ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের — পঞ্চদশ পর্ব

চার্লস বুকাওস্কি

 

অনুবাদ : শুভঙ্কর দাশ

চতুর্দশ পর্বের পর

৮/২৮/৯২
রাত ১২টা ৪০

জীবনে হাজার রকমের ফাঁদ আছে আর আমরা অনেকেই পড়ি অনেকগুলো ফাঁদে। কথা হল এটা চেষ্টা করা যত কম ফাঁদে পড়া যায় তার। এটা করতে পারলে মরা অবধি আপনি গনগনে থাকবেন…

চিঠি এসেছে কোনও এক টেলিভশন নেটওয়ার্ক স্টেশনের অফিস থেকে। ব্যাপারটা খুব সোজাসাপ্টা, ওরা বলতে চাইছে এই লোকটা ধরা যাক তার নাম জো সিঙ্গার, আমার কাছে আসতে চায় কতগুলো ব্যাপারে কথা বলতে। চিঠির প্রথম পাতায় আঁটকানো ছিল ২টো একশো ডলারের নোট। দ্বিতীয় পাতায় আরেকটা একশ ডলার। আমি তখন ঘোড়দৌড়ের মাঠের জন্য বেরোচ্ছিলাম। আমি দেখলাম টাকাগুলো না ছিঁড়েই আমি খুলে নিতে পারলাম চিঠিটা থেকে। একটা ফোন নম্বর দেওয়া ছিল। আমি ঠিক করলাম জো সিঙ্গারকে সেই রাতে ফোন করব রেসের মাঠ থেকে ফিরে।

আমি করেওছিলাম। জো ছিল স্বাভাবিক, সোজাসাপ্টা। সে বলল, আইডিয়াটা হল টিভির জন্য একটা সিরিজ তৈরি করা আমার মতো একজন লেখককে নিয়ে। একজন বয়স্ক লোক যে এখনও লিখে চলেছে, মাল টানছে, ঘোড়দৌড়ের মাঠে বাজি ধরছে।

‘এটা নিয়ে একসাথে বসে কথা কি বলা যায়?’ সে জিজ্ঞাসা করে।

‘তোমায় আমার বাড়িতে আসতে হবে,’ আমি বললাম, ‘রাতের দিকে।’

‘বেশ,’ সে বলল, ‘কখন?’

‘সামনের রাতের পরের রাতে।’

‘খুব ভালো। কার সাথে আপনার মোলাকাত করাব বলুন তো?’

‘কার সাথে?’

সে একজন অভিনেতার নাম করল, ধরা যাক তার নাম হ্যারি ডেন। আমার চিরকাল ভালো লাগে হ্যারি ডেনকে।

‘দারুণ,’ আমি বললাম, ‘আর ওই তিনশো ডলারের জন্য ধন্যবাদ।’

‘আমরা আসলে আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছিলাম।’

‘করেছ।’

তো, সে রাতটা এসে গেল আর জো সিঙ্গার এসে হাজির। তাকে দেখে খারাপ লাগছিল না, বুদ্ধিমান, সহজ। আমরা মাল খেতে খেতে কথা বলছিলাম, ঘোড়াদের বিষয়ে আর নানান ব্যাপার নিয়ে। টেলিভিশন সিরিজের ব্যাপারে তেমন কোনও কথা হচ্ছিল না। আমার বউ লিন্ডা ছিল আমাদের সাথে।

সে বলল, ‘ওই সিরিজটার ব্যাপারে আমাদের কিছু বলুন।’

‘ঠিক আছে লিন্ডা’, আমি বলি, ‘আমরা জাস্ট একটু ল্যাদাচ্ছি…’

আমার মনে হচ্ছিল জো সিঙ্গার এসেছে এটা দেখতে আমি সত্যি পাগলা কিনা।

‘বেশ,’ সে বলল তার ব্রিফকেসের দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে, তারপর তার ভিতর থেকে টেনে বার করল কয়েকটা কাগজ, ‘এইখানে কিছুটা আইডিয়ার খসড়া আছে…’

