দেবীপক্ষে লেখা অন্ধকার

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

 

‘আরে! আজ যা কাণ্ড হয়েছে না!’

কলিংবেল টেপার পর, ওরা সবে ফ্ল্যাটের বাইরে চটি এবং জুতো ছাড়ছে ক্রমান্বয়ে, ভেতর থেকে স্বর উড়ে এল। হ্যাঁ, এই অ্যাপার্টমেন্টে সব ফ্ল্যাটের বাইরেই সিমেন্ট-বাঁধানো জুতোর তাক আছে, জুতোটুতো সেখানেই রাখা হয়। টাচ উড, আজ অব্দি চাঁদা থেকে চাকরি চাইতে আসা, নানাবিধ লোকজন আবাসনে ঢুকলেও জুতোচোর ঢোকেনি কখনও। মুনুর ধবধবে সাদা, মুখের কাছে রুপোলী জরির কাজ, চটকদার কেড্‌সই হোক, সৈকতের স্লিপফ্লপ কিংবা অরুণিমার স্পেয়ার হাওয়াই চপ্পল, সবাই পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে স্যু-র‍্যাকে। বাবা মেয়ের চোখাচোখি হয়ে গেল এক রাউন্ড। তারপর দুজনে ঘরে ঢুকে সোজা একসঙ্গে তাকাল রান্নাঘরের দিকে। সৈকত বলল, ‘ও! তাই দুধপোড়ার গন্ধে নেপালের ঘর অব্দি ম ম করছে!’ নেপাল, মানে সিকিওরিটি গার্ড ওদের। মুনু চেঁচাল, ‘ও মা, আজ তাহলে দুধ-মুশলে খেতে পাব না?’ অরুণিমা ছিটকে বেরিয়ে এল রান্নাঘর থেকে, ‘আরে শোন না কী হয়েছে। দুধ সবে ফুটব ফুটব করছে, হঠাৎ শুনি বারান্দায় কেমন একটা ডাক, ঠিক যেন কেউ বলছে ‘আমাকে ছেড়ে কোথায় গেলে মা?’ আমি তো তখনই বারান্দায়। দেখি, সামনের অশোক গাছটার ডালে একটা পুঁচকে পাখি, রংটং অত বোঝা যাচ্ছে না, ভয় পেয়ে তারস্বরে চেঁচিয়েই যাচ্ছে!’

সৈকত নির্বিকার থাকলেও মুনু তো চুপ থাকার পাত্রী নয়। সে বাধা দিয়ে বলল, ‘তুমি কি একেবারে পাগল হয়ে গেছ মা? পাখি ওসব বলছিল?’ অরুণিমাই বা ছাড়বে কেন! ‘পাগল তো তুই! পাখি কথা বলেছে বললাম আমি? ওর শিসের সুরে কথা বসালে এরকমটাই শোনাত, যেভাবে ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করছিল। অবশ্য তোর তো কোনও ফিলিংস-ই নেই। আমার হাত পুড়ে গেলেও –‘ কথা অন্য নদীপথ তৈরি করে নিচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি সেখানে বোল্ডার বসায় সৈকত। ‘তারপর কী হল বলো না!’ ‘বলছি তো! আমি হাঁ করে রেলিঙে ঝুঁকে –‘ ‘তোমার না ভার্টিগো আছে, রেলিঙে ঝোঁকা বারণ!’ ‘আরে বাবা অতটা ঝুঁকিনি। দেখছিলাম ও কতক্ষণ কান্নাকাটি করে আর তখনই একটা মির‍্যাকল ঘটল, বুঝলি? লম্বা লেজওয়ালা একটা পাখি এসে বসল ওর পাশে আর অমনি ছানা চুপ। তারপর দুজনে মিলে বসে আছে তো বসেই আছে। আমার সে কী অশান্তি। এবার তো আলো ফুরিয়ে আসবে রে বাবা। এসব সাতপাঁচ ভাবছি, দুজনে ধীরেসুস্থে ওই পাঁচিল তোলা কারখানাটার দিকে উড়ে চলে গেল।’

গল্প শেষ হয়নি। একটু পজ দিয়ে অরুণিমা আবার বলল, ‘তারপর রান্নাঘরে ফিরে দেখি কেলেঙ্কারি। দুধ তো নেই, অ্যালুমিনিয়ামের বাটিও উড়ছে আকাশে।’ অরুণিমা ও সৈকত একই ক্লাসে ফিজিক্স পড়ত কলেজে। এই বাটি ওড়ার ব্যাপারে, সৈকত ফিজিক্স সংক্রান্ত কোনও প্রশ্নের ধারেকাছে না গিয়ে, বোধহয়, এটা তো অ্যাস্ট্রোনটদের ব্যাপার এমন একটা ভাবনা ভেবেটেবে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল, চুপচাপ। মুনুও চেঞ্জ করতে গেল। অরুণিমা রান্নাঘরে ঢুকল। দুধ নেই। চিড়ে ভাজবে এখন।

