হ্যাশট্যাগ আমিও

সত্যব্রত ঘোষ

 

মানুষ হিসেবে সমাজে আমার অবস্থানটা কোথায়? অনেকের মতো আমিও কি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চোখে আস্থাভাজন হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখব? নৈতিকতার পক্ষে যতই অবমাননাকর হোক না কেন, আমার মনোযোগকে কি নিজের প্রয়োজনটুকু মেটানোর বাইরে কিছুতেই সরতে দেব না? কোনও একটি পক্ষে দাঁড়ানোর প্রশ্ন অবশ্যম্ভাবী হলেও কি আমি নিরপেক্ষতা বজায় রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করব? বৃহত্তর জগতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়াসে কি আমার সংকীর্ণ স্বার্থপর ভাবনাই প্রধান বক্তা হয়ে উঠবে? বুদবুদের মধ্যে আমার মতো যারা সুরক্ষা খোঁজে, এমন প্রশ্ন তাদের শলাকার মতো বিঁধবেই।

নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে তনুশ্রী দত্ত যখন শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলে, অনেকের মতো আমারও সন্দেহ হয়। সংবাদের শিরোনাম দখলের তাড়নায় কি এই পদক্ষেপ? কিছুটা ব্যক্তিগত কারণে আমার অনুসন্ধিৎসা বাড়তে থাকে। নীরব মুম্বাই ফিল্মজগৎ এবং তারকাদের কষ্টারোপিত সারল্য থেকে একথা বুঝতে অসুবিধা হয় না, যে গোপন কথাটি গোপন রাখবার দিন এবার শেষ হতে চলেছে। কারণ, মুম্বাইয়ের হিন্দি ফিল্মজগৎ যখন থেকে নিজেকে ‘বলিউড’ সাব্যস্ত করবার জন্য উঠেপড়ে লাগল, তখন থেকেই এখানে অর্থনিবেশের সমীকরণটি পাল্টানোর পালা শুরু। আগে সমাজবিরোধীরা বেনামে ছবি প্রযোজনা করত। আজ ‘বলিউড’-এর জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি যে পরিমাণ অর্থনিবেশ করছে, তা প্রমুখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রত্যক্ষ সহযোগ ছাড়া সম্ভব হত না। এর ফলে মুম্বাই ফিল্মজগৎ এখন ভারতীয় রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। ‘বলিউড’-এ বর্তমানে যাদের বোলবোলা, রাজনৈতিক নেতাদেরও তাঁরা বিশেষ বন্ধু। প্রয়োজনে তাঁদের বাঁচবার রাস্তা এই রাজনৈতিক নেতারাই বানিয়ে দেবেন। কিন্তু যে মুহূর্তে নেতা বুঝতে পারবেন, তিনি নিজে বিপন্ন, তখন কিন্তু দোস্তিকে উচ্ছন্নে পাঠাতে তাঁর বিন্দুমাত্র দেরি হবে না।

