পাঁচটি অণুপ্রেমের গল্প

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

১। টাওয়ার

আবার মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলে? মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল সোমনাথের। বলেই জব্দ। চুপ করে অন্যদিকে ফিরে তাকিয়ে রইল দূরের পাহাড়টার দিকে।

ফোনটা ঘাড় থেকে না নামিয়েই ঘাড় শক্ত। ভঙ্গিটা চেনা ও ভয়ংকর। দেখলেই সোমনাথের ভয়ে পেট গুড়গুড় করে ওঠে। সুদক্ষিণা রেগে গেলে কী হয় তা যে না দেখেছে সে কী বুঝবে? দাপুটে সুন্দরী একে। তার ওপর আবার।

অথচ বেড়াতে বেড়াতে মাকে খুঁটিনাটি বলতে থাকাটা দেখলে মাঝে মাঝে পেটের মধ্যে কুলকুল করে হাসি আসে মাঝে মাঝে অসম্ভব হিংসে হয়।

সেদিন তো, ঝগড়া, মুখ লাল, মেয়েকে দেখে ভয় পাচ্ছিল ও। কী, না, বোঝা গেল, মা কী যেন উল্টোপাল্টা বলেছে। অত হাই অলটিচ্যুডে যাবার কী দরকার ছিল তোদের। এইরকম কিছু। মানালিতে গেলি, এখনও বাকি অতটা হিমাচল দর্শন বাকি, এখনই শপিং করতে শুরু করে দিলি?

সুদক্ষিণার মায়ের কাছে সুদক্ষিণা, মানে কিঙ্কি, এখনও ছোট্ট দুই পনিটেলের মেয়েটি। সেজন্যেই কিনা কে জানে। প্রতি পদে মায়ের খবরদারি ফোনে। আর প্রতিদিন ঝগড়া।

মুখ লাল করে সুদক্ষিণা বলছিল মাকে, আহা, একটা তো জাস্ট টি শার্ট কিনেছি মা, এত ভালো একটা ছবি ছিল, দেখলে বুঝতে, গুম্ফা পেইন্টিং-এর প্রিন্ট। আর ওই সোয়েটারটা আমার লাগবে তো।

মা ওদিক থেকে কিছু একটা বলতে, খট করে ফোন কেটে দিল কিঙ্কি। ধুত, মা এত পোজেসিভ না।

তুমিও মায়ের ব্যাপারে কম পোজেসিভ? বলেই সোমনাথ ম্যানেজ দিল, কী হয়েছেটা কি রে বাবা, বলো না।

মনে মনে বলছিল, ওই মুখ লাল করে ঝগড়াটা আমার প্রাপ্য ছিল কিঙ্কি। আমার সঙ্গে যা যা করার সব তুমি মায়ের সঙ্গে করো কেন?

***

সুমদোতে কোন টাওয়ার নেই। শুধু স্বচ্ছ নীল আকাশ আছে। এত নীল, এত স্তব্ধ। নিচে বহু নিচে শতদ্রুর উৎসমুখ। না কি ওটাই স্পিতি নদী? ইন্ডিয়াতেও গ্র্যান্ড ক্যানিওনের মতো দেখতে জায়গা আছে তাহলে?

নীরবতার গান শুনছিল ওরা। একটা দুটো করে তারা ফুটে ওঠা দেখছিল বিকেল থেকে সন্ধের দিকে। চারদিক অপার্থিব। হু হু হাওয়া দিচ্ছে। চাতালের মতো প্রশস্ত, তবে মাত্র একশোগুণ বড় যেকোনও পরিচিত ছাতের থেকে। এ তো পৃথিবীর ছাত রে!!!

সোমনাথ হাত চেপে ধরেছিল সুদক্ষিণার। এই ফাঁকা মাঠে ওরা দুই আদিম নরনারী যেন। কী প্রশস্তি। কী আরাম। আর কোথাও কোনও আওয়াজ নেই।

গতকাল থেকে বাসে করে, সরু রাস্তা, পাশে গভীর গিরিখাত, এমন এক পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছে ইস্তক মনে হচ্ছে স্বর্গে আছে। প্রকৃত স্বর্গ। অসামান্য ফিলিং কিন্তু।

মানালি থেকে কিন্নর, কল্পা, তারপর এই লাহুল স্পিতির পথ। অদ্ভুত, মানুষের পায়ের স্পর্শে ছিন্নভিন্ন না। প্রায় জনমানবহীন সুমদো। জনসমাগম হয়ই না প্রায়। শুধু মিলিটারির লোক ছোট ছোট ডেরা বেঁধে থাকে।

