একটি খোলা চিঠি

সৌরভ প্রকৃতিবাদী

 

ছোটনাগপুর মালভূমির পূর্বতম প্রান্তের নিম্নতম ধাপের একটি পাহাড়শ্রেণি অযোধ্যা পাহাড়শ্রেণি। মাঠাবুরু, গোর্গাবুরু, পাখিপাহাড়, অযোধ্য পাহাড়গুলি এই পাহাড়শ্রেণির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়। সারা বছর ভ্রমণপিপাসু সবুজপ্রেমী বহু মানুষ ভিড় করেন পশ্চিমবঙ্গ ওড়িশা ঝাড়খণ্ড বিহার সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। কেবল বেড়াতে যাওয়ার জায়গা হিসেবেই নয় অযোধ্যা পাহাড়শ্রেণি ভারতের তামাম আদিবাসী জনতার কাছে আরও গভীর গুরুত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বছরের কিছু বিশেষ দিনে এই পাহাড় তাদের টেনে আনে লক্ষে হাজারে। পাহাড়ের উপর থাকা সীতাকুণ্ড, সুতানতান্ডি বাৎসরিক শিকার উৎসব, অথবা বাৎসরিক মিলন উৎসব পালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বিশেষ করে সাঁওতাল জনজাতির মানুষের কাছে। এই অযোধ্যা পাহাড় দেশের শক্তি মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে ২০০৫ সাল থেকে। এই সময় অযোধ্যা পাহাড়ের বাঘমুন্ডি-র দিকের ঢালে বারেরিয়া গ্রামের ঠিক নিচে বামনি নদীর ওপর তৈরি হয় পুরুলিয়া পাম্পড পাওয়ার স্টোরেজ প্রকল্প। এটি একটি পাম্প স্টোরেজ ধরনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রোজেক্টটির প্রমিস ছিল ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের। ২২৫ মেগাওয়াটের চারটি রিভার্সিবিল টার্বাইন দিয়ে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কথা। বামনি নদী থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার সরলরৈখিক দূরত্বে আছে তুর্গা নদী। তুর্গা নদীর উপর আর একটি পাম্পড পাওয়ারস্টোরেজ প্রোজেক্ট তৈরি হওয়ার কাজ প্রায় রাস্তায় পড়ে গেছে। এর সাথেই আগামী তিন বছরের মধ্যে ওই একই পাহাড়ে আরও দুটি পাম্পড পাওয়ার স্টোরেজ প্রোজেক্ট তৈরি হওয়ার কথা। তৃতীয় এবং চতুর্থটি হল যথাক্রমে কাঁঠালজোল এবং বান্দু নদীর উপরে। অর্থাৎ একরকম গোটা অযোধ্যা পাহাড়ের চারদিকে চারটি পাম্পড পাওয়ার স্টোরেজ প্রকল্প চারটি পৃথক পৃথক নদীর উপর হতে চলেছে।

এই চিঠির উদ্দেশ্য দেশবাসীর কাছে এই প্রোজেক্টগুলির সাথে সম্পর্কিত চিন্তার বিষয়গুলি তুলে ধরা।

  1. একটি মাত্র ছোট পাহড়ের উপর এই ধরনের চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ যুক্তিসঙ্গত কি না?
  2. এই পাহাড়ের অনন্য (অন্যত্র অমিল) জীববৈচিত্রের ভবিষ্যৎ কী?
  3. এই পাহাড়ের অনন্য সাংস্কৃতিক গুরুত্বের ওপর এই প্রোজেক্টগুলি কী প্রভাব ফেলতে পারে?
  4. প্রোজেক্টগুলি সম্পন্ন হলে এই অঞ্চলের কমবেশি ৭৫টি গ্রামের মানুষের জীবনজীবিকায় কী প্রভাব পড়বে?