তনুশ্রীর সাহসী পদক্ষেপ বারুদের স্তূপের কাছে দেশলাই কাঠিটি জ্বালে। বারুদে অগ্নিস্পর্শ করবার কাজটি কিন্তু হল বিনতা নন্দার বিবৃতি দিয়ে। টুইটার এবং ফেসবুকে এই উদ্যোগী, মেধাবিনীর মর্মস্পর্শী বয়ানে ‘সংস্কারবাদী’ অভিনেতা অলোকনাথের ক্ষমতাগর্বী এক মাতাল লম্পটের যে ঘৃণ্য চেহারাটি ফুটে উঠল, স্থিতাবস্থার সংস্কারে আগুন লাগল তখনই। দক্ষিণ ভারতের কণ্ঠশিল্পী চিন্ময়ী টুইটারে তাঁর সম্মানহানির অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জনসমক্ষে উন্মোচিত করলেন পদ্মবিভূষণ পুরষ্কারে সম্মানিত তামিল কবি ভাইরামুত্থুর নোংরা স্বরূপ। অন্যদের মতো বলিউডের নৃত্যনির্দেশক তথা চিত্রনির্মাতা ফরাহ খান নীরব ছিলেন এতকাল। ভাবটা এমন, যেন তাঁর পরিচিত বৃত্তে তিনি কোনও লম্পটকে প্রবেশাধিকার দেন না। কিন্তু প্রকৃত সত্য হল, ফরাহ খানের ভাই এবং অন্যান্য ক্ষমতাশালীরা যে লম্পটও হতে পারে, তা অস্বীকার করাটাই এযাবৎ রীতি ছিল। (অভিনেত্রী পারভিন বাবির অকালমৃত্যু আজ আরও দুঃখজনক মনে হয়।) বাস্তব জীবনে সাজিদ খানের ধারাবাহিক অভব্যতার নিদর্শনগুলি জনগণের সামনে স্পষ্ট হবার পর সিনে অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (CINTAA) এবং মুম্বাইয়ের ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন নড়েচড়ে বসে। একই কথা বলা যায় মুকেশ ছাবরার প্রসঙ্গে। টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্স তাঁদের নির্মীয়মান ছবি ‘কিজি ঔর ম্যানি’র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে এই প্রখ্যাত কাস্টিং ডিরেক্টরকে সরিয়ে দিয়েছে। ‘কুইন’ নির্মাতা বিকাশ বহেলের দীর্ঘ সময়ের লাম্পট্যের মূল্য চুকিয়ে দেশের অন্যতম একটি প্রযোজনা সংস্থা ‘ফ্যান্টম ফিল্মস’ আজ ইতিহাস।

অভিযোগের আঙুল যাঁদের দিকে, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের ‘সচ্চরিত্র’ প্রমাণ করবার চেষ্টা করে চলেছেন। যাঁরা তাঁদের ধ্বজাধারী, তাঁদের মুখেও এক প্রশ্ন, “অপরাধ যদি আদৌ ঘটেই থাকে, অভিযুক্তরা কেন পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাননি?” অর্থাৎ, উকিলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এই স্তাবকের দল বারবার বোঝাতে চেয়েছে সাক্ষ্যের মাধ্যমে আইন দ্বারা প্রমাণিত না হলে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। এবং পুলিশের ডায়েরিই এসব ক্ষেত্রে অন্যতম সাক্ষী হিসেবে গৃহীত হতে পারে। ২০১২ সালে নির্ভয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটির পরও অত্যন্ত খেদের সঙ্গে বলতে হয় ভারতীয় পুলিশ এখনও অত্যাচারিত নারীর প্রতি সহমর্মী নয়। আর অভিযুক্ত পুরুষটি যদি কমবেশি প্রভাবশালী হন, সেক্ষেত্রে পুলিশ নিজে বিচারকের ভূমিকা গ্রহণ করে অত্যাচারিত মহিলাটিকেই অভিযুক্ত বানাতে তৎপর। মহিলার সপক্ষে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হলেও লাঞ্ছিতার বিবৃতি বিষয়ে পুলিশ এবং প্রশাসন আগে যতটা নির্বিকার ছিল, এখনও তেমন থাকাটাই শ্রেয় মনে করে।