ইন্দো টিবেটান বর্ডার পুলিশের টিম ওদের অভ্যর্থনা দিয়েছে। পকোড়া আর গরম চা খাইয়েছে। পকোড়ার জন্য আলু, পেঁয়াজ, তেল, স্টোভ, এমনকি চায়ের জলটুকু অব্দি নিচ থেকে আসে। অনেক নিচ থেকে, মিলিটারি ট্রাকে বোঝাই হয়ে আসে র‍্যাশন। সবুজ মিলিটারি ট্রাকে ছাওয়া পথ। ছাউনিগুলোও সবজেটে।

কিন্তু ছাউনি থেকে ওরা যখন হেঁটে হেঁটে অনেকটা দূরে চলে এসেছিল, তখন আর কেউ দেখেনি ওদের। ডাকেওনি। এক অপরিসীম শূন্যতার মাঝখানে এসে দাঁড়াল ওরা। সেদিন প্রথম সোমনাথ পরিপূর্ণভাবে পেল সুদক্ষিণাকে।

মধ্যরাতের বিছানার প্রাইভেসি এর কাছে কিসসু নয়।

হঠাৎ কথাটা ফট করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল সোমনাথের। কাল থেকে মা-কে ফোন করোনি, তাই না?

চমকে তাকাল সুদক্ষিণা। মনেই ছিল না তার। হু হু হাওয়া আর নীল স্বচ্ছ আকাশের নেমে আসার ভেতর সে ভুলেই গেছিল মায়ের কথা। অপরাধবোধে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল চোখ। “করবটা কী করে, শুনি? টাওয়ার আছে এখানে?” ঝলসে উঠল রাগ, আবার।

তারপর, হঠাৎ থেমে গিয়ে মৃদু গলায় বলল, মনে করালে কেন?… মা বোধহয় খুব চিন্তা করছে আমাদের জন্য, জানো সোমনাথ?

সোমনাথ ঠোঁট কামড়াল। সত্যি, মনে করাল কেন। এই প্রথম পুরোপুরি আনপ্লাগড অবস্থায়, পেয়েছিল সুদক্ষিণাকে। পৃথিবীর থেকে, সব সম্পর্কের থেকে, অনেক আবেগ-বোঝার থেকে মুক্ত।

***

ট্র্যাভেল এজেন্টকে ফোন করে করে, ইন্দো টিবেটান বর্ডার পুলিসের কনট্যাক্ট নম্বরটা, ততক্ষণে পেয়ে গিয়েছেন সুদক্ষিণার মা। গতকাল সারারাত ঝড়ের বেগে সুদক্ষিণা সোমনাথ দুজনের ফোনে ফোন করে গেছেন আর আউট অফ রিচ পেয়েছেন, সকাল অব্দি পাগল পাগল লাগছিল, চোখ রক্তজবার মতো লাল।

শেষমেশ কলকাতার ট্র্যাভেল এজেন্টের থেকে মানালির ট্র্যাভেল এজেন্ট, তার কাছ থেকে কী, কীব্বর, কাজা সব জায়গার মিটিমিটি সরাইখানা আর এজেন্টদের ফোন। তারপর শেষমেশ পেয়ে গেছেন একজনকে। সে-ই দিয়েছিল আই টি বি পির নম্বর।

সুদূরে রিং যাচ্ছে। ছাড়ার পাত্র নন অনামিকা। একমাত্র মেয়ে, যাকে মানুষ করতে হয়েছে একা, স্বামীহীন, বুকের রক্ত জল করে যার মুখে অন্ন জুগিয়েছেন। আজকের মা উনি। সেকেলে মহিলা নন। মেয়ের প্রতিটি মুহূর্ত না জানলে তাঁর চলবে না। ঘুম হবে না। মুখে খাবার উঠবে না।

রিং যাচ্ছে। মিলিটারির লোকের বসানো তারে তারে।

সোমনাথ আর সুদক্ষিণা শুধু পরস্পরের দিকে কী এক আসক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে। যেন ঘর পালানো দুই শিশু। ওদের মাঝখান দিয়ে খেলে যাচ্ছে স্পিতি নদীর ক্ষীণ গমগম আওয়াজ সহ, হিমাচলের তুষারশৃঙ্গবিধৌত হাওয়া। ওদের ব্যক্তিগত পরিসর টাওয়ার থেকে টাওয়ারে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে শুধু।

 

২। মানবীদানবী

আপনার জীবনটা খুব সাদাকালো খোপ কাটা খোপ কাটা দাবার বোর্ডের মতো ছিল, নিরুবাবু। সব মিলিয়ে আপনি খুব ইন্টারেস্টিং লোক ছিলেন। তার মানেই ভালো লোক নন ঠিক। মানে, সে অর্থে ভালো লোক নন। তাই আপনাকে নিয়ে গল্প লেখা যায়, সিনেমা করা যায়। সাদাকালো সিনেমা, বা রঙিন।

