চন্দ্রকুমার ও আয়না বিবির কাহিনি

অমর মিত্র  

 

নেত্রকোনার অতীন সরকার এবং খবরিয়া, নেত্রকোনা টাইমসের ইমতিয়াজ আলী চন্দ্রকুমারের সঙ্গে বিপুল সোম এসেছিল সুসঙ্গ দুর্গাপুর, গারো পাহাড়ের কোলে, ইন্ডিয়ার মেঘালয়ের সীমান্তে। মৈমনসিংহ গীতিকার দেশ এই সব অঞ্চল। মহুয়া, মলুয়া আর রানি কমলা, আয়না বিবির দেশ। রাজবাড়ি দেখছিল তারা বাইরে থেকে। সুসঙ্গ রাজা সোমেশ্বর সিংহর প্রাসাদ, ক্ষুধিত পাষাণ হয়ে গেছে এখন। তারা দেখল এই দ্বিপ্রহরে সেই ভগ্নাবশেষ থেকে বেরিয়ে এল একজন। বিপুল চিনতে পেরেছে। কাঁখে একটি সন্তান, আর হাত ধরে আছে বছর ছয়-সাতের কন্যা। আয়না বিবি। কমলাপুর স্টেশনের সেই আয়না বিবি। পরশু রাতে দেখা হয়েছিল স্টেশনেই। হাওর এক্সপ্রেস ধরতে এই বিবিও এসেছিল স্টেশনে। আশ্চর্য! বিপুল আর চন্দ্রকুমারের দিকে সে তাকায় কিন্তু যেন চেনেই না, এমন করে রাস্তা পার হতে যায়। চন্দ্রকুমার ডাকে, আরে, তুমু তো আয়না বিবি, তুমার ভাই তো মোল্লা বদিউল ইসলাম, কলমাকান্দায় ঘর, ইমামতি করে।

সে দাঁড়ায়, বলে, জ্বি, নাম আয়না বিবি ঠিকাসে, কলমাকান্দা ঠিকাসে, কিন্তু কেন, আফনে কেডা? বিভ্রান্ত লাগে তার চোখমুখ। চিনতে পারেনি স্পষ্ট। অথচ না চেনার কথা নয়। দুদিন হয়েছে মাত্র। স্টেশনে কত কথা হল। তার স্বামী আরব দেশে গেছে। দু’মাস ধরে ফোন করে না। সে আসছে ভাইয়ের বাড়ি মানে বাপের বাড়ি। আরবে গিয়ে কী হল স্বামীর?

তুমি হাওর এক্সপ্রেসে আসোনি, পরশু? জিজ্ঞেস করে চন্দ্রকুমার।

জ্বি কিসুই মনে থাকে না, ভুলি যাই সব, কবে আইসি, কহন আইসি ভুলি গিসি, মা বাপ নাই, ভাই মুরে খেদাই দেসে, আফনেরা মুরে চিনেন, মনে রেখিসেন, মুর নসিব, কিন্তু আরবে গিইসে যে…। আয়না বিবি কথা থামিয়ে দেয়, অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে সকলের মুখ। তার চোখে চেনা মানুষের ছায়া তো পড়েনি।

বিপুল অবাক, ভুলে গেল? বিপুলের দিকে তাকিয়ে আছে আয়না বিবি। তারপর নিজ মনে বলল, মুই ঘুরতিসি মুর সোয়ামির জন্যি, মুই কি ফের শ্বশুরঘর ঘুরান যাব, ভাই বলিসে মুই চরিত্তহীনা, মুর ঠাই নাই, মুর সোয়ামিরে গুণ করিসে আরবের মাইয়্যা, মুর লাগবে না আসমানতারা কাপড়, মুরে নাকি ফের গাজিপুর, শউর ঘর যেতি হবে, আবার সে কী বলে তা বুজিনে, মুর মাথা খারাপ হই গিইসে।

বিপুল জিজ্ঞেস করে, এখেনে কোথায় এসেছিলে রাজার বাড়ি?