১। বামনি নদীর উপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে এবং শেষ হয় ২০০৭ সালে। এটি সাধারণ কোনও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নয়। অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতন এতে অনেক জলের প্রয়োজন হয় না। তুলনামূলক অনেক কম পরিমাণ জলেই এই ধরনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কাজ করতে পারে। বরং বলা ভালো তুলনায় শুকনো অঞ্চলেও জলবিদ্যুৎ তৈরি করা যায় এই ধরনের ব্যবস্থাপনা দিয়ে। কী হয় এখানে? কোনও নদীর উপর বাঁধ দিয়ে একটি উচ্চ জলাধার নির্মিত হয়। ওই উচ্চ জলাধারের থেকে কয়েকশো মিটার নিচে আরও একটি জলাধার নির্মাণ করা হয় যাকে নিম্ন জলাধার বলে। উচ্চ জলাধারটিতে নদীর জল আটকে রেখে একটি সুড়ঙ্গপথে নিচের জলাধারে নিয়ে এসে ফেলার সময় মাধ্যাকর্ষণের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে টার্বাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এই টার্বাইন রিভার্সিবল বা দুই দিকেই ঘুরতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর নিম্ন জলাধার থকে ওই জল আবার পাম্প করে উপরের জলাধারে তোলা হয়। এই সময় উৎপাদিত বিদ্যুতের অনেকটাই খরচ হয়ে যায়। ফলত প্রকল্পের মোট উৎপাদন আর প্রাথমিক উৎপাদনের সমান না থেকে কমে আসে অনেকটাই। কিন্তু জলের অপ্রতুলতার সমস্যাটি এতে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। জাপান থেকে আমদানি করা এই প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে জাপানে বেশকিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প চলছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রকল্পটির ধরনের একটি সুবিধা হল— কম জলেও এটি চলতে পারে ফলে অযোধ্যার মতন একটি শুকনো পর্ণমোচী অরণ্যেও এই প্রোজেক্ট করা সম্ভব হচ্ছে।

আর অসুবিধা বা সমস্যার জায়গাগুলি কীরকম?

দুটি জলাধার নির্মাণ করতে হচ্ছে ফলে—

  • প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ অথবা ডাইভার্শনের প্রয়োজন পড়ছে।
  • দ্বিগুণ পরিমাণ কৃষিজমি, বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে।
  • দ্বিগুণ পরিমাণ নির্মাণ খরচ হচ্ছে।
  • দ্বিগুণ পরিমাণ নির্মাণ উপাদান ব্যবহারের ফলে সেই নির্মাণ উপাদান তৈরিতে, পরিবহনে হয়ে যাওয়া পরিবেশহানি মোট পরিবেশের উপর প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলছে।
  • মূলত শুকনো অঞ্চলে এই ধরনের প্রকল্প তৈরি হওয়ার ফলে এমনিতেই জলের সংকট আরও প্রবল আকার ধারণ করছে।
  • নদীগুলি ক্ষীণকায়া হওয়ায় এই প্রকল্পে তাদের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ছে।
  • মোট উৎপদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ এবং ভোক্তাদের থেকে আসা টাকার ফারাক কোষাগার শূন্য করছে।
  • ছোট্ট একটি পাহড়ের উপর এই পরিমাণ খোঁড়াখুড়ি চলায় পাহাড়ের মাটির বাধন আলগা হয়ে আসার ফলে ধ্বসের সম্ভাবনা বেড়ে উঠছে।

উপরের সমস্ত সমস্যাগুলিই অযোধ্যায় ঘটে চলেছে। মাত্র কয়েক কিলোমিটার বিস্তৃত একটি রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে এই ধরনের উন্নয়ন কার্য চলার ফলে রিজার্ভ ফরেস্টটির আর কোনও ফরেস্ট অস্তিত্বই থাকবে না হয়তো আগামী দিনে। কেবল মাত্র তুর্গা নদীর উপর হতে চলা প্রকল্পই প্রায় ২৯২ হেক্টর জমি গিলে খাবে। এর মধ্যে ২৩৪ হেক্টর জমি হল বনভূমি। এই ধরনের চারটি প্রোজেক্টে প্রায় ১০০০ হেক্টর বনভূমি ও সর্বমোট অন্তত ১২০০ হেক্টর ভূমি নষ্ট হয়ে যাবে এবং পুরোটাই ঘটছে উত্তর দক্ষিণে সর্বাধিক ২৫ কিলোমিটার ও পূর্বপশ্চিম সর্বাধিক ১৮ কিলোমিটার এবং সর্বনিম্ন ৬ কিলোমিটারের একটি অঞ্চলের মধ্যে, যার পুরোটাই ভঙ্গিল পাহাড়। বামনি থেকে তুর্গার দূরত্ব কম বেশি ২.৫ কিলোমিটার। এবং চারটি প্রোজেক্টের প্রত্যেকটিই একে অপরের থেকে ১০ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি দূরে নয়। এই রকম একটি জায়গায় এ ধরনের চারটি নদী শুষে নেওয়া প্রোজেক্ট কীভাবে ছাড়পত্র পেতে পারে তা বোধগম্য হয় না।