আপনি যেদিন মারা গেলেন, নিরুবাবু, আপনার মৃতদেহের উপর আছাড়িপিছাড়ি কেঁদেছিলেন যে মহিলা, তিনি আপনার স্ত্রী নন। আপনার স্ত্রী হলে বুকের ওপর পড়ে কাঁদবেন, তা অবশ্য ভাবা যায় না। কারণ তিনি শান্তিনিকেতনে পড়াশুনো করা মেয়ে।

যিনি কেঁদেছিলেন, নাটকীয়ভাবে কেঁদেই চলেছিলেন, তিনি আসলে অন্য লোকের স্ত্রী। আপনার বন্ধুপত্নী সুলক্ষণা। যারা নিয়মিত আপনার শেষ কটি দিনে অর্জি মানাতেন, আপনার বাড়ির সোফা চেয়ার টেবিল ক্যাসেট প্লেয়ার বইপত্রের সঙ্গে যাদের একান্ত সম্পর্ক ছিল…

আপনার স্ত্রী তখন গুয়াহাটিতে ছিলেন, চাকরির খাতিরে তিনি দূরে থাকতেন। আপনার স্ত্রী শেষ সময়ে আপনার পাশে ছিলেন না, ছিলেন ওই অন্য লোকের স্ত্রী। অন্য লোকটিও এসেছিলেন, পায়ের কাছে হাঁটু দুমড়ে বসে হাউ হাউ কেঁদেছিলেন, নিরুবাবু। ওর নাম সঞ্জয়… সবাই ওকে চেনে। কনট্রাকটর। আপনার বাড়িতে মদের বোতল নিয়ে রোজ বিকেলে ঢুকত।

আপনার স্ত্রী পরের দিন এসেছিলেন, পরের দিন এসে দেখেছিলেন আপনার মরা মুখ হুবহু আপনার ২০ বছর আগেকার বিবাহ রাত্রির মতো সুন্দর। কারণ অতিরিক্ত ফ্ল্যাব, অতিরিক্ত মেদ, শরীরে জমা অতিরিক্ত জল সব মরে শুকিয়ে গিয়েছিল, মৃত্যু সব জলকে শুকিয়ে দেয়… জানতেন না, নিরুবাবু?

আপনার স্ত্রীকে নিয়ে এখন বিস্তর আলোচনা। তিনি মানবী না দানবী। বিপদের সময়ে, অসুখের সময়ে, আপনার স্ত্রী কীভাবে আপনাকে ফেলে চলে গেলেন। তিনি কতটা নিষ্ঠুর। আপনার সন্তানকে আপনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। আর আজ, যেহেতু ডিভোর্স হয়নি, সুতরাং তিনি ফিরে এসেছেন, আপনার তিনটে ল্যাপটপ, সারাবাড়ির স্তূপীকৃত জিনিসের মধ্যে থেকে খুঁজে পাওয়া চারটে মোবাইল ফোন, দুটো ডিজিট্যাল ক্যামেরা, একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার আর অসংখ্য বইয়ের দখল নেবেন বলে।

আমরা যারা এসব আলোচনা করছি তারা কেউ জানি না, যে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একটিও টাকা নেই। সাকুল্যে দশ হাজার টাকা অ্যাকাউন্টে রেখে আপনি চক্ষু বুজেছেন, ইয়েবাবু! আপনার স্ত্রী আর কীসের দখল নেবেন? দখল নেবার আছেই বা কী? আপনার ফ্ল্যাটের ই এম আই তো এখনও শোধ হয়নি। সেটা শোধ করলে তবে তো ফ্ল্যাট পুরোপুরি আপনাদের হত, তাই না? সুতরাং আপনার স্ত্রীর সাকুল্যে সম্বল ওই কয়েকটা বই আর একগাদা গ্যাজেট।

আজ বসন্তোৎসব, তাই চাদ্দিকে হুল্লোড় চলছে। দুধওয়ালা দুধ দিয়ে গেল এক গাল রং মেখে, রাস্তায় ছোট ছেলেমেয়েরা মাথায় বাঁদুরে রং নিয়ে বাঁদর সেজেছে। মদ্যপান হবে আজ। সেই বন্ধু আর বন্ধুর স্ত্রী আপনাকে মিস করবে, যারা এই দিনে আপনার সঙ্গে মাল খেত। তবে এরা অন্য কাউকে ইতিমধ্যে জপিয়ে নিয়েছে।

