তোমার আমার আগামী

কৌশিক দত্ত

 

বছর দুয়েক আগে মে মাসের এক সন্ধেবেলা অত্যন্ত পরিশ্রান্ত দেহে এবং বেশ খানিকটা মানসিক ক্লান্তি কাঁধে চাপিয়ে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে তারাতলার দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল এক সাধারণ ঘরোয়া দৃশ্যে। উজ্জ্বল রঙে সাজুগুজু সেরে উচ্ছল এক বালিকা এক পক্ককেশ বৃদ্ধার হাত ধরে টানাটানি করছে একটি দোকানের সামনে। যাবতীয় শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির দাবি নস্যাৎ করে তার সান্ধ্য খুশি আমার মধ্যে সংক্রামিত হল। এরকম তো প্রায়ই হয়ে থাকে, একটি ঘটনার কথা বিচ্ছিন্নভাবে এতদিন মনে থাকার কথা নয়। মনে থাকার কারণ এই যে পরমুহূর্তে এক অপূর্ব নিশ্চিন্ততা অনুভব করেছিলাম সেদিন। মনে হয়েছিল, ক্লান্তিকে এমনকি মৃত্যুকেও সহজভাবে মেনে নেবার জন্য আমি তৈরি। আমাকে তৈরি করে দিয়েছে শিশুর হাসি, যার মধ্যে বেঁচে থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ, যা ব্যক্তির মৃত্যুকে সামূহিক অবলুপ্তি হয়ে উঠতে দেবে না। যখন আমি থাকব না, তখন এই মেয়েটি থাকবে, পৃথিবীকে গতিশীল এবং দৃশ্যমান রাখবে নিজের কর্ম আর দৃষ্টি দিয়ে। আসলে এভাবেই মানুষ বাঁচে, ভবিষ্যতের হাতে জীবনের ভার দিয়ে, শিশুদের ভরসায়।

আজও নিজের মেয়েটির মুখ দেখে ভরসা পাই। আমার থেমে যাবার সঙ্গে সময়ের বা মানুষের থেমে যাবার কোনও যোগ থাকবে না, তা নিশ্চিত করবে আমার মেয়ে… সে এবং তারা… তাদের প্রজন্ম। মাঝে মাঝে কন্যার মুখের দিকে চেয়ে বুক কেঁপে ওঠে। তার বেঁচে থাকার জন্য কোনও অবশিষ্ট পৃথিবী, বাতাস, জীবন ছেড়ে যাচ্ছি তো আদৌ? তার এবং তাদের বেঁচে থাকার জন্য? দুনিয়ার এত ব্যূহ চক্র তীর তীরন্দাজ পেরিয়ে বেঁচে থাকার জন্য তার ক্ষুদ্র শরীর ঘিরে কি আদৌ বুনে দিচ্ছি কোনও বর্ম, আমি এবং আমরা… পিতারা এবং মাতারা? ব্যক্তিগত, সামাজিক আর প্রশাসনিক স্তরে আমরা কি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি?

ব্যক্তির মতো সমাজ এবং দেশও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই তাকানো শুদ্ধ স্নেহবশত নয়, নিজেদের প্রয়োজনেও বটে। আজকের যুবসমাজ যখন প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ হবে, আজকের শিশুরা তখন হবে তরুণ বা যুবক, অর্থাৎ দেশ বা সমাজের চালিকাশক্তি। ব্যক্তি মা বা বাবা যেমন আশায় থাকেন যে তিনি বৃদ্ধ হলে তাঁর সন্তান তাঁর দেখভাল করবে, দেশ তথা রাষ্ট্র সেই একই ভরসায় থাকে। মনে করুন, আপনি ত্রিশ বছর চাকরি করে অবসর নিলেন এবং স্বভাবতই প্রত্যাশা করলেন যে পেনশন বা সোশাল সিকিওরিটি আপনার প্রাপ্য। অধুনা জাতীয় সরকার নতুন কর্মীদের পেনশন বন্ধ করে দিয়েছেন বটে, তবু মডেলটা বোঝা দরকার। আপাতভাবে মনে হতেই পারে, আপনার ত্রিশ বছরের শ্রমের যে ফসল বা উপার্জন থেকে কেটে নেওয়া যে অংশ অথবা কর বাবদ প্রদত্ত অর্থ সরকারের ঘরে জমা হয়েছে, তা ভাঙিয়ে বা তারই সুদে বার্ধক্যে আপনার ভরণপোষণ চালাতে পারে সরকার। বাস্তবে অর্থব্যবস্থা এত সরল নয়। প্রথমত অর্থনীতি স্থাবর নয়, জঙ্গম। অতএব আপনার টাকার অংশ লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে জমানো থাকে না, যা একদিন ভেঙে আপনাকে ফেরত দেওয়া যায়, অর্থকে বিনিয়োগ করা হয় নানা খাতে। সেই অর্থের ফিরে আসা প্রয়োজন, এমনকি বেড়ে ওঠা প্রয়োজন, তবেই আপনি কর্মজীবন থেকে অবসর নেবার বা অসুস্থ হবার পরেও আপনার ভরণপোষণ হতে পারবে এবং সমাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে যোগান বজায় রাখা সম্ভব হবে। এর মধ্যে একটা ধরে নেওয়া আছে, যেটা এমনই স্বতঃসিদ্ধ যে তা নিয়ে কেউ আলাদা করে ভাবে না। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আজকের শিশুরা বড় হয়ে সেদিন হাল ধরবে, কাজ করবে। খুব সাদা এবং মোটা দাগের ভাষায় বললে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়, আমরা আশায় আছি যে এই শিশুরা যখন বড় হবে তখন তাদের হাত তাদের পেটের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে, তারা যতটা খাবে, তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করবে এবং সেই উদ্বৃত্ত খেয়ে আমরা বেঁচে থাকব। সচেতনভাবে এই ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়ালে এই বোধ জন্মাবে যে তাদের হাতকে পেটের চেয়ে শক্তিশালী করে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই।