২। পুরুলিয়া জেলা বনদফতর তার ওয়েবসাইটে লিখছে–

Bio-Diversity :

Biogeographically it represent zone 0 6 B (Deccan Peninsula Chhotonagpur), Mammal – 39 species (5 in Schedule – I) – (Pangolin, wolf, leopard cub, leopard, elephant). Amphibian – 9 species, Fish – 27 species, Mollusk – 9 species. Most interesting is Madras Tree Shrew which is found on the top hills of this ecosystem and nowhere else in West Bengal. Ajodhya hill ecosystem hosts few number mega-mammals like elephant. Though major elephant habitat is engulfed by PPSP.At present number of such resident elephant is considered to be 8-10. Apart from that the seasonally migrated herds of elephant from nearby Jharkhand forest took shelter in this area for days together in different seasons of the year.

Ecological Importance :

The total area drains into two major river system, namely Subarnarekha and Kangsabati. Ajodhya hill plays an important role in harvesting of monsoon rain. Moreover, few lakhs of people residing in and around forest directly or indirectly depends on this forest for fodder, fuel wood, small timber and other tangible or intangible benefits. Small dams like Murguma, Pardi, Burda, Gopalpur, Tilaitar helps in irrigation of agriculture field.

উপরে দেওয়া তথ্য ররকারি তথ্য ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের। এবার দেখা যাক কয়েক দশক আগে এই অঞ্চলে কী ধরনের জীববৈচিত্র পাওয়া যেত বলে দাবি করেছিলেন সরকার। আমরা সরকারি গেজেট থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি তালিকা পাচ্ছি :

Leopard, Jungle Cat (বন বিড়াল), Leopard Cat, Hyena, Wolf, Jackal, Fox (খ্যাঁকশিয়াল), Black/Sloth Bear, The common otter (ভোঁদড়), Indian Civet (ভাম), The Indian grey mongoose (নেউল), Wild Pig (বুনো শুয়োর), Sambar, The barking deer (muntjac), The four horned antelope, Common Hare, Rhesus Macaque, Langur, The short-tailed Indian pangolin, The striped, squirrel, Porcupine, House mouse, House rat, House shrew, Bandicoot rat, Yellow bat, Flying-fox.

বোঝাই যাচ্ছে কী পরিমাণ জীববৈচিত্র্য এই বনাঞ্চল আশ্রয় দিত! যার অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। তারপরেও সরকারি দাবি অনুয়ায়ী অন্তত ৫টি স্তন্যপায়ী প্রজাতি এই অঞ্চলে রয়েছে যারা শিডিউল ১-এর অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জার্ড। অর্থাৎ যাদের বাসস্থান রক্ষা করা জাতীয় দায়। এদের মধ্যে প্রধানতম হল হাতি। এই অঞ্চলে ১২টি হাতির একটি দল স্থায়ীভাবে থাকে। এই বনাঞ্চল নষ্ট হলে এই হাতিদের যাওয়ার জায়গা থাকবে না। ইতিমধ্যেই বামনি নদীর উপর তৈরি প্রথম প্রোজেক্টের জন্য খাবারের অভাব ঘটায় হাতি গ্রামের মধ্যে ঢুকে আসছে বলে জানাচ্ছেন গ্রামের মানুষ। এমনকি মৃত্যুও ঘটছে মানুষ এবং হাতি উভয়েরই।

