ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের — ষোড়শ পর্ব

চার্লস বুকাওস্কি

 

অনুবাদ : শুভঙ্কর দাশ

পঞ্চদশ পর্বের পর

৮/৩০/৯২
রাত ১টা ৩০

৬ নম্বর রেসের পর ঘোড়দৌড়ের মাঠে এস্কালেটার চড়ে নেমে আসছিলাম যখন ওয়েটার আমাকে দেখল। ‘আপনি এখন বাড়ি চলে যাচ্ছেন?’ সে বলল।

‘আমি তোমাকে এমন প্রশ্ন করতাম না হে বন্ধু’, তাকে বললাম আমি।

বেচারাকে ঘোড়দৌড়ের মাঠের রান্নাঘর থেকে খাবার বয়ে আনতে হয় ওপরের তলায়, ট্রেতে করে প্রচুর খাবার নিয়ে আসতে হয়। যখন খরিদ্দারদের টাকা শেষ হয়ে যায় তখন তাদের সে টাকা মেটাতে হয়। কিছু খেলুড়ে একটা টেবিলে চারজন মিলে বসে থাকে। ওয়েটার সারাদিন ধরে কাজ করলেও ঘোড়দৌড়ের মাঠে তাদের টাকা বাকি থেকে যায়। আর যেদিন ভিড় থাকে সেদিন সব থেকে খারাপ দিন, সবাইকে তো আর নজরে রাখতে পারে না বেচারা। আর যখন তারা টাকা পায় খেলুড়েরা খুব খারাপ টিপ্স দেয়।

আমি দোতলায় নেমে এলাম আর বাইরে বেরিয়ে এলাম, রোদে দাড়ালাম গিয়ে। বেশ ভালো লাগছিল ওখানটায়। ঘোড়দৌড়ের মাঠে এসে হয়ত রোদে দাড়ানোটা ভালো। ওখানে লেখালিখি নিয়ে আমি খুব কমই ভাবনাচিন্তা করি কিন্তু রোদে দাঁড়িয়ে আমি তা করতে পারছি্লাম। আমি ভাবছিলাম একটা লেখা নিয়ে যা আমি পড়েছি দিনকয়েক আগে, যে আমি হয়তবা আমেরিকার সেই কবি যার বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় আর আমি সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী আর সেই লেখক যাকে সবচেয়ে বেশি কপি করা হয়। কী অদ্ভুত। যাক, ওতে আমার বালছেঁড়া গেছে। আসল কথা হল কখন আবার ফের বসব কম্পিউটারের সামনে। যদি এখনও কাজটা করতে পারি আমি, যদি বেঁচে থাকি, আর যদি না পারি, আগে যা করেছি তার কোনও মানে নেই আমার কাছে। কিন্তু আমি কী করছি, লেখা নিয়ে ভাবছি? আমার বারোটা বেজে যাচ্ছে। আমি যখন লিখি তখন আমি ভাবি না লেখা নিয়ে। তারপর আমি শুনতে পেলাম পরের রেসের জন্য ডাক, ঘুরে হেঁটে ভেতরে এলাম আর এস্কালেটারের দিকে এগোলাম। উপরে উঠছি, একজন লোকের পাশ দিয়ে গেলাম যার থেকে আমি টাকা পাই। সে মাথা নিচু করে নিল। আমি ভাব দেখালাম যে আমি তাকে দেখিনি। ওতে কিছু ভালো হল না যখন সে আমাকে টাকাটা ফেরত দিল, ও টাকাটা আবার ধার নিল। ওদিন একটা বুড়ো লোক আগে এসেছিল আমার কাছে, ‘আমাকে ৬০ সেন্ট দিন!’ ওটা জুড়ে ও দু ডলার বেট ধরতে পারবে, স্বপ্ন দেখার জন্য আরেকটা সুযোগ। রেসের মাঠ একটা বালের জায়গা কিন্তু সব জায়গাই তো তাই। কোথাও যাবার জায়গা নেই। যদিও আছে একটা, আপনি নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিতে পারেন কিন্তু আপনার বউ তাতে মন খারাপ করবে। আমেরিকা হল সেই দেশ যেখানে সমস্ত বউয়ের মন খারাপ। আর সেটা পুরুষদের দোষ। একদম ঠিক কথা। অন্য কে আর আছে ধারে কাছে? আপনি দোষ দিতে পারেন না পাখিগুলোকে, কুকুরগুলোকে, বেড়ালগুলোকে, পোকাগুলোকে, ইঁদুরগুলোকে, মাকড়শাগুলোকে, মাছগুলোকে, ইত্যাদিগুলোকে। পুরুষগুলোই আছে হাতের কাছে। আর পুরুষেরা দুঃখিত হতে দিতে পারে না নিজেদের কারণ তাহলে তো পুরো জাহাজটাই ডুবে যাবে। গাঁড় মারাক গে।

