একটি ড্যান্স হাঙ্গামা

শৈলেন সরকার

 

শব্দ পাচ্ছিস না কোনও? কী বললি, বুঝে উঠতে পারছিস না? ঠিক আছে, ওই পশ্চিমের আকাশটাতে জঙ্গল ছুঁয়ে বেশ হলদেটে ভাব আছে না একটু, সেই আকাশটাকে লক্ষ করে কানটা খাড়া কর, এবার বুঝতে পারছিস? ফাঁকা মাঠ ছাড়িয়ে, দূরের অস্পষ্ট ঘরবাড়ির ছায়া ছাড়িয়ে, বাঁধ ছাড়িয়ে, নদী বা জঙ্গল ছাড়িয়ে কোথাও দূর দ্বীপের কোনও গ্রাম থেকে আসা ঝমঝম করা ধ্বনি না একটা! যেন কোনও গলা চড়ায় উঠতে উঠতে আচমকা নামতে শুরু করল। ঠিকই ধরেছিস, যাত্রা চলছে এখনও। নাম? নাহ্, নাম মনে নেই আমার। হবে কিছু একটা, ওই যেমন, ‘বউ গেলে বউ পাব, মা গেলে মা পাব না’ বা ‘রক্তধারায় সিঁথির সিঁদুর’। তোর বন্ধু কী বলল ফিসফিস করে? মানে, যার সাইকেলের রডে বসে আছিস—, সেই হলুদ হওয়া আকাশের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতে দেখে, তোকে উসখুস করতে দেখে, বলল না কিছু?  

