#মিটু : যে বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী ছিল

শতাব্দী দাশ

 

২০১৭ সালের অক্টোবরে আমরা যে যার টুইটার হ্যান্ডেল থেকে বা ফেসবুক টাইমলাইনে হ্যাশট্যাগ দিয়ে লিখেছিলাম— ’মি টু’। ‘আমি-ও’। গতে বাঁধা যে কপিড-পেস্টেড বয়ানটি ছিল এর সঙ্গে, সেটির বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় মোটামুটি এরকম : “যদি কখনও যৌন নির্যাতন বা লাঞ্ছনার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে লিখুন #মিটু। পৃথিবী বুঝুক, যৌন নিগ্রহের সমস্যা আসলে সর্বগ্রাসী। এর ব্যাপ্তি সুবিশাল।”

আসলে গত বছরের সেই ঘটনাবহুল অক্টোবর মাসে সাত সমুদ্র তেরো নদী পারে এক হলিউডি প্রযোজক, হার্ভে উইন্সটেইন-এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন অভিনেত্রী আলিসা মিলানো। তিনি সরব হয়েছিলেন তাঁর বান্ধবীর যৌন নিগ্রহ নিয়ে। তাঁর  সেই টুইটের তলায় ‘#মিটু’ লিখেছিলেন প্রায় দশ হাজার মহিলা। মিলানো অবশ্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন অ্যাক্টিভিস্ট তারানা বার্ক-কে। ২০০৬ সালে তিনিই প্রথম যৌন নির্যাতনের শিকার হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করতে ‘#মিটু’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে বলেন নির্যাতিতদের। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে, (যেমনটি প্রথম অনুচ্ছেদের কপিড-পেস্টেড বয়ানেও বলা হয়েছে) জোর দেওয়া হয়েছিল ‘অপরাধ’-টির উপর, তার ভয়াবহতা ও ব্যাপ্তি নিয়ে বিশ্বকে সচেতন করতে চাওয়া হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, এর ফলে সহ-সারভাইভারদের মধ্যে গড়ে উঠবে সমমর্মিতার সেতু। তার চেয়েও বড় কথা, যৌন নির্যাতনকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে যে গোপনীয়তার বরফ জমে আছে, তা ভাঙতে শিখবে নির্যাতিতরা। এরপর সারা বিশ্বজুড়ে মহিলারা যে হারে হ্যাশট্যাগ মিটু লিখতে থাকেন নিজের প্রোফাইল থেকে, যে হারে কপি-পেস্ট করেন বয়ানটি, তাতে স্পষ্ট হয়, জীবনে কোনও না কোনও সময়ে, ঘরে, পরিবারে, পথে, যানবাহনে, ভিড়ে, ফাঁকায়, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, প্রমোদক্ষেত্রে— কোথাও না কোথাও তাঁরা সকলেই যৌন হেনস্থার শিকার। তাঁদের সকলেরই শরীরের সীমানা লঙ্ঘন করা হয়েছে তাদের ইচ্ছা-ব্যতিরেকে। শুধু লঙ্ঘন মাত্রা ও পদ্ধতি নানা ক্ষেত্রে নানা রকম।

হার্ভে উইন্সটেইন এরপর ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অপরাধে গ্রেপ্তারও হন, বেইলও পান। উইনস্টেইন সহ নানা বিখ্যাত ও অখ্যাত ব্যক্তিত্বকে নির্যাতক হিসেবে চিনিয়ে দিতে থাকেন বিভিন্ন মহিলা। এই জায়গায় এসে গোল বাধে। ‘অপরাধ’-এর পর ‘অপরাধী’-দের নিয়েও মুভমেন্ট মুখর হয়। মুখহীন অপরাধীকে যত সহজে মেনে নেওয়া যাচ্ছিল, ‘নেমিং ও শেমিং’-কে তত সহজে মেনে নেওয়া গেল না। কারণ সেই ব্যক্তিদের সকলেই হার্ভে উইন্সটেইনের মতো সুবিদিত লম্পট নন। অনেকেই পণ্ডিত, সুভদ্র, শালীন হিসেবে পরিচিত। তাঁদের নামে সোশাল মিডিয়ায় খাপ বসায় অনেকেই বিচলিত হলেন৷ ‘এঁকে তো কখনও তেমন করতে দেখিনি! ইনি তো ভারি অমায়িক! ইনি তো বিদগ্ধ!’— ইত্যাদি যুক্তি শোনা যেতে লাগল। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কারও নাম নিয়ে প্রমাণ ছাড়াই তাকে অপরাধী দাগিয়ে দেওয়া যেহেতু খুবই সহজ, তাই নেমিং-শেমিং-এর বিপক্ষে অনেকেই সরব হলেন।