সে আমাকে ৪ বা ৫টা পাতা ধরতে দিল। ওখানে প্রধান চরিত্রের একটা বর্ণনা আছে আর আমার মনে হল ওরা আমাকে ভালোই বুঝেছে। বৃদ্ধ লেখক থাকে সদ্য কলেজ থেকে বেরনো বান্ধবীর সাথে, মেয়েটি তার সমস্ত বাজে কাজগুলো করে দেয়, কোথায় কোথায় কবিতা পাঠ করতে যেতে হবে ইত্যাদি সব ঠিকঠাক করে।

‘টেলিভিশন স্টেশন চাইছে তরুণী মেয়েটা থাকুক, বুঝতে পারছেন তো?’ জো বলে।

‘হ্যাঁ, বুঝছি,’ আমি বলি।

লিন্ডা কিছু বলে না।

‘বেশ তাহলে।’ বলল জো, ‘আপনি আরেকবার এটাতে চোখ বুলিয়ে নিন। এখানে কতগুলো আইডিয়া আছে, প্লট আছে, প্রত্যেকটা এপিসোড হবে আলাদা ধরনের, কিন্তু তা হবে আপনার চরিত্রগুলোর কথা মাথায় রেখে।’

‘হ্যাঁ,’ আমি বললাম কিন্তু আমার কেমন যেন সন্দিগ্ধ লাগছিল।

আমারা আরও কয়েক ঘন্টা মাল খেলাম। কী কথা হয়েছিল মনে নেই। ওই ছুটকোছাটকা কিছু কথা হবে। আর রাত শেষ হয়ে গেল।

পরের দিন ঘোড়দৌড়ের মাঠ থেকে ঘুরে আসার পর আমি বসলাম এপিসোড আইডিয়ার পাতাগুলো নিয়ে।

১ হ্যাঙ্কের গলদা চিংড়ি দিয়ে রাতের খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বানচাল হয়ে গেল পশু অধিকার রক্ষার লোকজনের বাওয়ালে।

২ সেক্রেটারি হ্যাঙ্কের কবিতার এক পাঠিকার সঙ্গে দুষ্টুমির সুযোগ ভণ্ডুল করে দিল।

৩ হেমিংওয়েকে সম্মান জানাতে মিলি নামের একটা মেয়েকে লাগাচ্ছিল হ্যাঙ্ক, মেয়েটির বর একজন জকি, হ্যাঙ্ককে সে টাকা দিতে চায় যাতে হ্যাঙ্ক তার বউকে লাগিয়ে চলে। কোথাও একটা ছক আছে এখানে।

৪ হ্যাঙ্ক একজন পুরুষ তরুণ আর্টিস্টকে তার পোর্ট্রেট আঁকতে অনুমতি দেয় আর সে কাজটা হয় একটা কোণা মতো জায়গায় যেখানে হ্যাঙ্ক বলে তার হোমোসেক্সুয়াল অভিজ্ঞতার কথা।

৫ হ্যাঙ্কের এক বন্ধু চায় হ্যাঙ্ক টাকা লাগাক তার নতুন স্কিমে। রিসাইকেল্ড বমির কারখানায় ব্যবহার।

আমি জোকে ফোনে ধরলাম।

‘এ ভাই এইসব হোমোসেক্সুয়াল অভিজ্ঞতার ব্যাপারটা কী? আমার ওসব অভিজ্ঞতা নেই।’

‘তা বেশ আমরা ওটা ব্যবহার করব না তাহলে।’

‘ব্যবহার না করাই ভালো। শোনো জো, আমি তোমার সাথে পরে কথা বলছি।’

আমি ফোনটা রেখে দি। সব কেমন অদ্ভুত হয়ে উঠছে।

আমি অভিনেতা হ্যারি ডেনকে ফোন করি। ও বার দুই তিনেক এসেছে আমার বাড়ি। ওর অভিজ্ঞতা পেটানো মুখটা দারুণ আর কথাও বলে কোনও ভনিতা ছাড়া। আমার বেশ পছন্দ ওকে।

‘হ্যারি’, আমি বললাম, ‘একটা টিভি চ্যানেল আমার উপর একটা সিরিজ করতে চাইছে আর ওরা চাইছে তুমি আমার চরিত্রে অভিনয় করো। ওরা তোমায় যোগাযোগ করেছিল?’

