আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস ও লিঙ্গসাম্য

শতাব্দী দাশ 

 

গত ১৯শে নভেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই দিনটি পৃথিবীর প্রায় ৭০টি দেশে পালিত হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবসের অর্থ যেমন পালটে নিয়েছে ধনতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্র নিজেদের মতো করে, তেমনভাবেই এই দিবস-পালনটিও দ্রুত লক্ষ্যচ্যুত হবে বলে সন্দেহ হয়। ইতোমধ্যেই শুনেছি শহর কলকাতায় নীল বেলুন উড়িয়ে উদযাপন হয়েছে৷ পশ্চিমী ঐতিহ্যে নীল হল ‘পুরুষালি রঙ’, মেয়েলি গোলাপির বিপরীত। অর্থাৎ নারী-পুরুষ দ্বি-বিভাজন তত্ত্বকে আরেকবার উসকে দেওয়া হল এই দিবস-পালনের মাধ্যমে। আবার আরেক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেল সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই বললেন, ‘পুরুষদের জন্যও আবার আলাদা দিন? এমনিতেই তো বছরের সব দিন তাদেরই ছড়ি ঘোরানোর।’ এই দুই মেরুর মধ্যে টানাপোড়েনে দিনটির তাৎপর্য কোথাও হারিয়ে গেল।

এই দিবস পালনের যাঁরা উদ্যোক্তা, তাঁরা প্রথম থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক নারীদিবসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। বরং লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠা করাও তাদের লক্ষ্যগুলির অন্যতম৷ যে ছ’দফা লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছিল, তার মধ্যে পঞ্চমটি ছিল— ‘লিঙ্গসাম্যের বাস্তবায়নে পুরুষ দায়িত্বসহকারে ভূমিকা গ্রহণ করবে।’

এবছরের থিম ছিল, পজিটিভ পুরুষ রোল মডেল গড়ে তোলা ও পুরুষজীবনের কিছু অনালোচিত সমস্যা নিয়ে আলোচনা— যেমন পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য, টক্সিক ম্যাস্কুলিনিটি, পুরুষের ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার হার৷ লক্ষ করুন, টক্সিক ম্যাসকুলিনিটিকে কিন্তু ‘সমস্যা’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে৷ অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বলছে, এ’বছর ফোকাস করা হয়েছে ‘men’s and boy’s health, improving gender relations, promoting gender equality, and highlighting positive male role models’-এর উপর।

নারীবাদী হিসেবে তাই এই দিন নিয়ে কোনও ক্ষোভ নেই। ‘প্রতিটি দিন তো পুরুষের, আলাদা করে দিবস পালন কেন?’— এইটে একটি বহুশ্রুত প্রশ্ন এবং খুব অযৌক্তিক নয়। পিতৃতন্ত্র ব্যক্তি পুরুষকে সুযোগ-সুবিধেয় ভরিয়ে দিয়েছে। মাছের মুড়ো, ভালো জামা, বই-খাতা-পেন্সিল, বয়ঃসন্ধিতে সমবেত যৌনতা যাপনের পর্ন, রাত বারোটায় স্বাধীন চলাচল, গৃহকাজ থেকে আজীবনের ছুটি— সব দিয়েছে। আজও কোনও চাকুরে পুরুষ বাড়ির কাজে হাত লাগালে চাকুরে স্ত্রী গদগদ হয়ে পড়েন, যেন এ তাঁর কর্তব্য ছিল না। আজও মেয়েকে আমরা স্বাধীনতার গালভরা মানে শেখাই, ছেলেকে রান্নার টুকিটাকি শেখাতে ভুলে যাই। আজও, যদি এমন যেকোনও পরিস্থিতি হঠাৎ হাজির হয় যাতে একজনকে কাজ ছাড়তেই হবে (বাড়ির বা সন্তানের প্রয়োজনে, বা বরের বদলি হলে) তাহলে স্ত্রীই তা ছাড়েন। আর ঘর-বার সামলানোর মিথকে সত্যি প্রমাণ করতে গিয়ে মেয়েদের ডিপ্রেশন ও নার্ভের সমস্যা হু হু করে বাড়ে।

