তিতলি

সৈয়দ কওসর জামাল

 

কলকাতার বাইরে যখন থাকি পারতপক্ষে খবরের কাগজ পড়ি না। পড়ার কথা মনেও আসে না। এই যে গত সপ্তাহের শেষ তিন দিন ভুবনেশ্বরে ছিলাম, কাগজ পড়ার কথা মাথাতেই আসেনি৷ অফিসের গেস্ট হাউসে খবরের কাগজ আসে না তা তো নয়। কিন্তু সে কথা মনেও ছিল না। অথচ যখন কলকাতায় থাকি, সকালে চায়ের কাপের সঙ্গে দু-দুটো কাগজ হাতে চাই। সবই অভ্যাস। বাইরে কলকাতা নেই, অভ্যাসও নেই।

তাই বলে খবর যে কানে আসেনি তা নয়। কিছু কিছু খবর বাতাসের আগে ছোটে। সেই যে সেবার পুরীতে ছিলাম, সমুদ্রের ধারে নির্জন পান্থনিবাস, বিশ্রাম, খাওয়া, সমুদ্রস্নান আর বিচে গিয়ে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করিনি, তখনও কি বাতাসের মতো কেউ এসে বলেনি, ‘সাবধান, সমুদ্রে ঝড় উঠেছে’? কিছু একটা টের পাই সমুদ্রস্নানের সময়। হঠাৎই মনে হল পায়ের নিচের বালি দ্রুত সরে যাচ্ছে৷ জলে অজস্র ছোট ছোট ঘূর্ণি। স্নান কমপ্লিট না করেই ঘরে ফিরে গেছি। সন্ধ্যা হতেই বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ দরজায় আছড়ে পড়া। দরজা খুললে আর বন্ধ করা যায় না। বাতাসের এই শক্তির পরিচয় আগে কখনও পাইনি৷ রাত বাড়তেই সামনের বালিয়াড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ণ ঝাউগাছগুলো ডাইনি চুল ছড়িয়ে মাথা নাড়তে থাকে৷ ভয়ে তাকাই না সেদিকে। ডাইনির নাম যদি মেডুসা হয়, জানি চোখ রাখলেই পাথর হয়ে যাব। অথচ ডাইনির সব চুল কোথায় যে উড়ে যায়। শীর্ণ ঝাউগাছগুলো একে একে স্কন্ধহীন হয়ে দুলতে থাকে। অন্য বড় বড় গাছগুলোও গাছের স্কেলিটান হয়ে পূর্বস্মৃতি বহন করছে। আর সমুদ্রের দিকে চোখ পড়তেই তেড়ে আসে আমাদের দিকে। এত ক্রোধ জমেছিল তার বুকের ভিতরে জানতে পারিনি।

সেই থেকে, সেই সুপার সাইক্লোনের পর থেকে, পুরী আমাকে আর অ্যাট্রাক্ট করে না৷ কিংবা বেশি বেশি অ্যাট্রাক্ট করে বলেই হয়তো ভয় পাই ভেতরে ভেতরে।

গতকাল এয়ারপোর্টে নামার পর থেকে দেখি ভয়ে ভয়ে আছে কলকাতা। এই বুঝি সমুদ্রঝড় উঠল! বে অফ বেঙ্গল কি আমাকে এতদূর তাড়া করে আসবে কলকাতা অব্দি? কে জানে! তবে আশ্বিনের এই দিনে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আশ্বিন মাস। বাংলা ক্যালেন্ডারের দু’একটি মাসের কথা আমি জানি৷ পঁচিশ তারিখের সূত্রে জানি বৈশাখ, খুব বৃষ্টির সূত্রে জানি হয় আষাঢ় না হয় শ্রাবণ। শ্রাবণের বাইশ তারিখ কোনও কোনও বছর মনে এসে যায়। আর এই আশ্বিন। পুজোর মাস, জেনে যাই। পুজোর কলকাতায় বৃষ্টি হয় না, এমন নয়। তবে বৃষ্টি এখন একটু বেশি বেশিই শুরু হয়েছে। ডিপ্রেশান ইন বে অফ বেঙ্গল। কথাটা প্রায়ই শুনি৷ এবার কিন্তু কেউ ডিপ্রেশানের কথা বলছে না। বলছে ঘূর্ণিঝড়ের কথা। না, তাও বলছে না। বলছে তিতলি।

