আমি আজ আমার নিজের পাশে দাঁড়াতে তৈরি

আত্রেয়ী কর

 

মাঝে মাঝে ফিরে দেখার দরকার হয়ে পড়ে।

সে ফিরে দেখা যতই কষ্টের হোক, সে ফিরে দেখা যত যত্ন করেই লোহার সিন্দুকে বন্ধ করে রাখা থাক।

কাজটা সহজ ছিল না। বলতে চাইনি বলে নয়, কতটা বলতে পারব জানতাম না বলে।

কিন্তু আমি চেষ্টা করছি।

মেয়েটির বয়স তখন সাত। আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, সেদিন তার আনন্দের সীমা ছিল না। থাকবেই বা কী করে, মাসির বিয়ে বলে কথা। মায়ের নিজের ছোট বোন। সাজগোজ, খাওয়াদাওয়া, হইহুল্লোড়… খামতি ছিল না কিছুতেই। নতুন মেসো সহজেই মন জয় করলেন সবার। তুখোড় রান্না, মনভোলানো কথাবার্তা, বইয়ের পোকা— এককথায় দিব্যি পছন্দসই। নিয়মমাফিক এগোচ্ছিল জীবন।

মাসির বাড়ি বেড়াতে যাওয়াটা ছিল খুবই আনন্দের। গল্প-আড্ডা-খুনসুটি আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া, নিয়ম মানার ব্যাপার নেই। আহ্লাদ যাকে বলে আর কী। স্বাভাবিক একটা মেয়েবেলার গল্পের মতোই এগোচ্ছিল জীবন। তারপর হঠাৎ মেয়েটি বড় হয়ে উঠল। এবং মাসির বাড়ি থাকতে গিয়ে হঠাৎ একদিন মেয়েটির ঘুম ভাঙল শরীরের ওপর প্রচণ্ড একটা চাপ অনুভব করে। তার শরীরের উপর আর একজনের শরীরের ভার। মেয়েটির এগারো। তার মেসোর ছত্রিশ। মেয়েটির ঠোঁট, বুক, সারাটা শরীর জুড়ে ঘোরাফেরা করছিল একটা নোংরা স্পর্শ। মেয়েটা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে কাঠ হয়ে শুয়েছিল, মনে আছে।

সেবার, এবং তারপর প্রত্যেকবার। এগারো বছরের মেয়েটা বুঝে উঠতে পারেনি, এই দুর্ব্যবহার কেন। কোন ভুলের জন্য এই জঘন্য সাজা তার প্রাপ্য। ভয় পেত, বেশি নড়াচড়া করলে বোধহয় পাশে শোওয়া ছোটবোনকেও কষ্ট পেতে হবে। না, মেসো ছোটবোনকেও ছাড়েনি। তবে বোনটার লড়াই করার প্রবণতা ছিল। মেসোকে ঠেলে সরিয়ে দিত সে। মেয়েটি পারেনি।

পারেনি প্রত্যেকটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে জড়িয়ে ধরা আটকাতে। পারেনি বছরের পর বছর একই ব্যবহার বন্ধ করতে। বাবাকে বলে দিতে পারেনি। বাবা খুন করে ফেলতেন লোকটাকে, সন্দেহ নেই।

প্রশ্ন উঠবে— কেন ফিরে গেছে তারপরেও বারবার? কেন জানায়নি বাবা-মাকে? কেন চুপ করে থেকেছে?

