দ্বিতীয় বর্ষ, সপ্তম যাত্রা : অল্পবয়স, কল্পবয়স

স্টেশন মাস্টার

 

“বাবা কেন আপিশে যায়, যায় না নতুন দেশে?” আবহমানের শিশু-কিশোরের কল্পনাপ্রবণ মনটিকে এই একটি সামান্য অথচ অমোঘ প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে ছুঁয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই কল্পনাপ্রবণতার সূত্রেই আমাদের মনে না-পড়ে পারে না বিভূতিভূষণের অপুকেও, যে নিশ্চিন্দিপুরের বাঁশবাগানের ছায়ার নিরিবিলিতে আপনমনে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলে, মহাভারতে যুদ্ধ জিনিসটা বড় কম লেখা আছে বলে যুদ্ধের দৃশ্যগুলোকে সে নিজের মনেই টেনে লম্বা করে নেয় – আর এভাবেই দৈনন্দিনের প্রাত্যহিকতার গণ্ডী পার হয়ে তার মন চলে অনন্তের যাত্রাপালায় যোগ দিতে। কিন্তু সাহিত্যে শিশুমনের যে প্রকাশ, তাকে কি কেবলই কল্পনাপ্রবণতার প্রথাগত মুঠোয় আঁটিয়ে ফেলা সম্ভব? নাকি, এই ধারণা আসলে আমরা বড়রা তাদের যেভাবে দেখতে চাই, তারই এক একমহলা প্রতিফলন? সেখানে কি প্রায়শই লুকিয়ে নেই প্রাপ্তবয়স্ক সমাজের প্রতি, শিশু-কিশোরদের অভিভাবক ও তথাকথিত গুরুজনদের প্রতি প্রবল বিদ্রোহের চোরা স্রোতও? সে বিদ্রোহ কি আদতে ভিন্ন বয়ঃগোষ্ঠীর মানুষজনেদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে উঠে আসা মানসিকতারই ফসল? অথবা, শিশুদের যে সমস্ত আচরণকে আমরা, তথাকথিত বড়রা, শিশুসুলভ দুষ্টুমি বলে দাগিয়ে দিতে চেষ্টা করি, সেও কি নিছকই দুষ্টুমি, নাকি তার মধ্যেও মিশে থাকে সুস্পষ্ট কোনও সোশ্যাল স্টেটমেন্ট? অথবা শিশু-কিশোর বলতে আমরা যাদের বুঝি, সেই ধারণাটি কি এতটাই স্টিরিওটাইপ, এতটাই একমাত্রিক, যে, একই ফ্রেমে সেখানে অক্লেশে জায়গা পেয়ে যেতে পারে বিদ্যাসাগরের গোপাল-রাখাল-ভুবন, রবীন্দ্রনাথের বলাই-ফটিক-তারাপদ, সুকুমারের পাগলা দাশু, সত্যজিতের পিকু-মুকুল-সদানন্দ-আর্যশেখররা? নাকি, সেখানেও থেকে যায় শিশুমনের নানা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য স্তর, হাজারো জটিলতা – তার সমস্তরকম পছন্দ-অপছন্দ-ভালবাসা-রাগ-অভিমান-হিংসা-দ্বেষ-প্রতিযোগিতাবোধ-প্রতিশোধস্পৃহার টানাপড়েন সমেত?

প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে তৈরি হয়ে উঠছিল রাটলেজ, টেলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস থেকে প্রকাশিত নিবেদিতা সেনের ‘ফ্যামিলি, স্কুল অ্যান্ড নেশন: দ্য চাইল্ড অ্যান্ড লিটারারি কনস্ট্রাকশনস ইন টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল’ বইটি পড়তে-পড়তে। শিশু বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি, তা যে বস্তুত আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক মনের একটি আধা-সচেতন নির্মাণের চেয়ে বেশি কিছু নয় – এবং সেই নির্মাণ যে মূলত গড়ে উঠেছে আমাদের গত দু’শো-আড়াইশো বছরের চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত সমাজের জীবনবীক্ষা থেকে, খুব সযত্নচয়িত উদাহরণ-সহযোগে তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন লেখিকা।

