তুমি দলিত বাচ্চা, তোমার মিড-ডে মিল নেই

ধ্রুবজ্যোতি মুখার্জি

 

এই মুহূর্তে চালু থাকা জাতীয় স্তরের প্রকল্পগুলির মধ্যে প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি পড়ুয়াদের জন্য মিড-ডে মিল স্কিম অন্যতম। সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের (যাদের একটা বড় অংশ আসে দিন আনে দিন খায় পরিবার থেকে) পুষ্টির প্রয়োজন যথাসম্ভব মেটানোর পাশাপাশি এই প্রকল্পের থেকে আরও কয়েকটা উপকারিতা আশা করা যায়। যেমন, আদিবাসী ও দলিত বাচ্চারা (বিশেষ করে মেয়েরা) মিড-ডে মিলের টানে স্কুলে আসবে, এবং নিয়মিত আসবে; পাশাপাশি বসে খেতে খেতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বেড়াগুলোর উচ্চতা কমবে আর হৃদ্যতা বাড়বে, ইত্যাদি। অস্বীকার করা যায় না মিড-ডে মিল ব্যবস্থা গত কয়েক দশকে স্কুলছুট পড়ুয়ার সংখ্যা বেশ খানিকটা কমিয়েছে। আর্থসামাজিকভাবে দুর্বল শ্রেণির শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজনও খানিকটা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু যতটুকু উপকার এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে তার থেকে অনেক বেশি পাওয়া যেত যদি ভারতবর্ষের নাড়িতে জড়িয়ে থাকা বর্ণবাদী বৈষম্য বাধা হয়ে না দাঁড়াত।

গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স অনুযায়ী আমাদের দেশের ২১% শিশুর ওজন বয়স ও উচ্চতার তুলনায় কম। শুধু কম না, যুদ্ধবিক্ষত সুদান ছাড়া আর সব দেশের থেকে কম! পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি পাঁচ জন ভারতীয় শিশুর মধ্যে একজন পুষ্টির দিক থেকে ‘ওয়েস্টেড’— ক্রমাগত অপুষ্টিতে ভুগে উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন অত্যন্ত কম। এটা ২০১৮-র হিসেব— ২০১৩ থেকে ২০১৭ অবধি সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে। এই সূচক অনুযায়ী একশো উনিশটি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান একশো তিন নম্বরে। তথ্যগুলি থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ভারতীয় শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি একটি ব্যাপক সমস্যা। ২০১৫-১৬-র ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র তথ্য অনুযায়ী ভারতের অন্তত ৩৯% শিশু ক্রমিক অপুষ্টির শিকার। আর প্রধান শিকার হল গরীব এবং সমাজের সহায়-সুযোগহীন অংশের মানুষ। এদের কথা মাথায় রেখেই আজকের মিড-ডে মিল প্রকল্পের সূত্রপাত এবং সেটিকে ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৩-র আওতায় নিয়ে আসা। সেইসময় ভাবা গিয়েছিল যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত শিশু একইসাথে বসে একই রাঁধুনির বানানো একই খাবার খেতে থাকলে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগবে এবং আস্তে আস্তে বর্ণভেদ প্রথার সৃষ্টি করা দেওয়াল ভেঙে পড়বে।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমাদের দেশে আদর্শ আর বাস্তবের মাঝে চিরকালই অনেকটা ফাঁক থেকে যায়। ক’দিন আগে হিমাচল প্রদেশের কুলু জেলায় এক স্কুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘পরীক্ষা পর চর্চা’ শীর্ষক ভাষণ সম্প্রচারকালীন স্কুল কর্তৃপক্ষ দলিত ছাত্রদের উচ্চবর্ণের সহপাঠীদের থেকে আলাদা বসিয়েছিল। কিছু ছাত্র পরে জেলাশাসককে চিঠি লিখে জানায় যে এইভাবে বর্ণের ভিত্তিতে ছাত্রদের আলাদা করা ঐ স্কুলে নতুন নয়, এবং মিড-ডে মিল পরিবেশনের সময় রোজই তা হয়ে থাকে। স্কুলের প্রিন্সিপাল এবং কুক দুজনেই উচ্চবর্ণের হওয়াটাই এর কারণ, দাবি করে তারা।

এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় কিন্তু। ভারতের নানা প্রান্ত থেকে পাওয়া খবর ও বিভিন্ন সমীক্ষার ফলাফল থেকে বেশ বোঝা যায় যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা বর্ণবৈষম্য মিড-ডে মিল ব্যবস্থাকে দুমড়ে-মুচড়ে নিজের মতো করে নিতে চাইছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ দলিত স্টাডিজ (IIDS) ২০১৪-তে উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড় এবং মধ্যপ্রদেশ জুড়ে এক সমীক্ষা চালায়। এই সমীক্ষা থেকে জানা যায় দলিত ছাত্রদের উচ্চবর্ণের ছাত্রদের তুলনায় বেশ কম খাবার দেওয়া হয় অনেক স্কুলে। প্রায় ত্রিশ শতাংশ দলিত ছাত্র এবং তাদের অভিভাবকরা অভিযোগ করে যে ঐ ছাত্রদের অল্প খাবার দেওয়া হয়, ১৪% অভিযোগ করে দলিত ছাত্রদের উচ্চবর্ণের খাবার ছুঁতেও দেওয়া হয় না। ২০% দলিত ছাত্র জানায় তারা স্কুলে যায় কখনওসখনও, এবং বৈষম্যের পরিবেশ থাকার জন্য তারা স্কুলে যেতে আগ্রহীও নয়।

এখানেই শেষ নয়। ২০১৫ সালে যোধপুরের এক সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে এক দলিত ছাত্রকে বেধড়ক মারধোর করা হয় সে উচ্চবর্ণের ছেলেদের মিড-ডে মিল খাওয়ার থালা ছুঁয়ে দিয়েছিল বলে! কিছু স্কুলে আবার দলিত শিশুদের বলা হয় বাড়ি থেকে নিজেদের থালা আনতে, কোথাও বা তাদের খাবার দেওয়া হয় বাকিদের খাওয়া হয়ে গেলে, অথবা উচ্চবর্ণের শিশুদের ট্যাপ থেকে জল খাওয়ার ব্যাপারে থাকে কড়া নিষেধ। এরকমও দৃষ্টান্ত আছে যেখানে উচ্চবর্ণের শিক্ষক বা রাঁধুনি দলিত পড়ুয়ার পাতে আলগোছে খাবার ফেলে দেন ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। ২০০৬-এ প্রকাশিত IIDS-এর একটি স্টাডি থেকে জানা যায় যে অনেক ক্ষেত্রে দলিত শিশুদের দূরে রাখার জন্য এমন পরিসরে মিড-ডে মিল খাওয়ানো হয় যেখানে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। তামিলনাড়ুতে যেমন দেখা গিয়েছিল মিড-ডে মিল খাওয়ানো হচ্ছে মন্দির চত্বরে, যেখানে কোনওদিনই দলিতদের প্রবেশাধিকার ছিল না। ২০০৮-এ রাষ্ট্রসঙ্ঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার কমিটির কাছে পেশ করা ন্যাশনাল ক্যামপেইন অন দলিত রাইটস-এর রিপোর্টেও বলা হয়েছে যে মিড-ডে মিল সাধারণত উচ্চবর্ণের অধিকারভুক্ত এলাকাতেই পরিবেশিত হয় এবং কোনও বর্ণভিত্তিক বখেড়া হলে দলিত শিশুদের জব্দ করতে তাদের মিড-ডে মিল থেকে বঞ্চিত করা হয়।

২০১৩-তে তফশিলি জাতি ও উপজাতি কল্যাণকল্পে গঠিত সংসদীয় কমিটির এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টে মিড-ডে মিল প্রকল্পে অস্পৃশ্যতার চর্চার কড়া নিন্দা করা হয়েছিল। তারপর কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়। যা জানা যায় তা কৌতূহলোদ্দীপক। টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা ওড়িশার ৭৬টি স্কুল সহ বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানের বহু স্কুল পরিদর্শন করেন। কিন্তু কোনও স্কুলেই তারা অস্পৃশ্যতা বা বৈষম্যের কোনও নিদর্শন দেখেননি! ব্যতিক্রম শুধু ওড়িশায় বওধ জেলার কিছু স্কুল। কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে টাস্ক ফোর্সের সদস্যদের অভিজ্ঞতা বাস্তব পরিস্থিতির সাথে আদৌ খাপ খায় না। সম্ভবত স্কুলগুলি আগেই খবর পেয়ে সাবধান হয়ে গিয়েছিল। কমিটির তরফ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয় যে মিড-ডে মিল ব্যবস্থায় অস্পৃশ্যতার চর্চার জন্য কঠোর শাস্তি এবং দলিত এলাকার স্কুলে স্কুলে নিয়মিত নজরদারি দলের সারপ্রাইজ ভিজিটের ব্যবস্থা করা হোক। এই প্রস্তাবগুলির বাস্তব রূপায়ণে এখনও তেমন কোনও সরকারি প্রচেষ্টা দেখা যায়নি।

