অন্তেবাসী — তৃতীয় পর্ব

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

দ্বিতীয় পর্বের পর

জন্মানোর পর যখন বালুরঘাট থেকে নীলফামারিতে আমাকে আনা হয় তখন একটি স্মরণীয় ঝগড়া হয়েছিল মা আর মেজজেঠির মধ্যে। কেননা মেজজেঠি আমার জন্মের মাস চারেক পরে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। ভাইবোনদের মধ্যে সে চতুর্থ না পঞ্চম এ নিয়ে নিজেরই ধন্দ আছে। ওর সঙ্গে দেখা হয় না প্রায় ষাট বছর। একসময় শুনেছিলাম মারা গেছে — এখন শুনছি বেঁচে আছে, ঝাড়গ্রামের ওদিকে থাকে। ওর ডাকনাম রাখা হয়েছিল বাচ্চু, এদিকে আমারও ডাকনাম মামাবাড়ি থেকে রাখা হয় বাচ্চু। একই বংশে দুজনের নাম এক রাখা চলবে না। মা যে পৃথক অস্তিত্ব কেননা তিনিই এ বংশের বৌদের মধ্যে শিক্ষিতা। সেই সময়ের মেট্রিক পাশ। তাই নিজে থেকে আমার বাচ্চু নামটাই উইথড্র করে নেন। আমি কোনওদিনই বাচ্চু বলে ডাকতে শুনিনি। মামাবাড়িতে এলে অবশ্য এই নামে ডাকা হত, মা আপত্তি করতেন না। নিজে ডাকতেন পোষাকি নাম ধরেই।

নীলফামারিতে মাঝেমধ্যে বিশেষ করে ছোটকাকা পুংবাচ্চু এবং স্ত্রীংবাচ্চু বলে ডাকতেন তবে তা বেশিদিন চলেনি কেননা পার্টিশনে সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যায়। যদিও ততদিনে কলকাতাতে একটি বাসাবাড়ি ছিল, বাবা ও মেজজ্যাঠা মিলে চিৎপুরের ঐ বাসাবাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন। যেহেতু মেজজ্যাঠারা নীলফামারিতে থেকে গিয়েছিলেন তাই পুং বা স্ত্রীং বাচ্চুর প্রসঙ্গটাও বাদ পড়ে যায়। স্ত্রীং বাচ্চু এরপর একক হয়ে যায়।

প্রায় দশ বছর পর্যন্ত কোনও স্কুলে ভর্তি করা হয়নি। সেজজ্যাঠার ছেলেদের বই পড়েই পড়াশোনা করেছি বাড়িতেই। সকাল সন্ধ্যা ওরা পড়ত, আমার পড়বার সময়টা ছিল দুপুরবেলা অর্থাৎ ওরা তখন স্কুলে, কী কারণে যেন ওরা আমাকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল একদিন, স্কুলটার নাম ছিল ওরিয়েন্টার সেভেনারি স্কুল। বাবার কোনও স্থায়ী চাকরি না থাকায় মা আমাদেরকে নিয়ে কখনও মামাবাড়ি, কখনও নীলফামারি এই করতে করতে একদিন দার্জিলিং-এর কাছাকাছি সোনাদায় মেজমাসির ওখানে পৌঁছে যাই। মেসো ছিলেন সোনাদার স্টেশন মাস্টার। ও বাড়িতে ছিল মাসতুতো দাদার শিকার করা চিতাবাঘের চামড়া, কেবলমাত্র মাথাটা স্টাফ করা, মুখটা সামান্য হা করা যাতে ছেদন দন্তগুলি দেখা যায় এবং বোঝাও যায় বাঘটি কতখানি হিংস্র। নকল চোখদুটি এমনভাবে বসানো যে, সামনে দাঁড়ালেই বাঘটা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে মনে হবে। আর এ হচ্ছে নিছক তাকিয়ে থাকা না। ওঁত পেতে থাকাও আছে। যে কোনও সময় বাঘের শিকার হয়ে যেতে পারি। যদিও দেহের আর চারটে পায়ের ভেতরের মাংস বের করে নেওয়া হয়েছে। শুধু ডোরাকাটা চামড়াটা কাঠের পাটাতনে টানটান করে পিন দিয়ে পোঁতা। তার পাশে একটা দোনলা বন্দুক। আবার এসবকে রাখা হয়েছিল বড় একটা কাচের আলমারিতে। যার তিনদিক মস্ত মস্ত কাচ দিয়ে ঘেরা। ঘরে ঢুকলেই যাতে চোখে পড়ে। আমি কিন্তু ট্রেন থেকে নেমে মেসোর কোয়ার্টারের পাহাড়ি সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই হাঁপিয়ে উঠেছিলাম এমনিতেই, ঘরে ঢুকবার মুখেই বাঘের সঙ্গে চোখাচোখি হতে দাঁড়িয়েই পড়েছি। বাঘের যে শিকারি অর্থাৎ কালুদা, আমাকে জাপটে ধরে বাঘের আলমারির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু যেভাবে ধরেছিলেন কালুদা, বাঘের ভয়টয় উধাও সুড়সুড়ির জন্য। ‘এটা তো মরা বাঘ!’ আমি তখনও সুড়সুড়ির প্রতিক্রিয়ায় হাসছি দেখে মা’কে— ‘বাহাদুর বটে! বাঘ দেখে ভয় খায় না! বাবলুটা তো এ ঘরে ঢুকতেই চায় না বাঘের ভয়ে।’ বাবলু হচ্ছে আমার সেজমাসির ছোট ছেলে।