কিন্তু প্রায় একনিশ্বাসে বইটি আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলার পর কয়েকটি পালটা প্রশ্নও গড়ে উঠতে থাকে। নিবেদিতা যে শিশুদের কথা লিখেছেন, শিশু কি কেবল তারাই? বা, আরও গুছিয়ে বলতে গেলে, শিশু বলতে কি কেবল তাদেরই বুঝব আমরা? ২০১১-র জনগণনা রিপোর্ট আমাদের জানায়, দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই শিশু, অর্থাৎ ১৮ বছরের কমবয়সি। তাদের একটা বিরাট অংশ বড় হয়ে উঠছে সমাজ ও রাষ্ট্রের চূড়ান্ততম অবহেলা ও উপেক্ষাকে সঙ্গী করে। গত শতকের ছয়ের দশকে কোঠারি কমিশন তার ঐতিহাসিক ভাষ্যে জানিয়েছিল, ভবিষ্যতের ভারত গড়ে উঠছে দেশের অসংখ্য ক্লাসরুমে। তার পর অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেলেও, সরকারি তথ্যই বলছে, এখনও দেশের সব শিশুকে ইস্কুলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিরিখে আমরা রীতিমত লজ্জাজনক অবস্থানে – সারা পৃথিবী যখন মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল পার হয়ে সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের দিকে যাত্রা শুরু করেছে, আমাদের অঙ্গনওয়াড়িগুলি তখনও ছ’বছরের কমবয়সি শিশুদের মাত্র অর্ধেকের জন্য পুষ্টিকর খাবারের বন্দোবস্ত করে উঠতে পেরেছে। শিশুসুরক্ষার হালও তথৈবচ – ২০১৬-র জাতীয় অপরাধপঞ্জী অনুসারে সারা দেশে নথিভুক্ত যৌন অপরাধের এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত হয়েছে শিশু ও কিশোররা। অথচ আমাদের সাহিত্যে কোথায় সেই আক্রান্ত শৈশবের মুখচ্ছবি?

নভেম্বর যেহেতু শিশুদের মাস – ১৪ তারিখ জাতীয় শিশুদিবস, ১৯ তারিখ আন্তর্জাতিক টীকাকরণ দিবস, ২০ তারিখ বিশ্ব শিশুদিবস – তাই আরও বেশি করে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল এইসব প্রশ্ন। সেইসব ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের নভেম্বর সংখ্যাটিতে আমরা বিশেষ নজর দেওয়ার চেষ্টা করব উপেক্ষিত শিশুদের বিষয়ে। সেই ভাবনারই ফলশ্রুতি এবারের রিজার্ভড বগি, যেখানে লিখেছেন তাপস দাস, কৌশিক দত্ত, শতাব্দী দাশ, ধ্রুবজ্যোতি মুখার্জিঅভীক ভট্টাচার্য। কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার অনুপ্রেরণায়, এবারের মূল বিষয়-ভাবনার নাম আমরা রেখেছি, ‘অল্পবয়স, কল্পবয়স’। নাম ভাবতে বসে আমাদের একবার সংশয় হয়েছিল, কল্পবয়স কথাটি সুপ্রযুক্ত হচ্ছে কি না। সত্যিই কি বাস্তবে কোথাও দেখতে পাচ্ছি সেই কল্পবয়সের ছবি? বরং চোখে কি পড়ছে না উলটো এক স্বর্গছেঁড়া সামগ্রিকতাই, যেখানে কল্পনার শৈশব থেকে তাদের আরও বেশি করে ছিন্ন করে আনারই চেষ্টা চলেছে সর্বস্তরে? তবুও ভেবেচিন্তে কল্পবয়স শব্দটিকে রাখতেই চাইল মন। প্রখর রৌদ্রদাহের দিনেই তো আরও বেশি অর্থবহ ও প্রাসঙ্গিক শোনায় তৃষ্ণার্ত চাতকের ডাক।

আর, অন্যান্য বিভাগগুলি— স্মরণ, স্টিম ইঞ্জিন, সবুজ স্লিপার, কবিতা, গল্প, অন্যগদ্য, প্রবন্ধ, ফটোফিচার, অণুগল্প, হুইলার্স, ধারাবাহিক, অনুবাদ সাহিত্য— সবই রইল যথাযথ।

একটা দিন দেরি হয়ে গেল। এটাই একটা আফশোস।

যাক… পড়ুন… মতামত দিন… সঙ্গে থাকুন…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. বরাবরের মতো স্টেশন মাস্টারের কলাম থেকে ঋদ্ধ লেখার প্রাপ্তিযোগ ঘটলো। শঙ্খ ঘোষের কবিতার অনুপ্রেরণায় শিরোনামটিও অনবদ্য। এ সংখ্যায় প্রকাশিত নানা লেখার হদিশসহ নিবেদিতা সেনের, “ফ্যামিলি, স্কুল অ্যাণ্ড নেশন: দ্য চাইল্ড এণ্ড লিটারারি কনস্ট্রাকশনস ইন টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল” বইটির উল্লেখ আরেকটি বড় পাওনা বলে মানছি। শিশু মাসে শিশুদের নিয়ে নানান সব লেখালেখির আনন্দ পাঠের সুযোগ দেবার জন্য ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মকে আন্তরিক ধন্যবাদ। তাবত শিশুর প্রতি রইল এক পৃথিবী ভালোবাসা শুভকামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*