জ্বি, আফনে কেডা দাদাভাই, মুর ভাই মুরে খেদাই দেসে। বলে আঁচলে চোখের কোণ মুছল আয়না বিবি।

তুমি তো আয়না বিবি? বলল বিপুল।

জ্বি, সেডা ঠিক আসে, কিন্তু আফনেরে মুই বুঝতি পারতিসিনে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আয়না বিবি।

তুমি তো পরশুদিন হাওর এক্সপ্রেসে এলে, কমলাপুর স্টেশনে দেখা হল। বিপুল বলে, তুমি ইসলামি কিতাব কিনলে।

জ্বি, বলতি পারতিসিনে, মুই সোয়ামিরে খুঁজতিসি এদিকি, সে নাকি আরব থেকি চলি এইসে বাংলাদেশে, কিন্তু কুথায় আইসে তা কেউ কইতাসে না। বলতে লাগল আয়না বিবি, না আসে যদি, তাও বুঝা যাসসে না।

এখানে কবে এলে? বিপুলের জিজ্ঞাসা ফুরোয় না।

জ্বি, ক’দিন আসসি, ক’দিন তা কইতি পারা যাবেনি, সেই বিষ্টির কাল হল, সেই রোদ উঠল, ফের বিষ্টি হল, ওই গাঙে পানি এল কত, পানিতি জমিন ভিটা বুড়ে গেল, তারপর জাড়ের কাল হল, কিন্তু একটা জাড় না দুইটা জাড়, কইতে পারসিনি, জাড়ের পর পুষ্প ফুটিল, বনে বনে পঙ্খী ডাকা করিল, তারা বলাবলি করে মুর সোয়ামী নাকি আরব মুলুক থেকে ফিরা এইসে, ভাই তা বলল, সে নাকি এহেনে থাকে। আয়না বিবি বলল, খাড়ান, মুই  পাউরুটি লিয়ে লি, ইয়াদের ক্ষুধা পাইসে, ক্ষুধায় শুকাই গেসে মুখ দুখানি…।

বিস্ময় নয়, বিপুলের মনে হল, সত্যি বলছে আয়না বিবি। দুই সন্তান নিয়ে সে কতকাল ধরে তার স্বামীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, বসন্ত……। পূর্ববঙ্গ গীতিকার আয়না বিবির স্বামী সেই উজ্জ্যাল সাধু গেল বাণিজ্যে,

অভাগিনী আয়না কান্দে, “শুন পরাণের পতি।
দেওয়ায় ডাকিলে বান্দিও নায়ের কাছি”।।
অভাগিনী আয়না কান্দে “আমার মাথা খাও।
রাইত নিশিথে বন্ধু না বহিও নাও।।

তুমি দেখলে, সে কি ফিরেসে? জিজ্ঞেস করে চন্দ্রকুমার।

জ্বি না, ভাই মুরে মিথ্যে কহি ঘরথুন বের করি দেসে, সে আরবেই রইসে মনে হয়। বলতে বলতে আয়না বিবি পথের ধারের দোকান থেকে পাউরুটি কিনতে গেলে চন্দ্রকুমার বলে, মুই তুমারে খরিদ করি দিসসি, তুমু টাহা কুথায় পাবা আয়নারানি।

অবাক আয়না বিবি বিড়বিড় করে, বলে, আয়না রানি, কী ক’ন আফনে, মুই আয়না রানি, কেউ কয় নাই কোনওদিন, দেন, কিনা দেন। বলে আয়না বিবি সরে দাঁড়ায়, বিপুলকে বলল, ভায়ের মনে দয়া মায়া নাই, আল্লা তারে ভালো রেখিসেন, রাখুন, মুই কিসুই বুঝতি পারিনে দাদা, মুর কেন এমন হয়।

কাঁখের বাচ্চা ঘুমিয়ে। তার মাথা ঢেকেছে আঁচলের অংশ দিয়ে। ক্যারি ব্যাগে পাউরুটি আর রসগোল্লা নিয়ে এল চন্দ্রকুমার, বলল, দুকানের বেঞ্চিতে বসে খাওয়াও ওদের, নিজিও খাও, তুমার মুখখানিও শুকাই গেসে, এমনি ঘুরে বাঁচা যায়?