এই পর্যায়ে এসে আরেকটা ব্যাপার বুঝে নেওয়া প্রয়োজন, সেটা হল পপুলেশন ডায়নামিক্স, যা বিভিন্ন দেশে আলাদা (বস্তুত বিবর্তনের আলাদা পর্যায়ে রয়েছে) এবং যার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশে পরবর্তী প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে থাকার ধরনও ভিন্ন। একদম প্রাথমিক পর্যায়ে একটি অনুন্নত দেশ পুষ্টি ও স্বাস্থ্য-ব্যবস্থায় এমন একটি অবস্থায় থাকে যেখানে প্রচুর শিশু জন্মাতে থাকে এবং প্রচুর মানুষের মৃত্যু হতে থাকে (প্রায়শ অপরিণত বয়সে)। এভাবে জন্ম এবং মৃত্যুর হারে একপ্রকার সাম্য বজায় থাকে এবং দেশটির জনসংখ্যা প্রায় স্থির থাকে অথবা ধীরে ধীরে বাড়ে। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থার লক্ষণীয় উন্নয়ন ছাড়াও চাহিদার সঙ্গে যোগানের সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হয়। একে সাধারণত শিল্পায়ন পূর্ববর্তী অবস্থা বলে চিহ্নিত করা হয়। এরকম দেশে মানুষের গড় আয়ু হয় কম এবং বৃদ্ধের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় তাঁদের মোটামুটি সম্মান দিয়ে রাখাও সমাজের পক্ষে সহজ হয়, যদি না অনুন্নত ব্যবস্থাটি কোনও দুর্ভিক্ষ বা মহামারীর কবলে পরে। এরকম অর্থব্যবস্থায় শিশুমৃত্যুর হার বেশ বেশি। প্রাক-স্বাধীনতা যুগের ভারতবর্ষ নিয়ে রচিত সাহিত্য পাঠ করলেই এই পরিস্থিতির ছবি দেখতে পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে খাদ্যের যোগানবৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যব্যস্থার উন্নতির ফলে মৃত্যুহার কমতে থাকে, যার মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার কমা এক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সূচক হিসেবে চিহ্নিত। এর ফলে গড় আয়ু ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই পর্যায়ে দেশটির জনগোষ্ঠী পূর্ববৎ বহুপ্রজ থাকে, অর্থাৎ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে না। পরিণতি জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যা কালক্রমে জনবিস্ফোরণ হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বৃদ্ধের সংখ্যা বাড়ে বটে, কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত বাড়ে বেঁচে যাওয়া শিশুর সংখ্যা এবং ক্রমশ (তারা আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকার পর) তরুণ ও যুবকের সংখ্যা।

তৃতীয় পর্যায়ে শিক্ষার প্রসার ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মৃত্যুর হার আরও কমে, কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হবার ফলে জন্মহারও অনেকটা কমে আসে। ফলে গড় আয়ু বাড়ে, কিন্তু জনসংখ্যা তেমন বাড়ে না, অর্থাৎ কম জন্ম এবং কম মৃত্যু নিয়ে দেশটির জনগঠন এক নতুন সাম্যাবস্থায় পৌঁছয়।

কিছু উন্নত দেশে একটি চতুর্থ পর্যায় লক্ষ করা যায়। বেশি বয়স অব্দি উচ্চশিক্ষা লাভের অতি-প্রসার, কর্মক্ষেত্রে খুব বেশি মানুষের যোগদান ও ব্যস্ততা, মাতৃত্বকালীন ছুটির অভাব বা মাতৃত্বের কারণে কেরিয়ারের সিঁড়িতে পিছিয়ে পড়ার ভয়, উন্নত ভোগবিলাসের প্রাচুর্য এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্রপ্রীতি প্রায় আত্মকেন্দ্রিকতায় পর্যবসিত হবার ফলে জন্মহার এত কমতে থাকে, যে অনেকটা কমে যাওয়া মৃত্যুহার সত্ত্বেও দেশটির জনসংখ্যা কমতে আরম্ভ করে। সেসব দেশে তখন আজকের শিশু তথা ভবিষ্যতের যুবক-যুবতীর সংখ্যা কমে গিয়ে প্রৌঢ় ও বৃদ্ধের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে তৈরি হয় এক মাথাভারী জনসমষ্টি, যাকে সামলানোর মতো পায়ের জোর ভবিষ্যতে দেশটির থাকবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। সেসব দেশের সরকার তখন হাঁটে চিন বা ভারতের বিপরীত পথে। “হাম দো, হামারে পাঁচ” স্লোগান তুলে সন্তান ধারণে উৎসাহ দিতে আরম্ভ করে, গর্ভ ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাড়াতে তৎপর হয় (নারীবাদী কারণে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপে) অথবা ভীনদেশি তরুণদের নাগরিকত্ব বা কাজের সুযোগ দিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হয়।