ভারতে #মিটু ঢেউ

ভারতে #মিটু আন্দোলনের ইতিহাসটিও একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। ২০১৭ সালের অক্টোবরেই এসে গেল রায়া সরকারের সেই বিখ্যাত তালিকা, যেখানে সারা পৃথিবীর প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় পঁচাত্তর-আশি জন পুরুষ অধ্যাপকের নাম শোভা পেয়েছিল। তাঁরা পাঠদান বা গবেষণায় তত্ত্বাবধানের নাম করে ছাত্রীদের (কেউ কেউ ছাত্রদেরও) যৌন নির্যাতন করেছেন, শোনা গেল। রায়া সরকারের তালিকারও অবশ্য এক পূর্ব-ইতিহাস ছিল। ওই ২০১৭ সালের অক্টোবরেই প্রফেসর ক্রিশ্চিন ফেয়ার হাফিংটন পোস্টে স্বনামধন্য প্রফেসর দীপেশ চক্রবর্তীকে অ্যাবিউজার হিসেবে চিহ্নিত করেন। হাফিংটন পোস্ট পরে নিবন্ধটি তুলে নেয়। পারিপার্শ্বিক চাপ তার কারণ হলেও হতে পারে। হাফিংটন পোস্টের তরফ থেকে যে চিঠি প্রফেসর ফেয়ারকে পাঠানো হয়, সেখানে তাঁর দাবিকে ‘ভুল’ বা ‘মিথ্যা’ বলা হয়নি। বলা হয়েছিল, তথ্যগুলি ‘unverified’। Unverified তথ্য পরিবেশনে হাফিংটন পোস্টের কতটা আপত্তি থাকত বিশেষ কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম না এসে পড়লে, তা আলোচনাসাপেক্ষ।

ক্যালিফোর্নিয়ার আইনের ছাত্রী রায়া সরকারের লিস্টটি আসে এর প্রতিবাদ হিসেবে। হাফিংটন পোস্টের এই যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ‘যাচাই’-এর অভাবে তুলে নেওয়ার নীতির প্রতিবাদে রায়া সরকার নাকি ফেসবুকে এই তালিকা প্রকাশ করেন, তাঁর নিজের বক্তব্য অনুসারে। এই লিস্ট যদিও আন্তর্জাতিক, কিন্তু যেহেতু তিনি তাঁর বন্ধুদের বয়ান নিয়ে লিস্টটি বানিয়েছিলেন ও তাঁর বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত, তাই লিস্টে নির্যাতকদের অনেকেই ছিলেন ভারতীয়। ফলে ভারতীয় সারস্বতমহলে শোরগোল পড়ে যায়৷ এইসব উল্লেখযোগ্য নামের অনেকেই প্রগতিশীল, বামপন্থী ও অন্তত বাচনে লিঙ্গসাম্যের আদর্শে বিশ্বাসী। বর্ষীয়ান কিছু নারীবাদী তথা বামপন্থী মহিলা রাজনীতিবিদ ‘কাফিলা’-য় রায়া সরকারের গোষ্ঠীকে অনুরোধ করেন খাপ না বসিয়ে ‘ডিউ প্রসেস’-এ আস্থা রাখতে। এঁদের মধ্যে ছিলেন কবিতা কৃষ্ণন, বৃন্দা গ্রোভার প্রমুখ। প্রত্যুত্তরে রায়া সরকার-বাহিনী তাঁদের ‘সাবর্ণ ফেমিনিস্ট’ ইত্যাদি বলে বিদ্রূপ করেন। ‘কাফিলা’-র এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হেনস্থার অভিযোগ  তাঁরা আড়াল করার চেষ্টা করছেন, এমন অভিযোগও ওঠে। কিন্তু সব অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কথা বাদ দিলেও, ‘ডিউ প্রসেস’ বনাম ‘নেমিং-শেমিং’ বিতর্কটি যথাযথ কারণেই গুরুত্ব পায়।