‘না।’

‘আমি ভাবলাম তোমাকে আর ওই লোকটাকে আলাপ করাই তারপর দেখা যাক কী ঘটে।’

‘কোন চ্যানেল?’

আমি চ্যানেলের নামটা বলি।

‘কিন্তু ওটা তো কমার্শিয়াল টিভি, সেন্সরশিপ, কমার্শিয়াল, চুটকুলা মার্কা ট্র্যাক সব।’

‘কিন্তু এই জো সিঙ্গার দাবি করছে ওদের অনেক স্বাধীনতা কাজ করার।’

‘পুরো সেন্সরশিপ, বিজ্ঞাপনদাতাদের তো আর চটানো চলে না।’

‘আমার যেটা সব থেকে ভালো লেগেছে ও তোমাকে চাইছে নায়ক হিসেবে। তুমি আমার বাড়ি চলে এসো বরং লোকটার সাথে মোলাকাত করো।’

‘আমার তোমার লেখা পছন্দ হয় হ্যাঙ্ক, যদি আমরা এইচ বি ও-কে পেতাম কাজটা ঠিকঠাক নামাতে পারতাম।’

‘হ্যাঁ, সে তো ঠিকই। তুমি চলে এসো না, দেখো না ও কী বলতে চাইছে। তোমাকে দেখিওনি অনেকদিন।’

‘বেশ আসব আমি কিন্তু প্রধানত লিন্ডা আর তোমার সাথে দেখা করতে।’

‘বেশ। পরশু রাতে ব্যাপারটা করলে কেমন হয়? আমি সব দেখে নিচ্ছি।’

‘বেশ,’ ও উত্তর দিল।

আমি জো সিঙ্গারকে ফোন করলাম।

‘জো, পরশু রাত ৯টায়, হ্যারি ডেন আসছে।’

‘দারুণ। আমরা ওনার জন্য একটা লিমুজিন পাঠিয়ে দিতে পারি।’

‘ও কি একাই থাকবে লিমুজিনে?’

‘হয়ত। বা আমাদের কিছু লোকও থাকতে পারে গাড়িটায়।’

‘হুম, ঠিক বলতে পারছি না এখন। দাঁড়াও তোমাকে ফোন করছি আবার…’

‘হ্যারি, ওরা তোমায় টেনে নিতে চাইছে, ওরা তোমাকে একটা লিমুজিন পাঠাতে চাইছে।’

‘শুধুই আমার জন্য?’

‘ও সেটা সঠিক বলতে পারল না।’

‘ওর ফোন নাম্বারটা পেতে পারি?’

‘একদম।’

ব্যস ওখানেই ইতি ঘটল।

পরের দিন যখন ঘোড়দৌড়ের মাঠ থেকে ফিরলাম লিন্ডা বলল, ‘হ্যারি ডেন ফোন করেছিল। আমরা ওই টিভির ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলছিলাম। ও জিজ্ঞাসা করছিল আমরা টাকাপয়সা চাই কিনা? আমি ওকে বলেছি আমাদের টাকার দরকার নেই।’

‘ও কি আসছে তবু?’

‘হ্যাঁ।’