ভারত এই মুহূর্তে দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে।  বেশ কিছু উন্নত দেশ তৃতীয় পর্যায়ে। সুইডেন বা জার্মানির মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অগ্রণী দেশগুলি চতুর্থ পর্যায়ের সংকটের মোকাবিলা করতে চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দেশের বাস্তবতা এবং প্রয়োজন আলাদা, তাই তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রকল্পগুলিও আলাদা হবে অবশ্যই। বিচার্য হল, সেই দেশের প্রশাসন তথা রাজনৈতিক মহল দেশটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সচেতন কিনা, দেশের জনগঠনগত সুবিধাগুলোকে কাজে লাগাতে তথা দুর্বলতাগুলোর মোকাবিলা করতে আদৌ চেষ্টা করছে কিনা এবং করলে সেই চেষ্টার পদ্ধতি সঠিক কিনা। এই কাজ সঠিকভাবে করতে গেলে দেশের বর্তমানকে ভালোমতো বুঝে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কিছু বিজ্ঞানসম্মত আন্দাজ করে নিতে হয় এবং তার ভিত্তিতে পরিকল্পনা ও যোজনা। বলা বাহুল্য, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আবর্তিত হবে অনেকাংশে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে, তাদের স্বাস্থ্য-শিক্ষা-জীবিকা ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে, কারণ শিশু-কিশোরদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং উপযুক্ত শিক্ষালাভের ওপরেই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ।

ভারতের মতো দেশগুলিতে পপুলেশন ডায়নামিক্সের দ্বিতীয় পর্যায়ে অবস্থানে ফলে জনবিস্ফোরণ এবং দ্রুত বর্ধমান চাহিদা যেমন এক সমস্যা, তেমনি কিছু সুবিধাও আছে। বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার একটা তাৎক্ষণিক সুবিধা বটে, তাকে কাজে লাগিয়ে কিছু কর্মসংস্থান বা বাণিজ্য বৃদ্ধি করে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখা যায়, কিন্তু এই সুবিধাটি চরিত্রগতভাবে স্থবির, উৎপাদনের চেয়ে বেশি করে ভোগের উপর নির্ভরশীল, বহু শ্যেন ও শকুনপক্ষীর লোভাতুর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক সুস্থিতির ভিত্তি হিসেবে কতটা ভরসাযোগ্য, তা বলা কঠিন। বরং যে সুবিধাটি নিকট ভবিষ্যতে ভারতের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারত বা পারে, তা হল এক বিপুল যুবশক্তি। এই শক্তির ভরসাতেই ভারত ভবিষ্যতের সুপারপাওয়ার হবার গল্পে মশগুল। কিন্তু ফিশন-ফিউশন রিয়্যাকশন ছেনে সূর্য নির্মিত হবে না অ্যাটম বোমা, তা নির্ভর করছে কাদার তালটি নিয়ে ক্রীড়ারত বিরাট শিশুটি আত্মায় ঈশ্বর না শয়তান, তার ওপর। আগামী দিনের যুবশক্তি (অর্থাৎ আজকের শিশু-কিশোর) দেশের অর্থনীতির পোক্ত মেরুদণ্ড হয়ে উঠতে পারে সুস্বাস্থ্য ও সুশিক্ষার অধিকারী হলে এবং কাজের সুযোগ পেলে। অন্যথায় তাদের হাত হবে দুর্বল, পেট হবে বড়, হতাশা হবে পাহাড়প্রমাণ। তখন নিজেদের ভগ্নস্বাস্থ্য ও বেকারত্বের বোঝা নিয়ে তারা বাস্তবে বৃদ্ধদের দলেই নাম লেখাবে এবং দুষ্কর্ম বা দাঙ্গাতেই তাদের যৌবনের বরাদ্দ সময়টুকু ব্যয় করতে বাধ্য হবে। বিষবৃক্ষের বীজ আজ পুঁতলে কাল তা ফলভারে আমাদের ওপর ঝুঁকে পড়বে, অমৃতফলের বীজ বপন করলে ভরে উঠবে অমৃতকলস।