কিন্তু সামাজিক স্তরে ইতিমধ্যে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া সহজলভ্য হওয়ার ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাঞ্ছিতাদের সোচ্চার কণ্ঠস্বর মিলেমিশে আজ এক বৃহত্তর আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছে। এর শুরু বেঙ্গালুরুতে। সেখানে বেশ কয়েকটি যৌন অত্যাচারের ঘটনার গুরুত্ব অস্বীকার করে জি পরমেশ্বর এবং আবু আজমী নামে দুই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা মহিলাদের বেশভূষা এবং আচরণ নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেন। দিব্যা তিতাস নামে নারী আন্দোলনের এক প্রমুখ কর্মী তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দশজন বন্ধুর কাছে আবেদন জানান ঐ দুই অসংবেদনশীল নেতাদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ানোর জন্য এমন কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিৎ যার মাধ্যমে সারা ভারতে প্রতিদিন ঘটমান নারী লাঞ্ছনা বিষয়ে জনসাধারণ সচেতন হয়। ১০ জনের কাছে পাঠানো এই প্রস্তাব অত্যন্ত দ্রুত ২০০ জনের কাছে পোঁছে যায়। নতুন একটি ফেসবুক পেজ এবং ওয়েবসাইট তৈরি করা হয় সম্মিলিতভাবে। স্থানীয় যা কিছু এই উদ্যোগের নেপথ্যে ছিল, তার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বিভিন্ন প্রান্তে ২১শে জানুয়ারি ২০১৭ নারী লাঞ্ছনা বিষয়ে সচেতনতাবৃদ্ধি কর্মসূচি পালিত হয়। এই ব্যাপ্তির অনুঘটক ছিল ফেসবুক। অনেকটা যেভাবে সেলফোনের মেসেজ সার্ভিস ব্যবহার করে ১৯৯৯ সালে দিল্লিতে জেসিকা লালের হত্যাকারীকে শাস্তি দেওয়ার দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে। দিব্যা তিতাসের মতে, এই আন্দোলনে প্রতিবন্ধকতা বলে যদি কিছু থাকে, তা একটাই। ভাষাগত সমস্যা। যাবতীয় বিবরণ এবং আবেদনে ইংরাজি ভাষা ব্যবহার করবার ফলে সমাজের অন্য স্তরগুলিতে জমে থাকা ব্যথার্ত কণ্ঠস্বরগুলি একটি বিস্তৃত পরিসরে প্রকাশিত হচ্ছে না। বৃহত্তর আন্দোলনের স্বার্থে ভাষাগত এই ইতস্ততা থেকে মুক্ত হওয়াটা একান্ত কাম্য।

তবে #IWillGoOut নামে আন্দোলনটির সূত্রে একটি উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে। তা হল, হ্যাশট্যাগের মধ্যে দিয়ে সারা দেশের মানুষ অন্তত ঐক্য অনুভবে আজ সক্ষম। যা #MeToo-র ক্রমবিস্তারে প্রমাণিত। এই তথ্যটিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মগুলিতে প্রমাণিত যে অভিযোগের আঙুল যাদের দিকে তোলা হচ্ছে, তাঁরা একজন নয়, বহু মহিলার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে অসঙ্গত আচরণ করতে অভ্যস্ত ছিলেন।

এখন এই আন্দোলন শুধুমাত্র আর চলচ্চিত্রজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যদিও এই প্রসঙ্গে মালয়ালাম চলচ্চিত্রজগতে ‘উইমেন ইন সিনেমা কালেক্টিভ’ নামক সংগঠনটির উল্লেখ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০১৭ সালের মে মাসে কেরালার মুখ্যমন্ত্রীকে অঞ্জলি মেনন, বীণা পাল, মঞ্জু ওয়ারিয়র, অর্চনা পদ্মিনী প্রমুখরা যে আবেদনপত্রটি পাঠান, তাতে চলচ্চিত্র উদ্যোগে লিঙ্গবৈষম্যের কারণে সুরক্ষার অভাব এবং চলচ্চিত্রে মহিলাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে বাস্তব চিত্রটি জনসমক্ষে ফুটে ওঠে।

তবে এই অসামঞ্জস্য এবং লাঞ্ছনা যে অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও ঘটমান, তা পরিস্ফুট হয় সম্প্রতি। যখন ভারতের সদ্য পদত্যাগে বাধ্য হওয়া বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরের বিরুদ্ধে সতেরো জন সাংবাদিকের যৌন হয়রানির অভিযোগ সঞ্চারিত হয় টুইটারে এবং ফেসবুকে। সংবাদমাধ্যমের জগতেও মেধাবী এই পেশাদার সাংবাদিকরা একইভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে, যেভাবে ক্ষমতালোভী পুরুষেরা অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে এসেছে। এই সত্যকে নিছক ষড়যন্ত্র প্রমাণ করবার রাজনৈতিক চেষ্টাটি কিন্তু এখনও সক্রিয়। এবং সক্রিয় আছে বলেই মহিলাদের অবমাননার বৃহত্তর চিত্রটি দেখে একটি কথা বারবার মনে হয়। প্রকৃত অর্থে ভারত স্বাধীন কিনা সেই বিষয়ে প্রশ্ন তো আছেই। কিন্তু পাশাপাশি এই প্রশ্নটিকেও কোনওমতে অবহেলা করা যায় না, কর্মক্ষেত্র হিসেবে ভারত কি আদৌ সভ্য?