এটা মরানির গন। সপ্তমী না কি অষ্টমী? নদীতে ভাটা চলছে এখন। মরানি না হলে ভুগতে হত খুব। নৌকায় উঠতে গিয়ে জেটি ছাড়িয়ে নামতে হত। গদ ভাঙতে হত। কিন্তু মরানি না হয়ে পূর্ণিমা কি অমাবস্যা বা তার আশপাশে হলে কী এমন আলাদা হত! তোকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত কেউ? বা তোর সঙ্গীকে? সাইকেল বা মোটর সাইকেল? তোদের চারপাশে এই যে চাদরে মুখ ঢাকা, এই যে ছায়া ছায়া নিঃশব্দ মানুষের মিছিল— এরা কি বসে থাকত ঘরে? কালাবানুর ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারত কেউ? তেমন হলে অনেক হিসেব করে আরও অনেক আগেই বাড়ি ছাড়ত সবাই। একেবারে জোয়ার থাকতে থাকতেই নদী পার হত। শুধু কি নদী পার হওয়া? এরপর মোটর ভ্যান, হাঁটা, ফের নদী, ফের মোটর ভ্যান—। এত কিছুর পর গিয়ে কালাবানুর ড্যান্স হাঙ্গামা। গেল একমাস ধরে বুধবারের বাজার, মাঝের খেয়া বা পঞ্চায়েত অফিস, স্বাস্থ্যকেন্দ্র  যে জায়গার কথাই বল সর্বত্র একটাই মাইকিং, ‘পঁচিশ তারিখ মনসামেলা উপলক্ষে—।’ এরপর এপাড়া থেকে ওপাড়া, এ কান থেকে ও কান, ফিসফিস গুজগুজে একেবারে কোথায়—। সত্যি কথা বলতে কী এ খবর কোন পর্যন্ত গিয়ে যে পৌঁছেছে তা আমি নিজেও জানব না। তোর কথাই ভাব, সেই কোন শহর থেকে ট্রেন-অটো-মোটর ভ্যান-নৌকা হয়ে বন্ধুর ঘর, এরপর—। আর যাত্রা তো একটা রাখতেই হয়। রাত না হলে, মানে অন্তত মাঝরাত না হলে হাঙ্গামার মেজাজটা আসবে কোত্থেকে বল? যাত্রার কথায় মনে পড়ল, আমি কিন্তু যাত্রাভক্ত ছিলাম খুব। আমাদের সময়—। থাক, এখন মাইলের পর মাইল ঠেঙিয়ে কে আর—। তোদের কথাই ধর, জাস্ট যাত্রা হলে আসতিস? কেন এলি? না কালাবানুর অনুপ্রেরণার ড্যান্স হাঙ্গামা। শুনেছিস তো সব? কালাবানুর এক কথায় মঞ্চের উপর নাচতে থাকা মেয়েছেলেরা কেমন কাপড়-জামা খুলে—। শুধু মঞ্চের নাচনেওয়ালীদের কথাটা বলা ভুলই হয়ে গেল। কে নয়? মঞ্চের সামনে বসে থাকে যারা? না, বসে আর থাকে কোথায় সবাই, বসে-দাঁড়িয়ে-শুয়ে। জেগে-আধাঘুমে-নিদ্রায়। সবাই, সবাই একেবারে—। কালাবানুর এক কথায়, পাড়ার মস্তান, দূরের প্রোমোটার, সমিতি, জেলা পরিষদ, এমএলএ, এমপি—। সব, সব্বাই পাগল কালাবানুর ডায়লগে। সবার ঘোর হয় যেন। বা ভয় পায় কালাবানুর মাইককে। ভয় না কি ভক্তি? ভয়ের সঙ্গে ভক্তির এই সম্পর্ক, তোকে বলেই ফেলি, বাঙালির বেলায় একেবারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট—। যাকে যত ভয়, তাকে তত ভক্তি। ভয় না জাগাতে পারলে ভক্তির অনুপ্রেরণা কোথায়? এটুকু না বুঝলে কীসের কালাবানু? অনেক কিছুই তো শুনেছিস আমাকে নিয়ে, এই প্রথম সুযোগ পেলি দেখার। দেখ! আর অল্প সময়ই বাকি তো! এই সময়টা বরং কল্পনা কর মনে মনে। কী এমন আছে মানুষটার, মানুষটার এক কথায় কেন হাজার-হাজার—, হাজার-হাজার মানুষ কেন তাদের সবকিছু—, তাদের ঘর-সংসার ভুলে, জমি জঙ্গল ভুলে, ফ্ল্যাট-বাড়ি বা গোপন রিসর্টের কথা ভুলে শুধু কালাবানুর জন্য—। আরে এই তো আমি! সেই কখন থেকেই তো আমাকে মনের মধ্যে বয়ে—। শুধু তুই বা কেন, কে নয়? সবার মনের মধ্যেই তো বসে আছি কবে থেকে! সবার, যেমন তোর বা সাইকেল চালাতে থাকা তোর সঙ্গীর। বা একেবারে চুপচাপ চাদরে মুখ ঢেকে তোর আগেপিছে যাঁরা—। এমনকি সেই যাত্রার আসরে বসে থাকা পাড়ার মা-মাসি-দিদা বা দাদু-জেঠু সবার মনের মধ্যেই এখন আমি। আমিই। জানি তো, টের পাই সব! সবার মনের সব গুপ্তকথাই জানা আমার, এই কালাবানু একেবারে নিচের তলা থেকে ধাপে ধাপে—। সবার মনোবাসনাই জানা আমার। সবার গোপন অভিসন্ধি, ব্যাভিচার, হননেচ্ছা, কী নয়? সবার মনের মধ্যেই আমার ডায়লগ। ‘তোনে আইসু বইলা ত আমানকে এগা করতে হয়… আমানে ত খারাপ…।’ সবার মনের মধ্যেই এখন আমার সেই খরখর গলা, ‘কী রে, কী খবর তোনকের… সব ত অ্যান্টেনা খাড়া কইরা বুসিয়াছু, ভালো?’ না, সবাই এখন কেউ সাইকেলে, কেউ বা মোটর সাইকেলে, কেউ বা হাঁটতে হাঁটতে—। কেউ বা এর মধ্যেই—। মানে যাত্রা প্যান্ডেলের বাইরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে কোথাও বসে বা দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছে। বা পানের ডিব্বা বের করে—। বা কেউ উঁকি মারছে জুয়ার আসরেও। তিন তাস। কেউ কি বসবি বসবি ভাবছিস? আছে কিছু একস্ট্রা? জুয়ার বাজারে অবশ্য সাইকেল, হাতঘড়ি, মোবাইল এমনকি মোটর সাইকেল বন্ধক নেওয়ার লোক রেডি আছে অনেক। দেখ কে বেশি টানে? তিন তাস না কি কালাবানু? নাচ করতে আসা ফর্সা আর ডগমগে মেয়েগুলি কিন্তু এসে গেছে অনেকক্ষণ। একেবারে কলকাতার। হ্যাঁরে বাবা, থাকবে সিনেমার, টিভি সিরিয়ালের—। চিনতে পারিস কিনা দেখ! ওরা কিন্তু হাঁফাচ্ছে সবাই, অপেক্ষায় আছে আমার জন্য, খবর নিচ্ছে অনবরত। সবাই ভাবছে কী বলব আজ, কীভাবেই বা সাজতে বলব সবাইকে, কীভাবে সাজাতে চাই। এমনকী যাত্রা দলের ম্যানেজারও জানে, টেনে যেতে হবে ওকে। একেবারে আমি না আসা পর্যন্তই। জানে আমি আসামাত্রই যাত্রা থামিয়ে মাইকে—।

