টয়লেট : একটি অসমাপ্ত প্রেমকথা

অভীক ভট্টাচার্য

 

মাত্রই বছরকয়েক আগের ঘটনা। ২০১৩-র ডিসেম্বর থেকে বাহির-দিল্লির শাহবাদ ডেয়ারি বস্তি এলাকায় হঠাৎই একের পর এক কিশোরী নিখোঁজ হতে শুরু করে। প্রথমদিকে দিল্লি পুলিশ থেকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম – কেউই বিশেষ গা করেনি। খাস রাজধানী শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতেই যে হারে প্রতিদিন শিশু নিখোঁজের ঘটনা ঘটে আর সেসবের কিনারা করতে গিয়ে যে পরিমাণ হিমশিম খেতে হয় স্থানীয় প্রশাসনকে, তাতে রোহিণীর ওই জঙ্গলে ঘেরা আধা-শহর অঞ্চলে একজন-দু’জন কিশোরী নিখোঁজ হয়ে গেল কি গেল না – তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায় তাদের! কিন্তু বিষয়টা আর উপেক্ষার রইল না যখন এক সমীক্ষায় দেখা গেল, ২০১৩-র শেষ থেকে ২০১৫-র মার্চের মধ্যে কেবল শাহবাদ ডেয়ারি এলাকা থেকেই নিখোঁজ হওয়া কিশোরীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭১। তদন্তে সামনে এল তাদের মধ্যে পাঁচজনকে খুন করা হয়েছে, ধর্ষিত ২৮, আর যৌন নিগ্রহের শিকার ১৭। নিখোঁজদের মধ্যে ৬৬জনের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। খাস রাজধানীর নাকের ডগায় একটি বস্তি-এলাকা থেকে দফায়-দফায় এত কিশোরী নিখোঁজের খবর নিয়ে যথারীতি হইচই পড়ে গেল মিডিয়ায়। প্রশ্ন উঠল, কেন একই জায়গা থেকে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? খবরাখবর নিয়ে জানা গেল শাহবাদ এলাকার ওই বস্তির কোনও বাড়িতেই শৌচালয় নেই। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে মেয়েদের তাই বাধ্য হয়েই জঙ্গলের আড়ালে যেতে হত, সারাদিন অপেক্ষায় থেকে, সন্ধের অন্ধকার নামার পর। পরবর্তী ঘটনাক্রম সহজেই অনুমেয়। জাতীয় মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে শোরগোল ফেলে দেওয়ার পর তড়িঘড়ি দিল্লি পুরপ্রশাসনের তরফে ওই এলাকায় একাধিক সুলভ শৌচালয় তৈরি করে দেওয়া হয়।

রোহিণীর শাহবাদ ডেয়ারি এলাকায় শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করে স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সক্ষম’। ওই এলাকার বাসিন্দাদের নিয়ে তাদের করা এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সেখানকার মহিলা ও কিশোরীদের প্রায় ৪৫ শতাংশই সারাদিনে প্রায় কিছু না-খেয়েই কাটান, পাছে দিনের বেলায় শৌচকর্ম করতে যেতে হয়। একই কারণে, অনেকেই জল পর্যন্ত খেতে সাহস পান না। যার প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ, দেখা গিয়েছে, এলাকার মহিলাদের অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদি ঊনপুষ্টি ও ‘ডিহাইড্রেশন’-এর শিকার। খুবই ছোট এলাকা নিয়ে সমীক্ষাটি করা হলেও, ওই সমীক্ষার রিপোর্ট একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শৌচালয়ের অভাবজনিত কারণে মানুষের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার পরিবর্তন কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, এবং তা কীভাবে কোনও এলাকার মানুষের জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়টিকে আমূল প্রভাবিত করতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে। মহিলা ও কিশোরীদের নিরাপত্তার পক্ষে বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় শৌচকর্মে যেতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা যে কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, তারও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এক উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে শাহবাদ ডেয়ারির ঘটনাগুলোকে।