রাজস্থান সরকারের মহিলা উন্নয়ন বিভাগের এক কর্মী ভাওঁরি দেবী শিশুবিবাহ প্রতিরোধে প্রতিটি ঘরে গিয়ে মানুষদের সচেতন করাকালীন গ্রামের মোড়লদের রোষের কারণ হন। “নিচু জাতের গরীব এই কুমোরদের ঘরের মেয়েটাকে” শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাঁকে গণধর্ষণ করে সংরক্ষণবাদী গোঁড়া পুরুষপুঙ্গবরা। রাজস্থান হাইকোর্টে ধর্ষণকারীরা সসম্মানে মুক্তি পেয়ে গেলে ‘বিশাখা’ নামে নারী অধিকার সংস্থা সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ বিষয়ক মামলা দায়ের করে। ‘বিশাখা’ বনাম রাজস্থান সরকারের এই মামলায় ১৯৯৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দেয়, তা আজ ‘বিশাখা গাইডলাইন’ নামে সর্বস্বীকৃত। ২রা সেপ্টেম্বর ২০১২-য় কর্মক্ষেত্রে যৌন অবমাননা প্রতিরোধে লোকসভায় একটি বিল পাশ করা হয়, যা ২০১৩ সাল থেকে একই নামে অ্যাক্ট হিসেবে দেশে লাগু আছে। খাতায়কলমে এই আইনটি কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবার জন্য যথেষ্ট হলেও, অধিকাংশ সরকারি, আধা-সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মবিধিতে তার কোনও অস্তিত্ব নেই। সাম্প্রতিক কালে এও জানা যাচ্ছে বিজেপি সহ প্রমুখ রাজনৈতিক পার্টিগুলির কেন্দ্রীয় দপ্তরে এবং শাখাগুলিতে কোনও ইন্টারনাল কমপ্লেন্টস কমিটি (ICC) নেই। সুপ্রতিষ্ঠিত একটি আইনের নির্দেশ উলঙ্ঘনের জন্য বাণিজ্যিক জগৎ তথা জাতীয় মূলস্রোতের রাজনীতিতে কোনও অনুতাপ বা সংশোধনীমূলক কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ এখনও আমাদের চোখে পড়েনি।

সম্প্রতি বিজেপি সাংসদ এম জে আকবর নিজেকে বাঁচানোর স্বার্থে অভিযুক্তদের চরিত্রহননে মন দিয়েছেন। প্রিয়া রমানির বিবৃতির বিরুদ্ধে মানহানির মোকদ্দমার শুনানিতে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। শুনানির পরবর্তী দিন তিনি তাঁর স্ত্রীকে সাংবাদিকদের সামনে এনে যে সাফাই দিয়েছেন তা এই ক্ষমতাদর্পী মানুষদেরই মানায়। আকবরের বিরুদ্ধে যাঁরা যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন, তাঁদের মধ্যে পল্লবী গগৈ একজন। আকবর তাঁর স্ত্রীর সাহায্য নিয়ে প্রমাণ করতে চাইছেন যে ২৩ বছর আগে দিল্লিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত থাকবার সময় সাংবাদিক পল্লবী গগৈ-র ‘সম্মতি’ নিয়ে তিনি সম্পর্কে লিপ্ত হন। যার জবাবে পল্লবী গগৈ স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন সম্পর্কটি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের দ্বারা তৈরি করেন আকবর। অন্যদিকে আকবরের স্ত্রী, তাঁর স্বামীর পক্ষ নিয়ে জানান এই সম্পর্কের কারণে তাঁদের গৃহবিবাদ লেগেই থাকত। কিন্তু তাতে সাংসদের কোনও দোষ তিনি পাননি। অর্থাৎ, তাঁর মতে, অন্যায় যদি কেউ করে থাকে তাহলে তা পল্লবী গগৈ করেছেন।

