সন্ন্যাসী লোকটা

জগন্নাথদেব মণ্ডল

 

আমাদের বংশটাই ছিল সাপমারা বংশ। শ্যামুলী গাইয়ের চুচুকে খড়িশ এসে মুখ লাগিয়ে দুধ খেয়ে যেত বলে ঠাকুমা গরম মাড় ছুঁড়ে মেরে ফেলেছিল। তারপর না কাঁপা হাতে কবর দিয়েছিল শেফালীতলায়। বাবা পিটিয়ে পিটিয়ে কতবার যে দাঁড়াশ মেরেছে তাঁর ইয়াত্তা নেই। সাপপোড়া গন্ধের কথা মনে এলে গা গুলিয়ে আসে।

সেবার মার্চের গরমে গায়ে ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে। গরম হাওয়ায় চোখ পুড়ে যাচ্ছে যেন। ঘটাং ঘটাং করে ফ্যান চলছে। ঠাণ্ডা লাল মেঝেতে বসে মা মুড়ি আর ডিংলের তরকারি বেড়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ দেখতে পেলাম কালোবর্ণ এক সাপ জানালার কাছে পুঁতি চোখ নিয়ে ঘরের দিকে তাকাচ্ছে। আমি চুপিচুপি উঠে জানালার পাল্লা দিয়ে দিলাম চেপে। শিরদাঁড়া গেল মট করে ভেঙে। অনবরত মোড়া মারছিল।

অনেকদিন পরে শুনেছি কালো সাপের ভিতরে ভালো লোকের আত্মা সিঁধিয়ে থাকে। মা বোষ্টম বাড়ির মেয়ে এসব দেখে নিরস্ত করার চেষ্টা করত। আমরা কেউই শুনতাম না।

তারপর প্রায় ভোররাতে স্বপ্নে দেখতাম আমি মোড়া মারছি। হাত পা বেঁকে আসছে নীল হয়ে। করোটি হাতে দেশি মদ ভিক্ষা করতে যাচ্ছি সাপুড়ের বাড়ি। ওরা হাতের শিরা কেটে নিচ্ছে। এই স্বপ্ন দেখে দেখে উদভ্রান্ত হয়ে গেলাম। ছুটে বেড়াতে লাগলাম এদিক ওদিক। খুব শীত করতে লাগল।

তারপর অগ্রদ্বীপের মেলায় এক লোকের সন্ধান পেলাম। সে বললে — চর্তুদশী তিথিতে আমার নাভি ফুলে ওঠে, ছিটকে বেরোয় শিবলিঙ্গ। আর এই নাও মহাদেবের অশ্রু থেকে জন্মানো রুদ্রাক্ষ। পুজো করো ভক্তিভরে তাহলেই স্বপ্ন কেটে যাবে।

পাড়ার একজন বলল এ তো রুদ্রাক্ষ নয়, কুলের আঁটি। আমার মনে অবিশ্বাস জন্মাতে কোশাকুশি দিয়ে চেপে ধরতে দেখি বনবন করে ঘুরতে লেগেছে ওই ফল।

আমি আবার সন্ধান করলাম ওই লোকটির। গৃহী লোক। একাই থাকে। দীর্ঘ সবল চেহারা। কালো রং। গাঁজা খায়। দেখে সন্ন্যাসী মনে হয় না তবে ভয় জাগে।

আমি পাটুলি থেকে ট্রেনপথ পেরিয়ে টোটো চড়ে পৌঁছেছিলাম তাঁর বাড়ি। সে তখন রেডিও শুনছিল। মুলিবাঁশের বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে তখন বিকেলের আলো।

আমায় দেখে বলল আমি জানতাম তুই আসবি। নে খানিক কারিপাতা তোল। চিঁড়ে ভাজ। আর এখানেই থেকে যা। চলে যেতে গেলেই গাভী বানিয়ে দোব। দোহন করে চান করাব লিঙ্গ।

রয়ে গেলাম লোকটার কাছে। একটু একটু করে ভালোও বেসে ফেললাম। চান না করা দেহ উলুঝুলু চুল ছাইমাখা বুকে বুক লাগিয়ে চুপচাপ বসে থাকি।

অনেক রাতে অমবস্যায় বুকে সর্দি বসলে রসুনতেল মাখিয়ে দেয় আমার বুকে। আমিও জলপাই তেল মাখিয়ে দিই শ্রীঅঙ্গে।

চায়ের জল চাপাই। স্টোভে শব্দ হয়।

রাসমণি সিরিয়াল দেখি একসাথে। পথে পথে ঘুরে মরি। লবঙ্গ গাঁজায় মিশিয়ে খাই। অশান্তি করি। পিছুটান নেই, পরিবার মরে হেজে গেছে। পাথরচাপরির মেলায় যাই একসাথে ঝোলা কাঁধে। চিমটেয় গান শুনি। এই বেশ ভালো আছি…

পেপার টেপার পড়ি না। সিগারেটকে আদর করে বিদেশি বিড়ি বলে ডাকি। তবে শুনলাম সমকাম আর অপরাধ নয়, পরকীয়া বৈধ।

এসব খবর শুনেই ভুলে গিয়েছি লোকটা আর আমি। সাপ ব্যাং নেউল বাঁচানোর কাজে নেমেছি দুজনে। বেশ বয়েস হয়ে গেছে আমাদের। বংশও শেষ, সাপ মারে না আমাদের কেউ। মহালয়ার সকলেই জল পেয়ে জ্বলজ্বল করে।

পুরো শ্রাবণমাস দুজনে রয়ানি গান গাই আমরা….

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. গল্পটাকে দমিয়ে দিলেন কেন? কী চমৎকার শুরু হয়েছিল…

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*