ফাঁস

নিবেদিতা আইচ

 

রফিক সাহেব দরদর করে ঘামছেন। স্কুলের বারান্দায় বসে আছেন স্থাণু হয়ে। একটু আগের ঘটনাটা আসলে হজম করতে পারছেন না কিছুতেই। ঘন ঘন রুমালে মুখ মুছছেন যেন মনের গ্লানিটাও মুছে যাবে রুমালের ভাঁজের সাথে! পিয়ন এসে খানিকটা অবাক গলায় জানতে চাইল শরীর খারাপ লাগছে কিনা। এমন উদভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে সে-ই স্যারকে ধরে রুমে নিয়ে গেল।

একটু ধাতস্থ হবার পর রফিক সাহেব পুরো ব্যাপারটা ঠান্ডা মাথায় আরেকবার ভাবার চেষ্টা করলেন। ছেলেটাকে নিরেট গাধা ছাত্র বলেই ভেবেছেন এতদিন। ওর মুখে এমন কথা শুনে একই সাথে বিস্ময় আর অপমান তাকে বশীভূত করে ফেলেছে। সেই জ্বলজ্বলে দৃষ্টিটাই বা ভুলবেন কী করে! রফিক সাহেব ছটফট করে ওঠলেন ভেতরে ভেতরে। স্থির হয়ে বসা সম্ভব না। একটু পরেই টিফিন বিরতি। কাউকে কিছু না জানিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়লেন তিনি।

‘সরযূবালা হাই স্কুল’-এ এই মাসেই রফিক সাহেবের পনেরো বছর পূর্ণ হল। সবাই তাকে ভীষণ ভক্তিশ্রদ্ধা করে। মাঠ পেরিয়ে ধুলোর রাস্তায় উঠে একবার পেছনে ফিরে তাকালেন তিনি। প্রায় শত বছরের পুরনো একটা ভবন দাঁড়িয়ে আছে, যার ইট, কাঠ, পাথর সবই তার নখদর্পণে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। যেন প্রতিটা ইট আজ তাকে বিদ্রূপ করছে! রফিক সাহেব খাড়া রোদ মাথায় নিয়ে হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন। কোথায় যাবেন এখন নিজেও জানেন না। কোথাও কি একদণ্ড স্বস্তি মিলবে আজকে তার?

এই রাস্তা ধরে আরও মিনিট দশেক হেঁটে গেল সোনাতলি দীঘি চোখে পড়ে। রফিক সাহেব ঘোরগ্রস্তের মতো অতদূর হেঁটেই চলে যেতেন যদি বাজারফেরত ভ্যানটা তাকে তুলে না নিত। পায়ের ব্যথাটা নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল একটু একটু করে। তাই বসতে পেরে আরাম হল এবার।

ভ্যানওয়ালা তাকে স্যার বলে সম্বোধন করেছে। তার মানে লোকটা রফিক সাহেবকে চেনে! নিশ্চয়ই ওর সন্তানও সরযূবালার ছাত্র! না, এত কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না আর। শুধু সবুজ নামের ওই ছেলেটার কথাই ঘুরে ফিরে ভাবনায় আসছে তার।

‘কাজটা কি ঠিক করলেন স্যার?’

ঠিক আর ভুলের জবাবদিহিতা যে এমন কারও কাছে করতে হবে তা কল্পনার অতীত ছিল। এই প্রশ্নের মুখে পড়বেন বলেও কি ভেবেছিলেন? ভাবেননি, কারণ সত্যটাকে এড়িয়ে গেছেন এতদিন। কিন্তু আজ সেটাই তীক্ষ্ণ বর্শার ফলার মতো তাকে জর্জরিত করে দিয়েছে, ভেতরটা রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে তার। তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। নির্জনে কোথাও বসে বুক খালি করে যদি কাঁদতে পারতেন!

স্যার কই যাইতেছিলেন?