একথাও খেয়াল রাখতে হবে যে শিল্পায়নের পর থেকে কাজের চরিত্র এবং শ্রমিকের সংজ্ঞা ক্রমাগত বদলেছে, যে বদলের হার অতি দ্রুত। কায়িক শ্রমের বিক্রয়মূল্য ক্রমশ কমেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অদক্ষ শ্রমের ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনার যোগান (অর্থাৎ কর্মপ্রার্থী) এত বেশি যে এই গোত্রের শ্রমিকদের শোষণ করা বা ইচ্ছেমত ছাঁটাই করা খুবই সহজ হয়ে উঠেছে। অদক্ষ শ্রমের প্রচুর যোগানের ওপর নির্ভর করে তাই একটি বলিষ্ঠ জাতীয় অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা বা দুনিয়ার বৃহৎ শক্তিগুলির মোকাবিলা করা কঠিন। কাজের চরিত্র বদলে যাবার ফলে এখন আর সাবেকি পদ্ধতিতে হাতেকলমে পারিবারিক কাজ শিখে দক্ষ শ্রমিক হয়ে উঠে জীবিকা নির্বাহ সম্ভব নয়, কিছু কুটির শিল্প এবং ছোট চাষ ছাড়া। এই ক্ষেত্রগুলিও বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসনে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে চলেছে। অতএব নতুন ঘরানার দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা এবং তাঁদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো ছাড়া গতি নেই, যে জায়গায় পশ্চিমা দেশগুলি বেশ কয়েক কদম এগিয়ে আছে। কিছু উন্নত দেশের সমস্যা যেখানে যুবক হাতের সংখ্যা, ভারতের সমস্যা সেখানে হাতগুলির দক্ষতা বা প্রশিক্ষণের অভাব। এদেশের অজস্র শিশু আজও এই দক্ষতা অর্জনের দৌড় শুরু করার জায়গাটায় পৌঁছনোর প্রাথমিক সুযোগটুকুও পায় না। কিছু সংখ্যক দক্ষ মস্তিষ্ক ও হাত যদি বা তৈরি হয়, তারা অন্যের ধানের গোলা বাঁধার কাজে নিযুক্ত হয় উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সুযোগের অভাবে। সুতরাং আজকের শিশুদের আগামী দিনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে চাই উপযুক্ত শিক্ষার (ও পুষ্টির) বন্দোবস্ত, যার জন্য প্রয়োজন সময়ের গতি এবং ভবিষ্যতের দাবি অনুযায়ী সঠিক পরিকল্পনা, যথেষ্ট বিনিয়োগ এবং পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এই সবকিছু করার জন্য মেধা বা বিচক্ষণতারও আগে প্রয়োজন আরেকটি বিরল গুণ, “সদিচ্ছা”। সমস্যা হল, কোনও দেশের ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলগুলির সব রাজনীতিবিদই যদি আগামী মাসের স্থানীয় বা জাতীয় স্তরের নির্বাচনে কোনওমতে কিছু আসন দখল করা, অর্থের বিনিময়ে আরও কিছু আসন ক্রয় করে সরকার বানিয়ে ফেলা আর পরবর্তী কয়েক বছরে আদরের নেপোকে যতটুকু সম্ভব দই খাইয়ে মোটা বানানো আর তার প্রসাদ পেয়ে তৃপ্ত থাকার বাসনাময় পঙ্কিল আবর্তে ঘোঁতঘোঁত নাদ করাকেই রাজনীতি বলে ভাবে, তবে সেই দেশ বা সমাজের অচিকিৎস্য মায়োপিক চোখ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেল, দীর্ঘমেয়াদি গঠনমূলক পরিকল্পনা তো বহুদূরের রূপকথা।

“উপযুক্ত শিক্ষার বন্দোবস্ত” লিখতে তার মধ্যে “পুষ্টি” শব্দটিকে জুড়ে দিতে বাধ্য হলাম। হয়ত এ আমার চিকিৎসকসুলভ ব্যামো, কিন্তু এই জুড়ে দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত যখন আমরা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছি। স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে বাদ দিয়ে পরিকল্পনা শুরু করলে তা হবে ভিত প্রস্তুত না করেই ইমারত গড়ার মতো। শৈশবে, বিশেষত জীবনের প্রথম সহস্র দিবসে পুষ্টির ঘাটতি দেহ ও মস্তিষ্কের বিকাশের পথ মেরামতির অযোগ্যভাবে কণ্টকিত করতে পারে, একথা বহু গবেষণায় প্রমাণিত। পরবর্তীকালে অর্থাৎ স্কুল স্তরেও শিশুদের পুষ্টির যোগান অব্যাহত রাখা জরুরি। দরিদ্র দেশে মধ্যাহ্নকালীন আহার শুধু পুষ্টিবৃদ্ধিই করে না, পড়ুয়াদের স্কুলের প্রতি আকৃষ্টও করে। আবার পুষ্টির ঘাটতি বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরকম, তার মোকাবিলা করার পদ্ধতিও তাই বিভিন্নরকম এবং পদ্ধতিগুলো সুফলের সাথে কুফলও দিতে পারে। যেমন, ক্যালরির ঘাটতি মেটানোর জন্য শর্করা জাতীয় খাদ্য সরবরাহ বাড়ালে বা তার দাম সস্তা করলে নিম্নবিত্ত মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অধিক ক্যালরিযুক্ত শর্করা ও ফ্যাট জাতীয় খাবার বেশি খায়, সবজি-ফল-আমিষ কম খায়, ফলে সেই সামাজিক স্তরের শিশুরা প্রোটিন ও ভিটামিনের ঘাটতিতে ভোগে, যা ক্যালরি ঘাটতির মতো চট করে বোঝা যায় না। যেসব দেশে ক্যালরির নিরিখে পৌষ্টিক ঘাটতি তেমন নয়, সেসব দেশে এই সমস্যা মেটানোর জন্য শর্করা ও ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের ওপর বাড়তি কর বসানোর চেষ্টা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, সার্বিকভাবে খাদ্যাভ্যাস উন্নত হয় বটে কিন্তু পুষ্টির ক্ষেত্রে সামাজিক অসাম্য (অর্থাৎ উচ্চ ও নিম্নবিত্তের পুষ্টির তফাৎ) বেড়ে যায়। আমাদের দেশে এমনিতেই এই অসাম্য বিপুল এবং ক্যালরির ঘাটতিও যথেষ্ট, সুতরাং দু’টাকা কিলো চাল সরবরাহের যৌক্তিকতা আছেই। তবে বৈজ্ঞানিক নথি থেকে শিক্ষা নিয়ে আর্থিকভাবে দুর্বলতর শ্রেণির শিশুদের খাদ্যকে সুষম করে তোলার চেষ্টাও রাখতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন রাজনীতি-অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়।

