আলেহান্দ্রা পিজারনিক ও তাঁর কবিতা

সব্যসাচী স্যান্যাল

 

‘আলেহান্দ্রা পিজারনিককে বলা হয় স্প্যানিশ কবিতার সিলভিয়া প্লাথ, আমার মনে হয় এর উল্টোটাই যথাযথ’—আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

আলেহান্দ্রা পিজারনিক (Alejandra Pizarnik; ১৯৩৬-১৯৭২) ইস্পাহানি কবিতার এক সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র উজ্জ্বল চরিত্র। রাশিয়ান অভিবাসী বাবা-মা; পিজারনিকের জন্ম বুয়েনস আইরেসের শহরতলি আভেশানিদা (Avellaneda)-য়। বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্রী আলেহান্দ্রা সুররিয়ালিস্ট পেন্টার Juan Batlle Planas-এর থেকে আঁকার তালিমও নেন। ১৯৬০-৬৪ কাটান পারী শহরে, এবং সেখানেই আলাপ হুলিও কোর্তাজার-এর সঙ্গে। পারীতে থাকার সময়, নানা পত্রপত্রিকায় কবিতা ও আলোচনা লেখেন।  অনুবাদের কাজ করেন অঁতোনা আখতোঁ (Antonin Artaud), ইভ বনফোয়া (Yves Bonnefoy), অঁরি মিশোঁ (Henri Michaux)-র মতো কবিদের। এবং এখানেই তাঁর কবিতা পরিণতিপ্রাপ্ত হয়। ১৯৬২-তে প্রকাশ পায় তাঁর কাব্যগ্রন্থ Árbol de Diana (Diana’s Tree), ওক্তাবিও পাজের ভূমিকা সমেত। তীব্র অবসাদগ্রস্ত আলেহান্দ্রা অ্যামফিটামিন জাতীয় নেশার কবলে পড়েন এবং কোর্তাজারের প্রেমে। যদিও কোর্তাজার রেসিপ্রোকেট না করে তাঁকে স্নেহের চোখে দেখতেন। ৩৬ বছর বয়সে ড্রাগ ওভারডোজ নিয়ে আত্মহত্যা করেন আলেহান্দ্রা। মৃত্যুর এক হপ্তা পরে কোর্তাজারের কাছে এক ছবি-পোস্টকার্ড পৌঁছায়— বেলাভূমিতে নগ্ন আলেহান্দ্রা…। মূলত একাকিত্ব, ব্যথা, মৃত্যু এবং স্টানিং সুররিয়াল ভিশুয়ালস সম্বল করে আলেহান্দ্রা তীব্র আগ্রাসী এক অবসাদ গড়ে তোলেন তাঁর কবিতায়। তাঁর অন্যান্য কবিতার বইগুলি La tierra más ajena (1955), La última inocencia (1956) and Las aventuras perdidas (1958), Los trabajos y las noches (1965), Extracción de la piedra de la locura (1968) এবং El infierno musical (1971).

আলেহান্দ্রা পিজারনিকের অগ্রন্থিত কবিতা (১৯৬২-১৯৭২):

মূল ইস্পাহানি থেকে ইংরাজি অনুবাদ Cole Heinowitz, সৌজন্য Jacket 2 Magazine।

ইংরাজি থেকে বাংলা অনুবাদ : লেখক

নিস্তব্ধতা সম্পর্কে

…it’s all in some language I don’t know… –C. (Through the Looking-glass)

I feel the world’s pain like a foreign language. –Cecilia Meireles

They play the part “estranged”. –Michaux

… SOMEBODY killed SOMETHING. –Carroll (Through the Looking-glass)

এই ক্ষুদে নীল পুতুলই আমার দূত
অনাথ সে এক, এই বাগানবারিষে— যেখানে বেগনী পাখি গোগ্রাসে গেলে লাইল্যাক ফুল
গোলাপী বিহগ গিলে খায় গোলাপমাংস

আমি ভয় পাই ঐ ধূসর নেকড়েকে, ঘাপটি মেরে যে থাকে বৃষ্টিবাদলে

যা কিছু দেখতে পাও তুমি, যা কিছু কেড়ে নেওয়া যায়— সবটাই অনুচ্চার্য
শেষপর্যন্ত শব্দরাই আবজে দেয় নিখিলের সমস্ত দরোজা