রফিক সাহেব যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। এখন কথা বলতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। কিন্তু লোকটা দ্বিতীয়বার মুখ ফিরিয়ে হাসি হাসি মুখে একই প্রশ্ন করল। কিছু হাসি মেকি হয় না, কিছু আহ্বান অবহেলা করা যায় না! রফিক সাহেবও সাড়া দিতে বাধ্য হলেন।

আপনি কোথায় যান?
আমি তো স্যার এখন ভ্যান জমা রাখমু, তারপর বাড়িত যামু, আপনার বাসা কোনখানে? নামায় দিয়া আসি?
আপনি কে? স্যার স্যার করতেছেন কেন? আমাকে চেনেন?
আমার নাম মোহাম্মদ আলাল। আমার ছেলে আপনার ছাত্র। ক্লাস সেভেনে পড়ে সে… আপনার ক্লাস সে খুবই মনোযোগ দিয়ে করে, আপনাদের দোয়ায় অংকের মাথা ভালো আমার ছেলেটার…

লোকটার লাজুক হাসি দেখে রফিক সাহেব সহসা কোনও কথা খুঁজে পান না। এত আন্তরিকতা আজকে সইবে না তার। একে এড়াতেই হবে। তাই ভীষণ গম্ভীর হয়ে এলোমেলো ভাবনায় ডুব দিলেন তিনি। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর ভ্যানের গতি শ্লথ হয়ে এল। আর স্যারের চিন্তায় ছেদ পড়ল ভ্যানওয়ালার ডাকে।

স্যার, কই যাবেন কইলেন না?
কোথাও তো যাওয়ার জায়গা নাই ভাই, তুমি যেখানে খুশি নাও..

অন্যসময় হলে সোজা বাড়ি যেতেন তিনি। কিন্তু এরকম মানসিক অবস্থায় এমন অনেক কথাই মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়। লোকটা ইতস্তত করছে। এই গরমের মধ্যে ওকে গাধার মতো খাটাতেও ভালো লাগছে না। ভ্যান থেকে নেমে গেলেন তিনি। নেমেই পকেট থেকে টাকা বের করলেন।

আলাল এক লাফে দূরে সরে গেল। ঘন ঘন মাথা নেড়ে কীসব বলতে লাগল সে।

আহ টাকাটা রাখো… অনেক দূর চলে আসছি… এই রোদে। তুমি বাড়ি যাও এখন…

আলাল কিছুতেই রাজি হচ্ছে না দেখে রফিক সাহেবও অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। ধমক লাগালেন তিনি।

কী হয় টাকাটা নিলে?
স্যার আপনে আমার ছেলের শিক্ষক, টাকা নিলে গুনাহ হইব, এটা আমি পারুম না!

রফিক সাহেব আর ধৈর্য ধরতে পারছেন না। হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছে সব মিলিয়ে। শিক্ষক হলেই কী! তিনিও রক্তমাংসের মানুষ, ফেরেশতা তো নন। এসব আদিখ্যেতা, ন্যাকামি এ যুগে অচল।

বিড়বিড় করতে করতে হাঁটছেন তিনি। গলা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে আছে, বুকের ছাতিটা ফেটে আসতে চায়। সামনে একটা শিরিষ গাছ একাবোকা দাঁড়িয়ে আছে একঢাল ছায়া নিয়ে। সেই ছায়াই এখন তার গন্তব্য। কয়েক পা এগোতেই পেছন থেকে আলালের ডাক এল। না, আজ হয়তো তিনি একটু আড়াল পাবেন না কোথাও! বিরক্তিতে ক্লান্ত লাগে তার।

কী ব্যাপার?
স্যার, এই ব্রিজটা পার হইলেই আমার বাড়ি। যাবেন? ওই যে আপনি বললেন আপনের যাওয়ার জায়গা নাই…

আলালের কথাগুলো কিছুই কানে গেল না রফিক সাহেবের। চোখ মুখ অন্ধকার করে এল। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না তিনি। ধপ করে রাস্তায় বসে পড়লেন।