পরের দিন ঘোড়দৌড়ের মাঠ থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরলাম। ভাবলাম জাকুজিতে একটু স্নানটা সেরে আসি। লিন্ডা বাইরে গেছে, হয়ত আমাদের বৈঠকের জন্য মদটদ কিনতে। আমার নিজেরই ভয় হচ্ছে এই টিভি সিরিজটা নিয়ে। ওরা চাইলে আমাকে চুদে খাল করে দিতে পারে। বুড়ো লেখকটা এই করে। বুড়ো লেখকটা ওই করে। হাসির একটা ট্র্যাক এরপর। বুঢঢা লেখকটা মাতাল হয়ে কবিতার বৈঠক মিস করে। হুম, এটা অতটাও খারাপ নয়। কিন্তু এই বালের ব্যাপারটা আমি লিখতে চাই না, তাই লেখাটা অতটা ভালো হবে না। এই আমি দশকের পর দশক লিখে গেছি অপরিসর ঘরে, ঘুমিয়েছি পার্কের বেঞ্চে, শুঁড়িখানায় সময় কাটিয়েছি, সমস্ত রকম বালের কাজকর্ম করেছি, আর লিখেছি ঠিক যেভাবে আমি লিখতে চাই ঠিক সেভাবে আর টের পেয়েছি এটা আমাকে করতেই হত। আজ আমার কাজ অবশেষে পরিচিতি পাচ্ছে। আর আমি এখনও লিখে চলেছি যেভাবে আমি লিখতে চাই আর বুঝতে পেরেছি এছাড়া আমার উপায় ছিল না। লিখে চলেছি যাতে পাগলে না যাই, আমি এখনও লিখে চলেছি, এই বোকাচোদা জীবনটাকে ব্যাখ্যা করে নিজেকে বোঝাতে। আর শালা এখনই আমাকে রাজি করানো হয়েছে একটা কমার্শিয়াল টিভি সিরিজের জন্য। যার জন্য লড়ে গেছি এতদিন ধরে সব কিছু এক ঝটকায় চুটকুলায় পরিণত হয়ে যেতে পারে টিভি সিরিজের হাসির ব্যাকগ্রাউন্ড ট্র্যাকের সাথে। হে ভগবান, হে ভগবান।

আমি জামাকাপড় খুলে ঘরের বাইরে গেলাম জাকুজিতে স্নান করব বলে। আমি ভাবছিলাম টিভি সিরিজটা নিয়ে, আমার অতীত জীবন নিয়ে, আর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আরও অনেক কিছু নিয়ে। আমি ঠিকঠাক খেয়াল করিনি জাকুজির ভুল দিকটায় পা দিলাম।

পা দেওয়ার সাথে সাথে টের পেয়েছিলাম ব্যাপারটা। ওদিকটায় কোনও সিঁড়ি ছিল না। ব্যাপারটা ঘটল খুব দ্রুত। একটা ছোট বসার জায়গা ছিল একটু সামনের দিকে। আমার ডান পা-টা ওটাতে গিয়ে আটকাল, হড়কে গেল, আমি ব্যাল্যান্স হারালাম।

তোমার মাথাটা গিয়ে ঠুকবে জাকুজির ধার বরাবর, মাথার ভেতর এ কথাটা পাকিয়ে উঠল।

পড়ার সময় মাথাটাকে সামনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলাম, বাকি সব ভোগে যাক। পড়ার চোটটা গিয়ে পড়ল আমার ডান পায়ের উপর, আমি ওটা মচকালাম কিন্তু মাথাটাকে বাঁচিয়ে নিলাম জাকুজির ধার বরাবর ঠোক্কর খাওয়ার থেকে।  তারপর আমি জাস্ট ভাসতে লাগলাম বুদবুদ ওঠা জলের ভেতর আর টের পাচ্ছিলাম ডান পায়ে ওঠা ওই তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার ছোবল। যদিও ওই পায়ে যন্ত্রণা আগেই ছিল এখন রীতিমত ছিঁড়ে ফেলেছে যেন। এই পুরো ব্যাপারটাই কেমন বোকা বোকা লাগছিল। আমি তো এই আঘাতে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারতাম। ডুবে যেতে পারতাম। লিন্ডা ফিরে এসে দেখত আমি জলে ভাসছি, মৃত।

বিখ্যাত লেখক, স্কিড রো-তে আগে থাকতেন যে কবি আর মাতাল তাকে তার জাকুজিতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি সবেমাত্র একটা কন্ট্র্যাক্ট সই করেছিলেন সিটকম-এর জন্য যা তার জীবনের গল্পের উপর বানানোর কথা চলছিল।