চাদ্দিকে অরগানাইজড প্যান্ডামোনিয়াম চলছে। আজ কেউ মৃত্যুর কথা ভাববে না, পরস্ত্রীর গালে রং দেবার কথা ভাববে। এরই মধ্যে আমি নিরুবাবু, মৃত আপনার কথা ভাবি। আপনার জন্য কেউ কাঁদুক না কাঁদুক, আজ তো আপনার জন্মদিন। মৃত্যুদিনের পরের দিনের জন্মদিন। সেদিন রাজু, আপনার স্ত্রীর ভাই, আপনার কথা বলতে গিয়ে অনেক নিন্দে, অনেক প্রশংসা করেছিল। সব ঘাঁটা কথা। মাথা গুলিয়ে যায় ও সব শুনলে। একটা কথা আর একটা কথাকে এমনভাবে কেটে দেয় যে শেষ অব্দি পড়ে থাকে শূন্য। তবে দিদির হয়ে সাফাই গাইতে চাওয়া রাজু, আপনার ব্যাপারেও সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাওয়া রাজু, একটা কথা পরিষ্কার বলেছিল, উনি লোকটা অন্যরকম ছিলেন।

দুর্জনে বলে আপৎকালে আপনার স্ত্রী চলে গিয়েছিলেন ছেড়ে, এখন সম্পত্তির জন্য ফিরে এসেছেন। তা বলুক না, আসলে তো বন্ধন, মায়ার না কীসের, কে জানে, শেষ কটা কিস্তির টাকা তো উনিই দেবেন আর আপনার অন্য যে ভাড়াটে বসানো পৈতৃক বাড়িটা, সেটার জন্যও তো, কত ঝঞ্ঝাট সইলেন। এখনও আপনার স্ত্রী আপনার প্রায় বেহাত হয়ে যাওয়া বাড়ির জন্য মামলা লড়তে আসেন। গুয়াহাটি থেকে, প্লেনভাড়া দিয়ে। স্ত্রী বলে কতা!

 

৩। একটি শরীরী গল্প

ছেলেটি, ও মেয়েটি। থুড়ি, ভদ্রলোকটি, ও মহিলাটি। শরীরী… খুবই শরীরী কারণেই ওদের দেখাসাক্ষাৎ। পেশাগতভাবে মেয়েটি….

না, ভদ্রলোকের বগলে ব্রাউনপেপারে মুড়ে মদের বোতল বা পকেটে বেলফুলের মালা নেই। রেস্তোরাঁয় সঙ্গিনীকে ড্রিঙ্কসে ড্রাগস মুড়ে দিয়ে কাত করেও ফেলাটাও অবাস্তব। এর পক্ষে। ভদ্রলোকটি, অকালে স্ট্রেসজনিত কারণে যার সুগার হয়ে গেছে, এবং টাক পড়ে গেছে, এবং ভুঁড়িটি নাদা থেকে চুপসোতে চুপসোতে এখন সেমি বাতাবিলেবু স্টাইল, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক হিরো। এই মুহূর্তে।

ভদ্রমহিলাকে নিয়ে শরীরী চিন্তাগুলি কেন যেন থামতেই চাইছে না। উনি ঘামছেন, প্রোফিউজলি ঘামছেন, ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা হবার আগের মুহূর্তে। দেখা হবার জায়গা একটাই। সেখানেই, যেখানে প্রথমবার দেখা। মহিলার কর্মস্থলে।

হাসপাতালের করিডোর। মহিলা মুখে পান ঠুসে বেরিয়ে এলেন কাচের দরজা ঠেলে। মরণ হয় না বুড়োর, টাইপস মুখ। বললেন, গজাননবাবু, আবার এসেছেন।

ইয়েস ম্যাডাম। আপনার জন্য একটা ছোট্ট ইয়ে…

আপনাকে তো অনেকবার বলেছি এভাবে আমাকে মিসড কল দেবেন না। আমার হাজবেন্ডের নজর খুব খারাপ। সব কল লিস্ট চেক করে আজকাল। ওর সন্দেহবাতিক আছে।

গজানন পকেট থেকে রুমাল বার করে ঘাম মুছলেন। স্বপ্নে এই মহিলাকে বহুবার আদর করেছেন। এখন পারবেন না।

অথচ এই করিডোর নীরব, অর্ধ অন্ধকার, শুনশান। পেছনে ভ্যাট রাখা তিন রঙের। তিনটিতে তিন রকমের বর্জ্য ফেলার নিয়ম, বিপজ্জনক বায়োডিগ্রেডেবেল যথা, অসুখঘটিত, শরীরাংশ সমেত, এমনি বায়োডিগ্রেডেবল, নন বায়োডিগ্রেডেবল ইত্যাদি…

একটা গোলাপ ফুলের মতো আকৃতির জিনিস বার করলেন কালো, পাশ দুমড়ে যাওয়া, ফুলে উঠে ফেটে যাওয়া ফোলিও ব্যাগ থেকে। খোলার পর বোঝা গেল ওটা বেনারসি জর্দার প্যাকেট, সঙ্গে একটা হেয়ার ক্লাচার। উপহার। তমসার জন্য।

তমসার মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটল। যাঃ কী করছেন। এসব কেউ আনে? আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?