গবেষক নিধি সবরওয়াল সমাজের দুর্বল শ্রেণির মানুষের ওপর বর্ণবৈষম্যের প্রভাব নিয়ে প্রচুর লেখালিখি করেছেন। তাঁর মতে অস্পৃশ্যতার সমস্যাটি সমাধান করতে শুধু আইনি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, সামাজিক প্রতিবিধানেরও দরকার। আইনি দিক থেকে ১৯৮৯-র শিডিউলড কাস্টস অ্যান্ড ট্রাইবস (প্রিভেনশন অফ অ্যাট্রোসিটিজ) অ্যাক্টের এমনভাবে সংশোধন করা প্রয়োজন যাতে মিড-ডে মিল রান্না ও পরিবেশনে বর্ণবৈষম্যের সমস্যাটা এর আওতায় আসে। “উদাহরণস্বরূপ, দলিত শিশুদের খাবার পরিবেশন থেকে সরিয়ে রাখা, দলিত রাঁধুনিদের কাজ না দেওয়া, খাবারের পরিমাণে বৈষম্য এবং দলিতদের সবার শেষে খাওয়ানো— এগুলো সংশোধিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে চিহ্নিত করা দরকার। তা হলে এইসব কাজ করার প্রবণতা কমবে। সাথে সাথে সামাজিক হস্তক্ষেপ আর শুরু থেকে বর্ণবৈষম্যবিরোধী শিক্ষা— এভাবেই বদলাবে পরিস্থিতি”, বক্তব্য নিধির।

পড়ুয়াদের সহ সমস্ত সমাজের ওপর বর্ণবৈষম্যের কুপ্রভাব সম্পর্কে শিক্ষক ও পরিবেশনকারীদের সচেতন করে তোলাও অতি জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বর্ণবৈষম্যের চর্চা হচ্ছে জেনেও স্কুল কর্তৃপক্ষ নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। কোথাও কোথাও বা তারা এ ব্যাপারে নিজেরাই সক্রিয়। বর্ণবৈষম্য সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় সর্বশিক্ষা অভিযানের স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকাটাই অতএব যথেষ্ট নয়, নিশ্চিত করতে হবে যাতে মিড-ডে মিল ব্যবস্থার সাথে যুক্ত প্রত্যেকে সেইসব নির্দেশ মেনে চলে। দলিত এলাকায় বেশি করে স্কুল খোলা এবং রাঁধুনি/পরিবেশনকারী হিসেবে দলিতদের কাজ দেওয়াও আর একটা সম্ভাব্য সমাধান।

বর্ণবাদ আর তজ্জনিত সামাজিক বৈষম্য মানবাধিকার বিরোধী। ভারতীয় সংবিধানে জাতিধর্মবর্ণলিঙ্গ নির্বিশেষে যে সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকার করা হয়েছে, বর্ণবাদ তাও অস্বীকার করে। এদিকে আমাদের দেশ আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক সাম্যমূলক চুক্তির অংশ, যার মাঝে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দি এলিমিনেশন অফ অল ফর্মস অফ রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশন (ICERD)-ও আছে। আর এই কনভেনশনের প্রথম আর্টিকলটিতেই ভারতে দলিতদের ওপর অত্যাচারের কথা বলা হয়েছে। অতএব, মিড-ডে মিল প্রকল্পের রূপায়ণে বর্ণবৈষম্য দূর করতে না পারলে ভারত সরকার যে শুধু নিজের দেশবাসীর কাছে নৈতিক অপরাধী হয়ে পড়বে তাই নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরেও দায়বদ্ধতা পূরণে ব্যর্থ হবে তারা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. দলিত শিখেরা লঙ্গরে রান্না করবার অধিকার পায় না। উপমহাদেশের কুষ্ঠরোগ এই ঘৃণা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*