পিপিএসপি প্রোজেক্টে কাটা পড়েছে অন্তত সাড়ে তিন লক্ষ গাছ। একটি গাছও লাগানো হয়নি ক্ষয়পূরণ বনসৃজন হিসেবে। তুর্গার জন্য কাটা পড়বে অন্তত ৪ লক্ষ গাছ। যদিও সরকারি ইআইএ-তে ভুরি ভুরি মিথ্যা কথায় বলা হয়েছে গাছ কাটা যাবে নাকি মাত্র ৬ হাজার। যখন ক্লাইমেট চেঞ্জ এবং অন্যান্য দূষণজনিত সমস্যার সঙ্গে লড়তে চাইছে বিশ্ব সেইসময় এই বিপুল বনহত্যা কি আত্মহত্যার সামিল নয়?

৩। অযোধ্যা গ্রাম পঞ্চায়েত অঞ্চলেই রয়েছে সুতানতান্ডি অঞ্চল। সাঁওতাল জননজাতির কাছে সুতানতান্ডি পবিত্র অঞ্চল। রয়েছে সীতাকুণ্ড। সারাভারতের আদিবাসী মানুষের কাছে সীতাকুণ্ডের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সীতাকুণ্ডের চার পাশে বাৎসরিক মিলন উৎসবে জড়ো হন লক্ষাধিক আদিবাসী মানুষ। গোট জঙ্গল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মারাংবুড়ুর থান। সেই সব থানেরই বা কী হবে? রয়েছে মারাংবুড়ু পাহাড় যে পাহাড় নিজেই এক আরাধ্য। মারাংবুড়ু পাহারের বেশিটাই ডুবে যাবে তুর্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উচ্চ জলাধারের জলে।

একবার ভাবুন তো এটি আদিবাসী মানুষের সাথে না হয়ে যদি হত হিন্দু অথবা মুসলমান মানুষের কোনও আরাধনার জায়গায়? হয়তো দেশ জুড়ে ধ্বংসলীলায় মেতে উঠত তারা। সরকারও ভয় পেত! কিন্তু আদিবাসী বলেই খুব সহজে ধ্বংস করে দেওয়া যাচ্ছে কি এই পবিত্র অঞ্চল?

৪। কোনও উন্নয়নী প্রকল্প হলেই যুক্তি দেওয়া হয় কর্মসংস্থানের। স্থানীয় মানুষজন যাদের জীবনজীবিকা নির্ভর করে জঙ্গলের ওপর, জঙ্গল চলে গেলে তাদের কর্মসংস্থানের কী হবে? পিপিএসপি প্রোজেক্টে কাজ পেয়েছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন। তাও ঠিকা অস্থায়ী কাজ। কনস্ট্রাকশন ফেস শেষ হতেই সে কাজও চলে যায় তাদের। একদিকে চাষের ক্ষেতে জল দেওয়ার একমাত্র উৎস যে ছোট পাহাড়ি নদীগুলি সেগুলিকে বেঁধে দিয়ে জলের সংস্থান সরিয়ে নেওয়া অন্যদিকে কৃষিজমি অরণ্য ডুবিয়ে জীবিকার আরেক সংস্থান কেড়ে নেওয়া হচ্ছে স্থানীয় সত্তরটির ও বেশি গ্রামের মানুষের। প্রসঙ্গত বলে রাখি পিপিএসপি-তে কাজ করেন কম বেশি ২০০ জন স্থায়ী কর্মচারী। চারটি প্রোজেক্টে সেই হিসেবে কাজ করবেন ৮০০ জন। আর জীবিকা হারাবেন ৭০-এর বেশি গ্রামের মানুষ। তাদের বাধ্য হয়ে মাইগ্রেটরি লেবার হিসেবে চলে যেতে হবে অন্যত্র। সস্তা শ্রমের বাজারে ভেসে যাবে মানুষগুলি।

কী চলছে? উন্নয়ন, না গণতন্ত্র?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. দ্বিতীয় বর্ষ, অষ্টম যাত্রা : চলচ্চিত্রচঞ্চরী — ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*