শেষটা তো সম্মানজনক চরিত্রের কথাও বলে না। গুয়েমুতে শেষ হচ্ছে যেন।

আমি কোনওক্রমে জাকুজি থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির ভিতরে গেলাম। আমি হাঁটতে পারছিলাম না। প্রতিবার ডান পা-টা ফেলছি আর একটা যন্ত্রণা গোড়ালি থেকে হাঁটু অবধি পাক খেয়ে উঠছে। আমি কোনওরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফ্রিজ থেকে একটা বিয়ার টেনে বার করলাম…

প্রথমে এল হ্যারি ডেন। সে এসেছে নিজের গাড়িতে। মোড় ওয়াইন বের করে ঢালতে শুরু করলাম। জো সিঙ্গার আসতে আসতে আমরা কয়েক পাত্তর চড়িয়ে ফেলেছিলাম। আমি ওদের আলাপ করিয়ে দিলাম। জো সেই সাধারণ ফরম্যাটটা হ্যারির জন্য বার করল। হ্যারি ধূমপান করছিল আর তার ওয়াইন খুব দ্রুত খাচ্ছিল।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ’, সে বলল, ‘কিন্তু সাউন্ড ট্র্যাক্টটা? আর হ্যাঙ্ক আর আমার এই পুরো মেটিরিয়ালটার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে দিতে হবে। তারপর, আমি জানি না। সেন্সরশিপ তো আছেই?’

‘সেন্সরশিপ? সেন্সরশিপ্টা আবার কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করে জো।

‘স্পন্সর, আপনাকে স্পন্সরদের খুশি রাখতে হবে। এই মেটিরিয়ালটা নিয়ে কতটা এগোনো যাবে তারও তো একটা সীমা আছে।’

‘আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে,’ জো বলে।

‘না থাকবে না,’ বলে হ্যারি।

‘চুটকুলার হাসির ট্র্যাকগুলো অসহ্য,’ বলে লিন্ডা।

‘হ্যাঁ ঠিকই,’ আমি বলি।

‘আরও আছে,’ বলে হ্যারি, ‘আমি টিভি সিরিজে অভিনয় করেছি। খুব বেকার, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায় দিনে, একটা ফিল্ম শুট করার থেকেও ওটা আরও খারাপ। কাজটা পরিশ্রমের।’

জো কিছু বলে না।

আমরা মাল খেয়ে চললাম। কেটে গেল কয়েক ঘণ্টা।

একই জিনিস বার বার বলা হতে লাগল যেন। হ্যারি বলে চলল আমাদের এইচ বি ও-তে যাওয়া উচিৎ। আর ওই চুটকুলার হাসির ট্র্যাকগুলো খুব খারাপ। আর জো বলে চলল সব ঠিক হয়ে যাবে, আর কমার্শিয়াল টিভিতে প্রচুর স্বাধীনতা, সময়টা পালটে গেছে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল বিরক্তিকর, খুব বাজে একটা সময়। হ্যারি তেড়ে মাল ঢেলে চলেছে। তারপর সে শুরু করল পৃথিবীর প্রধান গণ্ডগোলটা কী আর তার কারণ নিয়ে। ওর একটা বাক্য যেটা ও বার বার বলছিল। বাক্যটা ভালো। কিন্তু হ্যারি থামে না সমানে বকে চলে।

হঠাৎ জো সিঙ্গার লাফিয়ে উঠল। ‘বেশ, গাঁড় মারান, আপনারা প্রচুর বালের ফিল্ম বানিয়েছেন! টিভি বেশ কিছু ভালো কাজ করেছে! আমরা যা করি সবটাই ফালতু নয়! আপনারা আপনাদের বালের ফিল্ম করা চালিয়ে যান!’

তারপর সে দৌড়ে ঢুকল বাথরুমে।

হ্যারি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল মিটিমিটি। ‘আরে ও খুব ক্ষেপে গেছে, তাই না?’