কে তিতলি তা জানি৷ আমার এক বান্ধবী। কিন্তু কেন তিতলি তা জানি না। মানে ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক বুঝতে পরছি না। তবে তিতলির আচরণের মধ্যে একটা ঝোড়ো হাওয়া আছে। বেশ স্মার্ট। চোখেমুখে কথা বলে। বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ৷ তার সঙ্গে বৃষ্টিকে মেলানো যায় না। বরং সে একটু কঠিন। ব্যবহারে রুক্ষ। হয়তো এ কারণেই ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক সাধারণ বান্ধবীদের চেয়ে আর এগোতে পারেনি৷ ঝড়ের সঙ্গে প্যাশনের সম্পর্ক আছে মনে হয়। বৃষ্টির সঙ্গে কি ইমোশনের? এসব ভেবে দেখিনি।

আপাতত বৃষ্টি খুব জ্বালাচ্ছে। একনাগাড়ে চলছে। আর ক’দিন এমন চললে দুর্গাপুজোটাই নিরানন্দ হয়ে যাবে। এ কারণেই কলকাতার মন খারাপ হওয়ার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি৷ কিন্তু অবস্থা যে শুধু বৃষ্টিতেই আটকে আছে তা নয়। গত তিনদিনের খবরের কাগজ পড়ে দেখার ইচ্ছে হয়। দেখামাত্র তিতলিময় হয়ে উঠি। উড়িষ্যার গোপালপুর সমুদ্রের কাছে তার তাণ্ডব কাগজে পড়ি৷ রাস্তায় একের পর এক বড় ট্রাক ঝড়ের দাপটে কাত হয়ে পড়ে আছে৷ তবে আশার কথা তিতলি এখন আর ঝড় হয়ে নেই। খুবই দুর্বল হয়ে আছে৷ আর এতেই নাকি বৃষ্টির দুর্ভোগ বাড়ছে। সমুদ্রঝড় এবার ডিপ ডিপ্রেশানে টার্ন নিয়েছে। তাই আরও ক’দিন হেভি রেনফলের পূর্বাভাস দিয়েছে ওয়েদার অফিস।

কলকাতা ফেরার পর থেকেই তিতলির কথা মাথায় ঘুরছে। ওর সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবছি না। অন্তত টেলিফোনে যদি কথা বলা যেত! সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, কী কথা বলব! ধরা যাক, এরকম কথা হচ্ছে আমাদের মধ্যে:

‘হ্যালো!’
‘তিতলি?’
‘হ্যাঁ, বলছি।’
‘তিতলি, আমি শুভ। কেমন আছ?’
‘ভালো নেই খুব।’
‘কেন, কী হয়েছে? এখন তো সবার মুখেই তোমার নাম। তোমাকে ভয় পাচ্ছে!’
‘সেটাই তো মুশকিল হয়েছে।’
‘তাতে তোমার কী?’
‘আরে, আমারই তো সব।’
‘মানে?’
‘ইটস সিম্পল! আমি বাড়ি থেকে বেরোতে পারছি না। কনফাইন্‌ড হয়ে আছি৷ সবাই টিজ করছে। তুমি জানো আমাকে নিয়ে ফেসবুকে কত কবিতা লেখা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ, তা হয়েছে। বাট তুমি সে নও। এসব সিলি ব্যাপারকে পাত্তা দেওয়ার মেয়ে তো তুমি নও!’
‘ওহ৷ রাবিশ! কিচ্ছু জানো না। আমি যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই স্টর্ম গ্রো করছে। রাস্তায় স্ট্যাম্পিড সিচুয়েশন তৈরি হচ্ছে। তাই ঠিক করেছি আই উইল নট গো আউট। লেট ইট রেইন, হেভি রেইন!’
‘তুমি তো ওয়েদার অফিসের মতো কথা বলছ?’
‘ওরা তো ঠিকই বলছে।’

তিতলির সঙ্গে আমার আর কথা এগোয় না। ফোন ছেড়ে আমি ভাবতে বসি। ওর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? কী সব আবোল তাবোল কথা বলছে! ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কনট্যাক্ট করতে বলি। ওর কাউন্সেলিং দরকার। তবু আমি তিতলির কথা ভুলে থাকতে চাই। ১৯৯৯ সালের সুপার সাইক্লোন এক্সপেরিয়েন্স করেছি আমি। আমার কী দরকার তিতলির কথা ভেবে!