আয়না বিবি মাথা নামায়, ফিসফিস করে, কী যে ক’ন আফনে খবরিয়া, ইয়েমন কেউ কয় না আর!

রাজার বাড়িতে কেউ থাকে? জিজ্ঞেস করল বিপুল।

জ্বি না, সব হূন্য দাদা। বলল আয়না বিবি, কত বড় বাড়ি রাজার, লক নাই একডাও।

এখন কোথায় যাচ্ছ? জিজ্ঞেস করে বিপুল।

জ্বি, কী মনে হল, ঘুরতিসি কতদিন, রাজার বাড়িতি নিশাকালে হুই, বিরিসিরি ফের যাই, যদি এসে থাকে, সে লক এসে যদি ভোল বদল করে থাকে, মুই কী করে তারে চিনব। বলল আয়না বিবি। তারপর সে টিউবোয়েলের সমুখে যায়। কন্যাটিকে বলে, হাত ধুয়ে নে, এই তো পাইসিস, আল্লায় দিইসে।

চন্দ্রকুমার বলে, তুমার ভাই যে তুমারে বাপের ঘরে রাখসে না, তুমার তো অধিকার রইসে।

আয়না বিবি বলল, জ্বি, মেয়েমানুষের অধিকারডা কী, তা তো জানিনে মু।

তুমি এখন বিরিসিরি কুথায় যাবা? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে, শীতির বেলা পড়ি যাবে অহনই।

মেয়ের মুখে প্লাস্টিকের পাত্রে ভরা রসগোল্লার একটি তুলে নিয়ে দিতে দিতে আয়না বিবি বলল, যাব বলে বেরাইসি, যাব কি না জানিনে, কুথায় যাব জানিনে, মুর সদাগর আরবে গিয়া ফিরেনি না ফিরিসে জানিনি, সে কইসিল আসমানতারা কাপড় কিনসে, সে কাপড় কারে দিইসে জানিনি।

তুমার ভাই বের করি দিল, আর তুমি চলি এলে? চন্দ্রকুমার বলল।

না, ভাই বলল, সে লক দুর্গাপুর আইসে, এহেনে বাড়ি কিনসে, মুই তা শুনি চলি এইসি সে কতদিন, তহন রোদ সিল খুব, গা পুরি যায়, ভাই আমারে নামাই দি গেসিল, কিন্তু সে লক দক্ষিণ পাড়ায় নাই, আমি ঘর ঘর গিইসি, মিথ্যে বলি ভাই এইডা করল।

চন্দ্রকুমার বলল, আবার ভাইয়ের বাড়ি যাও।

ভাই একই কথা কইবে, ভাই বলবে, সে দেশে আইসে। আয়না বিবি বিমর্ষ মুখে বলল, দেশে ফিরেনি।

অমুক মণ্ডল পতি সে, আরবে গিইসে।
আসমানতারা কাপড়খানি সতীনে নিইসে।।

###

আরব থেকে এসে থাকতিও তো পারে। চন্দ্রকুমার বলল, কতদিন ভিনদেশে থাকবে?

জ্বি, এহেনে আসবে কেনে, সে তো গাজিপুর যাবে। বলল আয়না বিবি, অনেক লকেরে জিজ্ঞাস করসি, কতদিন ঘুরি ঘুরি দিনমানে, সাঁঝের বেলায়, আজানের পরে, সব লক কহে, অমন নামে কেউ নাই।

কী নাম কহ দেখি। চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

এই রাবিয়া, তুর বাপের নাম কী? আয়না বিবি জিজ্ঞেস করল মেয়েকে। মেয়ের মুখের ভিতর পাউরুটির অংশ, সে গিলতে থাকে মায়ের কথার উত্তর দেওয়ার জন্য। উত্তর দিতে পারলেই যেন বাপের দেখা মিলে যাবে। মেয়ে রুটি গিলে নিয়ে বলল, লতিফ, মুর বাপ লতিফ মণ্ডল, তার বাপ শুভান আলী মণ্ডল, মুর দাদা।

চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে, কেমন চেহারা?