রাত কত হল বল তো? খুব মুশকিল। আমি জানি মোবাইল না দেখে বলতে পারবি না কিছুতেই। আকাশে চাঁদ অবশ্য আছে একটা। আধখাওয়া, ভাঙা। পাশে হালকা পলকা মেঘ। রাস্তায় গাছপালার ফাঁক ফুড়ে ছেঁড়াখোড়া আলো। না না, এই চাঁদ বা আলো দেখে রাতের পরিমাণ বোঝা অত সহজ নয়। রাত মানে রাত। অন্ধকারের উপর অন্ধকার। অন্ধকারের ভেতর ডুবে থাকলে তখন আর আন্দাজ নেই কোনও। আউশের শেষে ফাঁকা মাঠ এবড়ো-খেবড়ো বুক নিয়ে অপেক্ষায় আছে আমনের চাষের জন্য। ব্যান তৈরির কাজ শুরু হয়নি এখনও। আসলে আকাশ এত খা— খা—। জৈষ্ঠের রোদ শুষে নিয়েছে সব। বীজতলা তৈরির জন্য কিছু অন্তত বৃষ্টি—। বৃষ্টির কথা এখন অবশ্য না আনাই ভালো। এই মুহূর্তে একটা বৃষ্টি মানেই ভুগতে হবে কালাবানুকে। অন্য একটা দিনে আসতে হবে ফের। বৃষ্টি আসুক, আসতেই পারে, আসার দরকারও খুব। এই মুহূর্তে জল না পেলে গরিব চাষিকে ভুগতে হবে। পাম্প ভাড়া করে পুকুর বা খাল থেকে কতটাই বা জল—। না না, বাঁচতে হবে সবাইকে। এরাই তো বছরের পর বছর আমার অনুপ্রেরণায় শরীর-মন উজার করে—। এরাই তো ঝড়-জল-বৃষ্টি ভুলে কালাবানুর ডাকে—। এরাই তো শ’য়ে শ’য়ে, হাজারে হাজারে, একেবারে পুবের বাতাসে বড়গাঙের ঢেউয়ের মতো নাচবে, হাসবে, জয়গান গাইবে কালাবানুর নামে। এরাই তো—। বৃষ্টি সুতরাং হোক, তবে কালাবানুকে আগে দাঁড়াতে দাও একবার মঞ্চে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে হাঁক দিতে দাও একবার! তারপর যেমন খুশি একেবারে মাঠ-জঙ্গল ভাসিয়ে—। আরে হ্যাঁ, বন্যার জলও থেমে যাবে কালাবানুর ধমকানিতে। হাঙ্গামা একবার শুরু হয়ে গেলে ফুল পেমেন্ট বাঁধা। মিস এষা, মিস রত্না, মিস পিয়া বা মিস রাইমারা জানে। জানে মাস্টার বাবলু বা পিন্টুরাও। সবাই ভরসা রাখে কালাবানুর ওপর। এরপর জুয়ার বাজারের কথা ভাবো, বা মেলার চা-দোকান, মিষ্টি বা তেলেভাজা। কসমেটিকসের দোকানিরা বা শাড়ি, চুড়িদার, লুঙি। বা জুয়ায় হারাদের জন্য বন্ধকী কারবারের মস্তানরা? ভাববে না ওদের কথা? এপাড়ার মাস্তান, ওপাড়ার প্রোমোটার, রাস্তা সাড়ানোর টাকা খেয়ে হজম করা সমিতি মেম্বার? সবাই, সবাই রাতভর যখন জয়গান গাইবে তোমার, একমাত্র তোমার নামেই জয়ধবনি তুলবে— ভাবতে হবে না তাদের কথা? সবার কথা ভাববে কালাবানু, ভাববে জুয়ারিদের কথাও। পকেট ফাঁকা হলে এদের জন্যই তো একরাতে পনেরো হাজারের মোবাইল এক হাজার বা পঞ্চাশ হাজারের বাইক স্রেফ পাঁচ হাজার। ভাববে মাতালদের কথাও। পা টলমল করা চোলাই বা দেশি। আকাশের দেবতা হয়ে কালাবানুকে ভাবতে হবে সবার কথাই। বৃষ্টি সুতরাং বন্ধ, হ্যাঁ, আরে বাবা আমি কালাবানুই বলছি তো!