প্লিজ, প্লিজ, অ্যাক্সেপ্ট ইট। আপনি কেমন আছেন?

আপনি কেমন আছেন? রিকভারি ঠিকঠাক হয়েছে?

ঈশ্বর রক্ষা করেছেন, ওই রিপোর্টটা, ইয়ে হয়েছে।

বলেইছিলাম আপনাকে। রুটিন বায়োপ্সি। কিচ্ছু পাওয়া যাবে না। তাছাড়া পেলেই বা কী। আমাকে তো দেখছেন। যমেরও অরুচি।

ছিঃ এভাবে কেন বলছেন?

এদিক ওদিক দেখলেন গজানন। একবার হাতটা ছোঁবেন?

এখানে রুগি হিসেবে এসে ভর্তি ছিলেন আড়াই সপ্তাহ। তখনই ব্যাপারটা দানা বাঁধে।

একটা অঙ্গ বাদ যাবার পর শরীরে কী যেন নেই কী যেন নেই বোধ হয়। সারাদিন মন আনচান করে। তমসাদি বলেছিলেন, বায়োপ্সিতে অঙ্গ গেলে মানুষের, বিশেষত মধ্যবয়সী পুরুষ মানুষের, অদ্ভুত ইনসিকিওরিটি হয়। আপনার যা হচ্ছে তাতে অবাক হবার কিছু নেই।

গলা নামিয়ে বলেছিলেন, আমারও ব্রেস্ট ক্যানসারের একদম ফার্স্ট স্টেজে কাটা পড়েছে। এখন ভালো আছি। প্যাডেড ব্রা, সঙ্গে সাপ্লিমেন্ট।

স্বপ্নে লজ্জাহীন দেখেন গজাদা। ফুলন্ত, ভরন্ত পুরন্ত বুক, তমসা তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন।

এখন ঘামছিলেন। আড়চোখে ঐ তিনটে বর্জ্যর ভ্যাট দেখলেন। পরীক্ষানিরীক্ষার পর কোনও অস্বাভাবিক গ্রোথ বা ম্যালিগন্যান্সি পাওয়া যায়নি। এই ছোট্ট স্যাম্পল ছাড়া বাকি সব পরিত্যাগ করা হইল।

একটা অঙ্গ কি ওই ভ্যাটের মতোই কোনও একটা ভ্যাটে চলে গেল?

সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। ঘরে স্ত্রী পুত্রাদি নেই। খালি তমসার শরীর ভাবেন রাতে শুয়ে। পরিপূর্ণ নারীর শরীর, মাতৃত্বময়, পৃথুল, তাঁকে ঢেকে দিচ্ছে স্তনদুটি, শ্বাসরোধ করে ফেলছে।

গজানন চলে গেলে, হাতের জিনিসদুটো নিয়ে তমসা ভ্যাটগুলোর দিকে এগিয়ে যান। বুড়ো বয়সের চুলকুনির দোষ। যাকগে, প্রৌঢ় লোক, এমনিতে ভদ্র টদ্র। গায়ে তো আর হাত দিতে সাহস পায়নি। রাতে, কেবিনে ইঞ্জেকশন পুশ করতে করতে চোখে যেন জলও দেখেছিলেন দু একবার। বেচারা!

 

৪। যন্ত্র না

বড় দুশ্চিন্তা। বড় কষ্ট। এই রোবট জীবনে এত কষ্ট কিছুদিনের মধ্যে আর পাইনি। সেই প্রথম যৌবনে একবার।

কাল জানতে পেরেছি পূষণের প্রেমিকা আসলে মানুষ। ছোট থেকে কত কতবার বলেছি, ওরে, মানুষ বড় সাঙ্ঘাতিক জিনিস, মানুষের সঙ্গে মিশিস না, মিশিস না, তবু সেই দ্যাখো, আবার গিয়ে পড়েছে মানুষেরই পাল্লায়। আমার ভাঙাচোরা জীবনটাকে দেখেও শিখলি না রে ছেলে!