উপযোগিতার প্রশ্নেও এই তালিকার কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল মনে হয়। এক্সেল শিটে প্রকাশিত, ফর্দের মতো একটি তালিকায় ভিক্টিমদের কোনও বিবৃতি ছিল না। কী পরিস্থিতিতে নির্যাতন হয়েছিল, হওয়ার পরের গ্লানি, হওয়ার পর তাঁরা কী করেছিলেন, কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, নেওয়ায় কী ফল হয়, না নিলেই বা কোন পরিস্থিতিতে নেননি— সেসব কিছুই জানা যায়নি। এসব জানাতে কি কেউ বাধ্য? পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে জানাতে তাঁরা বাধ্য নন। কিন্তু এটিকে যদি আন্দোলন ধরি, তবে তার নির্দিষ্ট অভিমুখ ও অভিঘাত থাকতে হয়। টেলিফোন ডাইরেক্টরির মতো একটি তালিকা দেখে হয়ত সেইসব অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংস্রব ত্যাগ করা যায়, সতর্ক হওয়া যায়, কিন্তু তেমন কোনও অভিঘাত তৈরি হয় না। উদাহরণস্বরূপ, ‘প্রফেসর এক্স ফ্রম হাওয়াই দ্বীপ’— এই কয়েকটি শব্দ পড়লে ততটা অভিঘাত সৃষ্টি হয় না, একটি নির্যাতনকে ততটা মেলানো যায় না নির্যাতনের বিশ্বজনীনতার সঙ্গে, যতটা মেলানো যেত টেক্সট ও কন্টেক্সট জানলে। নির্যাতনের খুঁটিনাটি থাকলে, সারভাইভারের ফিনিক্সীয় কাহিনী শুনে, প্রতিরোধের কাহিনী শুনে অন্য ভিক্টিমরা উজ্জীবিত হতে পারতেন বা তাঁর চুপ থাকার গল্প শুনে অন্যরা সংকল্প নিতে পারতেন— ‘আর নয়’। শুধু অপরাধীর নাম দিয়ে এইসব উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। স্বনামে হোক বা বেনামে, ছাতি চিতিয়ে নিজের গল্প বলা নিয়ে নির্যাতিতদের মনে তখনও দ্বিধা ছিল।

এই খামতি পূরণ হল ভারতীয় #মিটু-র দ্বিতীয় ঢেউ-এ। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাক্তন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত মুখ খুললেন প্রতিভাবান অভিনেতা ও বর্তমানে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নানা পাটেকর এবং পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীর বিরুদ্ধে। এতদিনের জমাট নৈস্তব্ধ্যের বরফে যেন শাবল পড়ল। তনুশ্রী মানহানির মামলায় অভিযুক্ত হলেন, কৃষক-কন্যারা তাদের মসিহা নানা পাটেকরকে সমর্থন জানালেন, তনুশ্রীর স্লাট-শেমিং হল, তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ হল। কিন্তু জানা গেল, নানার অভব্যতার ঘটনা আসলে জানতেন অনেকেই।

অনুরাগ কশ্যপ-সহ অন্য ধারার চার পরিচালক ‘ফ্যান্টম’ নামক যে ফিল্ম-কোম্পানি খুলেছিলেন, তার অন্যতম ডাইরেক্টর তথা পরিচালক বিকাশ বহাল এরপর অভিযুক্ত হলেন এক কর্মীর দ্বারা। প্রসঙ্গত, বিকাশ ‘কুইন’ নামে এক সুনির্মিত নারীবাদী চলচ্চিত্রের স্রষ্টা। একে একে অভিযুক্ত হলেন এআইবি-র গুরসিমরন খাম্বা বা ‘সংস্কারী’ আলোকনাথ, পরিচালক সুভাষ ঘাই বা সুরকার অনু মালিক বা সুগায়ক কৈলাশ খের। প্রতিদিন যে হারে সেলিব্রিটিরা অভিযুক্ত হচ্ছেন, তাতে এই মুহূর্তে খেই রাখা মুশকিল৷ আরও নানা পেশার পুরুষ অভিযুক্ত হতে থাকলেন৷ উল্লেখযোগ্য, এবার নামের সঙ্গে এল নির্যাতনের বর্ণনাও৷