আলাল চমকে গিয়ে ছুটে এল। ওর হাত ধরে কোনওরকমে ভ্যানে উঠে বসলেন স্যার। একটা আধছেঁড়া ছাতা ছিল আলালের সাথে, সেটা মেলে দিতেই চোখের সামনের আঁধারটা একটু সয়ে এল। আলাল দ্রুত পায়ে প্যাডেল চালিয়ে ছুটেছে। রফিক সাহেব জানেন না কোথায় চললেন।

দুই।।

বাড়ির আশেপাশে রায়হানকে অনেক খুঁজেও পাওয়া গেল না। রেহানা রাগে গজগজ করতে করতে ফিরে এসে চুলোর কাছে বসল। গামলায় সদ্য জবাই করা মুরগিটা রাখা আছে।

আলাল এসে দাওয়ায় বসে। রেহানার ঘামে ভেজা মুখটা দেখে মায়া লাগে তার।

আমারে দে, কাজ আগাইয়া দেই!
কল থেইকা পানি আইনা দাও… কী করে স্যারে?
হাত মুখ ধুইয়া বইছে।
নাস্তাটা মুখে দিছে?
হ কিন্তু ভাত খাওনের সময় এইটা..
কী করুম, যা আছিল কোনওমতে রান্ধসি। আর এই দুপুরবেলায় তুমি তারে লইয়া আইবা আগে কইছিলা?
আচ্ছা হইছে, অহন মাথা গরম করিস না, তাড়াতাড়ি রান্ধন শেষ কর… রায়হান কই গেল? তার স্যার আইছে আর হ্যায় কই গিয়ে পলাইছে!

রেহানা মশলাগুলো কষায় ভালো করে। ঘ্রাণে ম-ম করছে পুরো বাড়িটা। আলাল ভাবছে এবার থেকে আরও ঘন ঘন মাংসের ব্যবস্থা করতে হবে। ছেলেটা এত পছন্দ করে! কিন্তু বাড়িতে শুধু মেহমান এলেই এসব ভালোমন্দ রান্না হয়।

কল থেকে পানি তুলে এনে দেয় আলাল। মাংসগুলো কষানো হলে কড়াইতে পানি ঢেলে ঢেকে দেয় রেহানা।

একটু আলু ছাড়লে পারতি!
আলু নাই… তুমি যাও স্যারের কাছে, চুলার পাড়ে তোমার কী কাম?

রেহানা মুখ কালো করে বসে থাকে। ঘরে বাজার সদাই কিছু নেই তার মধ্যে এমন একজনকে ধরে এনেছে এই অসময়ে। ঠিক করে যত্নআত্তি করার মতো অবস্থায় নেই ওরা। আলালের কাণ্ডজ্ঞান আর কবে হবে!

রেহানার রান্না যখন শেষের দিকে তখন পেয়ারা গাছের পেছনে রায়হানকে দেখতে পায় আলাল। ছেলেকে ডেকে আনে সে। সবেমাত্র পরীক্ষা শেষ হয়েছে ওর। তাই সারাদিন টো টো করে বেড়ায়। কী চেহারা হয়েছে! চুল উস্কুখুস্কু, মুখটা রোদে পুড়ে লালচে হয়ে আছে।

শিগগির গিয়া গোসল কইরা আয়… তোর অংক স্যারে বাড়িত আইছে, বেড়াইতে।

রায়হান হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। মাথামুণ্ডু বুঝতে পারে না। রফিক স্যার ওদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে!

সত্য?
হ সত্যই তো!
উনি কই আব্বা?
ঘরে বইছে, তুই পুকুর থেইকা ডুব দিয়া আয়, আম্মায় বকতেছে কইলাম..