কলকাতা ফিরেছি শুনেই তোমার ফোন। বৃষ্টির মধ্যেই তুমি দেখা করতে চাইলে৷ এমন আবগারি ওয়েদারে তোমার সঙ্গের চেয়েও মনে হল মদ্যপান করা জরুরি। তুমি উপলক্ষ মাত্র। আমি জানি তুমি পার্ক স্ট্রিট পছন্দ করো। আর পার্ক স্ট্রিট মানেই এখনও তোমার কাছে অলিপাব। নস্টালজিক হবার বয়স তোমার আসেনি। আর অলিপাব এখন কত বদলে গেছে। তবু তার দৈন্য ঘোচে না, সেই শ্যাবি স্যাঁতস্যাঁতে দমবন্ধকরা পরিবেশ৷ দ্যাখো চন্দনা, আমি তো তোমাকে পার্কের পাবেও নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু তোমার ওই একই জায়গা, অলিপাব! কী আনন্দ পাও ওই ভিড়ে? হ্যাঁ, মানছি, একদিন আমিই তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তখন তো আমি একজন কেরানি মাত্র। সবে চাকরিতে ঢুকেছি। আর ছিল কবিতা লেখার শখ। উফ, সেসব দিন গেছে। প্রথম দিকে তো তোমার প্রতি আমার অন্যরকম কোনও ইন্টারেস্ট ছিল না। কবিতা লিখতে এসেছিলে বলে অলিপাবে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। কবিবন্ধুদের সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম। আজ একটা ঠিক কথা বলো তো — এখানে আসার আগে কি তোমার হুইস্কি খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না?

আমার সঙ্গেই প্রথম খেয়েছ। জানি, তুমি একথা আগেও বলেছ, কিন্তু বিশ্বাস করিনি। তাই আজ আবার জিজ্ঞেস করছি। আমাকেই রেসপনসিবল করছ? তা করতেই পারো। কিন্তু তোমার কি নিজের ইচ্ছে ছিল না? শুধু আমার অনুরোধেই?

হ্যাঁ, আব্দুলকে বলছি আর এক পেগ করে দিতে। সাথে বিফস্টেক, ফুলডান? ওহ্‌, তুমি এখনও এসব খেতে ভালোবাসো দেখছি। একমিনিট। আব্দুলকে ডাকি।

কী বললে? আমাকে বেশ কিছুদিন ধরে খুঁজছ? কেন, টেলিফোন করলেই তো পারতে? হ্যাঁ, হ্যাঁ, কদিন অফিসের কাজে বাইরে গেছিলাম। মাত্র কদিনের জন্য। গ্লাসটা শেষ করি, তারপর তোমার কথা শুনব। না, এত তাড়াহুড়ো করে খেও না। নেশা ধরে যাবে কুইকলি। উই হ্যাভ মাচ টাইম ইন হ্যান্ড। আস্তে খাও। বাইরে বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছে।

হ্যাঁ, আমি অফিস ট্যুরে একাই যাই। তুমি যেতে চাইছ আমার সঙ্গে কোথাও? না, এখনই প্রমিস করছি না। কারণ, কোথায় যাচ্ছি তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। অনেক জায়গাতেই অফিস গেস্ট হাউসে উঠতে হয়। কলিগরা মিট করতে আসে। ওদের কাছে যেতে হয়। ঝোঁকের মাথায় কিছু করলে মাই রেপুটেশন উইল বি অ্যাট স্টেক। আর তুমিই বা যাবে কী করে আমার সঙ্গে? তোমার স্কুল আছে না? আচ্ছা, ছুটি নেবে। ঠিক আছে পরে দ্যাখা যাবে। আমি তোমাকে বলব।…