চিনারবাগানে অগোছালো আমার ঘোরাঘুরি
কিন্তু এই নাটককে থামাতে পারি না— গ্যাসে ভরে ওঠে ক্ষুদে পুতুলের অলিন্দনিলয়
অসম্ভব আমার বেঁচে থাকা, অসম্ভবই আমায় শেষ করে দেয়

ওহ, কী তুচ্ছ আমার অশুভ আসক্তি
প্রাচীন করুণার ক্রীতদাস

সবুজ রঙে কেউ আঁকে না

সমস্ত কিছুই কমলা রং

নিষ্ঠুরতা বই আমি কিছু নই

পচা-গলা জন্তুর মতো রঙের আঁচড় নিস্পন্দ আকাশে। তারপর একজন কবিতা লিখতে চায়, ফর্ম, রং, তিক্ততা, আর প্রাঞ্জল্য নিয়ে (চুপ করো আলেহান্দ্রা, বাচ্চাগুলোকে ভয় পাইয়ে দেবে নাকি…)

কবিতা ব্যবধান আর সে বিক্ষত করে
আমি তো আর আমার ক্ষুদে নীল পুতুল নই যে পাখির দুধ চুষে বড় হয়

কাছিমের চোখে ধাক্কা খেতে থাকা সূর্য পাহারা দেয় তোমার স্বরের স্মৃতি, আজ ঘাতক সকালে

তোমার গলার স্বর মনে ক’রে এক সবুজ অমর্ত্যের সামনে নিভে যায় চেতনাপিদিম, এই তো বিবাহ যা সমুদ্র আর আকাশের

আর আমি প্রস্তুত করি আমার মৃত্যু

[…] ON SILENCE

…it’s all in some language I don’t know… –C. (Through the Looking-glass)

I feel the world’s pain like a foreign language. –Cecilia Meireles

They play the part “estranged”. –Michaux

… SOMEBODY killed SOMETHING. –Carroll (Through the Looking-glass)

I.

This little blue doll is my envoy in the world.
An orphan in the garden rain where a lilac-colored bird gobbles lilacs and
a rose-colored bird gobbles roses.

I’m frightened of the grey wolf lurking in the rain.

Whatever you see, whatever can be taken away, is unspeakable.
Words bolt all doors.

I remember rambling through the sycamores…
But I can’t stop the drama— gas fills the chambers of my little doll’s heart.
I lived the impossible, destroyed by the impossible.

Oh, the banality of my evil passions,
enslaved by ancient tenderness.

II.

No one paints in green.

Everything is orange.

If I am anything, I’m cruelty.

Colors streak the silent sky like rotting beasts. Then someone tries to write a poem out of forms, colors, bitterness, lucidity (Hush, alejandra, you’ll frighten the children…)

III.

The poem is space and it scars.
I am not like my little blue doll who still suckles the milk of birds.

Memory of your voice in the fatal morning guarded by a sun rebounding
in the eyes of turtles.

The light of sense goes out remembering your voice before this green
celestial mixture, this marriage of sea and sky.

And I prepare my death.

 

(শিরোনামহীন)

সে কথা বলতেই চায়, আর আমি জানি সে আসলে কী। সে বিশ্বাস ক’রে ভালোবাসাই মৃত্যু— যদিও ভালোবাসাহীন যে কোনও জিনিস তার বিতৃষ্ণার কারণ। তার ভালোবাসা নিষ্পাপ যেহেতু তাকে ক’রে রেখেছে, কথা বলারই বা কী তার প্রয়োজন? প্রাসাদের মালকিন সে, তার আঙুল খেলে বেড়ায় আর্শির সর্বনামে।

প্রতিটা শব্দ লেখার সময় আমি মনে রাখি সেই শূন্যতাকে যে আমায় লেখায়, তোমাকে প্রবেশ দিলে আমি আর লিখতে পারব না।

আমি কবিতার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকি। সে আমায় খাদের কিনারে নিয়ে যায়, জীয়ন্ত মানুষের গৃহ থেকে দূরে। শেষবারের মতো যখন উবে যাব— কোথায় থাকব আমি?