আমি আবার নিজের টেবিলে ফিরে এসেছি। পাশের টেবিলে বসে আছে তিনজন লোক আর তাদের সাথে আছে একটা বাচ্চা ছেলে। প্রত্যেকটা টেবিলে লাগানো একটা করে ছোট্ট টিভি সেট, শুধু ওদেরটা চালানো আছে খুব জোরে। বাচ্চাটা কোনও একটা মজার চ্যানেলে চালিয়ে রেখেছে আর লোকগুলোকে ভালো বলতে হবে যে ওরা বাচ্চাটাকে সেটা দেখতে দিচ্ছে। কিন্তু ও ওটা মন দিয়ে দেখছে না, কান দিয়ে শুনছেও না, ও ওখানে বসে বসে একটা গোল্লা পাকানো কাগজ এদিক ওদিক ঠেলছে। ও কয়েকটা কাপের গায়ে ঠোক্কর খাওয়াল সেটাকে, তারপর সেটা নিয়ে সে ছুঁড়ে দিতে লাগল এ কাপের ভেতর ও কাপের ভেতর। কিছু কাপ ছিল কফি ভর্তি। কিন্তু লোকগুলো শুধু ঘোড়া নিয়ে কথা বলে চলল। হে ভগবান, ওই টিভিটা বড় জোরে চলছে। আমি ভাবলাম লোকগুলোকে কিছু বলি, টিভির আওয়াজটা একটু কমাতে। কিন্তু লোকগুলো ছিল কালো মানুষ আর আমি যদি কিছু বলি ওরা ভাববে আমি বর্ণবিদ্বেষী। আমি টেবিল ছেড়ে উঠে হেঁটে গেলাম বেটিং কাউন্টারে। আমার ভাগ্য খারাপ, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একটা খুব ধীরে ধীরে এগোনো লাইনে। সামনে একজন বৃদ্ধ প্রচুর সময় নিচ্ছিলেন তার বেট লাগাতে। তিনি তার ফর্ম মেলে রেখেছিলেন কাউন্টার জুড়ে তাঁর প্রোগ্রামের কাগজের সাথে আর তিনি খুব দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন কী করবেন তাই নিয়ে। তিনি হয়ত থাকেন কোনও বৃদ্ধাশ্রমে বা কোনও এক ধরনের কোনও প্রতিষ্ঠানে আর হয়ত বেরিয়েছেন একদিনের জন্য রেস খেলতে। আর এর বিরুদ্ধে কোনও আইন নেই আর কোনও আইন নেই তার বিরুদ্ধে যে তিনি আছেন কুয়াশার ভেতর। কিন্তু তবু ব্যাপারটা বেদনাদায়ক। হে ভগবান, আমি কেন এর জন্য ভুগব, আমি ভাবলাম। আমি মুখস্থ করে ফেলেছি কেমন দেখতে তাঁর মাথার পিছনটা, ওনার কান, ওনার জামাকাপড়, ব্যাঁকা পিঠ। ঘোড়াগুলো গেটের কাছে এসে গেছে। সবাই চেল্লাচ্ছে ওনাকে নিয়ে। উনি টেরই পাচ্ছেন না ওদের। তারপর, খুব বিরক্তি নিয়ে আমরা দেখলাম উনি নিজের ওয়ালেটে হাতে নিলেন। ধীরে, খুব ধীরে। ঊনি খুলে ওটাতে উঁকি দিলেন। তারপর আঙুল ঢোকালেন ওয়ালেটের ভেতর। আর ভালো লাগছে না এসব বলতে। অবশেষে তিনি টাকা মেটালেন আর ক্লার্কটি তাঁকে ফেরত পয়সা দিল ধীরে ধীরে। তারপর তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন তাঁর টাকা আর টিকিটের দিকে, তারপর ক্লার্কের দিকে ফিরে বললেন, ‘না। আমি চাইছিলাম ৬-৪ এক্স্যাক্টা, এটা নয়…’ কেউ একজন খিস্তি করে উঠল। আমি হেঁটে বেরিয়ে এলাম। ঘোড়াগুলো গেট দিয়ে লাফিয়ে বেরোল আর আমি মুততে গেলাম টয়লেটে।