‘হ্যাঁ, হ্যারি।’

আমি আরও খানিকটা ওয়াইন ঢালি। আমরা তারপর বসে অপেক্ষা করতে থাকি। জো সিঙ্গার বাথরুমে অনেকক্ষণ সময় নেয়। যখন সে বেরোয় হ্যারি উঠে দাঁড়িয়ে তার সাথে কথা বলতে থাকে। কী কথা হয় আমি শুনতে পাই না। মনে হয় হ্যারির খারাপ লেগেছে জো-র জন্য। তার খানিকক্ষণ পরে সিঙ্গার তার জিনিসপত্র তার ব্রিফকেসে ভরে নেয়। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় তারপর ফিরে তাকায় আমার দিকে, ‘আমি আপনাকে ফোন করব’, সে বলে।

‘বেশ কথা, জো।’

তারপর সে চলে যায়।

লিন্ডা, আমি আর হ্যারি মাল খেয়ে চলি। হ্যারি পৃথিবীর প্রধান রোগটা কী তাই নিয়ে চালিয়ে যায়, মাঝে মাঝেই বলতে থাকে সেই ভালো বাক্যটা যা আর আমার মনে নেই। আমরা ওই টিভি সিরিজ নিয়ে কিছুই বলি না আর। যখন হ্যারি চলে গেল আমরা ওর গাড়ি চালানো নিয়ে ভয় পাচ্ছিলাম। আমরা বললাম ও চাইলে থাকতে পারে। কিন্তু ও বলল না থাকবে না, ঠিক পারবে গাড়ি চালিয়ে যেতে। ভাগ্যক্রমে ও পেরেছিল।

পরের দিন সন্ধ্যেবেলা জো সিঙ্গার ফোন করল।

‘শুনুন, ওই লোকটাকে আমাদের দরকার নেই। ও কাজ করতে চায় না। আমরা অন্য কাউকে পেয়ে যাব।’

‘কিন্তু জো আমি প্রাথমিকভাবে এটাতে উৎসাহিত হয়েছিলাম হ্যারি ডেন থাকতে পারে বলেই।’

‘আমরা অন্য কাউকে পেয়ে যাব। আমি লিখে জানাব আপনাকে, একটা নামের লিস্ট করে পাঠাব, আমি দেখছি কী করা যায়।’

‘আমি জানি না, জো…’

‘আমি লিখে জানাচ্ছি। আর শুনুন আমি ওদের সাথে কথা বলেছি ওরা রাজি হয়েছে পেছনে হাসির ট্র্যাক না চালাবার জন্য। আর ওরা এও বলেছে আমরা এইচ বি ওতে যেতে পারি। ওটা আমাকে অবাক করেছে কারণ আমি ওদের জন্য কাজ করি, এইচ বি ও-র জন্য কাজ করি না। যাইহোক আমি অভিনেতাদের একটা লিস্ট আপনাকে পাঠাব…’

‘ঠিক আছে জো…’

আমি তখনও জালে জড়িয়ে আছি। আমি চাইছি বেরিয়ে আসতে কিন্তু কীভাবে ওকে সেটা বলব বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটা আমাকে অবাক করছে, আমি তো লোক তাড়াতে ওস্তাদ। আমার আসলে খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে হয়ত ও অনেকটা সময় এটার জন্য দিয়েছে, কাজ করেছে। আর হয়ত সত্যি বললে প্রাথমিকভাবে একটা গোটা সিরিজ আমার উপর হবে ভেবে একটা অহংকার হয়েছিল আমার। আর এখন সেটা খুব একটা সুবিধার লাগছে না। পুরো ব্যাপারটাতেই খটকা লাগছে আমার।

কদিন পরে এল অভিনেতাদের ছবি, এক গাদা, আর পছন্দেরগুলোতে সার্কেল মারা। আর প্রতিটা অভিনেতার ফোটোর সাথে আছে এজেন্টের ফোন নম্বর। ওই মুখগুলো দেখে আমার বিরক্ত ধরে যাচ্ছিল, বেশিরভাগ ছবিই তোলা হয়েছে মিষ্টি হাসি হেসে। মুখগুলো বৈশিষ্ট্যহীন, ফাঁপা, হলিউড মার্কা, বেশ বেশ ভয়ানক।