উত্তর একটাই— পারেনি।

ছোট ছিল। ঠিক কেন শাস্তিটা তার বরাদ্দ, মেয়েটা জানত না, বুঝত না। বড় হয়ে উঠতে উঠতে তার মাথার মধ্যে তৈরি হয়ে উঠছিল দুটি পৃথিবী— একটা সুন্দর, সেখানে সমস্ত ঠিক, অন্যটায় সব ওলটপালট। দ্বিতীয় পৃথিবীটাকে মেয়েটা মনেপ্রাণে অস্বীকার করত। এতটাই অস্বীকার করত যে, বোন যে তাকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল, সেটাই সে কখনও মনে রাখেনি। মনে রাখতেই চায়নি। বাবা-মাকেই বা কী বলত? কোনটা নিরাপদ স্পর্শ, কোনটা নয়, সেই নিয়ে কোনওদিন কেউ কথা বলেনি তার সঙ্গে। তার চেয়েও বড় কথা, সে নিশ্চিত ছিল পুরোটাই তার দোষ। নয়তো এত প্রিয়, এত ভরসার, এত কাছের একটা মানুষ এরকম করে কষ্ট দেবে কেন? এতটা নোংরামি তার সঙ্গে কেনই বা হবে, যদি তার কোনও দোষ না থাকে?

তেরো বছর বয়েসে মেয়েটির বাবা মারা গেলেন। তার দৈনন্দিন জীবন পাল্টে গেল। বন্ধ হল মাসির বাড়ি যাওয়া। সঙ্গে বন্ধ হল নিয়মিত অত্যাচারও। তবে দেখা হত প্রায়ই। উৎসবে, আনন্দের দিনে, মেসোর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা থেকে জন্মদিনের উপহার কিনে দেওয়া অবধি সবই করতে হত। বদলে তিনি জড়িয়ে ধরার ছুতো পেয়ে যেতেন, পেয়ে যেতেন দৃষ্টি দিয়ে শরীরটাকে মেপে নেওয়ার সুযোগ।

পৃথিবীর সবথেকে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে আর মনের ভেতর অবিরাম একটা যুদ্ধ লড়তে লড়তে কথা ফুরিয়ে গেল মেয়েটির। চুপ করে গেল সে। রাস্তায় কেউ অসভ্যতা করলে, ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। ভিড় যানবাহনে অশ্লীল আচরণে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেত তার। দোষ যে তারই, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না আর। অনেক বছর পরে, কলেজে সমাজবিজ্ঞান পড়ার সময় সে জানতে পারল যে, তার সঙ্গে যা হয়েছে, তার একটা নাম আছে— শিশু যৌন নির্যাতন। তবু কাউকে বিস্তারিতভাবে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি মেয়েটার।

তারও পরে, বয়স যখন ২৩, প্রেমিককে প্রথম জানানোর সাহস হয়। প্রেমিক বলেছিল, মেয়েটির সমস্ত ‘খামতি সমেত মেয়েটিকে মেনে নিতে তার অসুবিধে নেই’। শুধু এই কারণে, মেয়েটি তার সমস্ত দাবি মেনে নিয়ে সহ্য করত সমস্ত অত্যাচার— মানসিক এবং শারীরিক। এত খুঁত থাকা সত্ত্বেও আর কেই বা মেনে নেবে তাকে? এর থেকে ভাল ব্যবহার কী করেই বা প্রত্যাশা করতে পারে সে?

তবুও একদিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছিল। সেদিন সম্পর্কটা ভেঙে দেওয়ার পর, মেয়েটি বাড়িতে জানিয়েছিল ছোটবেলার ঘটনা। বলা বাহুল্য, বাড়িতেও কেউ বুঝে উঠতে পারেনি ঠিক কী করা উচিত। তাকে বলা হয়েছিল, মাসির বিয়ে যাতে না ভাঙে, সেটা তার দায়িত্ব। দুটো মেয়ে নিয়ে মাসি কোথায় যাবে? এছাড়া আর কিছু বদলায়নি। জামাইষষ্ঠীর যত্নে সাজানো ভুরিভোজ থেকে পুজোয় নতুন জামা কিনে দেওয়া, সমস্তই চলেছে নিজস্ব নিয়মে। মেয়েটি তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা না জানালে মেসোর নিজেকে অপমানিত মনে হত। তিনি মাসির ওপর রাগ করতেন।