আদালতে এই মামলা সূত্রে এযাবৎ যে অভিযোগগুলি জমা পড়েছে, তাঁর ভিত্তিতে আদালতের পক্ষ থেকে ৩রা নভেম্বর অবধি কোনও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। রাফায়েল এবং রাম মন্দির নিয়ে বিরোধী কংগ্রেস পার্টি যতটা সোচ্চার, এম জে আকবরের ব্যাপারে কিন্তু ততটাই নীরব। কারণ, আকবর বর্তমানে বিজেপির একজন হলেও এককালে কংগ্রেসিই ছিলেন। বস্তুত, কোনও রাজনৈতিক দলই এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি নয়। সম্ভবত এই কারণে, যে তাঁদের মুখ থেকে নারী লাঞ্ছনার প্রতিবাদ বা সমর্থন যাই বার হোক না কেন, আরও অনেক লাঞ্ছিতার অভিযোগের আঙুল তাঁদের কারও দিকেও নির্দেশ করতে পারে। আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই ঝুঁকি না নেওয়াই সমীচীন। আরেকদিকে, স্বয়ংশাসিত ‘নিউজ এডিটরস গিল্ড’ নামক প্রতিষ্ঠানটিও আকবরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণের সিদ্ধান্তে এখনও যে অটল আছে তা বলা যায় না।

#MeToo আন্দোলন শুধুমাত্র লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়। তথাকথিত ক্ষমতাবানদের অন্যায় স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধে এই আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। আহমেদাবাদের ন্যাশনাল স্কুল অফ ডিজাইনের সিনিয়র লেকচারার কৃষ্ণেশ মেহতাকে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। NID-র ক্লাসগুলিতে এই বিকৃতমনা মানুষটি শুধু ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করেই নয়, অশ্লীল কথাবার্তা বলে সবাইকে উত্যক্ত করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপটি নিশ্চিতভাবে দৃষ্টান্তমূলক। তবে, এবার সত্যিই একটা বড় লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে ভারতের সাধারণ মানুষকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলা মেয়েদের অভিযোগগুলিকে এবার আদালতে বিচারকদের সামনে প্রমাণ করা প্রয়োজন। করুণা নন্দীর মতো কিছু আইনজীবী স্বেচ্ছায় এবং নিঃশর্তে অভিযোগকারিণীদের হয়ে লড়তে প্রস্তুত। তিনি স্পষ্টভাষায় জানাচ্ছেন, “মহিলারা যাঁদের অবমাননার জন্য অভিযুক্ত করছেন, তাঁরা সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি। আইনের লড়াইয়ে তাঁদের জন্য এমন একটি পথ খুলতে হবে, যাতে তাঁরা কেউই আদালতের সুবিচার থেকে বঞ্চিত না হন। হয় অপরাধীদের শাস্তি পেতে হবে, নয়তো অভিযোগকারিণীদের ক্ষতিপূরণ দেবেন অভিযুক্তরা।” একই সঙ্গে তিনি এই আশঙ্কার দিকটি সম্পর্কে আমাদের সচেতন করেছেন যে মামলাগুলিতে মহিলারা তাঁদের অভিযোগ প্রমাণ না করতে পারলে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযুক্তরা মানহানির মোকদ্দমা দায়ের করবে। এই বিষয়ে আইনজীবী ভীরা মাহৌলি আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন সমবেতভাবে এই মামলাগুলি লড়বার জন্য আইনজ্ঞ সমাজকে সংগঠিত করবার কাজটি চলছে। “মূল লক্ষ্য একটাই”, ঋতুজা শিণ্ডের বক্তব্য, “২০১৮ সালে আরেকবার কর্মক্ষেত্রে যৌন অবমাননার বিষয়টিকে আইনগত দিক থেকে বিশ্লেষণ করবার পর প্রিভেনশন অফ সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট (PoSH) এবং বিশাখা গাইডলাইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনগুলির প্রয়োজনীয় সংশোধন।” আদালত কক্ষে ভবিষ্যতে যে লড়াই চলবে, তার প্রতিফলন দৈনন্দিন সমাজজীবনেও কাম্য। এতে যদি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় আরও বড় আঘাত আসে, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে ভারতে নবযুগ আসন্ন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*