তেমনিভাবে শিশুদের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জন্যও সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা শুরু হয় গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টি ও পরিচর্যা থেকে, তারপর স্বাস্থ্যসম্মত প্রসব, জন্মপরবর্তী পরিচর্যা ও চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা, টিকাকরণ, ইত্যাদি বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এগোতে থাকে সুস্থ শৈশব, তথা সবল জীবনের দিকে।

এইসব ক্ষেত্রে একেবারেই কিছু কাজ হয়নি ভাবলে ভুল হবে। পুষ্টি বা শিশু বিকাশের কথাই ধরা যাক। ১৯৭০ সালে ভারত সরকারের সমাজকল্যাণ দপ্তর চালু করে “Balwadi Nutrition Programme”, যা গ্রামীণ এলাকায় বালওয়াড়ি প্রিস্কুলগুলির মাধ্যমে ৩ থেক ৬ বছর বয়সী শিশুদের ৩০০ কিলোক্যালরি ও ১০ গ্রাম প্রোটিনযুক্ত খাদ্যের যোগান দিতে শুরু করে। সমসময়ে শিক্ষাবিদ ও শিশুবিকাশ গবেষিকা মিনা স্বামীনাথন জাতীয় শিক্ষা পরামর্শদাতা বোর্ডের কাছে একটি রিপোর্ট পেশ করেন, যার ভিত্তিতে ১৯৭৫ সালের ২রা অক্টোবর জাতির জনকের জন্মদিনে শুরু হয় ICDS প্রকল্প (Integrated Child Development Scheme), যা ১৯৭৮-এ বন্ধ হয়ে যায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই-এর হাতে এবং দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ফের চালু হয়। অপুষ্টির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি মেয়েদের কাছে পুরুষ শিশুদের সমান পুষ্টি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, স্কুল পূর্ববর্তী শিক্ষা, ইত্যাদি পৌঁছে দিয়ে প্রকল্পটি হয়ে ওঠে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। দুঃখের বিষয়, প্রকল্পটি নিজেই প্রায়শ অপুষ্টিতে ভুগেছে এবং যে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের উপর ভর করে এর যাত্রা, তাঁরা নিজেরাই হয়েছেন নানাভাবে প্রবঞ্চিত। অতিরিক্ত কর্মভারাবনত এবং অখুশি কর্মীদের মাধ্যমে কতখানি শুভলাভ সম্ভব, তা অনুমেয়।

১৯৯৫ সালে চালু হয় ভারত সরকারের বহুনন্দিত “Mid Day Meal” প্রকল্প, যা ২০১৩ সালে “জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন”-এর রক্ষাকবচ পেয়েছে। প্রাথমিক ও উচ্চতর প্রাথমিক শ্রেণিগুলিতে ছাত্রীছাত্রদের ধরে রাখা এবং তাদের পুষ্টির যোগান দিতে প্রকল্পটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য, কিন্তু এর প্রয়োগ পদ্ধতির ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা গেছে এবং শুরু থেকেই প্রকল্পটি বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির শিকার। বলে রাখা ভালো, স্কুলে মধ্যাহ্ন আহার বিতরণের ধারণাটি নতুন নয়। ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগেই মাদ্রাজের স্কুলে এধরনের প্রকল্প চালু হয়, স্বাধীনতার পর কেরালা ও গুজরাত ১৯৮৪ সালে এবং আরও কিছু রাজ্য পরবর্তী সময়ে এই চেষ্টা করেছে। অন্য অনেক দেশেও এরকম ব্যবস্থা আছে।

শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে “সর্বশিক্ষা অভিযান” এবং একটু বড় ছেলেমেয়েদের শিক্ষায় “রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অভিযান” গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত বা পারে। প্রাথমিক শিক্ষার বহুল প্রসারের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯৩-৯৪ সাল থেকে শুরু হয় “District Primary Education Program” (DPEP), যার ৮৫% খরচ বহন করতেন কেন্দ্রীয় সরকার (যে অর্থের অনেকটাই তাঁরা বিশ্বব্যাঙ্ক আর ইউনিসেফ থেকে পেতেন) আর ১৫% বহন করতেন সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার। পরবর্তীকালে সর্বশিক্ষা অভিযান হাঁটি-হাঁটি পা-পা শুরু করে ২০০০-২০০১ সাল নাগাদ এবং ২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বে জোরদার হয়ে ওঠে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সব শিশুর কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই প্রকল্পের ঘোষিত উদ্দেশ্য।