আমি যখন ফিরে এলাম ওয়েটার তখন আমার বিলটা রেডি করে ফেলেছে। আমি বিলটা মেটালাম, ২০% টিপ দিলাম আর বললাম ধন্যবাদ।

‘কাল দেখা হবে, হে বন্ধু,’ ও বলল।

‘হয়ত।’ আমি বললাম।

‘আপনি ঠিক আসবেন এখানে,’ সে বলল।

মাঠে অন্যান্য রেস চলছিল। আমি আগেই বাজি ধরলাম ৯ নম্বরে আর তারপর চলে গেলাম। আমি গাড়ির কাছে গেলাম আর বেরিয়ে এলাম। পার্কিং-এর শেষ মাথায় সেঞ্চুরি বুলভার্ডের সিগন্যালে একটা অ্যাম্বুলেন্স, একটা দমকলের গাড়ি আর দুটো পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। দুটো গাড়ি ধাক্কা মেরেছে মুখোমুখি। সারা জায়গায় কাচ পড়ে আছে, গাড়ি দুটো জড়িয়ে মড়িয়ে গেছে। কেউ একটা দ্রুত ঢুকতে চাইছিল আর কেউ একটা চাইছিল দ্রুত বেরোতে। ঘোড়া-খেলুড়ে সব।

আমি ওদের পাশ কাটিয়ে বাঁদিক নিলাম সেঞ্চুরির রাস্তায়। আরও একটা দিন মাথা ফুটো করে বেরিয়ে গেল আর দফন হয়ে গেল। সেটা ছিল নরকের এক শনিবারের দুপুর। আমি গাড়ি চালিয়ে চললাম অন্যান্যদের সাথে।

৯/১৫/৯২
রাত ১টা ৬ মিনিট

একজন লেখকের রাইটার্স ব্লক নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। আমি বিশ্বাস করি আমাকে একটা মাকড়শা কামড়েছিল। তিন বার। বাঁ হাতে নজর করেছিলাম উঁচু হয়ে থাকা লাল কামড়গুলো ৯-৮-৯২-এর রাতে। রাত ৯টা নাগাদ। ছুঁলে হালকা ব্যথা লাগছিল। আমি ওটাকে পাত্তা দিলাম না। কিন্তু মিনিট ১৫ পর আমি কামড়গুলো লিন্ডাকে দেখালাম। ও সেদিনই সকালে ডাক্তারের কাছে গেছিল একটা এমারজেন্সির জন্য। কোমরে কোনও কারণে ও একটা তীব্র ব্যথা অনুভব করছিল। এখন রাত ৯টা বেজে গেছে, সব বন্ধ একমাত্র লোকাল হসপিটালের এমারজেন্সি ওয়ার্ড ছাড়া। ওখানে আমি আগে গেছি, মাল খেয়ে একবার গরম ফায়ার প্লেসে পড়ে গেছিলাম। একেবারে সরাসরি আগুনের ভেতর পড়িনি অবশ্য কিন্তু পড়েছিলাম তেতে থাকা জায়গাটাতে আর তখন আমার পরণে ছিল একটা হাফ প্যান্ট শুধু। আর এখন এটা এই লাল হয়ে উঁচু হয়ে থাকা কামড়গুলো।

‘আমার মনে হয় এটা নিয়ে যদি আমি যাই তাহলে ব্যাপারটা খুব বোকা বোকা হবে। ওখানে রক্তাক্ত সব লোকজন আসছে তাদের গাড়ির ধাক্কাতে আহত, ছুরিতে আঘাতপ্রাপ্তরা, গুলি খাওয়া, আত্মহত্যা করতে যাওয়ারা, আর আমার শুধুমাত্র এই ৩টে লাল কামড়।’

‘আমি জেগে উঠে দেখতে চাই না একটা মরা স্বামীকে,’ লিন্ডা বলল।

আমি ব্যাপারটা নিয়ে ১৫ মিনিট ধরে ভাবলাম, তারপর বললাম, ‘বেশ যাওয়া যাক।’