আমি রোবট। আমার শহরে আমার মতন রোবট ৪৫৬৩৫৫৪৬ জন। প্রত্যেকে বিয়ে করেছে এক এক জন রোবটকে। সুখে আছে। কারখানা থেকে ছেলেমেয়ে নিয়েছে। তাদের সিস্টেমে ডেটা ইনপুট করেছে। ভাল থাকার ডেটা। কারুর জীবনে কোনও জটিলতা নেই, অশান্তি নেই। রবিবারে মাংসভাত খায়। সোম থেকে শুক্র হাস্যকৌতুক সিরিয়াল দেখে। কারুর দাঁতে পোকা নেই, বুকে হাঁপানি নেই। সমস্যা যা কিছু সে তো বয়সোচিত জং ছাড়া আর কিছু নয়। সে একটা বয়সে তো সার্কিটগুলো খারাপ হবেই, জং ধরবেই গাঁটে গাঁটে।

অথচ আমি বয়সের ভুলে, তিরিশ হবার আগেই, বেখাপ্পা, বেভুল কাজ করে ফেললাম একটা। বিয়ে করে ফেললাম এক মানুষের মেয়েকে। এ শহরে মানুষরা রোবটরা পরস্পরের গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকে, এটা ঠিক। মেয়ে রোবটের সঙ্গে মানুষের ছেলে বা ছেলে রোবটের সঙ্গে মানুষের মেয়ের প্রেম করারও কোনও বাধা নেই, এটাও ঠিক। কিন্তু একই সঙ্গে, ফট করে বিয়ে করার ঝুঁকি? সে আমার মতো আকাট মুখ্যুরাই নিতে পারে। ব্রেনের সবকটা সার্কিটে বিস্তর তেল ঢালার দরকার ছিল আমার সেদিন। স্ক্রুগুলো টাইট দেবার দরকার ছিল। কারখানার ওরাও সে কাঁচা বয়সে আমাকে বলে দেয়নি কী সর্বনাশ হতে চলেছে। অবশ্য, বললেও শুনতাম নাকি?

আমার বউ আমার সঙ্গে থাকল না। মানুষ কখনও রোবটের সঙ্গে থাকতে পারে? ওর যে যখন তখন যা খুশি করতে ইচ্ছে করে। ওর রবিবার মাংসভাত না খেয়ে আলুপোস্ত খেতে ইচ্ছে করে। ওর যে বিকেলে ভালো করে গা ধুয়ে চুল বাঁধতে ইচ্ছেও করে। কী মুশকিল। সবচেয়ে বড় অসুবিধে, আমাদের, রোবটদের যা কোনওদিন হবে না, ওর যখন তখন বিনা নোটিসে, মনখারাপ বলে একটা জিনিস হত। তখন ও খোলা চুলে, এলোমেলো বিবর্ণ জামা পরে জানালার দিকে তাকিয়ে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার রাগ হত, হিংসেও। রোবটদের ঐদুটো হতে তো কোনও মানা নেই। তাহলে জানালার ওপারেই কিছু এমন আছে যা ওকে বেশি বেশি করে অধিকার করে নিচ্ছে। ওর চোখ, মন, টেনে নিচ্ছে। তাই, খটখটিয়ে উঠে যেই জানালা বন্ধ করে দিয়েছি, বউটা রেগে কেঁদে, পটাপট কয়েকটা চুল ছিঁড়ে, একবস্ত্রে চলেই গেল। “হৃদয়হীন পুরুষ, শুধু বুঝেছ কয়েকটা সার্কিট… ছিঃ!” বলে সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেই যে গেল, আর ফিরল না। উফফ। রোবটের জীবনে এমন মানুষ মানুষ দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা তো ভগবান দেননি। সেই থেকে আমার হৃদয়ের একটা তার জ্বলে গেছে। কারখানার ওরাও ঠিক করতে পারেনি।

আমার ছেলে পূষণকে কোনওদিন বলিনি ও এক মানবীর পেট থেকে জন্ম নেওয়া মানুষ। ওকে ছোটবেলা থেকে রোবটের মতো করে বড় করেছি, সব সময় বন্ধু হিসেবে এগিয়ে দিয়েছি রোবটদের। ও পড়াশুনোয় ভালো, ওর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ওকে রোবট জগতে নাম রওশন করতে হবে। মানুষদের সঙ্গে মিশলে চলবে না। কোনও মানুষের সংস্পর্শে আসতেই দিইনি ওকে শিশুকাল থেকে তাই। এতদিন পেরেছিলাম। ও পড়াশুনো করেছে, টিভি দেখেছে, কম্পিউটারে বসেছে। মানুষ চেনেনি।