এই ফোটোগুলোর সাথে ছিল একটা ছোট নোট—

‘…আমি ৩ সপ্তাহের ছুটিতে যাচ্ছি। ফিরে এসে দ্রুত এই কাজটা শুরু করতে চাই আমি…’

ওই মুখগুলো আমার প্রবল ঘেন্না আরও উস্কে দিল। আমি আর নিতে পারছিলাম না। আমি কম্পিউটারে বসে লিখে ফেললাম।

‘…আমি সত্যি সত্যি তোমার প্রজেক্টটা নিয়ে অনেক ভাবলাম, আর খোলাখুলি বললে বলা উচিৎ, এটা আমি করতে পারব না। এটা করা মানে যে জীবন আমি বেঁচে এসেছি আর বেঁচে থাকতে চাই তাতে মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করা। আমার বেঁচে থাকার ভেতর এটা অতি ভয়ানক এক অনধিকার চর্চা। এটা আমাকে খুব অখুশি আর বিষণ্ণ করে তুলবে। এটা আমি টের পাচ্ছিলাম আর কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলব। তুমি আর হ্যারি ডেন যখন সে রাতে ঝগড়া বাধালে, তখন বেশ ভালো লাগছিল আমার, ভেবেছিলাম বেশ সব চুকেবুকে গেল তাহলে। কিন্তু তুমি ফিরে এলে ফের এক গোছা নতুন অভিনেতাদের নিয়ে। আমি ব্যাপারটাতে থাকতে চাই না জো, এটা আমি সামলাতে পারব না। প্রথম থেকেই এটা আমার মনে হচ্ছিল আর সেটা ক্রমে বেড়ে চলল যত সময় এগোল। তোমার বিরুদ্ধে কোনও রাগ নেই আমার, তুমি একজন বুদ্ধিমান তরুণ যে চাইছে তাজা রক্ত বইয়ে দিতে টিভির প্রোগ্রামে, কিন্তু সেটা আমি হতে চাই না। তুমি হয়ত আমার ব্যাপারটা বুঝতে পারবে না কিন্তু, বিশ্বাস করো, এটা সত্যি, খুব সত্যি। আমার গর্বিত হওয়া উচিৎ যে তুমি জনতার কাছে আমার জীবন তুলে ধরতে চাও কিন্তু আসলে আমি খুব ভয় পেয়ে যাচ্ছি এটা চিন্তা করেই। আমার মনে হচ্ছে আমার জীবনটাই আক্রান্ত যেন। এর থেকে বেরোতে হবে আমায়। বহু রাত আমি ঘুমোতে পারিনি। আমি কিছু ভাবতে পারছি না। আমি কিছুই করতে পারছি না।

দয়া করে কোনও ফোন নয়, কোনও চিঠি নয়। কিছুতেই এই মত আর পালটাবে না।’

পরের দিন ঘোড়দৌড়ের মাঠে যাওয়ার আগে আমি চিঠিটা ডাকবাক্সে ফেলে দিলাম। মনে হল আবার যেন বেঁচে উঠলাম আমি। পুরো স্বাধীন হতে আরও কিছুটা লড়াই হয়ত করতে হবে আমায়। কিন্তু আমি কোর্টে যেতেও রাজি আছি। যে কোনও কিছুতেই। তবু খারাপ লাগছিল জো সিঙ্গারের জন্য। কিন্তু গাঁড় মারাও আমি আবার স্বাধীন।

ফ্রি ওয়েতে ভাগ্যক্রমে রেডিও চালিয়ে মোজার্টের মিউজিক পেয়ে গেলাম। জীবন কখনও কখনও এত সুন্দর কিন্তু সেটা নির্ভর করে খানিকটা আমাদের উপরও।

আবার আগামী সংখ্যায়

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের -- ষোড়শ পর্ব — ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*