এইসব সত্যি। কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যি নয়। পিতৃতন্ত্রের পয়লা শিকার মেয়েরা, বলা ভালো পুরুষ বাদে আর সব লিঙ্গও। কিন্তু পিতৃতন্ত্রের ভুক্তভোগী পুরুষ নিজেও। যে ছেলেটি সায়েন্স পড়তে বাধ্য হল সাহিত্য মেয়েলি বিষয় বলে, সে পেট্রিয়ার্কির শিকার। যে কোমলমতি ছেলেটির খিস্তি না দিলে বন্ধুমহলে মান থাকে না, সেও শিকার। একটি বাচ্চা ছেলে বলেছিল, ভিড়ের মধ্যে বন্ধুরা জোর করে তার একটি হাত দিয়ে কোনও এক মেয়ের বুক ছুঁইয়ে দিয়েছিল। সে চায়নি, তাই কেঁদেছিল; সে পিতৃতন্ত্রের বড় নির্মম শিকার। যে ছেলেটি লেখালেখিতে থাকতে চায়, কিন্তু কলসেন্টারে কাজ করতেই হবে কারণ ছেলের উচিত বাড়িতে টাকা জোগানো নির্দিষ্ট বয়সের পর, সে পিতৃতন্ত্রের শিকার। যে ছেলের হাঁটাচলা, কথা বলা মেয়েলি বলে সে ‘বৌদি’ তকমা পেয়েছে, সে পিতৃতন্ত্রের শিকার। যে পুরুষ কাঁদতে শেখেনি সে পিতৃতন্ত্রের শিকার। যে পুরুষ ধর্ষিত হয়, সহ পুরুষের দ্বারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিন্তু কখনও নারীর দ্বারাও, সে তার নির্যাতনের কথা বলে না সচরাচর। পুরুষ মানেই সার্বিকভাবে একজন যৌনক্ষুধাময় সত্তা, তাই তার যৌন নির্যাতন হতে পারে না, এটা ধরে নেওয়ার ফলে যাদের প্রতি অত্যাচারের ইতিহাস চাপা পড়ে গেল, তারা সবাই পিতৃতন্ত্রের শিকার। বাচ্চা ছেলেদের উপর যৌন নির্যাতনের হার কিন্তু যথেষ্ট— প্রতি ছ’ জনে একজন। ছেলে বলেই তার নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি নিশ্চিন্ত বোধ করছে যখন তার বাপ-মা, তখন সেও পেট্রিয়ার্কির শিকার। বছরখানেক আগে দিল্লিতে প্রদ্যুম্ন বলে বাচ্চা ছেলেটিকে যে কিশোর মারল, সেই কিশোরের কী এমন মানসিক বিকার ছিল? এত কমবয়সে সেই বিকার এল কোথা থেকে? কিংবা ভিন্নধর্মী মেয়েকে ধর্ষণ করছে যে কিশোর? ভিনধর্মীকে পুড়িয়ে দিচ্ছে যে কিশোরেরা? নির্ভয়াকাণ্ডে ১৪ বছরের সেই দিল্লির ধর্ষকের বিকারকে কীভাবে ব্যখ্যা করবেন, যে বলেছিল যোনিতে রড ঢোকানোর প্ল্যান তারই ছিল? পুরুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরি করাও এই ‘ইন্টারন্যাশনাল মেন্স ডে’ কর্মসূচির একটি লক্ষ্য কিন্তু।

এইভাবে দেখতে দেখতে, ভাঙতে ভাঙতে, হয়ত ধর্ষক, অত্যাচারী, স্ত্রী-হত্যাকারী সকলেই পিতৃতন্ত্রের শিকার। প্রিভিলেজ বিনামূল্যে আসে না। পুরুষকে মূল্য চোকাতে হয়। সমবেদনা, কোমলতা, অশ্রু, সংবেদনা— এই সব হারিয়ে ফেলাই কি কম মূল্য চোকানো? এইসব অন্ধকার থেকে পুরুষকে টেনে তোলাও কিন্তু ছিল এই দিবস-পালনের উদ্দেশ্য।

শুনতে যত সহজ লাগে, অত সহজ অবশ্য নয় বিষয়টা। লান্ডি ব্যাংক্রফট বছরের পর বছর গৃহহিংসার কেসগুলির নির্যাতকদের কাউন্সেলিং করে দেখেন, সর্বাধিক সিস্টেমেটিক চেষ্টা করে নির্যাতকের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ৬%। লান্ডি ব্যাংক্রফট নিজে মনোবিদ ও এক পুরোধা গৃহহিংসা অ্যাক্টিভিস্ট আমেরিকায়।