শুনতে পাচ্ছিস? এবার কিন্তু পা চালিয়ে। মাইকে কী বলছে শোন, বলছে, ‘মা-বোনেরা, দাদা-ঠাকুমারা যারা রাত জাগতে পারবেন না, তারা এখন অনুগ্রহ করে বাড়ি চলে যান, চ্যাংড়াদের জন্য জায়গা করে দিন।’ যাত্রা তার মানে শেষ। ওই দেখ ওরা দেখতেও পেয়েছে আমাকে, ‘প্রিয় দর্শকবৃন্দ, যার জন্য আপনারা, যার অনুপ্রেরণা—।’ ‘হ্যালো… হ্যালো… চেক… ওয়ান… টু… থ্রি… হ্যালো… টেস্টিং…।’

এটা কালাবানুর গলা নয়, মানে আমি শুরুই করিনি এখনও, কালাবানুর গলা খড়খড়ে, না ছেলে না মেয়ে। মানে ছেলেও হতে পারে, আবার মেয়েও। আমি সবকিছুর ওপরে। ছেলে বললে ছেলে, আবার মেয়ে বললে মেয়েই। বরং কালাবানুই ভাববি আমাকে। স্রেফ কালাবানু।

উঁহু, বাঁদিকে নয়। ওটা মেয়েদের। স্টেজের সামনে থেকে একেবারে মাঠের শেষ পর্যন্ত হাঁটু সমান উচ্চতার কাপড় টেনে দেওয়া। নিজেদের জায়গায় বসে যা খুশি করো, তবে মেয়েদের ওখানে ঢুকতে গেলেই ভলান্টিয়ার। বাঁশ হাতে দাঁড়িয়ে দেখছিস তো? বাঁশ ছাড়াও প্লেন ড্রেসে—। আসলে মানুষের সিকিউরিটি বলে কথা—। না, কালাবানু নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবে কোথায়? পাবলিক আছে না! জনগণ। কালাবানুকে দেখে তো তারাই। এই যেমন তুই, তোর বন্ধু, চারপাশের ছুটতে থাকা মা-মাসি-দাদা-কাকা। মঞ্চের পেছনে টাঙিয়ে রাখা সবুজ কাপড়ের লেখাটা দেখেছিস? সবকিছু আমারই ঠিক করে দেওয়া। ভালো হয়নি? ‘কালাবানুর অনুপ্রেরণায় সারারাত্রিব্যাপী ড্যান্স হাঙ্গামা, ‘কলকাতার ষোল থেকে আঠারো, ষোল থেকে আঠারো’, ‘গ্যারান্টি হান্ড্রেড পার্সেন্ট’, ‘মিস এষা, মিস রত্না, মিস পিয়া, মিস রাইমা, সঙ্গে মাস্টার বাবলু, মাস্টার পিন্টু।’ পাশের ছবিটাতেই আমি। আমারই পছন্দ। একেবারে সেরা লোক লাগিয়ে তোলা গোটা তিরিশেক ছবির থেকে নেওয়া। ভালো হয়নি? আবক্ষ। হাসিমুখ।