বর্ণনাগুলি লক্ষ করলে দেখা যাবে, সব নির্যাতনের মাত্রা এক নয়৷ বিনতা নন্দা যেভাবে অলোকনাথের দ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন, তার সঙ্গে এআইবি-খ্যাত খাম্বার সেক্সুয়াল অ্যাডভান্সমেন্টের পার্থক্য আছে। সুভাষ ঘাই-এর স্থূল নির্যাতন আর সৃজিত মুখার্জীর কাজ দেওয়ার নাম করে স্কাইপে চ্যাট করতে বাধ্য করার মধ্যে তফাত আছে। অনু মালিকের লাম্পট্যের সঙ্গে তফাত আছে কৈলাশ খেরের সীমালঙ্ঘনের। কিন্তু সবকটিই যে হেনস্থা, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

নির্যাতনের ধারণার বিবর্তন

এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। সব ক্ষেত্রে সীমানা লঙ্ঘনের সংজ্ঞা নির্যাতকের কাছে স্পষ্ট ছিল তো? নির্যাতিতদের কাছেও কি এতদিন তা খুব স্পষ্ট ছিল? বিনোদন জগতেই হোক বা আকাদেমিক ক্যাম্পাসে, সর্বগ্রাসী পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশে পুরুষের কিছু আচরণ যুগ যুগ ধরে এতটাই ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠেছে যে বাউন্ডারির ধারণা গুলিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয় নির্যাতক বা নির্যাতিত উভয়ের ক্ষেত্রেই। গবেষণারত ছাত্রী যেমন ধরেই নেয়, গাইডের সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু সময় কাটাতে সে বাধ্য, যদি তিনি তেমনটা চান৷ উঠতি নায়িকা যেমন ধরেই নেয়, পরিচালকের সঙ্গে এক-আধবার লং ড্রাইভে যেতে হতেই পারে। এমনকি অল্পবিস্তর অযাচিত শারীরিক নৈকট্যকেও অনেকে ‘স্বাভাবিক’ বলে ভেবেছেন বহুদিন ধরে। ‘কাস্টিং কাউচ’ কথাটিও নেহাতই বিছানা-গন্ধী, যদিও বিছানা পর্যন্ত না গড়ালেও যৌন নির্যাতন হতেই পারে। কাজ দেওয়ার নাম করে স্কাইপ চ্যাটে বাধ্য করা, অযাচিতভাবে সহকর্মীর নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রশংসাসূচক বর্ণনা, আলতো পিঠে হাত রাখা, এমনকি ক্ষমতার অপব্যবহার করে মহিলার সঙ্গে অতিরিক্ত কাটাতে চাওয়া— যা কিছুকে হয়ত এতদিন হালকা চালে ‘ফ্লার্টিং’ বলে চালিয়ে দেওয়া হত, যে যে আচরণ এমনকি প্রগতিশীল, বিদ্বজ্জনদের মধ্যেও দুর্লভ ছিল না, সেগুলিও নির্যাতন রূপে চিহ্নিত হল। অন্যপ্রান্তের মানুষটি কতটা ইচ্ছুক, তাঁর সম্মতি আছে কিনা, নির্দিষ্ট কিছু আচরণকে তিনি নির্যাতন ভাবছেন কিনা— তা গুরুত্ব সহকারে বোঝার প্রয়োজনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হল।

তাত্ত্বিকভাবে যদিও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই ‘নো মিন্স নো’ একটি নারীবাদী স্লোগান, যদিও যৌনতায় ‘কনসেন্ট’-এর ধারণাও বিবর্তিত হচ্ছে অনেকদিন ধরেই, যদিও ‘নো মিন্স নো’-এর পরের ধাপে ‘ইয়েস মিন্স ইয়েস’ স্লোগানের আবির্ভাব ঘটেছে ইতোমধ্যে, যদিও শুধুমাত্র সুস্পষ্ট ‘হ্যাঁ’-কেই আমেরিকার মতো দেশে আইনিভাবে যৌনতায় সম্মতি হিসেবে গ্রাহ্য করার কথা বলা হয়েছে, তবু প্রায়োগিক স্তরে #মিটু আন্দোলন জনমানসে যৌন নির্যাতনের পরিধির সম্প্রসারণ ঘটাতে যথেষ্ট সাহায্য করেছে নিঃসন্দেহে৷