এই স্বপ্ন আইনি রক্ষাকবচ লাভ করে যখন ২০১০ সালের পয়লা এপ্রিল তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনোহন সিংহ ঘোষণা করেন “শিক্ষার অধিকার আইন” বলে এখন থেকে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়স অব্দি আর্থসামাজিক স্তর, লিঙ্গ, ইত্যাদির বেড়া ডিঙিয়ে সকলের জন্য শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক এবং বিনামূল্যে। শিক্ষাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে ভারত সেদিন ১৩৫টি সমমনস্ক দেশের তালিকায় নাম লেখাল। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ আইনটি প্রণয়নের আগে অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি এবং আইনের লিখনে ছিল তাড়াহুড়োর ছাপ, যার ফলে এর কার্যকারিতা নিয়ে থেকে গেল সংশয়। শিক্ষাবিদ অনিল সদগোপাল চাঁছাছোলা ভাষায় বলেই ফেললেন, “It’s a fraud on our children. It gives neither free education, nor compulsory education. In fact, it only legitimizes the present multi-layered, inferior quality school education system, where discrimination shall continue to prevail.” এই বক্তব্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভারতের শিশুশিক্ষার বাস্তবতা নিয়ে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের হতাশাও, যা চিনিয়ে দেয় এই বিষয়ে দল নির্বিশেষে সব সরকারের সদিচ্ছার অভাবকে। তার ফলে বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতির ঢক্কানিনাদ শুনতে শুনতে গুরুচরণ দাস লক্ষ করেন, শহরাঞ্চলের ৫৪% ছেলেমেয়ে প্রাইভেট স্কুলে যায় এবং এই সংখ্যা প্রতিবছর প্রায় ৩% হারে বাড়ছে।

সরকারি সদিচ্ছার একটা পরিমাপ হতে পারে বাজেট বরাদ্দ। ২০১৮-১৯-এর ইউনিয়ন বাজেটে শিক্ষাক্ষেত্রে মোট বরাদ্দ ৮৫,০১০ কোটি টাকা। (বাঙালি পাঠকদের কথা ভেবে রুপিয়া না লিখে টাকা লিখছি ভারতীয় মুদ্রা বোঝাতে, যা বাংলাদেশি টাকার থেকে আলাদা।) এর মধ্যে স্কুল শিক্ষায় বরাদ্দ ৫০,০০০ কোটি, যা থেক সর্বশিক্ষা অভিযান পাবে ২৬,১২৮ কোটি (আগের বছরের থেকে ২,৬০০ কোটি বেশি) এবং রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অভিযান পাবে ৪,২১৩ কোটি (আগের থেকে প্রায় ৩০০ কোটি বেশি)। মিড ডে মিল প্রকল্প বাবদ বরাদ্দ ৫০০ কোটি বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০,৫০০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় এবং জওহর নবোদয় বিদ্যালয়গুলির বরাদ্দ কমলেও অরুণ জেটলি ঘোষণা করেছেন আদিবাসী শিশুদের জন্য একলব্য বিদ্যালয়ের কথা, যা উদ্যোগ হিসেবে সাধু কিন্তু বরাদ্দের অভাবে কৌপীনধারী।

এবার এই ব্যয়বরাদ্দকে কিছু সত্যের আলোকে ভালো করে দেখা যাক। শিক্ষাক্ষেত্রে ২০১৭-১৮ সালের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ ছিল ৮১,৮৬৮ কোটি টাকা। তা থেকে এই বছর বরাদ্দ বেড়েছে ৩.৮৪% মাত্র, যেখানে সরকারের আয় বেড়েছে ১৪.৬৩% (১৫.০৫ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭.২৫ লক্ষ কোটি)। উপরন্তু আগের বছরের ৩% শিক্ষা সেস এবছর বেড়ে হয়েছে ৪%, যা থেকে প্রায় প্রায় ২,৭৫০ কোটি টাকা বাড়তি আদায় হবে। মোট ৩,১৪১ কোটি থেকে এই ২,৭৫০ কোটি বাদ দিলে দেখা যাবে, ইতোমধ্যে ১৪.৬৩% বাড়তি রেভিনিউ পাওয়া সত্ত্বেও সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়িয়েছে মাত্র ০.৪৬%! অর্থাৎ সরকারের চোখে শিক্ষার গুরুত্ব অন্যান্য ক্ষেত্রগুলির তুলনায় ত্রিশ ভাগের একভাগ মাত্র। এই মানসিকতা নিয়ে আজকের শিশুদের আগামীদিনের প্রশিক্ষিত যুবশক্তিতে পরিণত করা যাবে না, তা না বোঝার মতো মূর্খ সরকারী মন্ত্রী-আমলারা নন। সরকার স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে ভারতের উচিত জাতীয় আয় (GDP)-র অন্তত ৬% শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় করা, অথচ সেই খাতে ব্যয়বরাদ্দ ২০১৭-১৮ সালে ছিল জাতীয় আয়ের ৩.৬৯%, এবছর আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৪৮% মাত্র। এর পরেও আমরা শুনতে থাকব অদূর ভবিষ্যতে “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড”-এর ফসল ঘরে তোলার কথা এবং হাততালি দেব।