মেয়ে চুপ করে থাকে। তার মুখে ভাষা জোগায় না। বাবা কেমন দেখতে? বাবার মতো। ভুলেই গেছে সে। আর আবছা মনে থাকলেও বর্ণনা করা তার সাধ্য নয়। তখন আয়না বিবি বলল, সুপুরুষ, লাম্বা মানুষ, মাথায় অনেক চুল, বাঁ চখের নিচে লম্বা কাটা দাগ, কিন্তু তা খারাপ সিল না। সলজ্জ স্বর আয়না বিবির, উনি খুব জুয়ান মানুষ, বলত, আরবে গিয়া রুগা হই গেসেন।

ভিডিও কোল করেসিল? জিজ্ঞেস করে চন্দ্রকুমার।

জ্বি, ফুন কল, একটা মুবাইল কিনি দিয়ে গিসিল, সেইডা চুরি হই গেসে। আয়না বিবি বলল।

কী করে চুরি হল? জিজ্ঞেস করে চন্দ্রকুমার।

জ্বি, বলতি পারব না, গেসে মুর কপাল। বলল আয়না বিবি।

তাহলে সে ফোন করবে কী করে? চন্দ্রকুমার বলে।

জ্বি, ফুন হয় না তো। বিড়বিড় করল আয়না বিবি।

ফোন না থাকলে ফোন করবে কী করে? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

কেনে তার ভাইয়ের ফুনে কল করা যায়। বিমর্ষ আয়না বিবি বলে।

সেইডা তো তুমার ফুন মা। বলে উঠল আয়না বিবির কন্যা রাবেয়া।

না, তা না, সে কিনসে। বলল আয়না বিবি, পুরানো ফুন কিনসে নাকি।

না, সিডা তুমার ফুন। বলে ওঠে রাবেয়া।

মাথা নাড়ে আয়না বিবি, মুর দেওর সফিক কিনসে, একেবারে এক ফুন, ফুন কি সব আলাদা, এক রকম হয়, তাই হইসে। বিড়বিড় করে আয়না বিবি, অমন কইতি নেই, সে তুমার চাচা।

চাচায় তুমারে ধরসিল কেন? সাত বছরের রাবেয়া গরগর করে ওঠে।

এই তুই থামবি, ঘরের কথা বনেও বলতি নেই। বলে আয়না বিবি মাথা নিচু করে। তারপর বলে, সে লোক তো গাঁর ফুন দুকানে ফুন করতি পারে, করে না, কেন করে না?

চন্দ্রকুমার বলে, তার ফোন নম্বর নাই?

ফুনে লিখা সিল। আয়না বিবি উত্তর দেয়।

তোমার দেওরের কাসে সিলনি? চন্দ্রকুমার বলে।

সইফ বলে, নাই, সে পাটি করে। আয়না বিবি বলে।

কোন পার্টি? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

সে বাস লরি পুড়ায়, খুব তার রোষ, মুরে খেদাই দিসে। আস্তে আস্তে নিজেকে ভাঙে আয়না বিবি, মুর ভাই যেমন নিঠুর, তেমনি নিঠুর সে…।

হায়! বাড়ি নাই ঘর নাই কপাল পুড়া আমি গো।

নির্বান্ধব করিয়া আল্লা মোরে বনে পাঠাইলো গো।।

মাও নাই সে বাপ নাই সে রে আমার গর্ভ সোদরার ভাই।
পানির মুখে শেওলার মতো আমি ভাসিয়া বেড়াই রে।।

সব কথা লিখা হবে, তার গায়ের রং? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

জ্বি, ময়লা রং, কিন্তু তাই ভালো, পুরুষের আবার রং কী কাজে লাগে? আয়না বিবি বলল।

তার কোনও ছবি আছে? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

আয়না বিবি বলল, আছে, কিন্তু তা বিবাহের।

দেখাবা। চন্দ্রকুমার বলল, মুই খবরিয়া, এইডা খবর হবে, খবর হই যায় যদি, সে এদেশে ফিরে বিবাহ করলি, তুমি ব্যবস্থা নিতি পারবা, সে যদি এসি থাকে, খবর হই যাবে, তুমু জানতি পারবা।

আয়না বিবি বলল, বিবাহের ছবি না দেখালি খবর হয় না?