সেই পূষণ, সেদিন দেখি, একজন মানবীকে হাত ধরে এনে ঘরে ঢুকলেন! আমাকে আলাপ করিয়ে দিলেন। বান্ধবী। নাম অনন্যা। মুখ চোখে টুপটুপে মানুষ-সৌন্দর্য। ছি ছি। এ কী করলি তুই। বাপের নাম ডোবালি? আমার তো বাক্যি হরে গেছিল। কিছু না বলে আমার আরামকেদারাটা ঘুরিয়ে নিয়ে টিভি দেখতে শুরু করলাম আবার।

পূষণের ঘরে বন্ধ দরজার আড়ালে তখন অনন্যা আর পূষণের গল্প, হৈ হৈ। গানের কলি ভেসে আসছে। আর, ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমার বুকটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আঃ আমার ছেলেটা আবার কোন ভয়ানক জীবনের পথে পা বাড়াচ্ছে, ও জানে না।

অনন্যা বেশ রাত করেই বাড়ি গেল। ওকে এগিয়ে দিয়ে ফিরে এল পূষণ। মুখে খুশির ছোঁয়া, গুনগুন গান গাইছে। আমাকে বসবার ঘরে দেখে থমকে গেল। তোমার কিছু হয়েছে, বাপি?

শোন। তোর এই বান্ধবী কি মানুষের বাচ্চা?

হ-হ্যাঁ, কেন বলো তো?

তুই আর ওর সঙ্গে মিশিস না।

কী বলছ?

আমার কথা শোন পুষু। নইলে কপালে দুঃখ আছে। ও যদি মানবী হয়, তাহলে ওকে বিয়ে করা মানে তোর সারাজীবন পস্তানো। সে পথ তুই বেছে নিস না। এত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তোর।

বাবা, কে বলেছে আমি অনন্যাকে বিয়ে করব? পাগল নাকি। ও আমার জাস্ট বান্ধবী।

সে কি! বিয়ে করবি না? তাহলে এমন ঘনিষ্ঠভাবে মিশছিস যে!

বাবা, উফ, তুমি না, মাঝে মাঝে তোমার কাণ্ডকারখানা দেখলে বুঝে পাই না রাগ করব না হাসব। তার ওপর তোমার কিছু কিছু কাজ তো ক্ষমার অযোগ্য, বাবা!

কোন কাজ?

লুকিয়েছিলে আমার কাছে। আমি আসলে মানুষ। বলোনি এতদিন, আমি নিজে জেনেছি। এরকম মিথ্যে কিন্তু শিশুদের মনস্তত্বে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

তুই জেনে ফেলেছিস নাকি, কবে জানলি, তুই মানুষ?

আমার তো কবে থেকেই বিকেল বিকেল চোরা মনখারাপ হত, তখন কারখানায় দেখালাম। তারা বলল, ডাক্তারখানায় যাও, এটা মনের রোগ, মানুষের হয়।

উফফ। আমি… আমি যা করেছিলাম, সব, সব তোর ভালোর জন্য, বাবা।

বাবা, শোনো, তোমার কোনও ধারণা নেই পৃথিবী কত পাল্টে গেছে এই ক’দিনে। তুমি সেই কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগে যে পড়ে আছ! মানুষ কত পাল্টে গেল!

কী হয়েছে মানুষের?

মানুষ এখন আর আগের মতো নেই, বাবা। জেগে ওঠো। জানো, অনন্যাকে ভালোবেসে আমার দেওয়া ভ্রূণ সে নষ্ট করে ফেলেছে। কোনও রোবট তার সন্তানকে মারতে পারে? শুনেছ কখনও? তুমি কি পেরেছিলে, আমাকে মারতে, মা যখন স্পার্ম সেন্টার থেকে মানুষের ভ্রূণ এনে নিজের গর্ভে লালন করেছিল?

উফফ এসব কী বলছিস তুই?

তারপর শোনো। অনন্যার তো আরও দু তিনটে ছেলে বন্ধু আছে। রোজ তাদের নিয়ে রাত বিরেতে যুগপৎ তিনজনের সঙ্গেই চ্যাটিং করে। প্রেম করে সময় ভাগ করে। কোনও রোবটকে করতে শুনেছ এরকম?

না পূষণ। আমাদের যে ওরকম করতে গেলে ‘টু মেনি ফাইলস ওপেন’ হয়ে, সিস্টেম বসে যায়, বাবা!

সুতরাং, জেনে রেখো, বিয়ে আমি অনন্যাকে মোটেই করব না। বিয়ে যদি করি, তোমার মতোই বোকাসোকা, একরোখা, খুব একনিষ্ঠ একটা রোবটকে, একটা যন্ত্র-মেয়েকেই খুঁজে নেব… অন্তত আমি ছেড়ে গেলেও যে কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না!