অনেকটাই দূর হয়ে গেল তোদের, আমাকে ছোট ছোট লাগবে। দেরিতে আসায় এখন অবশ্য আফশোস করে লাভ নেই কোনও। তবু একেবারে নিজের চক্ষে দেখার, নিজের কানে শোনার সুযোগ তো পেলি।

কালাবানুকে দেখতে না পেয়েও, নিজের মনের মধ্যে আমাকে লক্ষ করে বলা কথাগুলি অনুভব করে বললাম, ‘দেখা যাবে সব?’ ফিসফিস করেই। সঙ্গী পরমেশ দেখলাম বিরক্ত হল খুব। বলল, কার সঙ্গে কথা বলছিস? চারপাশে নাকি প্লেন ড্রেসেও আছে অনেকে। সিকিউরিটির।

‘না, এটাও আমি না কিন্তু—।’ একেবারে কানের পাশেই কেউ, বা ভুলও শুনতে পারি হঠাৎ করে। বা মনের মধ্যেই। ‘ঢুলুঢুলু চোখের মোটাসোটা যে লোকটাকে দেখছিস ও কর্মকর্তা একটা। এবারের এমএলএ। চায়ের দোকান চালাত বছর দশেক আগে। এখন—।’

‘থাক ওসব কথা, ব্যাটার কায়দা দেখ, এক্কেবারে আমার মতন হাত নাড়ানো, আমার মতোই মঞ্চের এদিক থেকে ওদিক, হাসছেও আবার মুচকি মুচকি, যেন ওটাকে দেখতেই তোরা এসেছিস সবাই। বাড়াবাড়ি করার আগেই কড়কে দিতে হবে একটু। এই যে দুটো শিস আর সতেরোজনের হাততালি শুনলে, এসব ওরই ফিট করা। এবার আমাকে কেমন কপি করবে দেখ, মাইক্রোফোন সেট করবে নিজের হাতে, চশমা মুছবে, এরপর ধমকাবে তোদেরকে। হ্যাঁ, যা বলেছি তাই।’

‘কালাবানুক অনুপ্রেরণায় হাঙ্গামা। কাকোকে যদি দ্যাখতে পাই যে ভিডিও করুঠু, ঔঠি কাটিয়া দুব কয়্যা রাখলি। ভালোভাবে অনুষ্ঠান দ্যাখ, ঘর যা সকালা।’

নিমেষে পুরো মাঠটাই ঠান্ডা মেরে গেল। পরমেশের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ‘কে রে লোকটা?’ আমাদের দু’জনের মুখের চোখদুটো বাদে একেবারে পুরোপুরিই ঢাকা। সবারই। পরমেশ ওই চুপ থাকার মধ্যেই যেন গোত্তা খেয়ে উঠল। বলল, ‘মন্ত্রী চেনো না? ছবিতে দেখোনি কোনও দিন?’

এবার হঠাৎ করেই লোক উঠছে মঞ্চে। একজন, দুইজন, তিনজন—। এবার ফের কালাবানুই কথা বলে উঠল না! আমাকেই। এবং কালাবানুই। ‘এরা সব মান্যগণ্য ব্যক্তি এখানকার, আছেন এমএলএ, এমপি, পঞ্চায়েতের মেম্বার, জেলা পরিষদ, আছে শিক্ষক, নাট্যকার, কবি—। এতবড় একটা অনুষ্ঠান চালানো কি সোজা? তাই আমি, আমিই—। এরা মানে এই সব বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নাকি নাচনি মেয়েদের হাতে ফোঁটা নেবে, ওই ভাইফোঁটার মতোই, নেবে প্রণামও। কেন? এইসব অচেনা ডবকা মেয়েগুলান অহেতুক মাত্র এক রাতের জন্য কি আর এতগুলি পুরুষকে ভাই পাতাতে যায়? এটাকেও সিকিউরিটির মধ্যেই ভাব না! নিরাপত্তার কৌশল। আসবে না সবার মাথায়, আমিই, আমারই মাথা থেকেই—।’