হয় না। চন্দ্রকুমার জবাব দেয়, বরং বিবাহ কীভাবে হইসে তাও জানাতি হবে।

এ তো মুর নিজির কথা, কী করে বলি, সরম হয়। বলল আয়না বিবি।

কিন্তু না বললি হবে, সে লক যদি তুমারে ভুলি গিয়ে থাকে, বিবাহর পিকচার দিখে মনে পড়ে যাবে।

সে মুরে ভুলি গিইসে, এমন হতি পারে? আয়না বিবি বিড়ম্বিত মুখে বলে।

জগতে সব কিসু হতি পারে। চন্দ্রকুমার বলে, তুমি তুমার বিবাহর কথা বলো।

জ্বি, সে লক আমার ্বাপের বাড়ি এইসিল এক বৈকালে, মুর বাপ ইসমাইল মিঞা তহন বেঁচে, সে আইসিল কেন জানিনে, নাও বাঁধিসিল গাঙের ধারে, পারেতে হিজল বিক্ষ, পানিতি পড়ে ডাল, কাছিতি নাও বান্ধি, দিইল সামাল, আগুন চাই, রান্ধিবে ভাত ডাইল, সঙ্গে কলমি ভাজা, আগুন আনিতে সে আইলো ভিটায় সুজা। সে ছিল বালুচর, বালুচর ভেঙে চরের ধারে শেষে এসে দেখে কুটির একখানি, বুড়া এক বসিয়া আছে, চখে বয় পানি। বিড়বিড় করে বলতে থাকে আয়না বিবি। মুই গিসি গাঙের পানি আনতি, কলসী লিয়া এসে দেখি, বসিয়া আছে সে, পুরুষ ভিনদেশি, পানি ছলকাইয়া পড়ে, তাকাইয়া দেখিসি। যেমন সোন্দর সে, তেমন যৈবন, এরে ছাড়ি কারে নিব, কী কথা কইবন?

তারপর? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

চারি চক্ষু মিলন হইসে, সুখির বিতান্ত, বাপে কয়, বিবাহ দিয়া যাইবে বেহেস্ত। আয়না বিবি বিড়বিড় করে, বলে, গাজিপুর এক পুর মেঘনার ধারে, সেখেনে সেই লক সংসার করে, ঘরে সিল মাতা পিতা, সিল এক বুন, সংসার সুখের সিল রমণীর গুণ, কিন্তু হইল যে কী করিয়া বলি, পীরিতির বহু দুঃখ বহু যাতনা মানি। আয়না বিবি বলতে বলতে আরক্ত হয়, ভেনদেশি পুরুষ সে সদাগরি করে, নাও লিয়া গাঙে গাঙে দেশে দেশে ঘুরে।

তারপর কী হয়েসিল? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

আসে না আসে না সে, কবে আসে ফিরা, বসি থাকি চরে গিয়া, নাও দেখি গিয়া। সে সিল বসন্ত কাল, গেল কবে চলি, আইল বোশাখ মাস, রোদি পুড়ি মরি, আষাঢ়ে আসিল মেঘ, শাদা আর কালো, মেঘ দেখি তার কথা মনে মনে আলোঝালো, ও মাঝি, মাঝি তুমু কোন দিশে ঘর, সদাগরে চিন তুমু, অমুক মণ্ডল নাম। বর্ষায় পানি উথাল, বানা আসে ঘরে, বুড়া বাপ রোগে রোগে, যায় বুঝি মরে।

তুমার ভাই? জিজ্ঞেস করে চন্দ্রকুমার।

ভাই মুর ভাই, সে থাকিতেও নাই, ভাই সিল তার ভিটায়, বানা নাই সেথা, বাপেরে দিখে না সে, মনে লাগে ব্যথা, ব্যথা লাগে খবরিয়া আর কত কহি, দুঃখের গাঙখানি নিজ যায় বহি।