সারাদিনের ট্রেনজার্নির ধকল নিতে পারেনি শরীর তাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বাঘের ঘরে। যে কয়েক মাস সোনাদাতে ছিলাম বাঘের নজরদারিতেই ছিলাম। হোক না মৃত বাঘ, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হত এই বুঝি বাঘটা কাচের আলমারি থেকে বেরিয়ে আসবে। যেভাবে মৃতরা হঠাত হঠাত ফিরে আসে। বলা হচ্ছে এ হচ্ছে একটা বিশ্বাস মায়ের সূত্রে পাওয়া। তথাপি তখন পর্যন্ত মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য করবার মতো বয়সে পৌঁছাইনি, শুধু একটা ধারণা ছিল যাদের প্রাণ আছে তাদের মৃত্যুর পরও আত্মা থেকে যায়। তারাও ফিরে আসে।

মা’র এ বিষয়ে বদ্ধমূল ধারণা ছিল এবং তা পরবর্তীতে বিশ্বাসে পৌঁছায়। কেননা আমার দাদু মৃত্যুর পর মাকেই নাকি স্বপ্নে দেখা দিতেন। তিনি বেছে নিয়েছিলেন আত্মহননের পথ। তিনি বারবার ফিরে আসতে চাইতেন তাঁর কন্যাদের কাছে। বিশেষ করে মা’র কাছে। তাঁর একমাত্র পুত্রের এত কম বয়স ছিল তার কোনও বুঝবার শক্তিই হয়নি এসব বিষয়ে। সেজন্য তিনি তাঁর শ্রাদ্ধের কয়েকদিন আগে মা’কে বলেন— তাঁকে যেন একটি ওভারকোট দেওয়া হয়, সমস্ত শরীর ঢেকে তিনি আসতে পারবেন তাদের কাছে। শ্রাদ্ধে মা’র দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতন একটি ওভারকোট দেওয়া হয়েছিল, সেটা বানিয়েছিল মা’র দূরসম্পর্কের এক ভাই, মা নাকি তাকে সেলাই করতে সাহায্যও করেছিলেন অশৌচের মধ্যে। মা’র বিয়ের সময় সেই মামাবাড়ির পারিবারিক পুরোহিত সেই কোট পরে এসেছিলেন এবং তা দেখে মা বিয়ের পিঁড়িতে বসতেই চায়নি, পুরোহিতকে সেই কোট খুলতেই হয় বালুরঘাটের প্রচণ্ড শীতকে উপেক্ষা করে, কেননা লগ্নভ্রষ্টা হয়ে যাবে যে!

এখন মনে হয় এ হচ্ছে সর্বাস্তিবাদী দর্শনের প্রভাব। পিতৃপক্ষের শেষে মহালয়ার দিন গঙ্গার জলে দাঁড়িয়ে তর্পণ করতে তাই আমরা অতীতের উদ্দেশে অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে মন্ত্র বলি : ‘যারা অতীতের বান্ধব, অনাত্মীয়, যারা অন্য পূর্ব পূর্ব জন্মের বান্ধব ছিল, সবাই এই অঞ্জলির জলের দ্বারা তৃপ্ত হোক।’

তবে বাঘের বেলায় কেন এই দর্শন কোনও কাজে লাগবে না? এই প্রশ্ন সেই বয়সে ছিল এখনও তা আছে তবে একটু অন্যভাবে। মনে হয় সেই বাঘ ঘুমিয়ে পড়লে চলে আসে এতদূর….

(ক্রমশ)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*