শিশুদের জন্য বরাদ্দের খতিয়ান দেখলে পাওয়া যায় একইরকম করুণ চিত্র। ২০১৮-১৯-এর বাজেটে নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রকের হাতে দেওয়া হচ্ছে ২০,৫৫৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫% বেশি, কিন্তু শিশুকল্যাণের জন্য বরাদ্দ অংশ মোট বরাদ্দের ৩.৩২% থেকে কমে হয়ে গেছে ৩.২৪%, যেখানে ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪২% হল ১৮ বছরের কম বয়সীরা। এবারই প্রথম নয়, একটি হিসেব দেখাচ্ছে ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে শিশুকল্যাণের বরাদ্দ অংশ হ্রাস হয়েছিল ১৯.৪৭% মতো।

২০১৮-১৯-এর বাজেটে শিশু-স্বাস্থ্য বাবদ বরাদ্দ ০.০১% বৃদ্ধি পেয়েছে। খুবই আনন্দের খবর, কিন্তু বৃদ্ধির পর তার কলেবরটা কেমন দাঁড়িয়েছে দেখা যাক। মোট বাজেটের ০.১৩% নিয়োজিত হচ্ছে শিশুদের স্বাস্থ্য খাতে, অর্থাৎ আপনার হাম দো হামারে দো পরিবারে প্রতি একশ টাকা ব্যয়ের মধ্যে মাত্র তেরো পয়সা আপনি আপনার দুটি সন্তানের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য ব্যয় করতে রাজি। এটুকু শুনলেই স্পষ্ট হবে পিতা বা মাতা হিসেবে আপনি কতটা দায়িত্বশীল। আপনার পরিবারে যা অকল্পনীয়, দেশ নামক বৃহৎ পরিবারে সেটাই বাস্তব।

সামগ্রিকভাবে শিশুদের নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশুরা দুর্বল এবং নানারকম বঞ্চনা ও নির্যাতনের (শারীরিক/ মানসিক/ যৌন) শিকার হয় সহজেই, শ্রমিক হিসবে শোষিত হয়, পাচার হয়ে যায় যৌনসামগ্রী বা দাস হিসেবে। ভারতীয় সংবিধান শিশুদের এইসব বিপদের সম্ভাবনা স্বীকার করে সংবিধানের ১৫ নম্বর ধারায় শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ মনোযোগ দেবার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে এবং তার জন্য বিশেষ আইন ও নীতি প্রণয়নের সংস্থান রেখেছে। এই লক্ষ্যে শিশুশ্রম নিরোধী আইন বা POCSO-র মতো আইন যেমন হয়েছে, তেমনি Program  for Juvenile Justice, Integrated Program for Street Children, Childline service, Shishu Greha, CARA (Central Adoption Resource Agency), Scheme for Working Children in Need of Care and Protection, Rajiv Gandhi National Crèche Scheme for Working Mothers (যার নাম বদলে National Crèche Scheme করা হচ্ছে), Pilot Project to Combat the Trafficking of Women and Children for Commercial Sexual Exploitation, National Child Labour Project (NCLP), ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকল্প চালু হয়েছিল। এইসব ব্যবস্থাগুলিকে এক ছাতার তলায় এনে Integrated Child Protection Scheme (ICPS) চালু করা হয়, যার নাম বদলে “Child Protection Services” করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা “Umbrella Integrated Child Development Services” Scheme-এর ছত্রছায়ায় কাজ করবে। নতুন এবং গালভরা নামকরণ এবং প্রকল্পের অদলবদলের মাধ্যমে দেখনদারি সুন্দরভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে, কিন্তু সদিচ্ছার অভাবে সেই সুদৃশ্য ছাতাটির অজস্র ফুটো দিয়ে বৃষ্টি ঝরে পড়ছে আমাদের শিশুদের মাথায়। শিশুদের নিরাপত্তার খাতে বরাদ্দ ২০০৫-০৬ সালে ছিল মোট বাজেটের ০.০৩৪%, ২০১৮-১৫ সালে ছিল ০.০৪%, ২০১৮-১৯এ হয়েছে ০.০৫%-এর সামান্য বেশি। NCPCR (The National Commission for Protection of Child Rights)-এর বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে ক্রেশ ব্যবস্থা কর্মরতা মায়েদের শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই মহিলাদের আর্থিক স্বাবলম্বনের পথে এগোনোর লড়াইতেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত (অর্থাৎ যুগপৎ নারী ও শিশুর বিকাশে সহায়ক হত), সেই ক্রেশ প্রকল্পের বাজেট বরাদ্দ প্রায় ২৭.৫৪% কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এমনভাবে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই এই সুবিধে দেওয়া হচ্ছে যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের নিম্নবিত্ত মহিলা শ্রমিকেরা (ও তাঁদের শিশুরা) এই সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২০১৬ সালে শিশুশ্রম নিরোধী আইনে পরিবর্তন এনে শিশুদের পক্ষে অনুপযুক্ত কাজের তালিকাটি ছোট করে ফেলা হল এবং পারিবারিক ব্যবসা, চাষ-আবাদ বা বিনোদনের নামে শিশুশ্রমকে বৈধতা দেওয়া হল। এরপর তো আশ্চর্য হবার কোনও অবকাশই থাকে না, যখন দেখি NCLP-র বাজেট বরাদ্দ ২৫% কমে গেছে আর Scheme for Welfare of Working Children in Need of Care and Protection-এর বরাদ্দ প্রায় ৯৯.৫% কমে একপ্রকার নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।