বাপ মরে গেল? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

মাথা নাড়ে আয়না বিবি, না, সেই বানা গেল, মরতি মরতি বেঁচি গেসে বাপ, বাপের সিল কঠিন জান, কেডা নেয় তা, শুখা বানা যাই হোক, বাঁচি থাকে পিতা। ভাই এসে বলে, কে এক মুল্লা বুড়া, তিনকুড়ি বয়েস, আয়নারে যাঞা করে, এমনি খায়েশ। শুনি মুই কেঁদে মরি, অভাগিনী আমি, কুথা গেস সদাগর, গাঙ ঝিমঝিমি।

সে বুড়ার ঘর কুথা? চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করে।

সে বুড়ার নাম সিল তিলোচন মিঞা, গয়লানি সিল তার, কুথায় ঘর জানিনি।

এখন তুমি করবে কী, কী ভেবেস মনে? চন্দ্রকুমার খবর নেয়।

কী করিব মুই, দুর্গাপুর হল, যাব ফির কলমাকান্দা, বারোহাটি, সিখেন থেকে মোহনগঞ্জ, হই খালিয়াজুড়ি, খুঁজি বেড়াব, সদাগর এয়েসে জানি, বালিয়া নদী, শুনাই নদী, ধলা নদীর পানিতি কি খবর হয় নাই? বলল আয়না বিবি, মুর দুঃখ যাবেনি জানি,

যেই রে বিরক্কের তলে যাই আরে ছায়া পাওনের আশে রে।
পত্র ছেদা রৌদ্র লাগে দেখ কপালের দুষে রে।।

হায়, আসমানতারা কাপড়ের কথা সে কত বলিসে, কিন্তু দেয় নাই, এহন আমি কী করব জানিনে। কপালে হাত রাখল আয়না বিবি। তার কোলের ছোটটি তখন চোখ মেলল, বড় বড় চোখে মায়ের মুখ দেখতে লাগল। তাকে বুকে চেপে আয়না বিবি বলল, পথে পথে বড় হব ইয়ারা, মানষে ভালো মন্দ এক সঙ্গেই হয়, যে মুরে আসমানতারা কাপড় দিবে কয়, সে তাই খরিদ করে আর একজনেরে দেয়…।

তখন চন্দ্রকুমার বলল, তুমার টায়েম দিতা হবে, তারে খুঁজি বের করতি টায়েম তো দিতাই হবে।

কত দিন ধরে খুঁজতিসি তারে, কত দিন আর লাগব জানিনি। বলল আয়না বিবি।

মু একটা কথা বলতিসি, তুমারে কুথাও যেতি হবেনি, মু খুঁজি দেখব সে আরবে না এদেশে, এদেশে হলে এদেশের কুথায়, কোন গাঙ ধরৎ তার নৈকো গেসে কোন গাঙে, কোন পথ দিয়ে হেঁটে গেসে সে, বিবাহ করি থাকে যদি, সে কারে?

মু কী করব তাইলে এখন, এডা একটা কাজ ছিল, এখন মু কী করব দুটা বাচ্চা লিয়া? জিজ্ঞেস করে আয়না বিবি, সংসার ভাইস্যা গেছে তাই তারে খুঁজি, যদিও সে মুর হবেনি আর, সে কথাডা বুজি।

আচমকা আয়না বিবির হাত ধরে ফেলে চন্দ্রকুমার, বলে, মুর ঘরৎ আইথর চ আয়না বিবি।

হাত ধরাই থাকে, আয়না বিবি নিঝুম হয়ে গেছে যেন। নিঝুম এক বনতলে বোধ হয় দেখা হয়েছে দুজনের। চারিদিকে কেহ নাই। লোক-লজ্জার ভয় নাই। আয়না বিবি মুখ নিচু করে বলল, তুমার ঘরৎ বিবি নাই, সে কি মুরে পা রাখতা দিবে, খেদাইয়া দিবে না?