ওখানে সব চুপচাপ। ডেস্কে বসা মহিলাটি ফোনে কথা বলছে। কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলল সে। তারপর তার কথা শেষ হল।

‘বলুন?’ সে জিজ্ঞাসা করল।

‘আমার মনে হয় আমাকে কিছু একটা কামড়েছে,’ আমি বললাম। ‘হয়ত আমার এটা দেখানো দরকার।’

আমি আমার নামটা বললাম। কম্পিউটারে আমার নাম আছে আগে থেকে। শেষবার এসেছি যখন আমার টিবি হয়।

আমাকে একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। নার্স যা করা হয় ওখানে তাই করল। ব্লাড প্রেশার, গায়ে জ্বর আছে কিনা মাপা ইত্যাদি।

তারপর ডাক্তার। তিনি লাল কামড়গুলো পরীক্ষা করলেন।

‘মনে হচ্ছে তো মাকড়শা,’ তিনি বললেন, ‘ওরা সাধারণত তিনবার কামড়ায়।’

আমাকে টিটেনাস ইঞ্জেকশন দেওয়া হল, আরেকটা প্রেসক্রিপশন অ্যান্টিবায়োটিক আর বেনাড্রিলের জন্য।

আমরা গাড়ি চালিয়ে গেলাম সারারাত খোলা থাকা একটা ওষুধের দোকানে জিনিসগুলো কেনার জন্য।

৫০০ এম জি ডুরিসেফ ক্যাপসুল প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা ছাড়া ছাড়া খেতে হবে। বেনাড্রিল একটা করে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা ছাড়া ছাড়া।

আমি শুরু করলাম। আর এটাই সেই সময়টা। একদিন মতো পরে আমাকে সেইরকম লাগতে লাগল যেরকম লাগত যখন আমি টিবির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খেতাম। তখন শুধু আমার দুর্বলতার জন্য, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে পারতাম না প্রায়। আর এখন সেই বমি বমি ভাব, মাথাটা কেমন যেন হয়ে আছে। শরীরটা অসুস্থ মাথাটা নিস্তেজ। ৩ দিনের মাথায় আমি বসলাম গিয়ে কম্পিউটারের সামনে কিছু বেরোয় কিনা দেখতে। কিন্তু শুধু বসেই থাকলাম। ভাবলাম এটা বোধহয় সেই অবস্থা যখন শেষ অবধি ওটা ছেড়ে যায় আপনাকে। আর আপনি কিছুই বিশেষ করতে পারবেন না। ৭২ বছর বয়সে এটা হতেই পারে যে ওটা আমাকে ছেড়ে গেছে। লিখতে পারার ক্ষমতা। একটা ভয়। সেটা খ্যাতির জন্য নয়। বা টাকাপয়সার জন্য নয়। এটা আমার জন্য। আমি নষ্ট হয়ে গেলাম। আমার একটা বেরোবার রাস্তা চাই, ওই আনন্দ, লেখা বেরোবার উপায়। লেখালিখির নিরাপত্তা। ওই বালের কাজকর্ম। অতীতের ওইসবের কোনও মানে নেই। খ্যাতির কোনও মানে নেই। পরের বাক্যটা বেশি জরুরি। আর পরের বাক্যটা যদি না আসে। আমি খতম, যদিও টেকনিক্যালি আমি বেঁচে আছি।

প্রায় ২৪ ঘণ্টা আমি অ্যান্টিবায়োটিক খাইনি কিন্তু তবু নিস্তেজ লাগছে, অল্প অসুস্থও। এই লেখালিখিতে সেই স্পার্ক নেই, সেই জুয়া নেই। খুব খারাপ হে সোনা।

কাল আমার রেগুলার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে এটা জানতে যে আমার আরও অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে কিনা। উঁচু হয়ে থাকা কামড়গুলো এখনও আছে যদিও ছোট হয়ে এসেছে ওগুলো। কে জানে কী ব্যাপার বাঁড়া!