অবিশ্বাস পেরিয়ে

#মিটুর প্রতিক্রিয়ায় প্রাথমিকভাবে অভিযোগকারিণীর প্রতি অবিশ্বাসের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা পিতৃতান্ত্রিক পরিসরে প্রত্যাশিতই ছিল। প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে কেন অভিযোগকারিণীরা সরব হলেন? উত্তর হল— তাঁরাও এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজেই বড় হয়েছেন। ছোটবেলা থেকে নির্যাতন দেখে ও ভোগ করে তাকে সচেতনভাবে বা অবচেতনে ‘নর্মালাইজ’ করে ফেলেছেন অনেকেই। আবার নির্যাতনকে ‘অপরাধ’ বলে জানলেও অনেকে শিখেছেন, তা নিয়ে হৈ চৈ করতে নেই। নিজের মা-মাসিদের থেকেই তাঁরা এই শিক্ষা পেয়েছেন। তাঁরা জেনেছেন, এ ধরনের ঘটনা নির্যাতিতর জন্যই লজ্জার, নির্যাতকের জন্য নয়। তাঁরা দেখেছেন, যৌন নির্যাতন নিয়ে মুখ খুললে নির্যাতিতর পোষাকের দৈর্ঘ্য, স্বভাব-চরিত্র, রাতে বেরোনোর সময় বা পানাভ্যাস নিয়ে মুখরোচক চণ্ডীমণ্ডপীয় আলোচনা বসে। এককথায়, নির্যাতনের জন্য নির্যাতিত-র ‘বেশ্যাসুলভ’ আচরণকে দায়ী করাই সামাজিক দস্তুর, যাকে নারীবাদীরা বলেন ‘স্লাটশেমিং’। এহেন পরিস্থিতিতে নীরবতা অস্বাভাবিক নয়। #মিটু যে সলিডারিটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, তার ছায়ায় তাঁরা মুখ খোলার অবকাশ পেয়েছেন অবশেষে।

অভিযোগকারিণীরা, আশা করা যায়, সকলেই জানতেন, তাঁদের আবারও অবিশ্বাস করা হতে পারে, ‘বেশ্যা’ তকমা জুটতে পারে। কেউ কেউ আগে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ করে সেরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীনও হয়েছেন। তা সত্ত্বেও ন্যায়ের আশায় তাঁরা যখন একসঙ্গে মুখ খুলেছেন, তখন এতদিনের সর্বজনীন অবিশ্বাসকে বিশ্বাস দিয়ে ব্যালেন্স করা আশু কর্তব্য। হয়ত জোর দিয়ে বলা যায় না যে কেউই মিথ্যাচারণ করবেন না। কিন্ত অপপ্রয়োগের ভয়ে আইন হবে না, অপব্যবহারের ভয়ে মুভমেন্ট হবে না, এ একরকম অবাস্তব কল্পনা।

#মিটু বনাম ফ্লার্টিং

#মিটুর বিরুদ্ধে আরেক অভিযোগ হল, তার প্রকোপে নারী-পুরুষের রোম্যান্টিক সম্পর্কের মাধুর্য অস্তাচলে যেতে বসেছে। তাহলে কি সহপাঠিনীর কাঁধে হাত দেওয়ার আগে দুবার ভাবতে হবে? ডেটে গিয়েও কোমর জড়িয়ে ধরার লাইসেন্স বাই ডিফল্ট পাওয়া যাবে না? তাহলে কি যে চুমু খেতে দিয়েছিল তার সঙ্গে যৌনতার আগে আলাদা করে সম্মতি নিতে হবে? বান্ধবীকে রগরগে জোক পাঠানো যাবে না? বিখ্যাত পরিচালক হয়ে ক্রু মেম্বারকে আড্ডা মারার জন্য স্কাইপে আসতেও বলা যাবে না? নারীসৌন্দর্যের প্রশংসা করা যাবে না? তাহলে কি কেউ ‘না’ বললে তাকে দেবদাসোচিত একটি ড্রাঙ্ক কলও করা যাবে না? তাহলে কি কবি/সাহিত্যের অধ্যাপক হয়ে কাব্যিকভাবে ‘ফ্লার্ট’ করা যাবে না? মোদ্দা কথা, তাহলে কি বিপরীত লিঙ্গের সামনে ভাবপ্রকাশের সাবলীলতা বা তাদের সঙ্গে সম্পর্কের সাবলীলতা কোনওভাবে ক্ষুণ্ণ হবে?

বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন, মহিলারা এতদিন ধরে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়েছেন, যেসব আশঙ্কায় ভুগেছেন, সেগুলির গুরুত্ব এসবের থেকে কিঞ্চিৎ বেশি। সেগুলি নিম্নরূপ :

তাহলে কি রাতে বেরোনো যাবে না? একা বেরোনো যাবে না? নির্দিষ্ট কিছু পোষাক ছাড়া অন্য কিছু পরা যাবে না? বেশি হাসা যাবে না, প্রগলভ হওয়া যাবে না? পুরুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যাবে না? বন্ধুত্ব করলে কি ‘না’ বলা যাবে না? সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করা যাবে না? কাজে যাওয়া যাবে না ওয়ার্কপ্লেস হ্যারাসমেন্ট এড়াতে? যার সঙ্গে কাজের সম্পর্ক, তাকে ‘না’ বলার পরে কি চাকরিটি ছেড়ে দিতে হবে? তাহলে কি কাজের জায়গায় টিকে থাকতে হলে কাউকে ‘না’ বলা যাবে না? তাহলে কি চিৎকৃত প্রতিবাদ করতে হলে স্লাট-শেমিং শুনতেই হবে? তাহলে কি আমিই কোনও ইঙ্গিত দিয়ে ফেলছি, যা আমাকে সহজলভ্য করে তুলছে? তাহলে কি অন্তঃপুরবাসিনী হয়েই থাকতে হবে? তাহলে কি আমি আদৌ একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক?

মনে রাখতে হবে, ফ্লার্টিং যতই কাব্যসুষমামণ্ডিত হোক না কেন, তা ব্যক্তির সুরক্ষার অধিকার তথা তার আত্মরক্ষার প্রাথমিক অধিকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। রোম্যান্টিকতা সম্বন্ধে যে বুদ্ধদেব-গুহ-ঘরানার ধারণা আমাদের মজ্জাগত, তাও নিঃসন্দেহে পিতৃতান্ত্রিক একটি নির্মাণ। লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলেই সে পৃথিবী প্রেম-হীন, আনরোম্যান্টিক হবে— এমনটা ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। তবে রোম্যান্টিকতার ধারণা ও সংজ্ঞা খানিক বদলে যাবে নিঃসন্দেহে।

ধূসর অঞ্চল

যেহেতু নির্যাতনের ধারণা রোজ সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাই ভিন্ন লিঙ্গের (ক্ষেত্রবিশেষে সমলিঙ্গের) মানুষের প্রতি কোন কোন ব্যবহার নির্যাতনের আওতাভুক্ত হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশায় আছেন অনেকেই। অবশ্যই ‘গ্রে এরিয়া’ যথাসম্ভব দূর করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হোক, সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে হোক বা ফিল্মজগতে হোক, বিশাখা গাইডলাইন মেনে অবশ্যই জেন্ডার সেল রাখতে হবে। সুস্পষ্টভাবে আপত্তিজনক আচরণগুলিকে চিহ্নিত ও ব্যাখ্যা করে উপযুক্ত নিয়মনীতি তৈরি করা গেলে সকলেরই সুবিধা। যিনি নির্যাতিত হলেও হতে পারেন, তিনি জানবেন কী কী আচরণ তাঁর সঙ্গে করা যাবে না। যিনি সম্ভাব্য নির্যাতক, তিনিও নিজের ও অন্যের বাউন্ডারি সম্পর্কে অবহিত হবেন, সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন। আবার, যৌন নির্যাতনের ধারণার  বিবর্তনের এই ধারায়, কিছু ‘গ্রে এরিয়া’-কে সাদা-কালোয় ভেঙে নেওয়ার পরেও, আরও কিছু ধূসরাঞ্চল থেকে যেতে পারে। সদিচ্ছা থাকলে সেইসব ধূসরাঞ্চল না মাড়ানোই ভালো। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ধূসরাঞ্চলগুলিকেও আপাতত নিষিদ্ধ অঞ্চল ধরে নেওয়াই সমীচীন, মনে হয়৷