একইভাবে ধর্ষক, নিপীড়ক থেকে শুরু করে নারীবিদ্বেষী বুদ্ধিজীবী— কাউকেই তাদের চিন্তাভাবনার ঘেরাটোপ থেকে বের করে আনা অত সহজ না। অর্থাৎ পিতৃতন্ত্র উপড়ে ফেলা বেশ দুঃসাধ্য কাজ, অসাধ্য না হলেও।

*********

যেহেতু তা দুঃসাধ্য, তাই অপুংভূমি যে নারীবাদ কখনও চায়নি, তা নয়। চেয়েছিল, বিশেষত সেকেন্ড ওয়েভের সময়। নারীবাদের দ্বিতীয় ঢেউ তখন আছড়ে পড়েছে পশ্চিমে, ‘ব্যক্তিগতও আদ্যন্ত রাজনৈতিক’— এই ঘোষণা করে। আ্যটকিনসন তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যটি করছেন— ‘Feminism is the theory, Lesbianism is the practice…’। একদিকে চরমপন্থী নারীবাদ নারী-সমকামিতার রাজনীতিকরণের মাধ্যমে এক পুরুষবর্জিত সমাজের রূপরেখা আঁকার চেষ্টা করছে খানিক বিচ্ছিন্নভাবে। অন্যদিকে ভ্যালেরি সোলানাস-এর মতো জঙ্গি নারীবাদী তখন প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন : “…there remains to civic-minded, responsible, thrill-seeking females only to overthrow the Government, eliminate the money system, institute complete automation and eliminate the male sex.”

এইরকম সময়ে, নারীর ব্যক্তিগত চাহিদা ও সামাজিক ভূমিকা পালনের আকাশ-পাতাল বৈষম্য থেকে বিস্ফোরণ-সম্ভাবনাময় কিছু গদ্য সৃষ্টি হয়েছিল নারীবাদী লেখিকাদের কলমে। ‘ফেমিনিস্ট’ তত্ত্বের আলোকে তাঁরা এক ‘আদর্শ অপর’ দেশের সন্ধান করছেন। এবং সেই জঁর কোথাও গিয়ে মিশছে কল্পবিজ্ঞানের সাথে, কারণ বিজ্ঞানই হয়ে উঠছে নারীর বিকল্প ঈশ্বর, যে তাকে উৎপাদন ও প্রজননের শ্রম থেকে মুক্তি দেবে। পরিবর্তনের বেলাগাম স্বপ্ন দেখার ছাড়পত্র যেহেতু ইউটোপিয়ান সাহিত্যের আছে, তাই শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা তা অনায়াসে বহন করতে পারে। সুতরাং আমরা পেয়েছি একের পর এক ‘ফেমিনিস্ট ইউটোপিয়া’। Charlotte Perkins Gilman-এর Herland-এর পুরুষবর্জিত ইউটোপিয়া বা Wonder Woman কমিক স্ট্রিপের অপুংভূমি।

আপাতভাবে এই পুংহীন সমাজ এক প্রকৃতিবিরুদ্ধ নাশক ভাবনা, যে নাশকতার গান-পাউডার জমা হয়েছিল দীর্ঘ অসহায়তার কালক্রম জুড়ে।

কিন্তু ৭০-এর দশক থেকে যতই নারীবাদীরা নিজেদের চর্চার বিষয়কে ইন্টারডিসিপ্লিনারি করেছেন, ততই একদিকে সাইকোএনালিসিস থেকে মার্ক্সিজম থেকে সোশিওলজি থেকে ক্লাস-কাস্ট-জেন্ডার-ইন্টারসেকশনালিটি ইত্যাদি ঢুকে পড়েছে নারীবাদের মধ্যে। আরেকদিকে, ঘটেছে আরও দুটি কাণ্ড।