আর হ্যাঁ, রিসেপশনে বসে থাকা ওই সোনা মেয়েটা আমি যখন বেরিয়ে আসছি তখন মাকড়শার কামড় নিয়ে বলতে শুরু করল। ‘হ্যাঁ, একটা ছেলে ছিল বছর কুড়ি বয়স হবে। তাকে কামড়েছিল মাকড়শা একবার, কোমর থেকে শরীরের উপরদিকটা এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেছে।’

‘তাই?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

‘হ্যাঁ,’ সে বলে, ‘আরও একটা কেস আছে। ওই লোকটা…’

‘বাদ দিন,’ আমি তাকে বললাম। ‘আমাদের এখন যেতে হবে।’

‘বেশ,’ সে বলে, ‘একটা সুন্দর রাত আসুক আপনার জন্য।’

‘আপনারও।’ আমি বললাম।    

১১/৬/৯২
রাত ১২টা ৮ মিনিট

আজ রাতে আমার মনে হচ্ছে আমাকে কেউ বিষ খাইয়েছে, গায়ে মুতে দিয়েছে, ব্যবহার করেছে, একটা খুদে দলা পাকিয়ে দিয়েছে। এটার কারণ পুরোটা বয়সের জন্য নয় কিন্তু হয়ত খানিকটা সে কারণেও। আমার মনে হয় ওই জনতা, ওই জনতার কারণে। মনুষ্যত্ব চিরকালই আমার কাছে খুব শক্ত ব্যাপার, ওই জনতা জিতছে শেষমেশ। আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় ঝামেলা হল এটা, ওদের কাজকর্মের পুনরাবৃত্তি। কোনও টাটকা ব্যাপার ওদের নেই। এমনকি একটা ছোট্ট মিরাকেলও নয়। ওরা আমাকে শুধু পিষে চলেছে। যদি একদিনও আমি দেখতে পাই কোনও একজন কিছু একটা করছে বা বলছে অন্যরকমভাবে সেটা আমাকে সাহায্য করবে চালিয়ে যেতে। কিন্তু ওরা সব বাসী, নোংরা। কোনও লিফট নেই। চোখ, কান, পা, বাচন কিন্তু কিসসু নেই। ওরা নিজেদের সাথে জমাট বেঁধে থাকে, একে অপরের সাথে ঠাট্টা করে, এমন ভাব করে যেন তারা বেঁচে আছে।

ভালো ছিল যখন আমি তরুণ ছিলাম, আমি তখনও খুঁজছি। রাতের রাস্তায় শিকারের সন্ধানে ঘুর ঘুর করছি। খুঁজছি, খুঁজছি… মিশছি, মারামারি করছি, খুঁজে বেড়াচ্ছি… আমি কিছু খুঁজে পাইনি। কিন্তু পুরো অবস্থাটা, শূন্যতাটা, আমাকে চেপে ধরে রাখতে পারেনি। আমি কখনওই একজন বন্ধু খুঁজে পাইনি। মেয়েদের সাথে, একটা আশা ছিল একজন নতুন মেয়ের সাথে প্রথম প্রথম শুরুর দিকের দিনগুলোতে। এমনকি অনেক আগেই, আমি বুঝেছিলাম, তাই স্বপ্নের মেয়ে খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, আমি শুধু এমন কাউকে চেয়েছি যে দুঃস্বপ্ন হবে না।

মানুষজনের ভেতর, যাদের আমি পেয়েছি যারা বেঁচে আছে, যারা মারা গেছে এখন— ওই বইয়ের ভেতরে, ক্লাসিক্যাল মিউজিকে। কিন্তু তা সাহায্য করেছে অনেক দিন। কত বই ছিল যা ছিল জ্যান্ত আর ম্যাজিক্যাল, তারপর তা থেমে গেল। ক্লাসিক্যাল মিউজিক ছিল আমার শক্ত খুঁটি। আমি বেশিরভাগটাই শুনেছি রেডিওতে, এখনও শুনি। আর আমি অবাক হয়ে যাই, এখনও, আর যখন শুনি তীব্র নতুন কিছু যা আগে শুনিনি আর সেটা মাঝেমাঝেই ঘটে। এখন যখন এটা লিখছি আমি রেডিওতে শুনছি কিছু যা আগে শুনিনি কখনও। প্রতিটা নোট উপভোগ করছি সেই লোকটার মতো যে উপোস করে আছে নতুন রক্তের জোয়ার আর নতুন অর্থের জন্য আর সেটা এই মিউজিকে আছে। আমি সত্যি অবাক হয়ে যাই এই মিউজিকের পরিমাণ দেখে যা শতকের পর শতক ধরে চলছে। সেটা নিশ্চয়ই এই কারণে যে এক সময় এইসব মহান মানুষেরা বেঁচে ছিল। আমি এটাকে ব্যাখ্যা করতে পারব না কিন্তু এ আমার জীবনের অসীম ভাগ্য বলতে হবে যে আমি এদের পেয়েছি, অনুভব করেছি, এ আমার খাদ্যের মতো, উৎসব করার মতো। রেডিওতে ক্লাসিক্যাল মিউজিক না চালিয়ে আমি কখনও কিছু লিখি না, ওটা আমার কাজের অঙ্গ চিরকাল, লিখতে লিখতে এই মিউজিক শোনা। হয়ত, কোনওদিন, কেউ আমাকে ব্যাখ্যা করে বলবে কীভাবে মিরাকেলের এতটা শক্তি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের ভিতর থাকে? আমার সন্দেহ হয় আদৌ কেউ আমাকে এটা বলতে পারবে কি না। আমাকে চিরটাকাল শুধু এই প্রশ্ন নিয়ে থেকে যেতে হবে। কেন, কেন, কেন আরও বই নেই এই শক্তি নিয়ে? লেখকদের অসুবিধেটা কী? কেন এত কম ভালো লেখক চারদিকে?