লোকগুলি সব বসছে এক এক করে। চেয়ার পাতা আছে আগে থেকেই। হঠাৎ করেই আলো নিভল মঞ্চের। বোঝা গেল কারা সব উঠছে। এবার হালকা সবুজ রঙের আলো জ্বলে উঠল। চারটি মেয়ে দর্শকদের দিকে পেছন ফিরে সামনে বসে থাকা এমএলএ বা পঞ্চায়েত প্রধানদের দিকে হাত জোড় করে হাঁটু গেড়ে বসে। হঠাৎ করেই শুরু হল, ‘মঙ্গলদীপ জ্বেলে অন্ধকারে দু’ চোখ আলোয় ভ’রে প্রভু… বলো তার কী অপরাধ…।’ গান থামা মাত্রই তুমুল চিৎকার, কেউ আর বসে নেই এখন। উদ্দাম নাচ, পাগলামিই। আমনের চাষের জন্য বুক উঁচিয়ে শুকিয়ে খাক হওয়া জমির আলগা ধুলো তখন বাতাসে। সামনে কী যে হচ্ছে চোখে পড়ছে না কিছুই। মঞ্চে যেন বেঁটেখাটো মতো কেউ। পরনে কী ওটা, সাদা পাঞ্জাবি না লং সালোয়ার? নাকি শাড়িই কোনও? ব্যাটাছেলে না মেয়ে? যে-ই হোক, দেখা গেল মঞ্চ জুড়ে ঘুরে ঘুরে হাত নাড়ছে। দর্শকদের দিক থেকে অনেকেই যেন ছুঁড়েও দিচ্ছে কিছু। হয়তো গোলাপ কি অন্য ফুল। না, শুধু ফুল নয়, পরমেশ বলল, আছে বিড়ি বা সিগারেটের প্যাকেটও। মিনিট পাঁচেকের উল্লাস থামার পর খড়খড়ে গলায় পুরুষ বা মেয়ে যেই হোক বলল, ‘থাম আগে, একদম হল্লা করিসনি, আজ ঐঠি সব হবে, আগে মাইয়াছেলেগুলানদের ভাইফোঁটা দিতে দে, পন্নাম করুক এট্টু গুণী মানুষগুলানরে, মানুষগুলানকে সম্মান জানাতে দে, আমার হাত থেকে সম্মান লওয়ার কত শখ মানুষগুলানের, শখ মিটাইতে দে, তোদের শখ মিটাইবার জন্য আমি তো—। তোনে সকাল পর্যন্ত রইবু ত?’ আবার সেই ধুলোর ঝড়। তুমুল চিৎকার। চিৎকার আর ধুলোর ঝড় উবে গেলে দেখি মঞ্চে কালাবানু ছাড়া কেউ নেই আর।

‘আচ্ছা, আমি ভাবি, তোনকের কি লজ্জাও লাগে না একটু, ঘরে বউ রাখিয়া আইসা ল্যাংটা মাগিদের লাচ দ্যাখতে চলিয়াসসু। তবে তেনে আইসু বইলা আমার আর আমার মায়াছানাগ্যার ভাত জোটে। কিন্তু একটা কথা, কেউ যদি ভিডিও করু বা ওই লেজার লাইট লইয়া কায়দা করু আগে তাকে পুঁতব, তারপর অনুষ্ঠান হবে। আর মাইয়াছেলেদিগের এদিকে এদিকে বলা চিল্লিবুনি, কালাবানু আছে মানে জানবু, সকলক সবটা দেখতে পাবে।’  