নাই, মুর কেহ নাই, আছে এক বুড়ি মা, চখে দ্যাখে না, চন্দ্রকুমার বলল, দুখিনী মেয়ে মুর ঘরৎ থাকবি চ।

মুই তো একা নই গো, চখের দু’ তারা নিয়ে হাঁটি আমি, তারা দুইরে রাখি কার নিকট, কে নিবে ভার, তারাদের চখে দেখি মু, অন্ধ নাচার।

তারাও চলুক সাথে, মুই কি তোরে শুধু বলি আয়না, তারাও আসুক তারা, আসমানের দুই তারা।

চমকে ওঠে আয়না বিবি, কী কহিসো খবরিয়া, কী কহিসো কহ ফের?

চখের তারা আসমানের তারা, নিয়ৎ ঘুরো পথে, আসমানতারা রাখি সে গিইসে আরব দিশে, ইডা বুঝ নাই মেয়্যা? বলে চন্দ্রকুমার খবরিয়া যে কিনা সেই বাণেশ্বর খবরিয়ার আপনজন, যে বাণেশ্বর সুধীন্দ্র সোমের স্ত্রী কুমুদিনীর কল্পিত মাত্র। কল্পিত খবরিয়া কেউ, সেই বাণেশ্বরের আপন কেউ ইমতিয়াজ আলী চন্দ্রকুমার আয়না বিবিরে বলছে নিয়ে যাবে তার ঘরে। কোথায় চন্দ্রকুমারের বাস, কোন গাঁয়ে তার ঘর?

রাজ রাজেশ্বরী নামে এদেশে এক নদী ছিল। সেই নদী মরে গিয়ে পড়ে আছে রাজিয়া খাল। দক্ষিণে কেন্দুয়া যাও, কেন্দুয়ার পশ্চিমে আছে আইথর গ্রাম। সেই গ্রামে নাকি চন্দ্রকুমারের পূর্ব পুরুষের ঘর। কোন চন্দ্রকুমার, যে চন্দ্রকুমার মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করেছিলেন, গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে খবর নিয়ে বেড়িয়েছিলেন সুসঙ্গয় কেমনে খনন হলো রানির সায়র। সায়রে জল উঠল কেমনে। আহা, রানির জীবন বিসর্জন হল কেমনে? মলুয়া সুন্দরী কেমনে দেখেছিল ভুখা পেটের চান্দবিনোদকে, মহুয়া সুন্দরী কেমন করে বড় হল বেদের নৌকোয় নৌকোয়। আর এই আয়না বিবি কেমন করে হারাল তার সওদাগরকে।

বিপুল এত সময় ধরে ঘোরের ভিতর ছিল দুজনের কথোপকথনে। তার সম্বিত ফেরে চন্দ্রকুমারের কথায়। বলল, তুমি কি আয়না বিবিকে সত্যিই নিয়ে যাবে বাড়ি?

আজ্ঞে হাঁ, আমার পূর্ব পুরুষ বাণেশ্বর খবরিয়া, আমাদের ওই আইথর গাঁয়ে চন্দ্রকুমারদের পূর্বপুরুষের বাস ছিল, আমি আয়না বিবিরে মুর ভিটায় নিয়া যাব, দুইটা সন্তান নিয়া রাস্তায় রাস্তায় কত দিন ঘুরবে?

যদি তার স্বামী আরব থেকে ফিরে আসে? বিপুল জিজ্ঞেস করে।

আসমানতারা রেখি গেসে, সে কেনে ফিরবে, আর ফিরে এলিও ভুলে গেসে আয়না বিবিরে। বলল চন্দ্রকুমার, আরব দিশে গিয়া ভুলিই যায় সব, ভুলি যাওয়া রীতি।

নাকি দাস হয়ে আছে শেখের বাড়িতে, সারাদিন বালি সরিয়ে দেয় উঠন থেকে, সেই তার কাজ। বলল বিপুল, কত লোক ফিরে আসে ভয় নিয়ে, কতজন ফিরতে পারে না, চাবুক খেয়ে মরে।

হায় হায় হায়, কে কইসে ইডা, সে যখন ফুন করত, কই তেমন তো বলে নাই। আয়না বিবি প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, হায় হায় হায়, সদাগর কোন দিকি যায়, মুরে না মনে থাকৎ, সুখি নাও বায়।