রায়হানের কানে এসব কথা গেল না। ছুটে গিয়ে বাইরের ঘরে উঁকি দিল সে। স্যার ওকে দেখতে পেয়ে কাছে ডাকলেন। রায়হান সালাম দিয়ে স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। খুশিতে চোখমুখ ঝলমল করছে ওর।

কোন শাখা?
স্যার, শাপলা শাখা!
রোল?
৪…

হ্যাঁ, রফিক সাহেব এবার মনে করতে পারছেন। তিনি নবম দশম শ্রেণির ক্লাস নেন নিয়মিত। ছোটদের ক্লাস সপ্তাহে দুটোর বেশি নিতে পারেন না।

প্রথম আর দ্বিতীয় সাময়িকে গণিতে কত নাম্বার পেয়েছ?
নিরানব্বই আর পঁচানব্বই।
পাঁচ নম্বর কোথায় গেল?
স্যার দ্বিতীয় সাময়িকে একটা জ্যামিতি ভুল করছিলাম..
সর্বোচ্চ কত ছিল?
স্যার এটাই সর্বোচ্চ।
গুড। এবার কত পাবে?
স্যার এবার প্রশ্ন কঠিন হইছে কিন্তু আমি সব অংক ঠিকমতো করে আসছি।
তোমার প্রিয় বিষয় কোনটা?
গণিত। স্যার আমার অংক করতে খুব ভালো লাগে।

রফিক সাহেব রায়হানকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। পেছনে কখন আলাল এসে দাঁড়িয়েছে ওরা টের পায়নি। আলাল চুপচাপ ওদের কথাগুলো শুনছিল। গর্বে বুক ভরে ওঠে তার। ছেলেটা মেধাবী, ওদের সংসারে এটা আল্লাহর একটা বড় রহমত।

স্যার ও কিন্তু বড় হয়ে আপনার মতো শিক্ষক হইতে চায়..

রায়হান লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখে। রফিক সাহেব আরও দ্বিগুণ অপ্রস্তুত হয়ে বসে থাকেন। তার মতো হতে চায় কেন? তিনি তো কারও আদর্শ হতে পারেন না!

রায়হানকে গোসল করতে পাঠিয়ে আলাল এসে স্যারের পাশে বসে। আজকে দেখা হবার পর থেকেই মনে হচ্ছে স্যার কিছু নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন।

স্যার শরীরটা কি একটু ভালো লাগতেছে এখন? বাড়িতে কি ফোন করছিলেন?

রফিক সাহেব নড়েচড়ে বসেন। বাড়িতে তার অনেক কাজ। মেজ মেয়েটার বিয়ের প্রস্তুতি চলছে। সত্যিই তো বাড়িতে জানানো খুব প্রয়োজন। এদিকে ফোনটাও ভুল করে অফিসঘরে ফেলে এসেছেন। আর বসে থাকা চলে না। তাকে ফিরতে হবে এখুনিই। আজ স্কুলে গিয়েছিলেন শুধু কয়েকটা সিগনেচার করতে। এত বেলা হয়ে গেছে সেটা এখন খেয়াল হল!

আলাল, আমি এখন উঠি। বাড়িতে কাজ আছে। তুমি ভাই অনেক করলে আজ!

স্যার আপনি কিছু মনে করলেন না তো? বাড়িতে ফোন করতে বলছি তারা দুশ্চিন্তা করতে পারে তাই। আর আপনি আসছেন, আমি কোনও মেহমানদারি করতে পারলাম না এখনও, দুইটা ভাত খেয়ে তারপর যাবেন..
না, না কী বলছ তুমি! আমার এখন যেতেই হবে।
স্যার কিছু মনে নিয়েন না, আমার ছেলে আপনারে খুব মান্যগণ্য করে। আপনি এমনে চলে গেলে সে খুব কষ্ট পাবে, আমি এখনই ব্যবস্থা করতেছি, দুইটা মিনিট বসেন আপনি।

আলাল ছুটে বেরিয়ে গেল। রফিক সাহেব হতভম্বের মতো বসে রইলেন। আজ পুরো প্রকৃতি বুঝি তাকে শাস্তি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। এত সম্মান যা এতকাল তার অহংকারের কারণ ছিল আজ সেটা শুধু গলায় ফাঁস হয়ে এঁটে বসছে!