এবার দু’জন ছেলে আর সঙ্গী মেয়েও দু’জন। মাইকে শুরু হল হিন্দি সিনেমার গান। ‘তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত…।’ আমাদের কালাবানু কিন্তু নামল না মঞ্চ থেকে, বরং নাচতে থাকা জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েদের মধ্যে গিয়ে কোমর দুলিয়া আসছে। অর্থাৎ কালাবানুও জানে সব। নাচ, গান, নাটক। সঙ্গীত বা অভিনয়। মঞ্চের আলো পাল্টাচ্ছে লাল থেকে নীল, নীল থেকে সবুজ। ধুলোর ঝড় উড়ছে চারপাশে। পুরুষ সঙ্গীরা একেবারে নিজেদের হাতেই খুলে দিল মেয়েদের শরীরের উপরের অংশ। চড়া লাল আর সবুজের দুটো টপ ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে মেয়েদু’টির শরীর বেয়ে, মিস এষা আর মিস রত্না—। প্রথমেই বুক, এরপর গলা, মাথাটাকে মুহূর্তের জন্য আড়াল করে টপদুটো মেয়েদুটোর শরীর ছেড়ে এখন একেবারে বাইরে মিস্টার বাবলু আর মিস্টার পিন্টুর হাতে। দুলতে থাকা মেয়েদের শরীরের সঙ্গে বাবলু আর পিন্টুর হাতেও উড়ছে সেই লাল আর সবুজের দুই টপ। এবার ভিড় থেকে মঞ্চের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকা জনাপাঁচেক ছেলে। হাতে পাঁচশ’ কি দু’হাজার। আমার শরীর, আমার শরীর—, এই প্রথম কোনও মেয়ের, এই প্রথম—। যেন ফরসা আকাশে ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ।

নাচ শেষ হওয়ামাত্রই ফের কালাবানু। ‘কী রে প্রথমেই ঝটকা লাগল কীরকম? পুরা সিনেমা অখন বাকি পড়িয়াছে। সিনেমা দেখার পরও যার ইঞ্জিন ঠান্ডা হবেনি, সে আমার ফোন নম্বর লে। তার ঘরে তুলসীতলায় খাট ফেলি করিয়া দিই সব। দম আছে কারও।’ একেবারে সামনের সারির এক দর্শক বলল কিছু, হেসে উঠল কালাবানু। সেই হাসি বিদ্রুপের, সেই হাসি একই সঙ্গে স্নেহেরও। ‘— আরে তোনকের দৌড় আমার জানা আছে। তোনে ত দিনের বেলা সব চরিত্রবান, ভদ্রলোক, আর রাইত হইলে আমার খোঁজ, কালাবানু কুনঠি আছে, চ…। বাদ দে পরের লাচটা দেখ…।’

এবার হিন্দি নয়, বাংলা। ‘সারা রাতটা উলুক-ভুলুক করে কাটাইলি, ভোর রাতে চাবি ঢুকাই তালা খুলে দিলি…।’ একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। মিস রাইমা ও মিস্টার বাবলু। নাচ হচ্ছে আর মিস্টার বাবলু একে একে মিস রাইমার—। প্রথমে উপরের হলুদ রঙের টপের মতো কিছু একটাকে, আর গানের ‘ঘরে আমি একাই ছিলাম, ঘুমাই নাই তোর ডরে—’ লাইনটি গাওয়া হচ্ছে যখন, তখন দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। শুধু কি আমার, নিশ্চিত সবার। কেন না, কোথাও আর কোনও উচ্চারণ নেই। মুহূর্তের জন্য ধুলোর ঝড়ও যেন উধাও। মিস্টার বাবলু এবার মিস রাইমার কোমরের পাশে বসে। তার দাঁত দিয়ে মিস রাইমার শরীরের একমাত্র আচ্ছাদন নিচের স্কার্টটিকে টেনে মেয়েটির গোড়ালির দিকে নিয়ে আসছে, আর—। পুরো আকাশ খুলে যাচ্ছে। খুলে যাচ্ছে। আমার শরীর কি অসার হয়ে যাচ্ছে? নোটের তাড়া নিয়ে জনা পাঁচ-ছয় ছেলে মানুষজনকে মাড়িয়ে মঞ্চের দিকে ছুটছে। ওদের ধাক্কায় যারা ছিটকে যাচ্ছে, তারাও বলছে না কিছু। সামনের বাঁশ হাতে দাঁড়ানো ভলান্টিয়াররা সবাইকেই ধরে ফেলছে। এবার হঠাৎ করেই চিৎকার, ‘এদিকে—, এদিকে—।’

