ফ্রান্সে আমি

আন্তন

 

 

জলাভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি, হাতে একটা টর্চ আর দূরবীন। মায়াবর্ণ বিকেল। আমায় সঙ্গ দিচ্ছেন দু’জন মানুষ, যাঁদের চেহারা আমি জেগে থাকা অবস্থায় কোনওদিন দেখিনি। ক্লিন-শেভেন দুটো বন্ধুবৎসল হাসিখুশি মুখ। কাছেই একটা খামারবাড়ি, যেখানে আমি অতিথি। কার অতিথি জানি না, তবে ঘরভাড়ার আন্দাজ আছে। হাস্যকর রেট। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের রেট-চার্ট যেন, যে সময়ে আমার দাদুরও জন্ম হয়নি।

দূরবীন চোখে লাগিয়ে চারিপাশ ভালো করে দেখতে লাগলাম, আশেপাশের জায়গাগুলো ময়না করার মতন খানিক। চোখ পড়ল একটা অশ্বথ গাছে, যেখানে, স্পষ্ট দেখলাম, একজন কোরিয়ান দম্পতি (?) গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আছেন। মোটা ডাল সামান্য নুইয়ে এসেছে। ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা চিতাবাঘও দেখতে পেলাম, চোখ দুটো গাঢ় কমলা রঙের, ভাঁটা। শিকারের দিকে সন্তর্পণে এগোচ্ছে। কিন্তু শিকার কী বা কে, সেটা দূরবীনে ধরা পড়ছে না। যে দু’জন মানুষ আমার সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের একজন বললেন ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করেন? নিশি? আসলে এই অঞ্চলে… একটু পরেই খাওয়ার টেবিলে জানতে পারবেন সব।

আমরা তিনজন খামারবাড়িতে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পরেই একজন স্বল্পবাক, বয়স্ক লোক রাতের খাবার পরিবেশন করলেন — হাতে গড়া মোটা রুটি, ঝাল-ঝাল মুর্গির মাংস, পেঁয়াজের রিং। খাওয়ার টেবিলের এক পাশে দেখলাম সেই কোরিয়ান দম্পতিও চুপচাপ বসে আছেন, একটু আগেই যাঁরা মটকানো ঘাড় নিয়ে গাছের থেকে ঝুলছিলেন। ভদ্রমহিলা খুবই লাজুক, মুখটা নিচু করে নিজের আঙুল নিয়ে খেলছেন। তাঁর স্বামী আমাদের জানালেন তাঁরা মারা যাননি, একটা ফিল্মের জন্যে রিহার্স করছিলেন কেবল, বিষয় — এ্যাপোক্যালিপ্স। সেই ফিল্মটাই পূর্ব এশিয়ার শেষ ফিল্ম, এমন অনুমান করা হচ্ছে। তারপরেই সিনেমাশিল্প ব্যান করে দেওয়া হবে ওই সব দেশে।

রাতের খাওয়াটা আমার পছন্দ হল না। যদিও পুরো খাবারটাই খেলাম। মফস্বলী দুই বন্ধুকে নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম আশপাশ অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। কোথাও কোনও জলাভূমি নেই, ঘন জঙ্গল, বড়-বড় গাছ নেই। রাস্তা অনেকটাই পাকা, এ্যাস্ফাল্টের। কয়েকটা বাড়িও উঠেছে ইতিউতি। ল্যাম্পপোস্ট বসেছে। একটা জনবসতি গড়ে উঠেছে, এটা স্পষ্ট। তবে এলাকাটা জনবহুল হয়নি।

রাস্তার পাশে একটা গুমটি দোকানে আমরা গেলাম। সেখানে পাঁচ-ছ’জন লোক বসে, দাঁড়িয়ে, আড্ডা দিচ্ছে। দোকানটা একটা ভাজাভুজির দোকান। কিন্তু ভাজা খাবারগুলো দেখে বুঝতে পারছিলাম না ওগুলো কী। কিনলাম কয়েকটা। একটা বড় ঠোঙায় দোকানদার এগিয়ে দিলেন। মাত্র দুই পয়সা দাম। বন্ধুদের ভাগ দিলাম, তারপরে কাছেই এদি-ওদিক ঘুরে দেখতে লাগলাম। ভালো লাগছিল ঠান্ডা বাতাস। এক জায়গায় লক্ষ করলাম, তিনটে লোক, ফ্লোরাল প্রিন জামা পরে, একটা গাছের তলায় বসে সুন্দর গান-বাজনা করছে। ব্লুগ্রাস। সুরটা সত্যিই খুব সুন্দর। আমি আগিয়ে গিয়ে তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম গানের সুরটা কার। তাঁরা আমায় বললেন — আপনার। আমি ওখানেই দাঁড়িয়ে একটা সিগেরেট ধরিয়ে তাঁদের গান শুনতে থাকলাম। ততক্ষণে বৃষ্টির ছোঁয়া লেগেছে বাতাসে।

চোখ খুললাম। ভোর পাঁচটা আট। ফ্রান্সে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...