ও, তোমার মনে আছে তুষারের কথা? হ্যাঁ, ওই পিছনের টেবিলে আমাদের আড্ডা হত। প্রায় রোজই। তুষার, প্রজিত, চিরঞ্জীব, দীপঙ্কর, রূপক, কল্লোল ও আরও অনেকে আসত। মেয়েদের মধ্যে স্বাতী ও ইন্দ্রাণী কখনও সখনও আসতে দেখেছি। তুমি আসতে, তবে যেদিন আমি থাকতাম।… হ্যাঁ, সে তো জানি। তুমি আমার জন্যই আসতে। কবিতা লেখা তোমার অছিলা মাত্র।

কিন্তু কেন চন্দনা? জানি না বলছ? আসলে স্বীকার করতে বাধছে। তুমি আমাকে অন্য চোখে দেখতে, তাই না?… না, আমি তা বলতে পারব না এখনও সেই চোখে দ্যাখো কি না। তুমি আজ নিজের মুখে বলছ যখন, মেনে নিচ্ছি। না, আর না! তিনটে ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে তোমার। ইচ্ছে করছে বলছ?… দ্যাখো, কন্ট্রোলের বাইরে যেও না। বি কেয়ারফুল। আমি অবশ্য তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দিতে পারি, অসুবিধে হবে না। কিন্তু বেশি হুইস্কি খাওয়ার মধ্যে বাহাদুরি নেই।… আমি চারটেতেই থামছি। খুব দরকার মনে করলে বাড়ি ফিরে আর একটা নেব।… না, আমি আর কোনও সম্পর্কে যাইনি। তোমার কি মনে হয় আমি খারাপ আছি? তুমি জানো আমার কোনও ভান নেই।…

আমি আব্দুলকে বিল দিতে বলি?… কিন্তু আমাকে খুঁজছিলে কেন জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। এবার বলো।…

চন্দনার সঙ্গে কোনও সেক্সুয়াল রিলেশনশিপে যাওয়ার মোটেই কোনও ইন্টারেস্ট আমার ছিল না। তবু তাই ঘটল। আমি আর সম্পর্কের অন্ধগলিতে ঢুকে সবকিছু জটিল করে তুলতে চাই না। কম খারাপ অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়নি।…

চারটে হুইস্কির পর ওর আর দশতলার ফ্ল্যাটে একা একা ওঠার শক্তি ছিল না। আমি চন্দনাকে ওর ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিতে যাই। যে কথা ও জানতে চাইলেও বলতে পারছিল না, ইনটক্সিকেটেড অবস্থায় তা প্রকাশ করতে বাধা ছিল না। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। আর ভেতরে চন্দনার আগলভাঙা কথা। স্বাভাবিক অবস্থায় যা বলতে পারেনি, আজ তা বলতে আটকায়নি। না, কোনওভাবেই ওর কথায় সায় দিতে পারিনি। আমি ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠব এমন ভাবনা ওর মাথায় কীভাবে এল জানি না। সেক্সও হত না। শুধু ওই তিতলি। আমিও স্বাভাবিক ছিলাম না।

চন্দনার ওখান থেকে ফিরেছি মধ্যরাত অনেকক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পর। অন্য কেউ হলে ওই অবস্থায় ওখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। বেরিয়ে এসেছি নিজেই ড্রাইভ করে। সাইক্লোন ধাওয়া করেনি আমাকে। কোনও তিতলির অনুসরণ ছিল না। কলকাতা শহরও সমুদ্রতাড়িত প্রলয়বাহনে সওয়ার হয়নি। শুধু অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। তিতলি দুর্বল হয়েছে। কনফাইন্‌ড হয়ে আছে। সুপার সাইক্লোন পেরিয়ে এসেছি ১৯৯৯ সালে। তিতলিও শান্ত ও শক্তিহীন হবে। যত খুশি বৃষ্টি হোক আজ রাতভোর। পুজোর দিনগুলো নিশ্চয়ই রৌদ্রোজ্জ্বল হবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 949 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*