এক, এলজিবিটিকিউএ মুভমেন্ট কোথাও এসে যে নারীর যুদ্ধের সাথে মিশেছে প্রকৃতিগতভাবে (অনেক বৈসাদৃশ্য সত্ত্বেও), এটা নারীবাদীরা আশি-নব্বই-এর দশকে অনুভব করেছেন, যা সেকেন্ড ওয়েভে অধরা ছিল। অর্থাৎ নারীপুরুষ বাইনারির অবসান ঘটে রামধনুর জন্ম হয়েছে।

দুই, পুরুষ ও পৌরুষের বিশ্লেষণ তাঁদের কাছে বেশ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই আগ্রহে শ্লেষ ও বিদ্রূপ নেই, অনুসন্ধিৎসা আছে। ‘পৌরুষের’ বিনির্মাণের জন্য, তার উৎস যে সামাজিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সেইখানে পৌঁছনোর চেষ্টা আছে। কারণ বিবর্তিত ধারণায় সমস্যা পুরুষদের নিয়ে নয়, ‘পৌরুষ’ নামক একটি লিঙ্গায়িত কনসেপ্টের মন্দ (শুধু নারীর জন্য মন্দ নয়, পুরুষের জন্যও মন্দ) দিকগুলি নিয়ে।

‘মেন্স স্টাডিজ’ তাই জেন্ডার স্টাডিজের এক অধুনা উদ্ভুত ভাগ।

*********

নারীবাদী দর্শন চর্চা প্রায় দুশো বছর ধরে চলছে। প্রতিবাদের, প্রতিরোধের রাজনীতিতে বলা বাহুল্য, বিপক্ষ কেউ থাকেই। বিমূর্ততায় তার নাম পিতৃতন্ত্র। কিন্তু আসলে বিপক্ষ ভেবে লড়া হয়েছে পিতৃতন্ত্রের ধারকদের সঙ্গে, মূলত পুরুষদের সঙ্গে। সেই লড়াই প্রয়োজনীয়। সেই লড়াই-এই ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, বাকস্বাধীনতা, জীবনযাত্রার স্বাধীনতা এসেছে, আরও আসবে ক্রমশ।

কিন্তু আন্দোলন যেন লক্ষ্য-অভিমুখী হয়। বিরোধিতা-অভিমুখী নয়। লক্ষ্য হল সমানতা। অর্থাৎ, সব লিঙ্গ সমানাধিকার ভোগ করবে যেখানে, তেমন পৃথিবী গড়ে তোলা। অর্থাৎ, যে পৃথিবীতে আর বিরোধিতার প্রয়োজন থাকবে না। অপরপক্ষে, বিরোধিতার রাজনীতি মাঝে মাঝে বিরোধীপক্ষ খুঁজতেই এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে লক্ষ্য আর মুখ্য থাকে না। লড়াই যদি হয় পিতৃতন্ত্র নামক একটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে, দাবার ছকের বিরুদ্ধে, তার বোড়েদের বিরুদ্ধে নয়, তাহলে যতই পুরুষেরা বুঝবে যে তাদের একই সমতলে এসে দাঁড়ানো দরকার নিজেদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে, অন্যের উপকার করতে নয়, ততই সে লড়াই সহজ হবে৷ তাদের বোঝানোর কাজটা ‘ক্যাচ দেম ইয়ং’ থিয়োরি মেনে শুরু করতে হবে তাদের জীবনে ‘টক্সিক ম্যাস্কুলিনিটি’-র প্রকোপ বাড়ার আগেই। আবার বোঝানোর ভাষা ও ভাষ্যই যদি ‘টক্সিক’ হয়, ঘৃণা, শ্লেষ বিদ্রূপে ভরা হয়, তা হলেও তারা ডিফেন্সিভ হবে। প্রয়োজনে বিকল্প ভাষা, পদ্ধতির সন্ধান হোক। তত্ত্ব ও আন্দোলনের রূপরেখা অভিযোজিত হোক পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুসারে।

বাস্তবক্ষেত্রে দেখেছি, লিঙ্গগত বৈষম্য বা লিঙ্গগত হিংসার কথা শুরু হলেই অনেক পুরুষ ডিফেন্সিভ হয়ে পড়েন। বোঝাতে চান যে তাঁরা অপরাধী নন। তাঁরা রেপ করেননি, মলেস্ট করেননি, কন্যাভ্রূণ হত্যা করেননি, বৌ পেটাননি।