অনেকেই বলছেন, এই মহিলারা নিজেরাই হয়ত যৌন সুবিধা দিয়ে কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হাসিল করেছেন এককালে। এখন তাঁদের সম্মতিতে ঘটা সেইসব যৌনাচারকেই তাঁরা ‘নির্যাতন’ আখ্যা দিচ্ছেন। এই কুযুক্তি আসলে কর্মক্ষেত্রের নির্যাতনমূলক, পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশের বাস্তবতাতেই শিলমোহর লাগায়। এমন পরিবেশেই যে মহিলাদের কাজ করতে হয়, যেখানে যৌনতায় সম্মত হওয়াই উন্নতির চাবিকাঠি, মেধা বা যোগ্যতা বা কর্মক্ষমতা নয়— তা #মিটুর বিরোধীরা নিজেরাই প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ‘দুর্নীতি নিরোধক সংশোধনী আইন’-এ ‘কর্মক্ষেত্রে উৎকোচ হিসেবে যৌন সুবিধা দান বা গ্রহণ’-কে ‘দুর্নীতি’-র আওতাভুক্ত করার দাবি উঠেছে।

নির্যাতিত যখন পুরুষ

নির্যাতিত যদি পুরুষ হন ও নির্যাতক হন মহিলা, তাহলে চেনা ছকের অনুপস্থিতির কারণে কিছু সাময়িক বিহ্বলতা তৈরি হতে পারে। তা থেকে আসতে পারে বিচ্যুতি, যদিও তা কাম্য নয়। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সাহিত্যের বিখ্যাত অধ্যাপিকা তথা ফেমিনিস্ট এভিটাল রনেলের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে অগাস্ট মাসে। অভিযোগ করেছিলেন এক পুরুষ ছাত্র, পাশ করে যাওয়ার ঠিক পরে। ইউনিভার্সিটি অভিযোগ মেনে নিয়েছিল সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখে। এই মুহূর্তে প্রফেসর রনেল সাসপেনশনে আছেন।

#মিটু মুভমেন্টের অন্যতম সূচনাকারী অভিনেত্রী এশিয়া আর্জেন্টোর বিরুদ্ধেও সতেরো বছর বয়সের একটি ছেলেকে যৌনতায় বাধ্য করার অভিযোগ ছিল। আবার ভিন্নতর পাওয়ার স্ট্রাকচারে এশিয়া আর্জেন্টো হয়ে যেতেই পারেন হার্ভে উইন্সটেইনের শিকার।

এই উদাহরণগুলিকে নারীবাদের বিরুদ্ধে বা #মিটু মুভমেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করা হোক। নারীবাদ কখনওই নারীকে ধোয়া তুলসীপাতা বলেনি। সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট আর যৌন-স্বাধীনতার উদযাপন এক নয়,এমনকি মহিলাদের ক্ষেত্রেও৷ যদিও পুরুষদের যৌন নির্যাতন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষদের দ্বারাই ঘটে, তবু নির্যাতকের ভূমিকায় মহিলা থাকলে বিষয়টিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার কারণ নেই। মহিলারা করলেও, ওগুলো অপরাধমূলক ঘটনাই বটে। যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়েই সেগুলি শোনা দরকার, সহমর্মিতা দেখানো দরকার। অপরাধের মাত্রা বিচার করে শাস্তিও প্রয়োজন।