মনে রাখতে হবে, এ এমন এক এলাকার কথা যা দেশের স্নায়ুকেন্দ্রের একেবারে নাগালের মধ্যে। প্রত্যন্ত এলাকায়, বা দেশের অন্যান্য শহরের বস্তি অঞ্চলের চিত্র, বলা বাহুল্য, অনেক ক্ষেত্রেই এর চেয়ে কোনও অংশে উন্নততর নয়। খোলা জায়গায় শৌচকর্ম কেন ও কীভাবে জনস্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক, তা তত্ত্বগতভাবে তো আমরা জানিই। পাশাপাশি এও জানি যে, বিশ্বে ডাইরিয়া ও প্রোটোজোয়া-সংক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যার নিরিখে ভারতের স্থান তালিকার একেবারে ওপরের দিকে। ডাইরিয়া শুধু যে শিশুদের বাড়বৃদ্ধিরই প্রতিবন্ধক তা নয়, একাধিক সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে কীভাবে তা শিশুদের স্থায়ী অপুষ্টির দিকেও ঠেলে দেয়। সেই অপুষ্টিরই দীর্ঘমেয়াদি ফল ‘স্টান্টিং’ ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা। অপুষ্টি-আক্রান্ত শরীর যেহেতু জীবাণু-সংক্রমণ প্রতিরোধে তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম, তাই নিউমোনিয়া বা যক্ষ্মার সংক্রমণকেও পুষ্টির অভাবজনিত পরোক্ষ ফল বলেই মনে করা যেতে পারে। অপুষ্টিলাঞ্ছিত শৈশব শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশেরও প্রতিবন্ধক। প্রকাশ্য জায়গায় শৌচকর্মের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিফলের বিষয়টিও যদি এরই পাশাপাশি স্মরণে রাখা যায়, তবে এই কুঅভ্যাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পক্ষে একটা সামগ্রিক ক্ষতি বলেই মনে হয়। এই প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে, স্বচ্ছ ভারত অভিযানের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আর কোনও প্রশ্নই করা চলে না।

কিন্তু এলাকায় সুলভ শৌচালয় থাকা সত্ত্বেও শাহবাদ ডেয়ারির ঝুপড়ির বাসিন্দারা কেন পারতপক্ষে তা ব্যবহার করেন না, তারও একটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন ‘সক্ষম’-এর প্রতিনিধিরা। কারণটা নিছকই অর্থনৈতিক। কথাপ্রসঙ্গে ওখানকার বাসিন্দারাই জানিয়েছেন, একটি পরিবারের গড় সদস্যসংখ্যা চারজন হলে কেবল শৌচকর্ম-বাবদেই প্রতিদিন খরচ হয় অন্তত ২৫ থেকে ৩০ টাকা, যা সেখানকার অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই বহন করা মুশকিল। শহরের সর্বত্র বিলাসবহুল শপিং মলে বা কনভেনশন সেন্টারে বিনামূল্যে শৌচালয় ব্যবহারের সুযোগ অপর্যাপ্ত, অথচ যাঁদের সত্যিকারের প্রয়োজন তাঁদের জন্য সে ব্যবস্থা নেই কেন, তা অবশ্য অন্য প্রশ্ন। সে প্রশ্ন ভাগ্যিস করেননি শাহবাদের বাসিন্দারা! তা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে অনেকের অনেক রকম গোঁসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারত।

কিন্তু সে প্রসঙ্গ আপাতত থাক। আর ক’দিন পরই, ১৯ নভেম্বর আরও একটি বিশ্ব শৌচালয় দিবস আসার আগে বরং দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে, দেশজোড়া স্বচ্ছ ভারত অভিযানের সুফল কতটা পেতে শুরু করেছি আমরা। সংখ্যার নিরিখে যদি দেখি, গত কয়েক বছরে প্রায় সব রাজ্যেই অনেক শৌচালয় তৈরি হয়েছে। বিশেষত ২০১৪-য় শুরু হওয়া স্বচ্ছ ভারত অভিযান কর্মসুচির আওতায় এ-বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে অনেকটাই। এরই পাশাপাশি, ২০০৯-এ শিক্ষার অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ে শৌচালয়, বিশেষত সহশিক্ষামূলক (কো-এড) বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচালয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যদি কাগুজে পরিসংখ্যানের আওতার বাইরে গিয়ে মাটির দিকে তাকানো যায়, দেখা যাবে, অনেকটা পথ এগিয়ে আসা গেলেও এখনও আরও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। বিদ্যালয়ে শৌচালয় তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলি ব্যবহারে খামতি রয়ে গিয়েছে অনেকটাই। অনেক ক্ষেত্রেই শৌচালয় গড়ে দেওয়া হলেও সেগুলিকে যথাযথ ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়নি।

একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে একাধিক সমীক্ষা চালাতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে প্রচুর। গুজরাট, রাজস্থানের একাধিক প্রত্যন্ত গ্রামে দেখা গিয়েছে স্কুলের চৌহদ্দির একপ্রান্তে ছোট পাকা ঘর তৈরি করে তার দরজায় ‘শৌচালয়’ লেখা কাগজ সেঁটে দেওয়া, অথচ দরজা খুলে দেখা গিয়েছে সেখানে শৌচকরমের কোনও ব্যবস্থাই নেই। অত দূরে যাওয়ারও দরকার নেই, প্রতিবেশী বিহার, ঝাড়খণ্ডেও বহু সরকারি বিদ্যালয়ে শৌচালয় থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত জল এবং হাত ধোওয়ার সাবানের কোনও বন্দোবস্ত দেখতে পাওয়া যায়নি। মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচালয় থাকলেও দেখা গিয়েছে তার দরজা নেই, থাকলেও তার ছিটকিনি ভাঙা, জানলা বন্ধ হয় না, সর্বোপরি পরিচ্ছন্নতার কোনও বালাই নেই। কোথাও-কোথাও দরজার জায়গায় চট ঝোলানো, কোথাও আবার টয়লেটের পাশেই সিঁড়ি, যার কয়েকধাপ উঠলেই অনায়াসে ভেতরটা পুরো দেখা যায়। একটি স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছেলেরা তো সগৌরবে এমনও জানিয়েছে, মেয়েরা টয়লেট দেখার সময় তা দেখার জন্য সিঁড়িটাকে তারা গ্যালারি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