 

৫। ঘরগেরস্তি

শুরু থেকে শেষ সবটা মন দিয়ে শুনবেন কিন্তু। নইলে ধরতে পারবেন না।

লোকটা বলল আমায়।

গা সামান্য গুলোচ্ছে এখনও। মাথা টলছে। বসে আছি পা ঝুলিয়ে, হাসপাতালের বেডে।

পাশের বেডেই ওই লোকটা। মাথায় ব্যান্ডেজ। দেখতে পাগড়ির মতো। বড় একটা অপারেশন হয়ে গিয়েছে। এখন পথ্যি পাচ্ছে। এখন তার সেরে উঠতে হবে খুব দ্রুত। বাড়ি ফিরতে হবে।

নিজের জীবনের গল্পটা বলছিল আমাকে। কেন? আমি জানতেও চাইনি, কিন্তু যেন আমাকে শুনতেই হবে। এভাবে, ওর স্ত্রীর কথা বলছিল। ওর স্ত্রী কত ভাল ক্যারামেল পুডিং বানাত তার কথা বলছিল। চিনি গলিয়ে নাকি কালো করা যায়… সেইভাবেই, খুব ধরে ধরে বানাত নাকি বৌটা।

বছর দশেকের বিয়ে ওদের। এখনও ছেলেপিলে হয়নি। বউ প্রথমটা খুব ভালোবাসত ওকে, বলছিল। তারপর কেন যেন, পরের দিকে ওর মনে হত ও বেশি সাদাসিধে, একটু গাঁইয়া ভাবে ওকে তাই ওর বউ…

শুনে আমার একটু একটু শরীর খারাপ লাগছিল। এত খুঁটিয়ে আমাকে এসব বলছে কেন। কেমন যেন অদ্ভুত লোকটা।

শুরু থেকে শুনেছেন, ম্যাডাম? মন দিয়ে শুনেছেন?

হ্যাঁ শুনছি। কিন্তু আপনি উত্তেজিত হবেন না যেন। আপনার শরীর এখনও তো ভালো না। সারেননি তো পুরো। এই তো কাল অপারেশন হল।

হ্যাঁ হ্যাঁ সে খেয়াল আছে আমার। আমার অপারেশন হয়েছে আমার খেয়াল থাকবে না তো কী। তারপর শুনুন না, প্লিজ…

শুনতেই হল। যদিও আমার মাথা ঘুরছিল। ক্লান্ত লাগছিল। চোখের ওপর এরা বড় বড় আলো জ্বেলে রাখে এমন…

সেদিন আমরা লং ড্রাইভে গেসলাম, বুইলেন? ও তো খুব বেড়াতে চায়। আমিও গাড়ি কিনেছি ওরই জ্বালায়। আসলে ওর হাঁ খুব বড়। যতটা খেতে পারবে তার চেয়ে বেশি কামড়ে ফেলে। আমাকেও বলল, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওনি তো কী হয়েছে? খালপাড়ের রাস্তাটায় চল। ওদিকে গাড়িফাড়ি বিশেষ থাকে না।

ওহ। তারপর? অ্যাক্সিডেন্ট হল বুঝি?

আরে দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমি তো হেব্বি চালাচ্ছিলাম। প্রথমটা বেশ আস্তে। তারপর ও-ই আমাকে ঠেলতে লাগল, আরও জোরে, আরও জোরে… বলে। এদিকে হঠাৎ দেখি উল্টোদিক থেকে একটা ট্রাকআসছে, আর সঙ্গে সঙ্গে বাঁদিকে স্টিয়ারিং ঘোরাতে গিয়ে, দেখলাম গোটা রাস্তা জুড়ে শুকনো লঙ্কা বিছিয়ে শুকুতে দিয়েছে কারা যেন…

ওহ্‌…

মাথা ঝুঁকিয়ে ফেললাম আমি। বমির মতো টকটক কীসব উঠে আসছে আমার মুখ দিয়ে… আর পারছি না। চরাচর ভরে গেছে শুকনো লঙ্কার ঝাঁঝে।

নার্স ছুটে এসে গামলা ধরল সামনে। ঝলকে ঝলকে টক জল। লালচে রং মাথার মধ্যে।

কী, সিস্টার! ঠিক বলেছিলেন তো তাইলে, ডাক্তারবাবু। ওর অপারেশন লাগবে না। এমনিই মনে পড়ে যাবে সবকিছু…

ওই গলাটা শুনলাম। দশ বছরের চেনা গলা।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*