বয়স ছাব্বিশ। যুদ্ধ করতে করতে ভীষণ ক্লান্ত মেয়েটি, প্রিয় বান্ধবীর কাছে সব কথা বলেছিল শেষে। সে শুনেছিল। কোনও মন্তব্য না করে, মেয়েটির ভেতরে জমে থাকা ধন্দটাকে অনুভব করে, রাগটাকে দমিয়ে না রেখে, কষ্টটাকে বুঝে, শক্ত হাতে মেয়েটিকে ধরে রেখে, সবটাই শুনেছিল। মেয়েটি সেই বান্ধবীর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। ভাঙনের মুখ থেকে তাকে ফিরিয়ে এনে দেওয়া এই বন্ধুত্বের জন্য সে সারাজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ।

তারপর থেকে যতবার মেয়েটি সুযোগ পেয়েছে, নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছে বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন মেয়েকে। প্রত্যেকবার বলার সময়ে মনে হয়েছে সে তার মেসোকে একটা চড় মারতে পেরেছে, প্রতিশোধ নিতে পেরেছে। এগারো বছরের মেয়েটাকে অনেকটা পথ একা হাঁটতে হয়েছে। মানসিক অসুস্থতা নিয়ে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মেয়েটি একা লড়েছে। মাসির বিয়েটাকে অটুট রাখার বোঝা বয়ে বেড়িয়েছে অনেকগুলো বছর। অবশেষে থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হয়েছে মেয়েটি, মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ কাটিয়ে উঠতে তিনি সাহায্য করছেন মেয়েটিকে।

আজ থেকে প্রায় তিন মাস আগে মেয়েটির ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায়। মাসি ও মাসির বড় মেয়ের গায়ে হাত তুলেছিলেন মেসো। না, প্রথমবার নয়, তবে মেয়েটির মনে হয়েছিল এটাকে শেষবার করে তোলার দায়িত্ব তার। মাসিকে সবকথা বলে দিতে, মাসি ২৬ বছরের বিয়ে ভেঙে দুই মেয়েকে নিয়ে মেসোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। মেয়েটি স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলেছিল।

তারপর থেকে মেসোর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। তিনি বলেছেন মেয়েটি এবং তার ছোটবোন মিথ্যুক। প্রশ্ন তুলেছেন— ২২ বছর এরা চুপ ছিল কেন? প্রমাণ কোথায়? এখন এসব কথা বলার মানে কী? সত্যি বলতে কী, মেয়েটির আর কিছু আসে যায় না। ওই বীভৎস মুখটা আর দেখতে হবে না, ওই নোংরা দৃষ্টি আর সহ্য করতে হবে না, ওই অশ্লীল লোকটার সঙ্গে আর কথা বলতে হবে না— সেটাই শান্তির।

এই মেয়েটি আমি। এবং আমি কিছুই ভুলব না। আমি জীবনে কোনওদিন ক্ষমাও করব না। এটুকু আমি জানি।

আমি জানি ওই লোকটার মুখোশ খুলে দেওয়াটা আমার কাছে ঠিক কতটা জরুরি। নিজের জন্য। শুধুমাত্র নিজের জন্য আমার আজকের এই লেখা। আজ তেত্রিশে পৌঁছে, এগারোর সেই ছোট্ট মেয়েটার নিস্তব্ধতা ভেঙে দেওয়াটা আমার কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অনামী লেখা আমি আগেও লিখেছি। আর নয়। মস্তিষ্কের মধ্যে সর্বক্ষণ চলতে থাকা এই যুদ্ধটা আমায় জিততেই হবে। তাই আজ তেত্রিশে পৌঁছে, সেই এগারো বছরের মেয়েটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমি তৈরি। তাকে জানাতে হবে যে, তার কোনও দোষ নেই। তাকে সেই সাহসটা জোগাতে হবে, যে সাহসটুকু আমাকে জুগিয়েছে এই #MeToo আন্দোলন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. এ লেখা পড়ে প্রশংসা করা যায় ? ঠা ঠা রোদের মধ্যে এক টুকরো ছায়ার মতো এই লেখা। যে আলোড়িত হবে না সে রোবট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*