রক মিউজিকে আমার এ ব্যাপারটা ঘটে না। একটা রক মিউজিক কনসার্টে গেছিলাম, আমার বউয়ের জন্য, লিন্ডা। আমি তো ভালো লোক, তাই না? তাই না? যাইহোক টিকিটের জন্য পয়সা লাগেনি, রক মিউজিসিয়ানদের বদ্যান্যতায় যারা আমার বই পড়ে। আমাদের একটা স্পেশাল সেকশনে বিখ্যাত বড় বড় লোকজনের সঙ্গে থাকার কথা। একজন ডিরেকটর, প্রাক্তন এক অভিনেতা, আমাদের তার স্পোর্টস ওয়াগানে তুলে নেওয়ার জন্য গাড়ি চালিয়ে এল। তার সঙ্গে আরেকজন অভিনেতা। এরা সব প্রতিভাবান লোকজন, আসছে, আর খুব খারাপ মানুষ নয়। আমরা গাড়ি চালিয়ে গেলাম ডিরেকটরের বাড়ি, ওখানে ছিল তার মেয়ে বন্ধুটি, আমরা তাদের বাচ্চাটাকে দেখলাম আর তারপর একটা লিমুজিনে চড়ে চললাম। মদ, কথাবার্তা। কনসার্ট হবে ডডজার স্টেডিয়ামে। আমরা ঢুকলাম দেরিতে। গান শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। ২৫০০০ লোক, ফাটিয়ে আওয়াজ। একটা স্পন্দনের শিহরণ সেখানে ছিল কিন্তু তা মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। ব্যাপারটা খুবই সাধারণ। আমার মনে হয় লিরিক্স ঠিকই ছিল যদি আপনি তা বুঝতে পারেন। ওরা হয়ত বলছিল বিষয়ের কথা, চিরাচরিত সমাজিক প্রথার কথা, প্রেম পাওয়া আর হারানোর কথা, ইত্যাদি। লোকজনের ওটা দরকার ওই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, বাপ-মায়ের বিরুদ্ধাচারণ, কিছুর একটা বিরোধিতা। কিন্তু সফল কোটি কোটি টাকা কামানো একটা দল, কিছু আসে যায় না তারা কী বলল, ওরা নিজেরাই এখন প্রতিষ্ঠান।

তারপর কিছুক্ষণ পর ওদের দলপতি বলল, ‘এই কন্সার্টটা লিন্ডা আর চার্লস বুকাওস্কির সম্মানে।’ ২৫০০০ লোক হর্ষধ্বনি করে উঠল যেন তারা জানে আমরা কে। এটা হাস্যকর।

সিনেমার বড় বড় তারকারা দল বেঁধে বেরিয়ে গেল। আগে ওদের সাথে দেখা হয়েছে আমার। ব্যাপারটা আমাকে চিন্তায় ফেলল। ডিরেক্টর আর অভিনেতারা আমার বাড়ি আসতে পারে ভেবে আমার চিন্তা হচ্ছিল। আমার বিরক্ত লাগে হলিউড, ওদের ফিল্ম আমার খুব কমই ভালো লাগে। আমি কী করছি এই লোকগুলোর সাথে? আমিও কি ঢুকে পড়লাম গলতায়? ৭২ বছর ধরে লড়ে শেষ অবধি এই গলতায়?