এখানেই শেষ নয়। যেখানে শৌচালয় রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলির দশা রাস্তার পাশের ‘পাবলিক ইউরিন্যাল’-এর চেয়েও খারাপ ও অস্বাস্থ্যকর। এমনও দেখা গিয়েছে, শৌচালয় রয়েছে, তার বাইরে বড়-বড় হরফে লেখা রয়েছে ‘ছাত্রীদের জন্য’, অথচ তার দরজায় ঝুলছে মস্ত তালা। চাবি শিক্ষকের কাছে। এখনই-শৌচালয়ে-যাওয়া-দরকার এমন পরিস্থিতিতে মেয়েদের প্রথমে ছুটতে হয় শিক্ষককে খুঁজে বের করতে। আর তিনি যদি কোনও কারণে সেদিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন (সরকারি স্কুলে শিক্ষকদের উপস্থিতির হার নিয়ে গর্ব করার মতো পরিস্থিতি সারা দেশের কোথাওই এখনও আসেনি), তবে তো হয়েই গেল। কিন্তু শৌচালয় তো ব্যবহারের জন্যই, সেখানে দরজায় তালা ঝুলিয়ে কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়? প্রশ্ন করলে উত্তর মিলেছে, সবাই যথেচ্ছ ব্যবহার করে যাতে নোংরা করতে না-পারে তার জন্যই এ ব্যবস্থা। শৌচালয় পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য বিদ্যালয়ের তহবিলে সাফাই কর্মী বা ফিনাইলের জন্য আর্থিক বরাদ্দ নেই কেন, সে প্রশ্নের সদুত্তর অবশ্য পাওয়া যায়নি। শৌচালয় নোংরা করার দায় মেয়েদের ঘাড়ে চাপিয়ে প্রকারান্তরে কি তাদের অসম্মানই করা হচ্ছে না? বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না যে, তোমরা এর ব্যবহারের উপযুক্ত নও? যদি তাদের সেই অভ্যাস না থাকে, কে শেখাবে? সেটা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়? ছাত্রীদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার সুঅভ্যাস গড়ে তোলা বিদ্যালয়ের কর্তব্য নয়?

মেয়েরা, বিশেষত বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেছে এমন মেয়েরা, এ-হেন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের শৌচালয় ব্যবহারে যদি উৎসাহী না-হয়, তার জন্য তাদের নিশ্চয়ই দায়ী করা চলতে পারে না। বিদ্যালয়ে শৌচালয়ের অভাব বা ব্যবহারের অযোগ্য শৌচালয় যে মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের স্কুলছুটেরও একটা মস্ত বড় কারণ, তাও একাধিকবার উঠে এসেছে সমীক্ষায়। বিহারের মুঙ্গেরে প্রত্যন্ত গ্রামের মায়েরা সসঙ্কোচে জানিয়েছেন, “মেয়ে বড় হয়েছে, কিন্তু স্কুলে মেয়েদের ভাল টয়লেট নেই, কিসের ভরসায় মেয়েকে সেখানে পাঠাই?” এর ঠিক উলটো ছবিও আমরা দেখেছি আমাদের হাতের নাগালে, পূর্ব বর্ধমানে। মন্তেশ্বর ব্লকের বামুনপাড়া পঞ্চায়েতের পূর্ব খাঁপুর হরিজন অবৈতনিক বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র শৌচালয়ের মান উন্নত করে দু’বছরের মধ্যে ছাত্রীদের হাজিরা বেড়ে গিয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। হুবহু একই ঘটনা ঘটেছে পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা দু’নম্বর ব্লকের বাথুয়াড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে। কমন টয়লেটের জায়গায় মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচালয়ের ব্যবস্থা করতেই, রাতারাতি স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি অনেক বেড়ে গিয়েছে। এইসব দৃষ্টান্ত থেকে একটা কথাই বারবার সামনে আসে। তা হল, শুধু শৌচালয় গৃহ তৈরি করাই নয়, সেগুলিকে ব্যবহারযোগ্যও করে তুলতে হবে। যতদিন তা করা না-যাচ্ছে, টয়লেট এক অসম্পূর্ণ, অর্ধসমাপ্ত প্রেমকথাই রয়ে যাবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*