তই। প্রথম পর্ব রইল। পোষালে শোনো, না পোষালে উঠে যাও। কাউকে দিব্যি দিলেশা করে বেঁধে রাখা আমার কর্ম নয়। কমলাকান্ত কি প্রসন্নকে বাঁধিয়া রাখিয়াছিল?

প্রথম পাঠ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...