এটাও জানি যে, তখন সেইসব দাবি নিয়ে #নটঅলমেন হ্যাশট্যাগ দিয়ে খিল্লি করাটা দস্তুর। এবং এর উত্তর হল #ইয়াসঅলউওম্যান, অর্থাৎ তুমি নির্যাতক কিনা, তাতে কিছু গেল-এল না, আমরা প্রত্যেকে নির্যাতিত। কোনও পুরুষ রেপ-মলেস্ট-ভ্রূণহত্যা না করলেও রেপ জোক শেয়ার করতে পারে, সেক্সিস্ট গালি দিতে পারে বা স্লাট শেমিং করতে পারে, মেয়েদের জামার ঝুল নিয়ে মন্তব্য করতে পারে, কোনও ছেলে কেঁদে ফেললে তাকে ‘মেয়েলি’ বলতে পারে, বউকে সিরিয়ালখোর নন-ইন্টেলেকচুয়াল ভাবতে পারে, তার মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে আপত্তি করতে পারে, বিনামজুরির গৃহশ্রম ভোগ করতে পারে৷ এমন অনেক দোষেই সে দুষ্ট হতে পারে। সর্বোপরি ‘ইজম’-এর চোখে ‘রেপ কালচার’ সর্বগ্রাসী৷ কিন্তু ‘রেপিস্ট’ আর ‘পোটেনশিয়াল রেপিস্ট’-এর মধ্যে অনেক সম্ভাবনাময় পথ ছিল। সে পথগুলো অবরূদ্ধ করে ফেলা দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক নয়।

কেমন হয় যদি সেই তথাকথিত ‘পোটেনশিয়াল’ নির্যাতকদের সাথে নির্যাতিতদের মোলাকাত করিয়ে দেওয়া হয়? What happens when #notallmen meet #yesallwomen? পারস্পরিক দোষারোপের জন্য নয়, গঠনমূলক আলোচনার জন্য? নির্যাতিত মেয়ের অভিজ্ঞতার তীব্রতা যদি কমিউনিকেট করা যায়, তবে কি সত্যি হালকাভাবে, খেলাচ্ছলে রেপ রেটরিক ব্যবহার করা কমানো যাবে না?

তাদের আরও জানানো হোক কীভাবে তারা নিজেরাও নির্যাতিত। তাদের কাঁদার অধিকার নেই ব্যথা পেলে, উপার্জন না করে উপায় নেই নির্দিষ্ট বয়সের পর, ধর্ষিত হয়ে বিচার চাওয়ারও উপায় প্রায় নেই। ষোলো থেকে বাইশ বছর বয়সী ছেলেদের আত্মহত্যার হার মহামারীসম। তাদের ডিপ্রেশনের কথা শোনা হোক৷

শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটি ক্লাস ফাইভের ছাত্রও নির্বিচারে এমন কথা উচ্চারণ করতে পারে, যা তার নিজের পক্ষে ও ভিন্ন লিঙ্গের প্রতি অবমাননাকর। তাকে বিপক্ষ ঠাওরানো যায়? ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার যে ষড় তার চারপাশে, তা থেকে তাকে মুক্ত করাটা কি আমাদের কাজ ছিল না? দুঃখের বিষয়, কোলকাতা পুলিশের ‘ডিয়ার বয়েজ’ প্রোজেক্ট খুব সাড়া ফেলতে পারল না। এরকম আরও অনেক প্রোজেক্ট বা ওয়ার্কশপ কিন্তু চলছে সারা দেশ জুড়ে৷ সেরকম ছোটবড় নানা উদ্যোগ নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ুক। পরিবারে। স্কুলে। পার্টি মিটিং-এ। পশ্চিমবঙ্গে তথা কলকাতায় ইন্টারন্যাশনাল মেন্স ডে যেন পরের বছর থেকে এ’সব কর্মসূচির একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।  

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. অসাধারণ লেখা। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং অসামান্য বিশ্লেষণ।

  2. সমৃদ্ধ আলোচনা। পিতৃতন্ত্রের শিকার পুরুষেরাও। আলোচনার খোরাক দিবে এই লেখাটি।

  3. আবার অতি মননশীল রচনা, যদিও পুরুষেরা এই ভরসা বা শ্রদ্ধার যোগ্য নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*