পুরুষের ক্ষেত্রেও ‘ইমপ্লায়েড কনসেন্ট’ বলে কিছু হয় না৷ পুরুষকে ‘যৌনতার জন্য সদা-উন্মুখ’ ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। তিনি তা না হলে তাঁকে ইমপোটেন্ট বা আসেক্সুয়াল দাগিয়ে দেওয়ারও কারণ নেই৷ এমনও হতে পারে, তিনি নির্দিষ্ট সেই মহিলার সঙ্গেই যৌনতায় আগ্রহী নন বা সেই মুহূর্তে আগ্রহী নন বা তাঁর অন্য সঙ্গী আছে বলে আগ্রহী নন৷ যে কোনও লিঙ্গের মানুষের ক্ষেত্রেই কনসেন্টহীন শারীরিক নৈকট্যর মাধ্যমে অস্বস্তি সৃষ্টি করা হল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট৷ মহিলাদের মতো পুরুষরাও ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল হতে পারেন বা মহিলার পাওয়ার পজিশনের কথা ভেবে চুপ থাকতে বাধ্য হতে পারেন, রনেলের ছাত্রটির মতো।

কতটা পথ পেরোনো গেল

কর্মক্ষেত্রে #মিটু মুভমেন্টের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল নিয়ে ইউগভ ইন্ডিয়া (Yougov India) ১৬ থেকে ২২ অক্টোবরের (২০১৮) মধ্যে যে সমীক্ষা চালিয়েছে, তাতে নাকি জানা গেছে, ৭৬% মানুষ (নারী পুরুষ নির্বিশেষে) স্বীকার করেছে, #মিটু তাদের যৌন নির্যাতন বিষয়ে আরও বেশি সচেতন করেছে৷ ৬৬% পুরুষ নাকি মহিলাদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় বেশি সতর্ক হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু আবার, ৫০% মানুষ বলেছেন,তাঁরা তাঁদের প্রজেক্টে বা টিমে বীপরীত লিঙ্গের কর্মীদের নিতে ভয় পাচ্ছেন। অর্থাৎ সচেতনতা প্রসারের এমন এক অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, যেখানে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে, প্রশ্ন আছে, সন্দেহ আছে, কিন্তু উত্তরণের আশাও আছে।

জাতীয় মহিলা কমিশন #মিটু মুভমেন্টের ফলস্বরূপ নির্যাতিতদের অভিযোগ আমন্ত্রণ করেছে বিশেষ ইমেইল ঠিকানায়। কলকাতা, দিল্লি ও বিভিন্ন শহরের পুলিশ অন্তত মৌখিকভাবে সংবেদনশীলতা দেখিয়েছে অভিযোগকারিনীদের প্রতি। তবে এখন পর্যন্ত  মিটুর সর্বোচ্চ সাফল্য হল প্রাক্তন মিডিয়া-ব্যক্তিত্ব তথা বর্তমানে কেন্দ্রীয় বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা। এইসব সাফল্য সূচিত করে যে কিছু বিচ্যুতি থাকলেও আন্দোলন ঠিক দিশাতেই এগোচ্ছে।

পরিশেষে

এসবের পরেও মনে রাখতে হবে, #মিটু সার্বিকভাবেই একটি শহরকেন্দ্রিক আন্দোলন। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শত ক্রোশ দূরে যে জগৎ, সেখানে আজও পরিবারের মধ্যেই নির্যাতিত হচ্ছে কিশোরী, টিউশন দেওয়ার ছুতোয় শিক্ষক নগ্ন করছে বালিকাকে, অখ্যাত বেসরকারি সংস্থায় যুবতীকে ঊর্ধ্বতনের মনোরঞ্জন করতে হচ্ছে, বধূ ধর্ষিতা হচ্ছে শ্বশুর-দেওর বা হয়ত নিজের বিবাহিত সঙ্গীর দ্বারাও। এখনও অত্যাচারের অন্ধকূপে আবদ্ধ লক্ষ লক্ষ মহিলা। যতদিন না তাঁরা নির্যাতকের থেকে নিরাপদ দূরত্বে যেতে পারবেন, পায়ের তলায় সহমর্মিতার মাটি পাবেন, নির্যাতিত না হয়েও যে ভাত-কাপড়ের সংস্থান করা যায়, সে বিষয়ে আশ্বস্ত হতে পারবেন, সমাজে তথা সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্দ্বিধায় বিচরণ করতে পারবেন, ততদিন তাঁদের বর্তমান মূক, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত৷

#মিটু একটি বৃহত্তর  আন্দোলনের প্রথম ধাপ মাত্র। একটি নির্যাতনমুক্ত, সাম্যবাদী আগামীর প্রথম সোপান। অনেক চড়াই ভাঙা এখনও বাকি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*