কনসার্ট প্রায় শেষের মুখে আর আমরা ডিরেক্টরদের পিছু পিছু ভি আই পি বারে। আমরাও বাছাইদের মধ্যে আছি, ভাবা যায়?

ভেতরে অনেক টেবিল আর বার। আর সব বিখ্যাতরা। আমি সোজা বারে গেলাম। বিনি পয়সায় মদ। বিশাল চেহারার এক কালো মানুষ বার সামলাচ্ছিলেন। আমি আমার মদটা অর্ডার দিলাম আর বললাম, ‘এই মদটা খেয়ে, আমরা পেছনে চলে যাব আর ঝাড়পিট করব।’

বারটেন্ডার হাসল।

‘বুকাওস্কি!’
‘আপনি চেনেন আমায়?’
‘আমি আপনার নোটস অফ এ ডার্টি ওল্ড ম্যান পড়তাম এল এ ফ্রি প্রেস আর ওপেন সিটিতে।’
‘বাহ, ভাবা যায় না…’

আমরা হাত মেলালাম। মারপিট আপাতত বাতিল।

লিন্ডা আর আমি নানান লোকের সাথে কথা বলছিলাম, কী নিয়ে তা আমি জানি না। আমি বারে বার বারে ফিরে যাচ্ছিলাম আমার ভদকা ৭-এর জন্য। বারটেন্ডার আমাকে পাতিয়ালা পেগ বানিয়ে দিচ্ছিল। আসার সময়েও লিমুজিনে তেড়ে মদ খেয়েছি। আমার জন্য রাতটা সহজ হয়ে এল, ব্যাপারটা হল তেড়ে পাতিয়ালা পেগ দ্রুত আর মাঝে মাঝেই মেরে দেওয়া।

যখন রকস্টার এসে ঢুকল ততক্ষণে আমার চড়ে গেছে কিন্তু সেখানে আছি তখনও। সে এসে বসে কথা বলতে লাগল কিন্তু আমি জানি না কী নিয়ে। তারপর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পালা এল। এটা স্পষ্ট যে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। আমি শুধু জানি পরে আমি যা শুনেছি সেটুকু। লিমুজিনটা আমাদের ফেরত এনেছিল কিন্তু যখন বাড়ির সিড়ির কাছে পৌঁছেছি আমি পড়ে গিয়ে ইটে মাথা ঠুকে ফাটিয়ে ফেললাম। আমরা সবে ইটগুলো লাগিয়ে ছিলাম। মাথার ডানদিকটা রক্তাক্ত আর আমার আঘাত লেগেছে ডান হাতে আর পিঠে।

এর অনেকটাই টের পেয়েছিলাম সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন মুততে গেলাম। একটা আয়না ছিল। নিজেকে লাগছিল পুরনো দিনের মতো শুঁড়িখানায় মারপিট করার পর। ভগবান। আমি কিছুটা রক্ত ধুয়ে ফেললাম, খেতে দিলাম আমাদের ৯টা বেড়ালকে তারপর ফিরে গেলাম বিছানায়। লিন্ডার শরীরটাও ভালো ছিল না। কিন্তু তার রক শো সে দেখেছিল।

আমি জানতাম আমি আগামী ৩ বা ৪ দিন লিখতে পারব না আর রেসের মাঠে যেতে দিন দুয়েক সময় লাগবে।

আমার জন্য সেটা ছিল ফের ক্লাসিক্যাল মিউজিকের কাছে ফিরে যাওয়ার সময়। আমি খুব সম্মানিত হয়েছি ইত্যাদি। এটা দারুণ ব্যাপার যে রকস্টাররা আমার লেখা পড়ে কিন্তু জেলখানায় আর পাগলা গারদে আমি লোকজনের মুখে শুনেছি তারাও আমার লেখা পড়ে। কেউ যদি আমার লেখা পড়ে আমি আর কী করতে পারি। ভুলে যান।

আজ রাতে দোতলার এই ছোট ঘরে বসে রেডিও শুনতে ভালো লাগছে, বুড়ো শরীর, বুড়ো মন সেরে উঠছে। আমার জায়গা আসলে এখানে, এভাবেই। এভাবেই। এভাবেই।

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

   

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*