তিন।।

রঞ্জু রফিক সাহেবের মেজ মেয়ে। আব্দুল চেয়ারম্যানের ভাগ্নের সাথে ওর বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছে। এর মধ্যে আংটি বদলও হয়েছে। কদিন পরেই ওদের বিয়ের অনুষ্ঠান। তার আগে এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে কিছুতেই ভাবতে পারেননি রফিক সাহেব।

প্রায় দু’সপ্তাহ আগে চেয়ারম্যানের বাড়িতে ডাক পড়ল তার। আব্দুলকে কখনও একা দেখা যায় না, সারাক্ষণ পাঁচ ছ’জন সাঙ্গপাঙ্গ তাকে ঘিরে থাকে। কিন্তু সেদিন আর কেউ ছিল না। শুধু রফিক সাহেব আর চেয়ারম্যান।

আধঘণ্টা পর রফিক সাহেব বেরিয়ে এলেন গোমড়া মুখে। টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন চাওয়া হয়েছে তার কাছে— এই কথাটা বাড়ি ফিরেও কাউকে বলতে পারলেন না। চেয়ারম্যানের ছেলে সবুজ, এবার তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়ার কথা। কিন্তু সে এতই খারাপ ছাত্র যে ম্যাট্রিকে বসবে কি সে টেস্টেই ফেল করবে। এ ব্যাপারে সবাই মোটামুটি নিশ্চিত। ফেল এড়াতে প্রশ্নপত্র চাওয়া হয়েছে স্যারের কাছে!

রফিক সাহেব দু’টো দিন ভাবলেন। তারপর বাড়িতে ব্যাপারটা খুলে বললেন। সবাই জানে আব্দুল মিয়া লোকটা সুবিধার নন। তার স্বার্থ উদ্ধার না হলে বিয়েবাড়িতে এই নিয়ে ঝামেলা হবে বোঝাই যাচ্ছে। রঞ্জু কেঁদে কেঁদে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলল। মেয়ের মা আরেক কাঠি সরেস। সে খাওয়াদাওয়াই বন্ধ করে দিল। বিয়েটা ভেঙে গেলে সমাজে মুখ দেখানো যাবে না, সামান্য একটা প্রশ্নের জন্য এত বড় শাস্তি মেয়েকে দেয়া ঠিক হবে না— এসব কথা বলে বলে সবাই রফিক সাহেবকে অস্থির করে দিল। তিনি বললেন— সামান্য একটা প্রশ্নের জন্য যে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় সে সম্পর্কে আর না জড়ানোই মঙ্গল। শুধু আংটি বদল হয়েছে। কাবিন তো হয়নি!

যে যার যুক্তিতে অটল রইল বলে রফিক সাহেব আর তার স্ত্রীর মধ্যে প্রতিদিনই কথাকাটাকাটি, মনকষাকষি হতে লাগল।

তোমার মেয়ের পরে অন্য জায়গায় বিয়ে হবে ভাবতেছ? ওরা ঝামেলা করবে না তোমার সাথে? এই তোমার বিবেচনা? তাছাড়া মেয়েও বিয়ে বসবে না অন্য কোথাও!

আংটি পরাইলেই কি বিয়ে হয়ে যায়? আজকাল দিন বদলাইছে… অন্য জায়গায় মেয়েরে বিয়ে দিব। আর আমার সম্মানটা থাকবে? প্রশ্ন ফাঁস করতে বলতেছ?

তুমি থাকো তোমার সম্মান নিয়ে, এই মেয়ে গলায় দড়ি দিবে! লিখে রাখো কথাটা!

মেয়ের মা হাপুস নয়নে কাঁদে। রফিক সাহেব ভাবেন মেয়ে গলায় দড়িই দিক। এমন মেয়ে তিনি জন্ম দিলেন! আর ছেলেটাই বা কেমন! মামার কথায় বিয়ে ভেঙে দেবে!