##

মুনুর গায়ের চামড়া হয়ে সেঁটে বসে থাকা জিন্‌সটা প্রায় জোর করেই খুলে নিয়ে কাচতে দিয়েছিল অরুণিমা। মুমু নাকিকান্না জুড়েছিল, ‘মা মেঘ করবে, বৃষ্টি হবে, শুকোবে না। থাক না এখন। রিয়ার বার্থডে পার্টি আছে।’ অরুণিমা মুখ ঝামটা দিয়ে, নাক টিপে বলল, ‘তোর ধারেকাছে বন্ধুরা আসতে পারবে না, এমন তেলচিটে গন্ধ বেরোচ্ছে, দাঁড়া না, দেড় দিনে শুকিয়ে যাবে এটা।’ কেচে মেলে দেওয়ার পরদিন সকাল থেকেই প্যান্টের কাছে ঘুরঘুর করছিল মুনু। স্কুল যাওয়ার সময় বলল, ‘যাক মা! শুকিয়ে এসেছে। একটু ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা ভাব। তুমি কিন্তু খেয়াল করে তুলে নিও।’ সৈকত ফুট কেটেছিল, ‘ওকে প্যান্ট কিনে দাও না কেন গো, আমার মেয়েটার একটা মাত্র জিন্‌স আছে শুধু!’ অরুণিমা বলল, ‘আলমারি খুলে দেখো না, তোমার গায়ে জ্যান্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে মুনুর জামাকাপড়গুলো!’ মুনু অমনি জবাব দিল, ‘তোমরা জানো না বুঝি টর্নড জিন্‌স আমার ওই একটাই? মাকে তো কতদিন ধরে বলছি আরেকটা কিনে দিতে, মার ওই এক কথা, পয়সা দিয়ে ছেঁড়া প্যান্ট কিছুতেই কিনব না!’

মেয়ে স্কুলে গেল। খটখটে রোদ তখন। দুপুর গড়ালেই তুমুল বৃষ্টি। মুনু সৈকতের সঙ্গেই যাতায়াত করে। অফিস যাওয়ার মুখে ওকে নামিয়ে দিয়ে সৈকত চলে যায়, আবার ফেরার পথে বড়সড় কিছু একটা বাধা না পড়ে গেলে ও-ই নিয়ে আসে মুনুকে। তারপর অবশ্য অনেকটা রাত জেগে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে হয় সৈকতকে। গাড়ি থেকে নেমে মুনু বলল, ‘দেখো বাবা, বৃষ্টি খতম। কিন্তু কাল বৃষ্টি হলে জোর মুশকিল হবে, রিয়ার বার্থডে তো।’ ঘরে ঢুকেই বারান্দায় চোখ গেল মুনুর। জিনসটা ভিজে ঢোল হয়ে গুম মেরে বসে আছে কাপড় শুকোনোর তারে। ছেঁড়া-ফাটা জায়গা থেকে যে সুতোগুলো ঝুলে থাকে লটপট করে, সেসব সুতো থেকেও ছোটখাটো বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। ‘মা!’ শুধু এই একটাই আর্ত চিৎকার দিতে পারল মুনু। ঝগড়া করতে, রাগ করতেও ভুলে গেল এমনকি! ‘দেখ না কী কাণ্ড!’ প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেও আবার ফর্মে ফিরে এসেছে অরুণিমা। ‘দুপুর অব্দি আকাশটা দিব্যি ছিল। আমি বোয়াল মাছের ঝাল খেলাম। ১০৩-এর খুকি এসে বলল চুলে সরু সরু অনেকগুলো বিনুনি বেঁধে দিতে, সেজেগুজে নাচতে যাবে কোথায়, তাও করলাম। তারপর এসে বসেছি বারান্দাতে। চোখটা একটু লেগে এসেছিল। হঠাৎ দেখলাম চারপাশে এককুচি আলোও নেই। ওই অশোক গাছটা, পাখি এসে বসে যেখানে, ওটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তোমাদের মনে আছে, সেই যে আমরা কোলাখাম গেছিলাম, একবার কেমন মেঘ ঢেকে দিয়েছিল সব কিছু। তোমরা হোম-স্টেতে ছিলে, আমি একাই হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। ফিরব কী করে, সেটাই ভাবছি তখন। তা ঠিক সেরকম, বুঝলি মুনু। বিদেশে ক্লাউড বার্স্ট হয় শুনেছি, সে খুব ভয়ঙ্কর, ভাবলাম তাই হল বুঝি। চেয়ারের সামনে বেতের টেবিলে সকাল থেকে চা-খাওয়া কাপটা পড়েছিল, আমি তুলতে ভুলে গেছি, আর বলিনি বলে রেণুকাও কাজ করতে এসে খেয়াল করেনি, ভেবে দেখ একবার, অমন টুকটুকে লাল রঙের একটা কাপ, সেটা পর্যন্ত, চোখের সামনে রাখা, অথচ দেখতে পাচ্ছি না। আমি ভয় পেয়ে বারান্দায় দরজা দিয়ে ঘরে চলে এলাম। তারপর কী বৃষ্টি কী বৃষ্টি। শুধু মনে হচ্ছিল, ওখানে বসে থাকলে মেঘ ফেটে যাবার পর আমাকে ঠিক গিলে নেবে।’