উদাহরণ ধরে ধরে আলোচনা করতে থাকলে প্রবন্ধ এবং হতাশার শ্বাস দীর্ঘতর হতে থাকবে। সামগ্রিক চিত্রটি বোঝার জন্য সম্ভবত এটুকুই যথেষ্ট। প্রশ্ন হল, কেন এমন হয়? যে শিক্ষিত সচেতন বাবা-মায়েরা নিজেদের সন্তানের সঙ্গে কখনও এরকম অন্যায় করবেন না, তাঁরাই উচ্চপদে আসীন হয়ে দেশের সন্তানদের প্রতি এমন বিমাতৃসুলভ বা বিপিতৃসুলভ আচরণ করেন কেন? এর কারণ, মনের সংকীর্ণতা এবং দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা। প্রথমত অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে আমরা পড়শির মেয়েটিকে খেতে দেবার মাধুর্যটুকুও ভুলে গেছি, ফলে দেশের অভিভাবকেরা দেশের শিশুদের সন্তান ভাবতেই শেখেননি। এই শিশুদের ভালো চাওয়ার প্রতিবর্ত প্রেরণা তাই তাঁদের নেই। দেশের তথা নিজেদের ভবিষ্যতের সংকটের কথা ভেবে হয়ত কিছু সদর্থক পদক্ষেপ নিতে পারতেন নেতাবাবুরা, কিন্তু চালসে পড়া চোখে আগামী মাসের বা খুব জোর আগামী বছরের নির্বাচনী বৈতরণীটির ওপারে আর কিছুই তাঁরা দেখতে পান না, আর সেই নদী পেরোনোর জন্য বিভাজন, কুৎসা আর হাঙ্গামার রাজনীতিতেই তাঁদের যাবতীয় আস্থা। গঠনমূলক কাজে পরিশ্রম অনেক এবং তার ফল ফলতে সময় লাগে। আজকের শিশুটি তো ২০১৯-এ ভোট দেবে না, তাই তাকে নিয়ে এখনই অত ভাবার কিছু নেই। কবে সে বড় হবে, ভোটার হবে, তখন নাহয় জাতি-ধর্ম-ভাষা-গাত্রবর্ণ-লিঙ্গ বা অন্য কোনও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোনও এক সুবিধাজনক অপর নির্মাণ করে তার অপুষ্ট এবং অগোছালো মস্তিষ্কে বুনে দেওয়া যাবে কোনও একধরনের ঘৃণা আর হিংসার বীজ, আর সেই ঘৃণা-ক্রোধের চাবুক খেয়ে সেই অপরিতৃপ্ত তরুণ হয়ে উঠবে মত্ত ভোটার। ব্যস! কেল্লা ফতে।

আশ্চর্য লাগে একথা ভেবে যে আজকের এই বঞ্চিত শিশুদের বাবা-মায়েরা তো বর্তমান ভোটার। তাঁরাই নির্বাচক। পথে বা ব্যালটে, কোথাও তাঁরা প্রতিবাদে নেই কেন? তবে কি শুধু সরকার বা নেতারা নন, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব থেকে চ্যুত হয়েছেন প্রায় সব বাবা-মায়েরাই? তবে কি আমাদের শিশুরা প্রকৃতই অনাথ?

আত্মস্বার্থসর্বস্ব সময়ের মানুষ, সমাজ আর প্রশাসনের কাছে একটাই অনুরোধ… প্রকৃত স্বার্থপর হয়ে উঠুন, বুদ্ধিমানের মতো স্বার্থপর হোন। আজকের দিনটা পেরিয়ে আরও কদিন বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করুন, “ভবিষ্যৎ” শব্দটা অভিধান থেকে খুঁজে নিয়ে দেওয়ালে টাঙিয়ে রোজ তার দিকে দু’মিনিট তাকানো অভ্যাস করুন। শিশুদের সুস্থতা ও বিকাশের মধ্যে নিজের স্বার্থকে খুঁজে পেতে শিখুন, নইলে আর বেশিদিন বাকি নেই পায়রা ওড়ানো জীবনে।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

5 Comments

  1. Integrated Child Development Scheme (ICDS). “Services” was not there in the original Scheme launched in 1975. It was an inadvertent error from my side.

  2. এরকম নিম্নমানের লেখা আর পড়েছি বলে মনে পড়ে না। মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা গেল না। তথ্যপ্রমাণ ছাড়া একগাদা মনগড়া কথা। দীর্ঘ লেখায় স্রেফ “ঘোঁতঘোঁত নাদ” করে গেলেন লেখক। লিখনশৈলী ততোধিক বিরক্তিকর। অন্য লেখাগুলির তুলনায় এত বাজে যে ভেবে অবাক হচ্ছি চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম কেন এই ব্যক্তিটিকে বারবার সুযোগ দিচ্ছে এত ধ্যাড়ানোর পরেও?

  3. চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ঠিক এমনটি যে মনে করছে না, অনসূয়া! দুর্ভাগ্য… 🙁

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*