আরও দুটো দিন ঝিম মেরে রইলেন রফিক সাহেব। কয়েকদিন বাড়িতে পা রাখা গেল না। মা মেয়ের আহাজারি, অনশনে নরকে পরিণত হয়েছিল সব। তারপর একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সরাসরি আব্দুল মিয়ার বাড়িতে চলে গেলেন রফিক সাহেব। একটা কথাও মুখ দিয়ে সরল না।

চুপচাপ একসেট প্রশ্ন দিয়ে এলেন। আব্দুল চেয়ারম্যান বারবার বলল ব্যাপারটা গোপন রাখা হবে, কাকপক্ষীও টের পাবে না!

এরপর আরও একটা সপ্তাহ কেটে গেছে। রফিক সাহেব কিছুটা সামলে উঠেছেন। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেন তিনি, মেয়েটা বিয়ের পর শান্তিমতো সংসার করুক। বাবা হিসেবে তার আর কীই বা করার ছিল!

টেস্ট পরীক্ষার আর যখন চার পাঁচদিন বাকি তখন আজ সকালে সবুজ নামের ছেলেটা এসে তার সামনে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে ঘৃণা বড় স্পষ্ট! রফিক সাহেব দরকারি কাগজে সাইন করছিলেন। এসব সেরেই বাড়ি ফেরার কথা তার। রঞ্জুর বিয়ের কেনাকাটা অনেক কিছুই এখনও বাকি। ছেলেটা একরোখার মতো দাঁড়িয়েই রইল রুমের সামনে। রফিক সাহেব মুখ তুলে তাকালেন ওর দিকে।

কিছু বলবে?
আমি পরীক্ষা দিব না…
মানে!
কাজটা কি ঠিক করলেন? আপনাকে খুব সম্মান করতাম স্যার…

রফিক সাহেব নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মুখে দাঁড়িগোফের জঙ্গল নিয়ে ভবঘুরের মতন দেখতে এই ছেলেটার ম্যাট্রিক পরীক্ষার বয়স কম করে হলেও আরও দু’বছর আগে হয়ে গেছে। মেধা নেই কিন্তু মেরুদণ্ড আছে। আর দৃষ্টিতে আছে আগুণ! এর উত্তাপ আজ টের পেলেন রফিক স্যার। ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন তিনি। কিন্তু সামলে নেবার সুযোগটাও দিল না ছেলেটা, পরীক্ষা দেবে না কথাটা জানিয়েই হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেল। ওর শরীরটা একটা বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত রফিক সাহেব পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর একসময় স্কুলের বারান্দায় বসে পড়লেন।

আলাল এসে তার হাত ধরতেই ভীষণ চমকে গেলেন তিনি। আজকের সকালের ঘটনাটা ভাবতে বসে স্থানকালের হিসেব ভুলে বসেছিলেন। আলাল কিছুই জানতে চাইল না। বিছানায় চাটাই পেতে খাবার পরিবেশন করতে লাগল। রায়হান দরজার কাছে লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় ঘোমটা তুলে আলালের বৌ ভাত তরকারি এগিয়ে দেয় ওদের।

আলালের ছেলেকে নিয়ে খেতে বসলেন রফিক সাহেব। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অবিরাম। এত সম্মান, এত আদরের যোগ্য তিনি নন, কেন এরা অপাত্রে সবকিছু দেয়! রফিক সাহেব নিজের বিবেকের কাছে ধরা পড়ে গেছেন আজ। কেউ একজন চোখের সামনে আঙুল নেড়ে বলে যাচ্ছে— তুমি ভণ্ড, তোমাকে চেনা হয়ে গেছে!

হুইলার্স স্টল । দ্বিতীয় বর্ষ, দশম মেল ট্রেন

  • Hindutwa or Hind Swaraj
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1097 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*