এতক্ষণে চোখ ফেটে জল এল মুনুর। মেয়ের কান্না একদম নিতে পারে না সৈকত। তাই রাগী গলায় বলল, ‘অরু, তুমি তো আমাদের জন্য এসব গল্প রোজ-রোজ না বানিয়ে ফর্মালি লেখালেখি করতে পারো।’ মুহূর্তের জন্য ঘোর-লাগা মুখ পালটে গেল অরুণিমার। ছোট-ছোট, ঘন-ঘন শ্বাস পড়তে লাগল। সৈকতের দিকে তাকিয়ে একদম অন্যরকম গলায় বলল, ‘তোমার মা-ই তো আমাকে দিয়ে বিয়ের পর প্রমিস করিয়ে নিয়েছিলেন, গল্প, কবিতা কখনও লিখব না আমি। কালচারাল ফাংশানে যাব না। বনেদি বাড়ির বউরা করে না এসব, ভুলে গেলে সৈকত সেই দিনগুলোর কথা!’

##

মহালয়ার দিন থেকেই বলতে গেলে স্কুল ছুটি। কিন্তু পরদিন ওদের স্কুলে আনন্দবাজার। যে যার হাতের কাজ, টুকিটাকি স্ন্যাক্স সাজিয়ে বিক্রি করবে, ছাত্রীরা। মুনু খুব উত্তেজিত। ঠিক হল, সৈকত ওকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আসবে। অরুণিমা পরে গিয়ে এটা-সেটা খাবে, কেনাকাটা করবে আর মেয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসবে।

মা আসেনি। রুমি বলল, ওদের গাড়ি করে বাড়ি নামিয়ে দেবে ওকে। ও রাজি হয়নি। মাকে ফোন করেছে, মা ধরছে না। শেষে মুনু বাবাকে ফোন করল উপায় না দেখে। বাবা ক্যাজুয়াল গলায় বলল, ‘আমার ফোনও তো ধরছে না। দেখ আবার কী গল্প ফেঁদে বসে। এনি ওয়ে, দশ মিনিটের মধ্যে আসছি। তোকে ড্রপ করে আজ অফিস ফিরতে হবে একবার।’ মুনুর কান্না পাচ্ছিল, রাগ হচ্ছিল। ভাবছিল, আজ মা নতুন কোনও গল্প শোনাতে গেলেই মায়ের মুখে হাতচাপা দিয়ে দেবে ও। গাড়ি চালিয়ে আসতে আসতে সৈকতের বিরক্ত লাগছিল। জরুরি মিটিং থেকে উঠে আসতে হল! অরুণিমা এটা কী শুরু করেছে? গল্পের গরু গাছে তুলছে সারাক্ষণ! মাঝে তো ও ভেবেছিল, অরুকে নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাবে। ওদের খুব ক্লোজ বন্ধু মণীশ সবটা শুনে বলল, ‘সৈকত তুই তো অস্বীকার করতে পারবি না, কলেজ লাইফে অরুণিমা বেশ হ্যাপেনিং রাইটার ছিল। মাসিমা ওর সব কল্পনার, ক্রিয়েটিভিটির জানলা দরজা একটার পর একটা বন্ধ করে দিয়েছেন। মেয়ে, বরকে ছাড়া আর কীভাবে ওর এই কল্পনা, গল্প-বলা এগুলো চ্যানেলাইজড হবে বল তো?

লিফটের দরজা খুলে নেমেই মুনু সৈকতকে বলল, ‘দেখো বাবা দেখো, ঘরের দরজা খোলা, কোলাপসিবলটা পর্যন্ত টানা নেই। মা ভেবেছেটা কী, আজ নির্ঘাৎ ভূতের গল্প শোনাবে আমাদের।’ সৈকত মুখে কিছু না বললেও, দাঁতে দাঁত চিপে, মনে-মনে উচ্চারণ করল, ‘শি ইজ ইম্পসিবল!’

ঘরের মধ্যে শান্তিনিকেতনী মোড়া গড়াগড়ি খাচ্ছে। মেঝেতে পড়ে আছে টমেটো-রঙা, রক্ত-লাগা, ফালা-ফালা করে ছেঁড়া একটা নাইটি। অরুণিমা নয়, ওই নাইটিটা আজ গল্প শোনাবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*