এবার ফের কালাবানু, ‘তোনে ত দিনের বেলা সব চরিত্রবান, তোদের চরিত্র সব কীরকম ক দেখি? খবরে পড়ছু ত, একটা পাগলিরও পেট করিয়া দিছে…।’

এবার ‘ষোল বয়েসি, হয়েছি রূপসী, একশ’ টাকা কেজি ফলের দাম/ আমি যে ফলওয়ালী, ফলওয়ালী, কে নিবি আমার পাকা পাকা আম—।’

এখন আর মেয়েদের পোশাক নেই কোনও। মিস এষা, মিস রত্না, মিস পিয়া, মিস রাইমা। উদোম গায়ে শুধুমাত্র একটা ওড়না জড়িয়ে গ্রিনরুম থেকে বেরিয়ে মঞ্চে উঠেই সেটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে। সেই ওড়না ধরার জন্য—।

আমি কি মঞ্চের ধারে চলে এসেছি? নাকি সব মানুষজনই শুয়ে বা বসে উড়ে আসা ওড়না খুঁজছে বলে আমি এত সহজেই—। আমি সব দেখতে পাচ্ছি, ইচ্ছে করলেই ছুঁতে পারছি সবাইকে, ছুঁতে পারি সবকিছু, ছুঁতে পারি আমাকেও, আমার—। আমার প্যান্ট কোথায়? শার্ট? পরমেশ? সেই ধুলোর ঝড়, উন্মাদনা, উল্লাস কোথায়? না কি আমিই হারিয়ে ফেলেছি সবকিছু। আমার চোখ, আমার কান, আমার সব ইন্দ্রিয়ানুভূতি। আমার যৌনসুখ। না কি কেউই কোথাও নেই আর। কেউ কি আর নেই? সবাইই কি হারিয়ে যাচ্ছে? হারিয়ে গেছে? পাশের মেয়েদের এলাকা আলাদা করে রাখা সেই কাপড়ের ব্যবধানই বা কোথায়? মেয়েরা? মাথার ওপর হাঙ্গামার চাঁদোয়া না কি আকাশ? আকাশটাই কি চাঁদোয়া? কালাবানু হাসছে, আমার মনের মধ্যেই যেন, না কি মঞ্চেই। সেই মৃদু আর বিদ্রুপের হাসি। বিদ্রুপ আর স্নেহপ্রশ্রয়ের।

আমি উঠে দাঁড়াতে চাই, আমি দাঁড়িয়ে থাকতেই চাই। আমি ফিরতে চাই। আমার মাথার উপর অন্ধকার, আমার শরীর জুড়ে অন্ধকারের দেওয়াল। অন্ধকারের ওপর অন্ধকার। অন্ধকারের চাপে ছোট হয়ে যাচ্ছি, আমি ফিরতে চাই। কালাবানু হাত নাড়তে থাকে। কালাবানু ঘুরতে থাকে গোটা মঞ্চ জুড়ে। মঞ্চ ছেড়ে নেমে গোটা মাঠ। গোটা দ্বীপ, গ্রাম, নদী আর মোটর ভ্যান জুড়ে। জেলা থেকে জেলা, শহর থেকে শহর। আমার মন জুড়ে, আমাদের শরীর জুড়ে। আমাদের সব যৌন ইচ্ছাগুলি জুড়ে। আমাদের খিদে, আমাদের তৃষ্ণা জুড়ে। অন্ধকারে অন্ধকারে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকে শরীর। আমি আর অবাক হতেও পারি না। আমার সবকিছুতেই যে শেষ পর্যন্ত কালাবানু ছাড়া আর কিছুই নেই সেই বোধটুকুও হারিয়ে যেতে থাকে।  

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*