চন্দ্রকুমার বলে, ওইডা ভুল দাদা, ফিরা আসে নারী শ্রমিক, মুর গাঁর সাত যুবতী নারী গিসিল, দুইজন মরিসে সে দেশে, পাঁচজনের ভিতর তিনজনের মাথা খারাপ হই গেসে, আর দুজন বলতেসে সব থুয়ে এসিসে, বাপ বেটা, শেখেরা এবেলা সেবেলা তাদের দিয়া অকাম করাত, তার নাম মধুমালা, সে কত কান্নাকাটি করল এসে,

যাইও না যাইও না, সে দিশে, আরব মুলুক
ছিড়া খায় গোস ঝেন, বড় কষ্ট মাঈ
বাপ বেটা দুই শেখে, সকলি হারাই।

পুরুষ ভালোই কাম করে, চ আয়না রে আয়না, মুর ঘরে চ, আসমানের দুই তারা নিয়া ঘুমাবি চ।

মধুমালা কে? জিজ্ঞেস করে বিপুল।

গরীব মা বাপের মেয়ে, বরে নেয় না, তাই আরব গেল দু’টা টাহার জন্যি। বলল আয়না বিবি।

তুমি তারে চেন? বিপুল অবাক।

হ চিনি, সোয়ামী খেদাইল যহন, পথে পথে ঘুরতিসিল, মুর সদাগরের সঙ্গে সেও গিসিল আরবে, তার নিকট জানিব সদাগরের খবর।

আয়না বিবির কথা শুনে চন্দ্রকুমার বিরক্ত হয়ে বলল, সদাগর সদাগর সদাগর করো, সদাগরে না পাইয়া কান্দনে মরো, মন নাই সদাগরের, ভুলিয়াছে সব, চন্দ্রকুমার খবরিয়া শুনে সেই রব।

আরও গিসিল কতজন, ফতেমা, নীলা আর কাঞ্চনমালা, তারা ফিরসে? জিজ্ঞেস করে আয়না বিবি।

চলো, সবারেই জিগাবা তুমি। বলে চন্দ্রকুমার সিএনজি অটো ডাক দেয়, ও ভাই, যাবা নাকি কেন্দুয়া, আইথর গাঁ, চলো।

আর সময় নিল না চন্দ্রকুমার। কতদূর যাবে, কত ঘণ্টা! সুসঙ্গ দুর্গাপুর একেবারে উত্তরে, আর আইথর দক্ষিণে। এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত। নেত্রকোনা থেকে দুর্গাপুর যত পথ, আইথর অন্যদিকে তার দ্বিগুন পথ। শীতের বেলা ফুরোল বলে। বেলা থাকতে থাকতে পৌঁছতে পারবে না বাড়ি। রাত হয়ে যাবে। আজ কী তিথি? চাঁদ কখন উঠবে? রাস্তা ভালো না। কিন্তু যেতে হবেই। অটোতে আয়না বিবি দুই সন্তান নিয়ে পেছনে উঠল। দু’চোখ ভরে গেছে জলে। ড্রাইভারের পাশে বসল চন্দ্রকুমার। হাত নাড়ল। বলল, দাদা, গীতিকায় এমন হইসে কত, মুর পরদাদা, তার দাদা, বাণেশ্বর খবরিয়া এমনি কত না খবর দিয়া নিয়া করৎ কত ধামা ফল-পাকুড়, ধান্য কলাই নিয়া ঘরে ফিরসে। এইডা ধরেন বাণেশ্বরের খবর। হয় খবরিয়া বাণেশ্বর বানাইসে, না হয় সত্যি ঘটসে, ঘটাইসে সে লোক।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. ধন্যবাদ। এইটি ময়মনসিংহ গীতিকার বাইরের আখ্যান নিয়ে নির্মিত আমার বড় উপন্যাসের একটি পরিচ্ছেদ। এই সব কাহিনি আমার নির্মাণ। গীতিকার চরিত্র আছে, এই সময়ে ফিরে এসেছে তারা। তাদের নিয়েই এই বৃহৎ উপন্যাস লেখা হয়ে এল প্রায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*