কেউ বোঝে না। যা কিছু আমি তা তোমারই প্রতীক্ষা করে অথচ আমি কবিতার অন্ধরাতে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। আমি শুধু তোমার শরীরের কথা ভাবি যখন আমার কবিতার গতরকে বারবার নতুন আদল দিই আর ঢেলে সাজাই, যেন সে আদতে ভাঙাচোরা।

আর কেউ আমাকে বোঝে না একটুও। আমি জানি জীবন আর প্রেমে একটা বদল দরকার। এই বিবৃতিগুলো যা আমার পশুমাংসের ওপরে চাপানো মুখোশ থেকে বেরিয়ে আসে— এক যন্ত্রণাদায়ক ইঙ্গিত দেয় শব্দ আর ছায়ার আত্মীয়তার। আর সেখান থেকেই এ’সমস্ত কথা বেরিয়ে আসে, এই ভয়াল আতঙ্কজনক অবস্থান যা সম্পূর্ণ বাতিল করে মানবতাকে।

[UNTITLED]

She wants to speak, but I know what she is. She believes love is death— even if everything devoid of love disgusts her. Since her love makes her innocent, why should she speak? Mistress of the Castle, her fingers play upon mirrors of pronouns.

With every word I write I remember the void that makes me write what I couldn’t if I let you in.

I stand by the poem. It takes me to the edge, far from the homes of the living. And when I finally disappear— where will I be?

No one understands. Everything I am waits for you and still I hunt the night of the poem. I think only of your body while I shape and reshape my poem’s body as if it were broken.

And no one understands me. I know that life and love must change. Such statements, coming from the mask over the animal I am, painfully suggest a kinship between words and shadows. And that’s where it comes from, this state of terror that negates humanity.

26/XI/69

 

রাত্রি নামের কবিতাটি

যদি নিজের নিখাদ ভাষাকে খুঁজে পাও, তাকে নিয়ে এসো মৃতদের দেশে। ছাইয়ের মধ্যেও করুণা থাকে। আর ভয় থাকে অনস্তিত্বে। একটা ছোট্ট মেয়ে হারিয়ে গেছে এক ধ্বস্তবাড়িতে, এই আমার কবিতার কেল্লা।

আমি সেই বাচ্চাদের অন্ধ আক্রোশ নিয়ে লিখি যারা পাগলিমানুষের দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারে, যেন কাক তাড়াচ্ছে। না— আমি লিখি না; আমি গোধূলির মধ্যে একটা ফাটল খুলে দিই যাতে মৃত মানুষেরা তাদের খবরাখবর পাঠাতে পারে।

লেখা ব্যাপারটাই বা কী? আর্শির আলোয় অন্ধকারে দিশা ঠিক করা। এমন জায়গার কথা কল্পনা করা— যার সন্ধান জানি একমাত্র আমি। দূরত্বের গান গাওয়া। সেই রংচঙে পাখিদের গান শোনা যারা বড়দিনের গাছে টাঙানো রয়েছে।

আমার নগ্নতা তোমায় আলোস্নান করায়। আমার শরীরকে চেপে ধরো তুমি রাতের ঐ ব্যাপক কালো হিমের আস্তরকে তাড়াতে।

আমার শব্দরা দাবি করে এক বঞ্জর জমির নিস্তব্ধতা।

শব্দগুলোর কারও কারও হাত থাকে আর যে মুহূর্তে লিখে ফেলি তাদের, আমার কলজে আঁকড়ে ধরে ওরা। কিছু শব্দের ভবিষ্যৎ নেই কোনও, যেন ঝড়ের প্রকোপে লাইল্যাক ফুল। আর কেউ কেউ মূল্যবান মৃত মানুষের মতো— যদিও ওদের সবার চেয়ে আমার পছন্দ সেই শব্দগুলো যারা একটা ছোট্ট দুঃখী মেয়ের পুতুলকে চেনায়।

NIGHT, THE POEM

If you find your true voice, bring it to the land of the dead. There is kindness in the ashes. And terror in non-identity. A little girl lost in a ruined house, this fortress of my poems.

I write with the blind malice of children pelting a madwoman, like a crow, with stones. No— I don’t write: I open a breach in the dusk so the dead can send messages through.

What is this job of writing? To steer by mirror-light in darkness. To imagine a place known only to me. To sing of distances, to hear the living notes of painted birds on Christmas trees.

My nakedness bathed you in light. You pressed against my body to drive away the great black frost of night.

My words demand the silence of a wasteland.

Some of them have hands that grip my heart the moment they’re written. Some words are doomed like lilacs in a storm. And some are like the precious dead— even if I still prefer to all of them the words for the doll of a sad little girl.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*